আমলাতান্ত্রিক পুকুরচুরি বন্ধ না হলে সংস্কার সম্ভব নয়: মহিউদ্দিন রনি

একসময় রেলওয়ের অনিয়মের বিরুদ্ধে একা কমলাপুর স্টেশনে দাঁড়িয়েছিলেন মহিউদ্দিন রনি। অল্প সময়েই পরিচিতি ছড়িয়ে যায় সারাদেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। কথা বলেছেন সমসাময়িক রাজনীতি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, তরুণদের ভাবনা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নানা বিষয় নিয়ে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।
এশিয়া পোস্ট: কমলাপুর স্টেশনে রেলওয়ের অনিয়মের বিরুদ্ধে একা প্রতিবাদ জানিয়ে আপনি পরিচিতি পেয়েছেন। সম্প্রতি বর্তমানে আপনি এনসিপিতে যুক্ত। প্রতিবাদী রনি কি বদলে গেছে?
মহিউদ্দিন রনি: জায়গাটা মোটেই সংকুচিত বা ছোট হয়নি। মানুষ তো মাত্রই পরিবর্তনশীল। পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট আমাদের প্রতিনিয়ত নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। সেই জায়গা থেকে বলা যায় যে পরিবর্তন এসেছে, তবে তা ইতিবাচক। আন্দোলন বা সামাজিক কাজের ক্ষেত্রটা সংকুচিত না হয়ে বরং আরও বড় এক পরিসরে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী। সেখান থেকে রেলওয়ের অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জড়ালেন কীভাবে?
মহিউদ্দিন রনি: আসলে আমার কাছে গল্প বলতে কিছু নেই, যা আছে সবই ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনা। ঘটনাটি ২০২২ সালের। আমরা সবাই জানি যে বাংলাদেশ রেলওয়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা স্বাধীনতার পর থেকে বারবার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েও লাভের মুখ দেখতে পারছে না। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি সেখানে দীর্ঘ বছরের।
আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী। দেশজুড়ে ঘুরে বেড়াতে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার ও জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখতে পছন্দ করতাম। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম ও ন্যাশনাল চিলড্রেন টাস্ক ফোর্সের (এনসিটিএফ) মতো সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলাম।
একদিন রাজশাহীতে যাওয়ার জন্য অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটতে গিয়ে বিপত্তি বাধে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হলো, কিন্তু টিকিট ইস্যু হলো না। হেল্প সেন্টার কিংবা বিকাশ, কোথাও থেকে কোনো সমাধান পেলাম না। এরপর সরাসরি কমলাপুর স্টেশনে 'সহজ ডটকম'-এর সার্ভার রুমে গিয়ে সাহায্য চাইলাম। তারা জানাল, আমার আবেদন ব্লক হয়ে গেছে এবং সিট আর পাওয়া যাবে না; নির্দিষ্ট কর্মদিবসের মধ্যে টাকা ফেরত পাব। কিন্তু আমার সেই মুহূর্তে যাওয়াটা খুব জরুরি ছিল।
আমি সেখানে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। তখনই আমার চোখের সামনে এক লোক এসে টিকিটের কথা বলল। আর যে কর্মকর্তা আমাকে মাত্রই বললেন কোনো টিকিট নেই, তিনি দ্বিগুণ দামে সার্ভার রুমে বসেই সেই লোকটিকে অন্য সিট কনফার্ম করে দিলেন। এটা দেখার পর আমার মনে হলো, আমার নাগরিক অধিকার প্রকাশ্যেই খর্ব করা হলো, অধিকার ছিনতাই হলো।
আমি তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ জানালে তারা দলবদ্ধ হয়ে আমাকে আক্রমণ করতে আসে। আমি সেখান থেকে সরে এসে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করি। কিন্তু এক মাস পার হলেও কোনো উত্তর পেলাম না। তখন বিভিন্ন যাত্রী গোষ্ঠী ও সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে গিয়ে দেখলাম, হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন একইভাবে প্রতারিত হচ্ছে। বুঝলাম, এটি শুধু আমার একার ভোগান্তি নয়, এটি দেশের সর্বজনীন সংকট।
এশিয়া পোস্ট: সাধারণত সাধারণ মানুষ ঝামেলা এড়াতে এসব মেনে নিয়ে চলে যায়। আপনি সেখান থেকে কীভাবে এই একক গণস্বাক্ষর ও আন্দোলনের পথে হাঁটলেন?
মহিউদ্দিন রনি: যখন অনুধাবন করলাম যে এই সমস্যাটা লাখ লাখ যাত্রীর, তখন চুপ থাকা সম্ভব ছিল না। আমি কিছু কাগজ হাতে নিয়ে সোজা কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত ও স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করি। রেলের কর্মকর্তা ও কিছু লোক এসে বাধা দিল, চলে যেতে বলল। আমি বললাম, ‘আমিও এই ভোগান্তির শিকার। এটা জনগণের সমস্যা, তাই এর প্রতিকার না হওয়া পর্যন্ত আমি সরব।’
তারা বাজে ব্যবহার করে চলে গেল। সন্ধ্যায় এক পুলিশ সদস্য এসে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করল এবং ধাক্কা দিয়ে স্টেশন থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করল। আমি এই নির্যাতনের কথা জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাহায্য চেয়ে পোস্ট করি। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, বড় ভাই এবং বিভিন্ন এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী বন্ধুরা পরামর্শ দিয়ে পাশে দাঁড়ান। মনে জিদ চেপে বসেছিল, এই সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান করতেই হবে।
পরের দিন আবার গেলাম। একপর্যায়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ‘পারফর্মিং আর্ট’ (Performing Art) শুরু করলাম। স্টেশনের ভেতরে-বাইরে, ট্রেনে, রাস্তায় সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণস্বাক্ষরে অংশ নিতে শুরু করল। প্রথম আলোর সাংবাদিক ইয়ানুর ভাই যখন এটি নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করলেন, তখন সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হলো। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরাও পাশে এসে দাঁড়ালেন।
আমি কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকার জন্য যতটুকু সাধারণ ছাত্রলীগের রাজনৈতিক চাপ সহ্য করতে হতো, তার বাইরে আমার বড় কোনো রাজনৈতিক জ্ঞান ছিল না। কিন্তু বিশ্বজুড়ে পপুলার আর্ট ফর্ম ব্যবহার করে কীভাবে গঠনমূলক আন্দোলন গড়ে তোলা যায়, সেই পথেই আন্দোলনটি একটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে রেলওয়ের অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের পরিস্থিতি কেমন দেখছেন? আন্দোলন কি কাঙ্ক্ষিত সমাধান এনে দিতে পেরেছে?
মহিউদ্দিন রনি: সে সময় আন্দোলন এতটাই তীব্র হয়েছিল যে রেলওয়ের পলিসি মেকিং ফোরামে অংশীজন সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নাগরিক অধিকারকর্মী হিসেবে আমি, শাওন ও কামরুন নাহার মুন্নি আপা অংশ নিই। রেল কর্তৃপক্ষ নীতিগত অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু বাস্তবে তাদের এক্সিকিউশন বা বাস্তবায়ন ছিল শূন্য। চারপাশ থেকে রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা সংস্থার নানা চাপ আসতে শুরু করে।
যেহেতু তখন আমার কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় বা ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না, একপর্যায়ে আমি পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই এবং সাময়িকভাবে আন্দোলন স্থগিত করি। ভেবেছিলাম হয়তো পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি যে অনিয়ম, টিকিট কালোবাজারি ও পুকুরচুরি আবার আগের মতো জাঁকিয়ে বসেছে। কিছুদিন আগে নির্মাতা আশফাক নিপুণ ভাইও ‘সহজ ডটকম’-এর দুর্নীতি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন।
রেলওয়ের মূল অনিয়ম শুরু হয় কেনাকাটা থেকে। আমলারা সেখানে যে দুর্নীতি করে, তা অবিশ্বাস্য। ১ টাকার নাট-বল্টু আমলারা ১০০০ টাকা দাম লিখে কেনাকাটা দেখায়। মন্ত্রী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বদলায়, কিন্তু আমলা ও ঠিকাদারদের যে সিন্ডিকেট, তা আজও বজায় রয়েছে। সরকারের দিক থেকে চরম কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া রেলকে এই দুর্নীতি থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।
এশিয়া পোস্ট: একসময় আপনি কেবল অধিকারকর্মী ছিলেন, সেখান থেকে রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন? এবং দল হিসেবে এনসিপি’কেই বেছে নেওয়ার পেছনে কারণ কী?
মহিউদ্দিন রনি: একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে আপনি রাজপথে আন্দোলন করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে একটা ঝাঁকুনি দিতে পারেন, কিন্তু নীতি নির্ধারণী জায়গায় পরিবর্তন না আনলে টেকসই কোনো উন্নয়ন হয় না। আন্দোলন করে আমরা হয়তো টেবিল পর্যন্ত যেতে পেরেছি, কিন্তু দিনশেষে নীতি বাস্তবায়ন করেছে পুরোনো সিস্টেম।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ একসাথে রাজপথে জীবন দিয়েছিল। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরও কি আওয়ামী লীগের তৈরি করা দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সিস্টেম পরিবর্তন হয়েছে? না, হয়নি। আমার কাছে মনে হয়, পুরোনো এক ভাঙা বাসের কেবল ড্রাইভার বদল হয়েছে, বাস আগের মতোই ভাঙাচোরা রয়ে গেছে।
আওয়ামী লীগের সময় দেখতাম নেতার পেছনে কর্মীরা 'আপা আপা' বলে চিৎকার করে দৌড়াচ্ছে। বর্তমানের পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোতেও দেখছি ছাত্রদল বা যুবদলের নেতারা একইভাবে দলীয় প্রধানের গাড়ির পেছনে দৌড়াচ্ছে। সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন আসেনি। অন্যদিকে এনসিপিতে কোনো ব্যক্তিপূজা নেই, পরিবারতন্ত্র নেই। এনসিপিতে যুক্ত হওয়া তরুণেরা অত্যন্ত মেধাবী, সুশিক্ষিত ও সৎ। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা পুরোনো দলগুলোর চেয়ে বহুগুণ ভালো। এরা রাজনীতিকে উপার্জনের পেশা না বানিয়ে দেশের সেবা হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার লক্ষ্যেই এনসিপিকে বেছে নেওয়া।
এশিয়া পোস্ট: এনসিপি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার কথা বলে। আপনার অভিজ্ঞতায় দলটির মধ্যে সেই পরিবর্তন বা সীমাবদ্ধতা কতটা দেখছেন?
মহিউদ্দিন রনি: এনসিপির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর দূরদর্শী চিন্তাভাবনা ও সৎ তরুণ নেতৃত্ব। এনসিপিতে নিয়মিত পাঠচক্র ও চিন্তার চর্চা হয়, যা গতানুগতিক ছাত্র সংগঠনগুলোতে দেখা যায় না। তবে আমাদের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো সম্পদের অভাব। আমাদের তরুণ নেতাদের সততা ও মেধা আছে, কিন্তু তাদের কোটি কোটি টাকা নেই। সদ্য পড়াশোনা শেষ করা বা অধ্যয়নরত ছেলেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে প্রবল আর্থিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সম্পদ থাকলে এদের কাজের গতি ও পরিধি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেত।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কী পরিবর্তন এসেছে এবং কোন জায়গায় আমরা ব্যর্থ হয়েছি বলে মনে করেন?
মহিউদ্দিন রনি: সবচেয়ে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন হলো, মানুষের বাকস্বাধীনতা ফিরে এসেছে, মানুষের মন থেকে ভয় কেটে গেছে। দীর্ঘদিন 'রিং মাস্টারের চাবুক'-এর ভয়ে যে জনগণ খাঁচায় বন্দি ছিল, তারা আজ বাঘের মতো গর্জন করতে শিখেছে। রাষ্ট্রযন্ত্র বুঝতে পেরেছে জনগণের ক্ষমতার শক্তিমত্তা কতটুকু।
তবে ব্যর্থতার জায়গা হলো, যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল, সরকারের আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। ৩১ দফার বাস্তবায়ন কেবল কাগজেই রয়ে গেছে। অনেকেই এখন হতাশা থেকে বলেন 'জুলাই ভ্যানিশ হয়ে গেছে'। মূলত যারা বিপ্লবকে ভয় পায়, তারাই এসব বিভ্রান্তিকর কথা ছড়ায়। 'জুলাই' এখন আর কেবল একটা মাস নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও বিপ্লবের প্রতীক। এটি কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, এটি সারা দেশের সর্বস্তরের জনতার।
এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
মহিউদ্দিন রনি: নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যে সাহসিকতা, তা আমাকে দিয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং শহীদ ওসমান হাদী। হাদী ভাই আমাকে শিখিয়েছেন যে এই দেশে একজন কৃষকের ছেলেও নিজের যোগ্যতায় সংসদে গিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন দেখতে পারে। তিনি সাধারণ মানুষের নিকট থেকে ফান্ডিং নিয়ে যেভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তা আমাদের পথ দেখিয়েছে।
ঢাকা-১৮ আসনে প্রার্থী হওয়ার সময় আমি জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে জিতি বা হারি, জনগণের অধিকারের জন্য লড়াই করে যাব। সম্প্রতি আশকোনার দীর্ঘ ২৫ বছরের পুরনো জলাবদ্ধতার বিষয়টি আমি বর্তমান এমপি জাহাঙ্গীর ভাইকে গিয়ে সরাসরি বুঝিয়েছি, সিটি কর্পোরেশনের সাথে সমন্বয় করে সেই রাস্তার কাজ শুরু করানো হয়েছে। একইভাবে আব্দুল্লাহপুরসহ আশেপাশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়েও সংসদ সদস্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছি। জনপ্রতিনিধি না হয়েও যদি সদিচ্ছা থাকে, তবে জনগণের সেবায় ভূমিকা রাখা সম্ভব।
এশিয়া পোস্ট: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে আন্দোলনের সময় আপনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। সেদিন কী ঘটেছিল?
মহিউদ্দিন রনি: শহীদ ওসমান হাদী হত্যার বিচারের দাবিতে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর ডাকে আমরা রাজপথে নেমেছিলাম। কিন্তু পুলিশ অতর্কিতে আন্দোলনকারী সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশুদের ওপর সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও বর্বর লাঠিচার্জ শুরু করে। আমি শুধু পুলিশ সদস্যদের কাছে গিয়ে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কোনো নারী কনস্টেবল ছাড়া আপনারা আমাদের বোনদের ওপর কেন হাত তুলছেন? আমাদের ট্যাক্সের টাকায় আপনাদের সংসার চলে, আপনারা এভাবে কীভাবে হাত তোলেন?’
এই কথাটুকু বলাতেই তারা আমার ওপর নৃশংসভাবে লাঠিচার্জ করে। ৬ মাস ধরে আমি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছি। এতে প্রমাণিত হয়, গত ১৭ বছরে পুলিশের যে লাঠিয়াল মানসিকতা তৈরি হয়েছিল, তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন না করা এবং ড. ইউনুসের সরকারের আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতার কারণে আজও পুলিশ জনগণের ওপর পুরোনো কায়দায় অত্যাচার চালাচ্ছে।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
মহিউদ্দিন রনি: বর্তমানে যে এলোমেলো ও বিশৃঙ্খল অবস্থা চলছে, তাতে সাধারণ মানুষ চরম হতাশ। অপরাধের সংস্কৃতি এখনো বন্ধ হয়নি। একজন পরিচিত নাগরিক হিসেবে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও যেভাবে ভাঙচুর করা হলো, সেখানেও দেখা গেল বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালীরা জড়িত। ফেসবুকে কিংবা গণমাধ্যমে যেসব ঘটনা উঠে আসছে না, সেগুলোর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
আগে যে টিসিবি বা ত্রাণ নিয়ে লুটপাট হতো, এখন 'কার্ড'-এর নামে নিজস্ব লোকজনকে সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে। কোনো যুবদল নেতা বা এমপি নিজেই বেআইনিভাবে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে মাদক নিধনের নামে রাস্তায় মাস্তানি করতে নেমে যাচ্ছেন। সংসদ সদস্যের কাজ আইন সংশোধন ও প্রশাসনকে বাধ্য করা, নিজে লাইসেন্সকৃত বা লেথাল ওয়েপন নিয়ে মাস্তানি করা নয়। অনিয়মে জড়িত নেতাদের কেবল 'সাময়িক বহিষ্কার' করে বিএনপি মূলত তাদের আড়াল করছে, যা কোনো প্রকৃত শাস্তি হতে পারে না। জনগণের ক্ষোভ কিন্তু ভেতরে ভেতরে জমা হচ্ছে।
এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সে বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?
মহিউদ্দিন রনি: প্রায় দুই হাজার মানুষকে হত্যা এবং ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে পঙ্গু করার পর কোনো বিচার ছাড়া আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানো অসম্ভব। কোনো বাবা তার সন্তানের খুনির বিচার না করে তাকে ঘরে ডেকে এনে চা-নাস্তা খাওয়াতে পারে না। আওয়ামী লীগকে আগে তাদের সব কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। গণহত্যার বিচার হতে হবে, শেখ হাসিনাসহ মূল অপরাধীদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হবে এবং পাচার হওয়া হাজার কোটি টাকা দেশে ফেরত আনতে হবে। আইনি বিচার নিশ্চিত হওয়ার আগে তাদের রাজনীতির ময়দানে আসার কোনো সুযোগ নেই।
এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে কালি দেওয়ার ঘটনাগুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মহিউদ্দিন রনি: এগুলো অত্যন্ত আবেগী ও ভুল পদক্ষেপ। শহীদ ওসমান হাদী ভাই মৃত্যুর আগে বলে গেছেন, কারো ওপর গায়ের জোর দেখিয়ে বা ছবিতে কালি মেখে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না। আধিপত্যবাদকে পরাজিত করতে হলে তার চেয়ে 'তমুল যোগ্যতা' অর্জন করতে হবে। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি না দিয়ে আমাদের এমন ওয়ার্কশপ করা উচিত যেন দেশ থেকে ১০ জন নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক তৈরি হতে পারে।
প্রথম আলোর কার্যালয় ভাঙচুর করার ফলে উল্টো শহীদ হাদীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবরটি ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। এটি ছিল এক ধরনের চরম বোকামি। আমাদের রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আধুনিক বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। অযথা উগ্রতা দেখিয়ে দেশের বিশৃঙ্খলা বাড়ালে আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারী ও সুবিধাবাদীদের লাভ হয়, দেশের কোনো লাভ হয় না।
এশিয়া পোস্ট: দেশ গঠনে আগামীর তরুণ প্রজন্মের ওপর আপনার আস্থা কতটুকু? হতাশ তরুণদের উদ্দেশে আপনি কী বলতে চান?
মহিউদ্দিন রনি: তরুণদের প্রতি আমার শতভাগ আস্থা রয়েছে। তরুণদের মধ্যে সাময়িক হতাশা থাকাটা স্বাভাবিক, কারণ যারা রক্ত দিল তারা আজও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ও উন্নত জীবন দেখতে পাচ্ছে না। তবে আমি বলব, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল আমাদের 'প্রথম টার্মিনাল পরীক্ষা', যেখানে শেখ হাসিনাকে হটিয়ে আমরা পাস করেছি।
আমাদের ‘দ্বিতীয় টার্মিনাল পরীক্ষা’ হলো, দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র ও পচা রাজনৈতিক সিস্টেমকে বদলে ফেলা। আর ‘ফাইনাল পরীক্ষা’ হলো, একটি সুসংগঠিত, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
হতাশ না হয়ে শিক্ষিত তরুণদের উদ্দেশ্যে বলব, আপনারা রাজনীতি ও নীতি নির্ধারণের জায়গায় এগিয়ে আসুন। কারণ, যোগ্য ও শিক্ষিত মানুষ রাজপথে ও রাজনীতিতে না এলে সেখানে ভেড়ারা এসে জায়গা দখল করবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলুন, আগামীর বাংলাদেশ তরুণদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হবে।








