Advertisement

গিটারের তারে আজও বেঁচে আছেন কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু

গিটারের তারে আজও বেঁচে আছেন কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু

বরেণ্য সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু নেই ছয় বছরেরও বেশি সময়। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর আকস্মিকভাবে পরপারে পাড়ি জমান বাংলা ব্যান্ড সংগীতের এই কিংবদন্তি। তার চলে যাওয়ার শূন্যতা আজও অনুভব করেন সংগীতপ্রেমীরা।

Advertisement

রোববার (১৬ আগস্ট) তার জন্মদিন। বেঁচে থাকলে দিনটি ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী ও প্রিয়জনদের ভালোবাসায় মুখর হয়ে উঠত নগরীর এবি কিচেন স্টুডিও।

আইয়ুব বাচ্চু শারীরিকভাবে না থাকলেও তার গান, সুর ও গিটারের জাদু আজও বেঁচে আছে। জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রিয় শিল্পীকে স্মরণ করছেন তার অসংখ্য ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী।

১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খরনা ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। তার বাবা ইশহাক চৌধুরী এবং মা নুরজাহান বেগম। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারের কেউ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ভাই-বোনদের মধ্যেও কেউ সংগীতচর্চা করেননি। তবে ছোটবেলা থেকেই গিটারের প্রতি গভীর আকর্ষণ তৈরি হয় তার।

জিমি হেনড্রিক্সের গিটার বাজানো দেখে আইয়ুব বাচ্চুর মধ্যে গিটারের প্রতি আগ্রহ আরও তীব্র হয় বলে জানা যায়। ১৯৭৭ সালের দিকে তার সংগীতজীবনের শুরু। ১৯৭৮ সালে তিনি ব্যান্ড ফিলিংসে যোগ দেন। সেখানে তার প্রথম গান ছিল ‘হারানো বিকেলের গল্প’। পরে তিনি যোগ দেন সোলস ব্যান্ডে। ১৯৮০ সাল থেকে পরবর্তী প্রায় এক দশক সোলসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।

সোলস ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে আইয়ুব বাচ্চু নিজেই গড়ে তোলেন নতুন ব্যান্ড এলআরবি। শুরুতে LRB-এর পূর্ণরূপ ছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’। একই নামে অস্ট্রেলিয়ায় একটি ব্যান্ড থাকায় পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’।

বাংলা ব্যান্ড সংগীতকে জনপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আইয়ুব বাচ্চুর ভূমিকা ছিল অনন্য। গায়ক, গিটারিস্ট, সুরকার ও সংগীত পরিচালক বহুমাত্রিক পরিচয়ে তিনি তৈরি করেছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। মঞ্চে তার গিটার পরিবেশনা হয়ে উঠেছিল আলাদা এক আকর্ষণ।

ব্যান্ড সংগীতের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও কণ্ঠ দিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু। তার কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়েছে বেশকিছু চলচ্চিত্রের গান। এরমধ্যে রয়েছে ১৯৯৯ সালের ‘লাল বাদশা’ ও ‘আম্মাজান’, ২০০০ সালের ‘গুন্ডা নাম্বার ওয়ান’, ২০০৪ সালের ‘ব্যাচেলর’ ও ‘রং নাম্বার’, ২০০৯ সালের ‘চাঁদের মতো বউ’, ২০১২ সালের ‘চোরাবালি’, ২০১৩ সালের ‘টেলিভিশন’ এবং ২০১৪ সালের ‘এক কাপ চা’।

এরমধ্যে ‘আম্মাজান’ গানটি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় গানে পরিণত হয়। গানটি এখনও শ্রোতাদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়।

আইয়ুব বাচ্চুর প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্তগোলাপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। এরপর ‘ময়না’ (১৯৮৮), ‘কষ্ট’ (১৯৯৫), ‘সময়’ (১৯৯৮), ‘একা’ (১৯৯৯), ‘প্রেম তুমি কি!’ (২০০২), ‘দুটি মন’ (২০০২), ‘কাফেলা’ (২০০২), ‘প্রেম প্রেমের মতো’ (২০০৩), ‘পথের গান’ (২০০৪), ‘ভাটির টানে মাটির গানে’ (২০০৬), ‘জীবন’ (২০০৬), ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ (২০০৭), ‘রিমঝিম বৃষ্টি’ (২০০৮), ‘বলিনি কখনো’ (২০০৯) এবং ‘জীবনের গল্প’ (২০১৫)সহ বেশ কয়েকটি একক অ্যালবাম প্রকাশ করেন তিনি।

এলআরবির ব্যান্ড অ্যালবামের মধ্যেও রয়েছে একাধিক জনপ্রিয় সৃষ্টি। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় ‘এলআরবি’। এরপর ‘ব্যান্ডের সুখ’ (১৯৯৩), ‘তবুও’ (১৯৯৪), ‘ঘুমন্ত শহরে’ (১৯৯৫), ‘ফেরারী মন’, ‘স্বপ্ন’ (১৯৯৬), ‘আমাদের বিস্ময়’ (১৯৯৮), ‘মন চাইলে মন পাবে’ (২০০০), ‘অচেনা জীবন’ (২০০৩), ‘মনে আছে নাকি নেই’ (২০০৫), ‘স্পর্শ’ (২০০৮) ও ‘যুদ্ধ’ (২০১২)সহ বেশকিছু অ্যালবাম প্রকাশিত হয়।

এ ছাড়া বিভিন্ন মিশ্র অ্যালবামেও কাজ করেছেন আইয়ুব বাচ্চু। নব্বইয়ের দশকে এলআরবি ও ফিলিংস যৌথভাবে ‘ক্যাপসুল’ ও ‘স্ক্রু ড্রাইভার’ নামে দুটি অ্যালবাম প্রকাশ করে, যা শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও মঞ্চে গান গেয়ে শ্রোতাদের মাতিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু। তার কণ্ঠ, সুর আর গিটারের অনন্য পরিবেশনা তাকে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে আলাদা অবস্থান দিয়েছে।

২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর না ফেরার দেশে চলে গেলেও আইয়ুব বাচ্চুর গান থেমে যায়নি। তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। জন্মদিনে তাই ভক্তদের স্মরণে আবারও ফিরে আসেন সেই শিল্পী, যার গিটারের তারে একসময় কেঁপে উঠত পুরো মঞ্চ।

গিটারের তারে আজও বেঁচে আছেন কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু