প্রতিদিন সাল্পিমেন্ট খাচ্ছেন, জেনে নিন শরীরে কি প্রভাব হচ্ছে

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
প্রতিদিন সাল্পিমেন্ট খাচ্ছেন, জেনে নিন শরীরে কি প্রভাব হচ্ছে
ছবি : সংগৃহীত

স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য ভিটামিন, মিনারেল বা বিভিন্ন ধরনের সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার প্রবণতা বর্তমান সময়ে আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই দেখা যায় নানা ধরনের প্রচারণা, যেখানে বলা হয় কোনো একটি সাপ্লিমেন্ট শক্তি বাড়ায়, ত্বক ভালো রাখে, ওজন কমাতে সাহায্য করে বা বার্ধক্যের প্রভাব কমায়।

Advertisement

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সাপ্লিমেন্ট খাওয়া অনেক ক্ষেত্রে উপকারের বদলে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সাপ্লিমেন্টের প্রতি বাড়ছে নির্ভরতা

অনেক মানুষ হয়তো মনে করেন তারা খুব বেশি সাপ্লিমেন্ট খান না। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, প্রতিদিনের তালিকায় রয়েছে ভিটামিন ডি, ম্যাগনেসিয়াম, কোলাজেন, ক্রিয়েটিন, ওমেগা-৩ কিংবা বিভিন্ন হারবাল সাপ্লিমেন্ট।

যুক্তরাজ্যের ভোক্তা অধিকার সংস্থা উইচ (Which)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৭৬ শতাংশ নিয়মিত অন্তত একটি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন। প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন চারটি বা তারও বেশি সাপ্লিমেন্ট খান।

অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট কিডনি ও লিভারের ক্ষতি করতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের বাসিন্দা এবং ব্র্যান্ড ইনফ্লুয়েন্সার জিঞ্জার স্মিথও একসময় মনে করতেন সাপ্লিমেন্ট তার স্বাস্থ্যের উন্নতি করছে। তিনি নিয়মিত উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, হলুদ-ভিত্তিক সাপ্লিমেন্ট, ইলেকট্রোলাইট পানীয়সহ নানা ধরনের পণ্য গ্রহণ করতেন।

কয়েক বছর পর তীব্র কোমর ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে পরীক্ষায় ধরা পড়ে তার কিডনিতে বড় আকারের পাথর হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট একসঙ্গে গ্রহণ করার কারণেই এই সমস্যা তৈরি হয়েছিল।

পরে অস্ত্রোপচার করে সেই কিডনি স্টোন অপসারণ করতে হয়।

লিভারের সমস্যাও বাড়ছে

স্পেনের মাদ্রিদের ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল লা পাজের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. পেদ্রো দে মারিয়া প্যালারেস জানান, হারবাল ও খাদ্য-সম্পূরক সাপ্লিমেন্টের কারণে লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।

তার মতে, অনেক রোগী শুরুতে কোনো ওষুধ খাওয়ার কথা অস্বীকার করেন। পরে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা যায়, তারা নিয়মিত একাধিক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, লিভারের ক্ষতির প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন হারবাল ও ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে ভিটামিন এ, গ্লুটামিন, অশ্বগন্ধা এবং গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্ট লিভারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বেশি মানেই ভালো নয়

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনারসের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ভিক্টোরিয়া টজর্টজিও ব্রাউন বলেন, অনেক রোগী বুঝতেই পারেন না যে তারা একই উপাদান একাধিক সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে গ্রহণ করছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি মাল্টিভিটামিনের সঙ্গে আলাদা করে ভিটামিন বি৬ খেলে শরীরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ভিটামিন বি৬ জমা হতে পারে। দীর্ঘদিন এমন হলে স্নায়ুর ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আবার আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম একসঙ্গে খেলে শরীরে সেগুলোর শোষণ কমে যেতে পারে। এ ছাড়া ভিটামিন এ, ডি, ই ও কে চর্বিতে দ্রবণীয় হওয়ায় শরীরে দীর্ঘ সময় জমা থাকে। তাই সবসময় প্রতিদিন এগুলো গ্রহণের প্রয়োজন নাও হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

যুক্তরাজ্যভিত্তিক পুষ্টিবিদ ক্রিস্টেন স্টাভ্রিডিসের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক মানুষকে বিশ্বাস করাচ্ছে যে সুস্থ থাকার জন্য একাধিক সাপ্লিমেন্ট অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সুষম খাদ্যই প্রয়োজনীয় পুষ্টির প্রধান উৎস।

তার মতে, শীতকালে ভিটামিন ডি, প্রয়োজন অনুযায়ী মাল্টিভিটামিন বা ফিশ অয়েল কিছু ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। তবে কোনো পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি আছে কি না, তা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অনুমান করা উচিত নয়।

  • সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার আগে যেসব বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি
  • কোনো সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
  • লেবেলে উল্লেখিত দৈনিক গ্রহণমাত্রা দেখে নিন।
  • একাধিক সাপ্লিমেন্টে একই উপাদান আছে কি না, তা যাচাই করুন।
  • নিয়মিত ওষুধ খেলে সাপ্লিমেন্টের সঙ্গে তার কোনো পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে কি না, তা জেনে নিন।
  • সুষম খাদ্যের বিকল্প হিসেবে সাপ্লিমেন্টকে ভাববেন না।

সাপ্লিমেন্ট অনেক ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে, বিশেষ করে যখন শরীরে কোনো নির্দিষ্ট পুষ্টির ঘাটতি থাকে। তবে প্রয়োজন ছাড়া একাধিক সাপ্লিমেন্ট একসঙ্গে গ্রহণ করা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, প্রথমে খাবারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণের চেষ্টা করা। কারণ সুস্বাস্থ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি এখনো সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।

সূত্র: বিবিসি