logo

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে সাফল্যের কৌশল জানালেন লুতফি চৌধুরী

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে সাফল্যের কৌশল জানালেন লুতফি চৌধুরী
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের আধুনিক অ্যাডটেক ও ডিজিটাল মার্কেটিং খাতের রূপান্তরের অন্যতম প্রধান কারিগর লুতফি চৌধুরী। তার কো-ফাউন্ডার ও সিইও নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘অ্যাডফিনিক্স’ দেশের অন্যতম শীর্ষ অ্যাডটেক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিজ্ঞাপনদাতা, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পাবলিশার এবং ভোক্তাদের মধ্যে একটি স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বর্তমানে দেশের শীর্ষ টেলকো, এমএফএস, মোবাইল হ্যান্ডসেট ও এফএমসিজি ব্র্যান্ডগুলোর বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন কোটি কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কাছে কার্যকরী ডিজিটাল বিজ্ঞাপন সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। মনিপুর স্কুল ও ঢাকা কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে লন্ডনের সাডবেরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিংয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনকারী লুতফি চৌধুরী করপোরেট নেতৃত্ব, অ্যাডটেক ইনোভেশন এবং স্ট্র্যাটেজিক বিপণন চিন্তার জন্য সুপরিচিত।

সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘বিয়ন্ড বিজনেস’-এ তিনি কথা বলেছেন তার শৈশব, লন্ডনের প্রফেশনাল অভিজ্ঞতা, দেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বিকাশ এবং ‘অ্যাডফিনিক্স’-এর রূপান্তর ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছেন রিয়াজুল করিম। প্রযোজনা করেছেন জায়েদ আল মাহবুব।

এশিয়া পোস্ট: আমরা শুরু থেকেই আপনার গল্পটা শুনতে চাই। আপনার শৈশব কোথায় কেটেছিল এবং আপনার স্কুল ও কলেজ জীবন কেমন ছিল?

লুতফি চৌধুরী: আমার শৈশব কেটেছে মিরপুরে। মনিপুর স্কুল থেকে পাস করেছি, তারপর ঢাকা কলেজ। ঢাকা কলেজের পর বাইরে পড়াশোনা করার চেষ্টা করছিলাম। সেই সময়টাতে তেজগাঁও কলেজে কিছুদিন পড়াশোনা করেছি। তারপর লন্ডনে যাই। সেখানে সাডবেরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিংয়ের ওপর বিবিএ করি। এরপর ২০১০ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসি।

এশিয়া পোস্ট: লন্ডনে থাকাকালীন পড়াশোনার পাশাপাশি কি আপনার প্রফেশনাল বা পার্টটাইম কাজের কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছিল?

লুতফি চৌধুরী: লন্ডনে কাজ করার সময় আমার জীবনের অন্যতম বড় একটি শিক্ষা হয়েছিল। আমি পিজা হাটে পার্টটাইম কাজ করতাম। আমাদের স্টোরটি ছিল ইউকের অন্যতম ব্যস্ত স্টোর- লেস্টার স্কয়ারে। যখন প্রচুর অর্ডারের চাপ থাকত, তখন এরিয়া ম্যানেজার বা অ্যাসিস্ট্যান্ট এরিয়া ম্যানেজার স্টোর ভিজিট করতে এসেই প্রথমেই ডিশওয়াশারের কাছে যেতেন। তারা গিয়ে বলতেন, ‘তোমার কোনো সাহায্য লাগবে কিনা?’ তারপর স্টার্টার টেবিল, মেক টেবিল হয়ে কার্ড টেবিলে আসতেন।

একদিন আমি এরিয়া ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘যখন প্রচুর ব্যস্ততা থাকে, তখন আপনারা কেন শুরুতেই ডিশওয়াশারের কাছে যান বা নিচ থেকে সাহায্য করা শুরু করেন? আপনারা তো ওপর থেকে সার্ভ করা শুরু করতে পারেন।’

তিনি আমাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন। প্রথমত, তারা ক্যারিয়ারের একদম নিচ থেকে (ডিশওয়াশার থেকে) প্রতিটি কাজ শিখে এই বড় পজিশনে এসেছেন। দ্বিতীয়ত, সমস্যা সবসময় নিচ থেকে সমাধান করা শুরু করতে হয়; নিচ থেকে সলভ করতে থাকলে ওপরের সমস্যাগুলো এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়।

যেহেতু পিজা হাট আমার পার্টটাইম কাজ ছিল এবং আমার লক্ষ্য ছিল মার্কেটিংয়ে ক্যারিয়ার গড়া, তাই এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি দুটি নীতি গ্রহণ করি। প্রথমত, মার্কেটিং শিখতে হলে একদম গ্রাসরুট লেভেল থেকে শিখতে হবে। তাই পরবর্তীতে লন্ডনে একটি কোম্পানিতে মার্কেটিংয়ের কাজ নিই, যেখানে স্ট্রিটে গিয়ে লিফলেট বিলানো ও পোস্টার লাগানোর কাজও করতে হয়েছে। এর ইতিবাচক ফল আমি পরবর্তীতে পেয়েছি। দ্বিতীয়ত, যখনই আমার কোম্পানিতে কোনো সমস্যা দেখা দেয়, আমি সবার আগে নিচ থেকে সমাধান শুরু করি। টিমের সবচেয়ে জুনিয়র সদস্যের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি তার কোনো সাহায্য লাগবে কিনা।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে ফিরে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আপনার ক্যারিয়ার কীভাবে শুরু হলো?

লুতফি চৌধুরী: ২০১০ সালে বাংলাদেশে ফিরে আমি ‘ক্লিকবিডি’-তে কাজ করতাম। এরপর জব সুইচ করার সিদ্ধান্ত নিই। তখন জিএনআর নামে একটি কোম্পানি বিডিজবসে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের জন্য সার্কুলেশন দেয়। তখন বাংলাদেশে গুগল বা ফেসবুকের ক্যাম্পেইন ছিল না, কিছু অনলাইন পত্রিকায় কেবল ফিক্সড প্লেসমেন্ট কিনে নেওয়া হতো। জিএনআর ছিল বাংলাদেশের প্রথম অ্যাড নেটওয়ার্ক। তারা বিজনেসে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং একজন বিজনেস ডেভেলপার খুঁজছিল। তখন আমি ইন্টারভিউ দিই ও সিলেক্ট হই। ওখান থেকেই মূলত ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আমার প্রবেশ।

এশিয়া পোস্ট: এর আগে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আপনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল কি?

লুতফি চৌধুরী: ক্লিকবিডিতে থাকা অবস্থায় প্রমোশনের কিছু কাজ করেছি, তবে তা ছিল খুবই সীমিত। তখন প্রমোশনের জন্য মূলত এটিএল ও বিটিএলের ওপর নির্ভর করতে হতো; যেমন কিছু পত্রিকায় প্লেসমেন্ট, গেমিং কনটেস্টের আয়োজন করা বা কনসার্টের টিকিট দেওয়া। তবে প্রপার ডিজিটাল মার্কেটিং বলতে যা বোঝায়, তা জিএনআরে আসার পরেই শেখা।

এশিয়া পোস্ট: জিএনআর প্রতিষ্ঠানটি কি এখনো রয়েছে?

লুতফি চৌধুরী: দুর্ভাগ্যবশত না।

এশিয়া পোস্ট: ২০১০ সালের প্রেক্ষাপটের সাথে বর্তমানের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের তফাতটা কীভাবে দেখেন?

লুতফি চৌধুরী: এটি একটি চমৎকার জার্নি। চোখের সামনে একটি মার্কেট গড়ে উঠতে দেখা এবং সেখানে নিজের অবদান রাখা অনেক বড় প্রাপ্তি। জিএনআরের কাছে আমি সবসময় কৃতজ্ঞ, কারণ ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে শূন্য অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তারা আমাকে শেখার সুযোগ দিয়েছে। প্রথম দুই-তিন বছর আমাদের কোনো বিজনেস টার্গেট ছিল না, শুধু মার্কেট ডেভেলপমেন্ট টার্গেট ছিল। প্রথম মেন্টর ভিকি রাসেল এবং পরবর্তী মেন্টর ন্যাশ ইসলামের কাছ থেকে সরাসরি গুগল লার্নিং মেটেরিয়াল থেকে শেখার সুযোগ পাই।

তখন কোনো ডিজিটাল এজেন্সি ছিল না। ট্রেডিশনাল মার্কেটিংয়ের মানুষদের কাছে গিয়ে ডিজিটাল মার্কেটিং বোঝাতে হতো। বিডিজবসে শনিবারগুলোতে ট্রেনিং দিতাম, সেখান থেকেও অনেক ডিজিটাল মার্কেটার তৈরি হয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: সে সময় করপোরেট লেভেলে বিটুবি ক্লায়েন্টদের কনভিন্স করা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

লুতফি চৌধুরী: মিটিংগুলো অনেক ইন্টারেস্টিং হতো। ২০১০ সালে জিএনআর লঞ্চের সময় লোকাল কোম্পানিগুলো গুগলে বা ফেসবুকে অ্যাড দিত না; কেবল ২-৪টি অনলাইন পত্রিকায় ফিক্সড প্লেসমেন্ট দিত। আমরা যখন ইম্প্রেশন-বেসড বা ক্লিক-বেসড ক্যাম্পেইন নিয়ে আসলাম, তখন দীর্ঘ সময় ধরে মিটিং হতো। এক-দেড় ঘণ্টা মিটিংয়ের পর ক্লায়েন্ট হয়তো বলতেন, ‘রিফ্রেশ দিলে তো আমার অ্যাড চলে যাবে, তাহলে কীভাবে হলো?’

আমরা বোঝাতাম যে ইম্প্রেশন-বেসড ক্যাম্পেইন আপনার টাকা বাঁচায় এবং বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। তখন কোনো ড্যাশবোর্ড বা রিপোর্টিং ছিল না। জিএনআর প্রথম ড্যাশবোর্ড ভিত্তিক রিপোর্টিং নিয়ে আসে, যেখানে প্রকৃত ইম্প্রেশন ও ক্লিক দেখা যেত। সেই জিরো মার্কেট থেকে আজ বাংলাদেশের ডিজিটাল মার্কেটিং মার্কেট প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের।

এশিয়া পোস্ট: আপনার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডফিনিক্স’ কীভাবে শুরু হলো এবং এর পেছনে কী চিন্তা কাজ করেছিল?

লুতফি চৌধুরী: ২০১০ থেকে আমি অ্যাডটেকে কাজ করছি। জিএনআরেরর পর ‘কিউবেক্স’-এ কাজ করি, যা দিয়ে ২০১৫ সালে নেপালে ‘ডামারু’ ও বাংলাদেশে ‘উইজার্ট’ লঞ্চ করি। তারপর ইউরোপীয় কোম্পানি ‘এসকিমি’-তে ২০২০ সাল পর্যন্ত সাউথ এশিয়ার ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে ছিলাম এবং ব্যবসাকে জিরো থেকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যাই।

কোভিডের সময় একটি ভাবনা আমার জীবন বদলে দেয়। চারদিকে প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছিল। একদিন কোম্পানির ফাইনান্স ও এডমিনকে ফোন করে জানতে চাইলাম, ‘আমি যদি এখন মারা যাই, তবে আমার সন্তান কী পাবে?’ তারা জানাল, তিন মাসের বেসিক স্যালারি। আমি চিন্তা করলাম, একটি কোম্পানির সাউথ এশিয়ান মার্কেট জিরো থেকে মাসে কোটি টাকার ব্যবসায় রূপান্তর করার পরও আমি না থাকলে সন্তান মাত্র তিন মাসের স্যালারি পাবে। কিন্তু নিজস্ব কোম্পানি থাকলে আমি না থাকলেও সে শেয়ার ট্রান্সফার পাবে। সেই সাথে একজন ইনভেস্টরও অনেক দিন ধরে সাথে কাজ করার প্রস্তাব দিচ্ছিলেন। তাই ২০২০ সালে অন্যের কোম্পানিকে বড় করার বদলে নিজের প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডফিনিক্স’-এর যাত্রা শুরু করি।

এশিয়া পোস্ট: বাজার থেকে আপনারা কী কী সমস্যা আইডেন্টিফাই করেছিলেন এবং কী কী সলিউশন প্রোভাইড করছেন?

লুতফি চৌধুরী: আমাদের মডেলটি কোনো সম্পূর্ণ নতুন বা ইনোভেটিভ আইডিয়া ছিল না; এটি গ্লোবালি এবং বাংলাদেশে অলরেডি এক্সিস্টিং একটি বিজনেস মডেল। তবে আগের চাকরিগুলোতে ক্লায়েন্ট ও মার্কেটের যেসব সমস্যা ও ফিডব্যাক ম্যানেজমেন্টকে দিতাম, তা অনেক সময় ওভারলুক করা হতো। অ্যাডফিনিক্স শুরু করার পর আমরা বেসিক প্রোডাক্ট রেডি করে অন-টপ সব ফিচার পুরোপুরি মার্কেট ও ক্লায়েন্ট ফিডব্যাকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছি। ফলে ক্লায়েন্টরা সরাসরি তাদের প্রয়োজনীয় সমাধানগুলো পেয়ে উপকৃত হয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বিশাল পরিসরে অ্যাডফিনিক্সে আপনারা কী কী সেবা দিচ্ছেন?

লুতফি চৌধুরী: আমাদের মূল চালিকাশক্তি হলো এসএসপি ও ডিএসপি। এসএসপি লোকাল পাবলিশার ও অ্যাপসগুলোকে কানেক্ট করে এবং ডিএসপি গ্লোবাল এক্সচেঞ্জগুলোর সাথে কানেক্ট হয়ে ওয়েবসাইট ও অ্যাপে বাংলাদেশিদের অ্যাড দেখায়।

এর বাইরে গ্লোবাল ও লোকাল মার্কেটের জন্য দুটি প্রোডাক্ট এনেছি- ১. ট্র্যাকার (Adsloft): বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ক্যাম্পেইন করার পর ব্র্যান্ডগুলোর মনে অনলাইন রিপোর্ট নিয়ে অবিশ্বাসের জায়গা থাকে। গ্লোবাল ট্র্যাকারগুলো (যেমন গুগল বা ওরাকল) এই অঞ্চলের বাজারের জন্য বেশ ব্যয়বহুল। তাই আমরা এই অঞ্চলের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে থার্ড-পার্টি ট্র্যাকার এনেছি। ২. অ্যাড ম্যানেজার ফর ওটিটি: ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণত সাবস্ক্রিপশন মডেলে শুরু হলেও পরবর্তীতে অ্যাড রেভিনিউ প্রয়োজন হয়। তাদের জন্য গ্লোবাল অ্যাড ম্যানেজার অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় আমরা ওটিটির জন্য অ্যাড ম্যানেজার এনেছি, যার প্রথম ক্লায়েন্ট ছিল টি স্পোর্টস।

এশিয়া পোস্ট: এই ট্র্যাকারের টার্গেট অডিয়েন্স কারা এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

লুতফি চৌধুরী: টার্গেট অডিয়েন্স হলো বিজ্ঞাপনদাতারা নিজেই। এখন বহু নেটিভ অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে একসঙ্গে অ্যাড যায়। ফলে সব রিপোর্ট জাস্টিফাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের ট্র্যাকারটি থার্ড-পার্টি রিপোর্ট দেয়। এটি একচুয়াল ভিউয়েবল ইম্প্রেশন কত ছিল, এক্সিডেন্টাল ক্লিক কত ছিল এবং বিভিন্ন প্লেসমেন্টের মধ্যে কোন প্লেসমেন্ট থেকে বেটার রেজাল্ট আসছে- তা নিখুঁতভাবে দেখায়, যা পরবর্তীতে টার্গেটেড ক্যাম্পেইনে সাহায্য করে।

এশিয়া পোস্ট: কিন্তু ভুয়া বা ফেক রিপোর্ট কীভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব?

লুতফি চৌধুরী: ফেক রিপোর্টের এই আশঙ্কা প্রতিটি বিজ্ঞাপনদাতার মনেই থাকে। সে কারণেই থার্ড-পার্টি ট্র্যাকারের সাহায্যে রিপোর্ট অডিট করা হয়।

এশিয়া পোস্ট: মেটা বা গুগলের নিজস্ব ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম থাকতে অ্যাডফিনিক্সের Adsloft-এর প্রয়োজন কোথায়?

লুতফি চৌধুরী: মেটা থার্ড-পার্টি ট্র্যাকার অ্যালাউ করে না। তবে গুগল, অ্যাডফিনিক্স কিংবা নিউজ পোর্টালগুলোর ক্ষেত্রে Adsloft দিয়ে অডিট করা যায়। কারিগরি কারণে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসক্রিপেন্সি (তারতম্য) স্বাভাবিক। কিন্তু ১০ শতাংশের বেশি ডিসক্রিপেন্সি এলেই বুঝতে হবে রিপোর্টে বা ডেটাতে ঝামেলা আছে।

এশিয়া পোস্ট: আপনারা অডিয়েন্স পারসোনা কীভাবে ডিফাইন করেন এবং এতে প্রাইভেসির কোনো ঝুঁকি তৈরি হয় কি?

লুতফি চৌধুরী: আমাদের ডাটা ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রায় ৬ কোটি ইন্টারনেট ইউজারের প্রোফাইলিং করা আছে। যখন একজন ইউজার একাধিক ডিভাইস (যেমন ল্যাপটপ, দুটি ফোন) একই ওয়াইফাই ও লোকেশনে দিনের পর দিন ব্যবহার করেন, তখন অ্যালগরিদম ও এআই কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করে আইডেন্টিফাই করে যে এই তিনটি ডিভাইস একজন ব্যক্তির। নাইট টাইম ও ডে টাইম লোকেশন দেখে বাসা ও অফিস আইডেন্টিফাই করা হয়। ব্যবহারকারীর স্পেন্ডিং বিহেভিয়ার, কন্টেন্ট পড়ার ধরন দেখে প্রোফাইল তৈরি হয়- তিনি স্টুডেন্ট, বিজনেসম্যান, নাকি ট্রাভেলার। এমনকি ওয়াইফাই বেশি আর ডাটা কম ব্যবহার করলে সিস্টেম ধরে নেয় যে ইউজার কিছুটা কৃপণ প্রকৃতির!

প্রাইভেসি বা সিকিউরিটির বিষয়ে বলব, আমরা কোনো ফার্স্ট-পার্টি ডাটা (যেমন নাম, ফোন নম্বর বা ছবি) সংগ্রহ করি না। তিনটি ডিভাইস আইডিকে মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ র‍্যান্ডম ডিজিটাল আইডি দেওয়া হয়। তাই ব্যক্তির আসল পরিচয় জানার কোনো সুযোগ নেই। এটি সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং আন্তর্জাতিক জিডিপিআর নীতিমালা মেনে নৈতিকভাবেই পরিচালিত হয়।

এশিয়া পোস্ট: অনলাইনে কোনো কিছু সার্চ করলে সেই সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন বারবার আসে কীভাবে?

লুতফি চৌধুরী: এটি গুগল ও ফেসবুক তাদের সার্চ ইঞ্জিনের সাথে ডিসপ্লে অ্যাডকে কানেক্ট করে দেয় বলে হয়। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে ১ টাকা থাকলে সেটি প্রথমে সার্চ মার্কেটিংয়ে খরচ করা উচিত, কারণ ইউজার অলরেডি প্রোডাক্টটি খুঁজছে।

এশিয়া পোস্ট: গুগল বা মেটার কাছে যে ফার্স্ট-পার্টি ডাটা রয়েছে, তা কখনো যুদ্ধ বা সেনসিটিভ ক্ষেত্রে বিক্রি বা অপব্যবহার হয় বলে মনে করেন?

লুতফি চৌধুরী: গ্লোবাল কোম্পানিগুলোকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি সিনেটে ও আদালতে হতে হয়েছে। তবে টেক অডিট ছাড়া বলা সম্ভব নয় কোনো প্ল্যাটফর্ম ম্যানিপুলেশন করছে কিনা। আর লোকেশন ডাটার জন্য গুগল ছাড়া আরও অন্তত ২৩টি গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম আছে যাদের কাছে নিখুঁত ডাটা থাকে। তবে আমরা বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে যতটুকু ডাটা ব্যবহার করি, তা শুধুই বিজ্ঞাপনকে নিখুঁত করার জন্য।

এশিয়া পোস্ট: ট্রেডিশনাল মিডিয়া (টিভি, পত্রিকা, বিলবোর্ড) এবং ডিজিটাল মিডিয়ার মধ্যে কার্যকারিতার তফাত কী?

লুতফি চৌধুরী: ২০১০ সালের শূন্য বাজার আজ ৪৫০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মোট ৯০০ মিলিয়ন ডলারের মার্কেটিং বাজেটের ৫০ শতাংশের বেশি এখন ডিজিটালে স্পেন্ড হচ্ছে। ডিজিটালে বড় সুবিধা হলো পিনপয়েন্ট টার্গেটিং এবং নিখুঁত রিপোর্টিং। যেমন- একাধিক ব্যক্তি একই নিউজ সাইটে ঢুকলে ডমেস্টিক ট্রাভেলারকে নভোএয়ারের অ্যাড এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলারকে এমিরেটসের অ্যাড দেখানো সম্ভব।

তবে প্রথাগত মিডিয়ার গুরুত্ব একদম শেষ হয়ে যাবে না; ম্যাস পিপল টার্গেটিংয়ের জন্য টিভি ও প্রিন্ট মিডিয়া এখনো দরকার। তবে সময়মতো ইনোভেশন না আনলে কোডাকের মতো বড় মাধ্যমও কিন্তু বাজার হারাবে।

এশিয়া পোস্ট: ডিজিটালে তো সরাসরি ক্লিক করে কেনার সুবিধা আছে, যা প্রথাগত মাধ্যমে নেই। তবুও করপোরেটরা কেন প্রথাগত মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে?

লুতফি চৌধুরী: দুই ধরনের ক্যাম্পেইন হয়- অ্যাওয়ারনেস বা ব্র্যান্ডিং এবং পারফরমেন্স ক্যাম্পেইন। ট্রেডিশনাল মিডিয়া ব্র্যান্ডিং ও ম্যাস পিপলের কাছে পৌঁছাতে চমৎকার কাজ করে। তবে বিক্রি বাড়ানোর জন্য ব্র্যান্ডগুলোকে ডিজিটালে পারফরমেন্স ক্যাম্পেইনে আসতে হয়।

এশিয়া পোস্ট: ফেসবুকে অনেক বিজ্ঞাপন দেখা গেলেও সেগুলোর কনটেন্ট কোয়ালিটি বা থট প্রসেসে ঘাটতি দেখা যায় কেন?

লুতফি চৌধুরী: মূলত প্রথম দিন থেকেই কেবল সেলস বা পারফরমেন্স ক্যাম্পেইন চালাতে চাওয়ার কারণে এমনটা ঘটে। ফেসবুক স্ক্রল করার সময় ইউজার শত শত অ্যাড দেখে, সেখানে ব্র্যান্ড রিকল তৈরি হয় না। ফেসবুক মূলত ইউজার জেনারেটেড কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম, সেখান থেকে বিক্রি হলেও লং-টার্ম ব্র্যান্ড বিল্ড হয় না।

দীর্ঘমেয়াদী ব্র্যান্ড বিল্ড করতে হলে এশিয়া পোস্টের মতো অথেন্টিক ও ট্রাস্টেড মিডিয়ামে কনটেন্টের মাধ্যমে আসতে হবে। অ্যাওয়ারনেস ও পারফরমেন্স উভয় ক্যাম্পেইনের সামঞ্জস্যপূর্ণ স্ট্র্যাটেজি থাকলে তবেই অর্গানিক সেলস বাড়ে।

এশিয়া পোস্ট: যারা এই ফিল্ডে ক্যারিয়ার গড়তে চান বা স্টার্টআপ শুরু করতে চান, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

লুতফি চৌধুরী: প্রথমত আগে মার্কেটিং শিখুন। ডিজিটাল মার্কেটিং আলাদা কিছু নয়, এটি মূল মার্কেটিংয়েরই একটি অংশ। তাই আগে মূল মার্কেটিং বুঝতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিজের এরিয়া নির্ধারণ করুন। কনটেন্ট ক্রিয়েশন, প্ল্যানিং নাকি বায়িং- কোন ক্ষেত্রে আপনি ভালো, তা বুঝে সে অনুযায়ী দক্ষতা বাড়ান। তৃতীয়ত, স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য। স্টার্টআপের সবচেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্ট হলো আপনার গোল্ডেন টাইম। তাই প্রপার বাজার গবেষণা করে নামা উচিত। ক্লায়েন্টের সাথে কখনো ওভার-প্রমিস করবেন না, ভুল তথ্য দেবেন না এবং ট্রাস্ট ব্রেক করবেন না।

এশিয়া পোস্ট: অ্যাডফিনিক্সের বর্তমান অবস্থা ও বড় বড় করপোরেট ক্লায়েন্টদের আস্থা অর্জনের পেছনে কী কাজ করেছে?

লুতফি চৌধুরী: ২০২১ সালে কমার্শিয়ালি লঞ্চ করার পর থেকে প্রতি বছর আমাদের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ গ্রোথ হচ্ছে। দেশের সব টেলকো (গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি), এমএফএস (বিকাশ, নগদ), হ্যান্ডসেট ব্র্যান্ড (স্যামসাং, অপ্পো, ভিভো) এবং প্রায় সব এফএমসিজি ও বেভারেজ কোম্পানি আমাদের ক্লায়েন্ট।

আমাদের ক্লায়েন্ট রিটেনশন অনেক বেশি। এর মূল কারণ- সততা, নিরবচ্ছিন্ন সার্ভিস সাপোর্ট এবং কোনো অবস্থাতেই ক্লায়েন্টকে ওভার-প্রমিস না করা। ডিজিটালে তথ্য কখনো মিথ্যা বলে না, তাই রিয়েল সংখ্যা তুলে ধরাই আমাদের এই ট্রাস্ট ও সাফল্যের মূল ভিত্তি।