দেয়ালের ওপারে জেমস, দেয়াল ভাঙল অদ্ভুত ছেলেরা—শূন্যতা পেরিয়ে সীমাহীন পূর্ণতা

রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের কার্নিভ্যাল অ্যারেনায় বসে ‘রক এন রিদম ৫.০ : নো লিমিটস ইন দ্য জোন’ শীর্ষক কনসার্ট শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেল তিনটায়। যেখানে সকাল থেকেই গানপাগল শ্রোতারা জড়ো হতে থাকে। এর মধ্যেই দুপুর গড়ায়, সাউন্ড চেক শুরু হয়। বিকেল তিনটায় খুলে দেওয়া হয় গেট, মুহূর্তেই অপেক্ষায় থাকা টিকিট সংগ্রহ করা শ্রোতারা ভেতরে প্রবেশ করে। তাদের সামনে মঞ্চে আসে দ্য ব্লু পোপার্স বিডি এবং এ কে রাহুল। কনসার্ট শুরু।

কয়েকটি গানে পারফর্ম করে তারা নেমে যায়। এরপর ব্যান্ড হাসান আর্ক এসে ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে নিজেদের সাউন্ড ঠিক করে। চারটার পরে শুরু হয় তাদের গান। একে একে নিজেদের জনপ্রিয় কয়েকটি গান পরিবেশন করে দলটি। এর মধ্যেই বাইরে বাড়তে থাকে শ্রোতার উপস্থিতি। নিরাপত্তাকর্মীরাও হতে থাকেন প্রস্তুত, তবে মুহূর্তেই জনস্রোত ঠেকাতে ব্যর্থ হয় নিরাপত্তাকর্মীরা, তাদের সঙ্গে দফায় দফায় চলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। গান শেষ করে হাসান নেমে যায়, এরপর বিকেল ৫টার পর থেকে এই দৃশ্য আরও ভয়ংকর হয়।

মাগরিবের আজানের ঠিক আগে কনসার্টস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। কারণ, এর মধ্যেই ভেতরে প্রবেশের জন্য গেট এবং সাময়িক তৈরি দেয়াল চুরমার করে ফেলে শ্রোতারা। ভেতরে ঢোকার জন্য টিকিট ছাড়া প্রবেশ করতে শুরু করে অসংখ্য মানুষ। যার কারণে ভয়াবহভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে, নারী শ্রোতারা হয়ে যায় আতঙ্কিত। এমন ঘণ্টাখানেক চলার পর চারিদিক থেকে যখন সবাই প্রবেশ করতে শুরু করে, এরপর নিরাপত্তাব্যবস্থা আর কাজ করে না। উন্মুক্ত আকাশের নিচে প্রবেশের জন্য খুলে দেওয়া হয় সব রাস্তা।

এ সময় এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদকের সঙ্গে উৎসাহী কয়েকজন শ্রোতার কথা হয়। যাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল নগর বাউল জেমসের ভক্ত, এরপর ওয়ারফেজ, অর্থহীন এবং শূন্য ব্যান্ডের গান শুনতেই তাদের এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
এদিকে বাইরের কোনো কিছুই যেন ভেতরের উন্মাদনায় ভাটা পড়তে দেয়নি। কারণ সন্ধ্যার ঠিক পরপর স্টেজে আসেন দেশের জনপ্রিয় গিটারিস্ট অনি হাসান। তার সঙ্গে পারফর্ম করে দেশের কয়েকটি ব্যান্ড। উন্মাদনা বাড়িয়ে দিয়ে নামেন অনি। এরপর দুই বছর পর ঢাকায় কনসার্ট করতে মঞ্চে আসে ব্যান্ড শূন্য। দলটির সদস্যরা দেশের বাইরে থাকায় অনেক দিন পর শ্রোতারা তাদের কাছে পেয়ে বেড়ে যায় উল্লাস, দেরি না করে এমিল-শাকেররা গাইতে শুরু করেন নিজেদের একের পর এক জনপ্রিয় সব গান। যে তালিকায় ছিল ‘বেহুলা’, ‘শত আশা’, ‘রাজাহীন রাজ্যে’ এবং ‘শোনো মহাজনের’ মতো জনপ্রিয় সব গান।

শূন্য নেমে গেলে রাত ৮টার পর স্টেজে ওঠে ব্যান্ড অর্থহীন। বেজবাবা সুমন ও শিশির আহমেদ তাদের দল নিয়ে ‘চাইতেই পারো’ দিয়ে শুরু করেন। ততক্ষণে কনসার্টস্থল উল্লাসে মাতোয়ারা। হঠাৎ শুনশান নীরবতা, কারণ সুমন ধরেছেন ‘যদি কোনো দিন’, তার সঙ্গে গাইছে সামনে থাকা হাজারও শ্রোতা। নিজেদের জনপ্রিয় ৬টির মতো গান পরিবেশন করে নেমে গেল তারা। যাওয়ার আগে ‘অদ্ভুত ছেলেদের’ কাছে কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানাতে ভোলেনি গোটা দল।

কিছুটা সময় নিয়ে আসে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ারফেজ। বেড়ে যায় চিৎকার, প্রথম গানের পর স্টেজে আবারও আসে অনি হাসান। নিজের সাবেক এই ব্যান্ডের হয়ে বাজান বেশ কয়েকটি গান। যার মধ্যে কালজয়ী পূর্ণতায় মুগ্ধ হয়ে যায় সবাই। স্টেজ ছাড়ার আগে ব্যান্ডলিডার শেখ মনিরুল আলম টিপু ওয়ারফেজে অনির অবদান এবং শ্রোতাদের প্রতি তাদের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেন।
-edd578.jpg)
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এদিনের কনসার্টের বিশেষ আকর্ষণ নগর বাউল জেমসের দেখা মিলল রাত ১০টার পর। তার গিটারের আওয়াজ শুনেই পাগল দুষ্টুছেলের দল। পাগলামি বাড়াতে জেমসও একের পর এক কালজয়ী সব গান পরিবেশন করতে থাকেন। তবে তার খুব একটা গাইতে হয়নি, কারণ গলা ফাটিয়ে শ্রোতারাই পুরোটা গেয়ে ফেলছিল। রাত ১১টার পর শেষ হয় কনসার্ট, কিন্তু এরপরও থামানো যায়নি উল্লাস।

‘বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে’ বলে জেমস বিদায় নেন, গাড়িতে ওঠেন, তবে ভক্তরা ছাড়ে না, ছুটে চলে তার গাড়ির পিছু পিছু। মারামারি, ভাঙচুর, উল্লাস, উন্মাদনার পর শ্রোতাদের এমন পূর্ণতার মধ্য দিয়ে এদিন শেষ হয় বছরের আলোচিত ‘রক এন রিদম ৫.০ : নো লিমিটস ইন দ্য জোন’ কনসার্ট।