ডেঙ্গু কিটের যাচাই ছাড়াই অনুমোদন, ভুল রিপোর্টে মৃত্যুঝুঁকি

ডেঙ্গু কিটের যাচাই ছাড়াই অনুমোদন, ভুল রিপোর্টে মৃত্যুঝুঁকি
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিক্স

ডেঙ্গু নির্ণয়ে কিট (শনাক্তকারী সরঞ্জাম) ব্যবহার করে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো। তবে কার্যকারিতা যাচাই না করেই এসব কিটের অনুমোদন দিচ্ছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ)। ফলে পরীক্ষায় ভুল রিপোর্টের সংখ্যা বাড়ছে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ হিসেবে দেখানোয় যথাসময়ে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। এতে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি।

Advertisement

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণে প্রায় দুই হাজার ৭০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ। তবে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা অন্তত পাঁচ গুণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে যে ধরনের কিট ব্যবহার করা হয়, তার সবগুলো একই প্রক্রিয়ায় আসে না। কিছু কিটের কাঁচামাল বিদেশ থেকে এনে দেশে এসে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। আর কিছু কিট সরাসরি অনুদান হিসেবে পাওয়া যায়।

দেশে যেগুলো তৈরি করা হয় সেগুলোর মানের বিষয়টি স্পষ্ট। কিন্তু বিদেশি কিটের ক্ষেত্রে দেখা যায় উল্টো চিত্র। অথচ এগুলোই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়।

বিদেশি এসব কিট কতটা নির্ভুল বা কার্যক্ষমতা কেমন; তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। নিয়ম অনুযায়ী, ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ডিজিডিএ এগুলোর মান যাচাই করে অনুমোদনের দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সংস্থাটি এ ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডেঙ্গু শনাক্তে দেশে ১০ থেকে ১২ ধরনের কিট ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও চীনের বিভিন্ন কোম্পানি এগুলো তৈরি করে।

সবচেয়ে বেশি দামি দক্ষিণ কোরিয়ার এসবি বায়োসায়েন্সের কিট। এটির সংবেদনশীলতা অন্যগুলোর তুলনায় এগিয়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বেশিরভাগ কিট ভারত ও চীনের তৈরি, যা আমদানি ও সরবরাহ করে কার্নিভাল কেয়ার ও হসপিটেক এসেনশিয়ালসহ কয়েকটি কোম্পানি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ও বেসরকারি; দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় চীন ও ভারতের তৈরি কিট।

আমদানিকৃত কাঁচামালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অনুমোদন থাকলেও রূপান্তরিত কিটের মান বা সক্ষমতা যাচাই হয় না। ফলে এগুলো ব্যবহারে ভুল তথ্য দেওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) একাধিক কর্মকর্তা। তারপরও বছরের পর বছর ধরে এসব কিট ব্যবহার হয়ে আসছে।

যাচাই ছাড়াই অনুমোদন

ব্যবহৃত কিটের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ)। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশ থেকে আসা কিটের উৎপাদন প্রক্রিয়া দেখা হলেও এগুলোর সক্ষমতা বা ভুল তথ্য দেওয়ার হার কেমন; সে ব্যাপারে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই।

ডিজিডিএর একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘কাঁচামালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন থাকলেও রূপান্তরিত কিটের সংবেদনশীলতা ও কার্যক্ষমতা যাচাই করা হয়নি। এমনকি ভুল রিপোর্ট দেওয়ার হার কত সে ব্যাপারে যাচাই-বাছাই হয়নি। স্বাভাবিকভাবে এসব কিট অনুমোদন পাওয়ার কথা নয়। কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এগুলোর অনুমোদন নেওয়া হয়।’

কাঁচামাল আমদানি করে দেশে কিটে রূপান্তর করে এমন একটি প্রতিষ্ঠান ওএমসি হেলথকেয়ার। প্রতিষ্ঠানটির কিটের মান নিয়ে জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন বলেন, ‘ওএমসির মালিককে ডাকা হয়েছিল। তারা মৌখিকভাবে জানিয়েছে, আইসিডিডিআর,বিতে কার্যকারিতা পরীক্ষা করানো হয়েছে। অনুমোদনের ফাইল অবশ্যই আছে, কিন্তু এই মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে না।’

বাড়ছে ভুল রিপোর্ট

ঢাকার যেসব হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু পরীক্ষা হয়, তার একটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এখানে গড়ে প্রতিদিন ৩০০ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা (এনএস-১, আইজিজি ও আইজিএম) হয়ে থাকে।

উচ্চ প্রকোপের সময় চাহিদা আরও বেড়ে যায়। সে অনুযায়ী বছরে প্রায় এক লাখ কিটের চাহিদা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কাছ থেকে বা সরকারি এমএসআর খাত থেকে নিজস্ব অর্থায়নে কিট কেনে হাসপাতালটি।

প্রতিষ্ঠানটির প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শামীম আরা কেয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের ব্যবহৃত কিটের অধিকাংশই ভারতে তৈরি। কোনো কিটের মেয়াদ দুই মাস থাকলে সেটির যা কার্যকারিতা, দশ মাস মেয়াদ আছে এমন কিটের কার্যকারিতা নিশ্চয়ই এক নয়। ফলে অনেক সময় ফলস বা নেগেটিভ রিপোর্ট আসে।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলো কিটের মানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেও সরকারিভাবে কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখানে দাম ও টেন্ডারসহ অনেক কিছু রয়েছে। ফলে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট ব্যবহার করা হলেও মানের পার্থক্য রয়েছে।’

দ্বিগুণ দামে কেনা হচ্ছে কিট

সিডিসি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর দেশে অন্তত ১০ লাখ কিটের চাহিদা রয়েছে। দেশে আসা কিটের অর্ধেকই আসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চীনের অনুদানের মাধ্যমে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশকে ১০ লাখ কিট দিয়েছে চীন, যার মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের জুনে।

সরকারিভাবে ২০২৩ সালের পর থেকে আর কোনো কিট কেনা হয়নি। ওই বছর সর্বশেষ ৫৫ হাজার কিট কেনা হয়েছিল, যার জন্য সরকারের বরাদ্দ ছিল পাঁচ কোটি টাকা। প্রতিটি কিট কেনা হয় ১৬০ থেকে ২০০ টাকায়।

চলতি বছর চার লাখ কিট কিনতে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারকে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হাতে পৌঁছাতে মাসখানেক লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানিকৃত কিটের দাম ১১০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত। অথচ বাংলাদেশে কাঁচামাল এনে তৈরি কিট প্রায় দ্বিগুণ দামে কিনছে সরকার।

রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতাল ল্যাব এইডে মাসে প্রায় দুই হাজার কিটের চাহিদা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি শুরুতে ওএমসিসহ দেশীয় কয়েকটি কোম্পানি থেকে কিট নিলেও বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার এসবি বায়োসায়েন্সের কিট ব্যবহার করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশে তৈরি কিটের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় আমরা বাইরে থেকে সরাসরি আমদানি করি। দেশে সরকারি পর্যায়ে চীন ও ভারতের কিটের ব্যবহার বেশি হলেও সবচেয়ে মানসম্মত কিট দক্ষিণ কোরিয়ার। দামেরও খুব একটা পার্থক্য নেই। এগুলোর দাম গড়ে ১১০ থেকে ১২০ টাকা। সেখানে সরকারি হাসপাতালে ২০০ টাকা তো অনেক বেশি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার অভিযোগ, ‘সরকারি হাসপাতালে কিট সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র থেকে সর্বোচ্চ মানের কাঁচামাল এনে কিট তৈরির কথা বললেও আমদানি করা হয় চীন থেকে। এতে কিট তৈরিতে খরচ কম পড়লেও সরকারের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে এসব কিটের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।’ সক্ষমতা না জেনে কিসের ভিত্তিতে এসব কিট ব্যবহার হচ্ছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসি লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘প্রতি বছর ছয় থেকে আট লাখ কিটের চাহিদা থাকে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই আসে বিভিন্ন দেশ থেকে অনুদান হিসেবে। এবার চার লাখ কিট কিনতে সিএমএসডিকে চাহিদা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালগুলোও নিজেদের অর্থায়নে কিনতে পারবে।’

কিটের মান যাচাইয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এসব কিটের মান কতটা তা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বলতে পারবে। তারাই অনুমোদন দেয়। এ ছাড়া সেই ধরনের ল্যাব আমাদের নেই।’

বেশি দামে কিট কেনার অনুমোদন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেসরকারিতে মানসম্পন্ন কিটের তুলনায় সরকারিতে দ্বিগুণ দামে নিম্নমানের কিট কেনার পেছনে সিডিসির সাবেক দুই কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের প্রধান ছিলেন সিডিসির সাবেক লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম ও উপপরিচালক ডা. মো. সফিকুল ইসলাম। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব কিট সরবরাহের অনুমোদন দেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিডিসির সাবেক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বেশি দামে কিট সরবরাহের জন্য লাইন ডিরেক্টর ও উপপরিচালক কোম্পানি থেকে ৫০ লাখ টাকা নিয়েছেন। তারা আওয়ামীপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতা হওয়ায় তখন চাকরি হারানোর ভয়ে কেউই কিছু বলতে পারত না। তারপরও কেউ প্রতিবাদ করলে বদলি করা হতো।’

তিনি বলেন, ‘মানহীন কিট ব্যবহারের ফলে অনেক রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও ডায়াগনোসিস রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। ফলে অনেকে চিকিৎসা নেননি। পরবর্তীতে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় বহু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর দায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এড়াতে পারেন না।’

অনিয়মের ব্যাপারে জানতে অধ্যাপক নাজমুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইলে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।

সিডিসির সাবেক উপপরিচালক ডা. মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নির্দিষ্ট শর্ত মেনে কিট কেনা হতো। এ জন্য একটি যাচাই কমিটি ছিল। তারা যেভাবে মত দিয়েছেন সেভাবে কেনা হয়েছে। কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন ছিল না।’

কতজনের যাচাই কমিটি ছিল ও কিসের ভিত্তিতে কিটগুলো কেনা হয়েছে? এমন প্রশ্নে বিষয়গুলো মনে নেই বলে জানান সফিকুল ইসলাম।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞ

সামগ্রিক বিষয়ে কথা হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা শতভাগ সঠিক না হলে মৃত্যুঝুঁকি হতে পারে। ভুল ফলাফলে আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসার আওতায় আসবে না। চিকিৎসকও সেভাবে নির্দেশনা দিতে পারবেন না। এতে রোগীর নানা জটিলতা দেখা দেবে। এমন সময়ে হাসপাতালে আসবে, যখন অবস্থা একেবারেই সংকটাপন্ন। আমরা দেখেছি, ডেঙ্গুতে গুরুতর অসুস্থ ও মৃতদের অধিকাংশই দেরিতে হাসপাতালে এসেছেন।’

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত যেসব রোগে মৃত্যু ঘটে, সেগুলো শনাক্তকরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপকরণ ও কিট ব্যবহারের ক্ষেত্রে মান যাচাই করে অনুমোদন দেওয়া। নিয়মিত সঠিক তথ্য দিচ্ছে কি না তা-ও তদারকি করতে হবে। সরকারি-বেসরকারিতে ব্যবহৃত কিট মানসম্পন্ন ল্যাবে যাচাই করতে হবে। দেখতে হবে ভুল রিপোর্ট দেওয়ার হার কেমন।’

কার্যকারিতা ঠিক না থাকলে মানহীন কিট বাজার থেকে তুলে নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে এগুলোর আমদানকারক ও সরবরাহকারীকে আইনের আওতায় আনার তাগিদ দেন এই বিশেষজ্ঞ।