টিপু জানতেন একসঙ্গে মিউজিক করতে পারলে একদিন ইতিহাস হবে

দেশের প্রথম ব্যান্ড হিসেবে একুশে পদক গ্রহণ করেছে তারুণ্যের ক্রেজ জনপ্রিয় ওয়ারফেইজ। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক এই সম্মাননা প্রদান করেন। তার কাছ থেকে ব্যান্ডের পক্ষ থেকে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য শেখ মনিরুল আলম টিপু। পুরস্কার অনুষ্ঠান শেষে দলের সব সদস্য রিকশায় গন্তব্যে ফেরেন।
তার আগে একুশে পদক, ওয়ারফেইজ ও নিজের যুদ্ধ নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা হয় টিপুর।
ব্যান্ডের শুরু বিয়াল্লিশ বছর আগে, ১৯৮৪ সালে। তখন স্কুলপড়ুয়া কয়েকজন কিশোর সিদ্ধান্ত নেয়, রক ও মেটাল সংগীত নিয়ে কাজ করার। এই কিশোরদের মধ্যে প্রধান ছিলেন টিপু। নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বন্ধু কমল, মীর, নাঈমুল, হেলাল ও বাপ্পিকে প্রস্তাব দেন। টিপুর সঙ্গে সবার সিদ্ধান্ত এক হয়ে গেলে জন্ম নেয় দেশের কিংবদন্তি এই ব্যান্ডের।
তবে শুরুর দিকের জার্নি একদমই সহজ ছিল না। গান করার চেয়ে দল টিকিয়ে রাখাই কঠিন ছিল। কারণ দলের সব সদস্যের মধ্যেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা। শুধু টিপু জানতেন, এই ছেলেগুলোর মধ্যেই ইতিহাস গড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তাদের একসঙ্গে পথচলা সম্ভব হয়েছিল অল্প কিছুদিন।

ব্যান্ডটির প্রথমে বাধা আসে সবার পরিবার থেকে। আশির দশকে কারও পরিবারই তখন চায়নি যে, তাদের ছেলেরা অনিশ্চিত একটি ভবিষ্যতের মধ্যে বেড়ে উঠুক। এ নিয়ে টিপু বলেন, ‘ওয়ারফেইজ যখন তৈরি হয় তখন আমাদের সবার বয়স ১৪ কি ১৫। তখন এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে আমি মনে করি। কারণ এত অল্প বয়সে এটি কন্টিনিউ করা যেমন কঠিন ছিল, তেমনই ছিল সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও পারিবারিক বাধ্যবাধকতা। সবাই তখন সেন্ট জোসেফ স্কুলে পড়ি। মনে আছে, আমার পরিবার ছাড়া কারও পরিবারই তখন ব্যান্ড করা মানতে পারেনি। তবে আমার বিশ্বাস ছিল, এই ছেলেগুলো একসঙ্গে মিউজিক করতে পারলে একদিন ইতিহাস হবে। কিন্তু উচ্চ শিক্ষার জন্য এক এক করে সবাই বিদেশে পাড়ি জমায়। আমি থেকে যাই দেশে, সঙ্গে থাকে বন্ধু কমল। এক পর্যায়ে সেও বিদেশে লেখাপড়ার জন্য চলে যায়। তখন আমি একদমই একা হয়ে যাই। ভেঙে পড়ি; কিন্তু হাল ছাড়ি না। গতি কমিয়ে আস্তে আস্তে এগোতে থাকি। এরপর নতুন করে বাবনা, সঞ্জয়, রাসেল আলীসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে চলতে থাকে ওয়ারফেইজ। তখন কমল উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ফিরে এলে আবারও একসঙ্গে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। এর মধ্যে অনেক কিছু ঘটে যায়; কিন্তু আমি কখনো থেমে যাইনি, নিজের এবং ব্যান্ডের ওপর বিশ্বাস ছিল।’

টিপু একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এ ব্যান্ডটি ছেড়ে কখনোই যাননি। একবার এক মাসের জন্য বিরতি নিয়েছিলেন। নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখে ওয়ারফেইজকে আজ শুধু একটি ব্যান্ড নয়, গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠান হিসেবে। তাই দেশের অসংখ্য তরুণ মিউজিশিয়ানরা আজ তাদের আইডল মানেন কমল-টিপুদের। হৃদয়ে ধারণ করেন তাদের কালজয়ী সব গান।

এই ব্যান্ডের ভোকাল তালিকায় ছিলেন বাপ্পি, রেশাদ, বাবনা করিম, সঞ্জয়, বদিউল আলম ‘বালাম’, মিজান রহমান মিজান ও পলাশ নুর (বর্তমান)। তাদের সবাই নিজেদের স্টাইলে সেই সময়ে স্টেজ মাতিয়েছেন। এর মধ্যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজ নিজ ব্যস্ততায় তালিকায় এসেছে পরিবর্তন। যার মধ্যে বালামের ব্যান্ড ছেড়ে যাওয়া ভীষণ কষ্ট দেয় টিপুকে।
টিপু বলেন, ‘ওয়ারফেইজ শুরু থেকেই একটি পরিবার। এখানে আমরা বন্ধু-ভাইর মতোই ছিলাম এবং আছি। তাই সবচেয়ে খারাপ লাগে তখন, যখন কেউ ব্যান্ডটি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ছেড়ে যাওয়ার কারণে আমি একা একা অনেকদিন কেঁদেছিলামও। মনে আছে কমল, বাপ্পিরা যখন বিদেশে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করে, তখন আমি একা একা কান্না করতাম। এরপর বালাম যখন ওয়ারফেইজ ছাড়ে তখনও খারাপ লাগে, কারণ সবে আমরা একটি ধাক্কা সামলে নতুন করে ভালো করছিলাম। এর মধ্যেই সে ছেড়ে যায়। এরপর আমি কখনো আশাহত হইনি। বিশ্বাস ছিল সৃষ্টিকর্তার ওপর, নিজের ওপর—একদিন এর ফলাফল আমি পাবো। সেই বিশ্বাস থেকেই আজ আমরা এখানে এবং দেশের প্রথম ব্যান্ড হিসেবে আমরা একুশে পদক পেলাম।’

চার দশকের বেশি সময় ধরে এই ব্যান্ডের হয়ে ড্রাম বাজিয়ে যাচ্ছেন টিপু। দেশ ও দেশের বাইরে অগণিত শো করেছেন তিনি। এ ছাড়া দীর্ঘ এই সময়ে ওয়ারফেইজ উপহার দিয়েছে অসংখ্য কালজয়ী গান। যার সবকিছুতেই টিপু দলগতভাবে সেরাটি দিয়ে নিজেদের আজ এই অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। এর জন্য তিনি তার ব্যান্ড সদস্য ও অনুরাগীদের জানিয়েছেন হৃদয় থেকে কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।

ওয়ারফেজের বর্তমান লাইনআপ: টিপু (দলনেতা, ড্রামস), পলাশ (ভোকাল), কমল (লিড গিটার), রজার (বেজ), শামস (কি-বোর্ড), সামির (লিড গিটার), সৌমেন (লিড গিটার)।