logo

টিকা যথাযথ না দেওয়ায় মহামারি রূপ নিয়েছে হাম

টিকা যথাযথ না দেওয়ায় মহামারি রূপ নিয়েছে হাম

দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রামক রোগ হাম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশে এখন পর্যন্ত সহস্রাধিক রোগী শনাক্ত হয়েছে। উপসর্গ নিয়ে প্রতিনিয়ত ভিড় বাড়ছে হাসপাতালে। ইতোমধ্যে হামজনিত অসুস্থতা নিয়ে ঢাকা, রাজশাহী, পাবনাসহ দেশের কয়েকটি জেলায় বেশকিছু মৃত্যুর খবর এসেছে। হঠাৎ করেই ভাইরাসটির এমন প্রাদুর্ভাবে বিস্মিত চিকিৎসক, রোগতত্ত্ববিদরা, উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। 

গতবছর টিকা কাভারেজের হার এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) টিকার ঘাটতি রয়েছে ৭০ শতাংশের বেশি। টিকার এমন ঘাটতিতে হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটেছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা) অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ। তিনি বলেছেন, টিকা যথাযথ না দেওয়ায় হাম এবার মহামারিতে রূপ নিয়েছে।

হাম কী, কিভাবে চেনা যাবে, আক্রান্ত হলে চিকিৎসা কী, টিকাগ্রহণের বয়সের কেন আক্রান্ত হচ্ছে, ব্যবহৃত টিকা কতটা সুরক্ষা দিতে পারছে, কেন টিকা ঘাটতি হলো- এসব বিষয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আজাদুল আদনান।  

এশিয়া পোস্ট: হাম রোগ আসলে কী, কেন হয়?

ডা. বে-নজীর আহমেদ: হাম প্রকৃপক্ষে একটি মারাত্মক ভাইরাল ডিজিজ। মায়াসলেস ভাইরাস নামের একটি ভাইরাস দ্বারা এটি ছড়ায়। টিকার মাধ্যমে এ ভাইরাসটি বহু বছর ধরে আমরা প্রতিরোধ করে আসছি। এবার একটু ব্যত্যয় ঘটতে দেখা গেল। যেখানে আগে হাম হতোই না, সেখানে এবার মহামারি আকারে দেখা গেল। এ ভাইরাসটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে, একজন শিশু আক্রান্ত হলে অন্তত ১৬ থেকে ১৭ জন পর্যন্ত শিশু আক্রান্ত হতে পারে। হামে যদিও সরাসরি মৃত্যু ঘটে না। কিন্তু হাম প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় তার ফলে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে বাচ্চা মারা যেতে পারে। তার মধ্যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের জটিলতা সৃষ্টির পাশাপাশি ভিটামিন এ কমিয়ে দেয়।

এশিয়া পোস্ট: একজন অভিভাবক কীভাবে বুঝবেন তার বাচ্চা হামে আক্রান্ত? 

ডা. বে-নজীর আহমেদ: হাম যেহেতু সংক্রমণ সুতরাং এখানে একটি কমন লক্ষণ হলো গলাব্যথা, হাঁচি, কাশি হতে পারে। এরপরে গায়ে ফুসকুড়ি বা র‌্যাশ দেখা দিতে পারে। বর্তমানে যদি জ্বর আসে শরীরের র‌্যাশ দেখা দেয়, তাহলে ধরে নিতে হবে এটি হাম। 

এশিয়া পোস্ট: হামে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা কী?

ডা. বে-নজীর আহমেদ: যেহেতু এটি ভাইরাল ডিজিজ, কাজেই প্রাতিষ্ঠানিক কোনো চিকিৎসা নেই। তবে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দিতে হয়। জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল কিংবা যেসব ব্যবস্থা নিলে জ্বর কমবে- তা নিতে হবে। হামের প্রভাবে নিউমোনিয়া দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে, ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশন দিতে হবে। 

এশিয়া পোস্ট: টিকাগ্রহণের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে কেন? 

ডা. বে-নজীর আহমেদ: এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে টিকা নেওয়ার বয়সের আগেই আক্রান্ত হওয়া। আমরা এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছি। মায়ের থেকে যে প্রতিরোধ ক্ষমতা আসে, সেটি ঠিকমতো পেয়েছে কি না দেখতে হবে। আগে দেখা যেত, জন্মের পর ৯ মাস পর্যন্ত হাম থেকে সুরক্ষিত থাকত শিশুরা। সে কারণে ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হতো এবং সেই টিকাও ছিল এক ডোজের। কিন্তু এখন আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তার মানে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে, কিংবা শিশুর মা টিকার আওতায় ছিল না। অর্থাৎ, একদিকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা, অন্যদিকে মায়ের টিকা না নেওয়া- এ দুই কারণে ৯ মাসের আগেই শিশুরা আক্রান্ত হতে পারে। এটি প্রকৃত অবস্থা বুঝতে হলে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা জরুরি।

আবার, টিকাগ্রহণের পর যে বাচ্চারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের অতীত ইতিহাস জেনে নেওয়া যে তারা ঠিকমতো টিকা নিয়েছে কি না। গণটিকা ক্যাম্পেইনেও টিকা থেকে বিরত থেকেছে কি না। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝা যাবে কেন টিকাগ্রহণের পরও আক্রান্ত হচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট: টিকার সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে কি না? 

ডা. বে-নজীর আহমেদ: অবশ্যই পারে। টিকা নেওয়ার পরও যারা আক্রান্ত হচ্ছে সেটির রহস্য বের করতে হলে টিকার কোল্ডচেইন ঠিকঠাক হয়েছে কি না, সরবরাহে সেটি ঠিক ছিল কি না, প্রয়োগেও যথাযথ নিয়ম মানা হয়েছে- এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের যে কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হয়, তা উপজেলা থেকে সংগ্রহ করা। সেই টিকা সঠিকভাবে তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা না হলে টিকার মান থাকবে না। 

এশিয়া পোস্ট: হঠাৎ কেন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ল হাম?

ডা. বে-নজীর আহমেদ: কোন কোন রোগের ক্ষেত্রে প্রাদুর্ভাব চার থেকে পাঁচ বছর পর ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এবারের হাম যেভাবে দ্রুত মহামারি রূপ নিয়েছে, গত ২০ থেকে ৩০ বছরের এমনটা হয়নি। আমরা মনে করছি, টিকা যথাযথভাবে দিতে না পারায় এমন মহামারি। 

হামের টিকার কাভারেজ বেশি লাগে। কারণ হামে আক্রান্ত হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসে। এ জন্য উচ্চপর্যায়ের প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য ছোট বয়সেই টিকা দেওয়া হয়। এই কাভারেজ ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত দরকার হয়। সেখানে গত বছর এই কাভারেজ ৮০ ভাগের নিচে ছিল। ফলে টিকা থেকে বঞ্চিত থেকেছে চার লাখের বেশি শিশু। যার ফলে সংক্রমণ বেড়ে গেছে। 

এশিয়া পোস্ট: টিকার সংকটের পেছনে কারণ কী?

ডা. বে-নজীর আহমেদ: অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে সরকারের স্বাস্থ্য খাতের অতি সব গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়। কিন্তু ২০২৪ সালে হাসিনা সরকার ওপি বন্ধ করে দিলে অন্তর্বর্তী সরকারও একই কাজ করে। কথা হলো- শুধু টিকা থাকলেই তো হবে না। প্রয়োগের জন্য সিরিঞ্জ, পরিবহন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য অর্থ প্রয়োজন হয়। ওপির ধারাবাহিকতা না থাকায় অর্থ সংকটে এগুলোর কিছুই করতে পারেনি স্বাস্থ্য বিভাগ, যা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো টিকা কার্যক্রমে।