পার্লামেন্টে যৌক্তিক কথা বলা উচিত, না হলে কম কথা বলা ভালো

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করবেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি। বরগুনা-২ আসন (বেতাগী-বামনা-পাথরঘাটা) থেকে এবার চতুর্থবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। চিফ হুইপ হিসেবে প্রথম অধিবেশনে বসার আগে সংসদীয় রাজনীতির ঐতিহ্য পুনঃস্থাপনের চ্যালেঞ্জ, বাস্তবতা এবং পরিকল্পনা নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত কথা বলেছেন অভিজ্ঞ এই পার্লামেন্টারিয়ান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাকিল ফারুক
এশিয়া পোস্ট: ১৯৮৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমবার সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। এবার যোগ দেবেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে। মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় চার দশক। আপনার অনুভূতি কী?
নুরুল ইসলাম মনি: আমি যেভাবে যাত্রা শুরু করেছিলাম, একজন ভালো সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য, একজন ভালো পার্লামেন্টারিয়ান হওয়ার জন্য চেষ্টা করেছি। চিফ হুইপ হওয়ার মধ্য দিয়ে তার একটা স্বীকৃতি মিলেছে। পরিণত বয়সে এসে এরকম একটা দায়িত্ব পালন করা—ভালো বোধ করছি, ভালোই লাগছে। সংসদকে ইন অর্ডার রাখার জন্য এবং কার্যকর করার জন্য যে চেষ্টা তা তো অব্যাহত থাকবে, তা আমরা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের পর আপনি হঠাৎ আলোচনায় উঠে এলেন। দলের ভাইস চেয়ারম্যান হলেন। গুঞ্জন ছিল, কোনো একটি দেশের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কোন্নোয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আপনাকে।
নুরুল ইসলাম মনি: আমাদের দেশে মিসইনফরমেশন আর ডিজইনফরমেশনের একটা যুগ চলছে। এটা একটা বিরাট অসুবিধা। কে কী করবে, আমি কী দিয়ে ভাত খাব এই চিন্তা আগামীকালকের। সেটাও সাংবাদিকরা করে ফেলে আগে। সাংবাদিকরা ডিসিশন নিয়ে ফেলে যে, আমি এইটা দিয়ে কালকে ভাত খাব। এটা বলা মুশকিল, খুবই মুশকিল। প্রধানমন্ত্রী, আমাদের নেতা তারেক রহমান মনে করেছেন আমাকে দিয়ে কিছু কাজ করানো সম্ভব। তিনি আমাকে সে মূল্যায়নই করেছেন—আমি যে যোগ্যতাটা রাখি। সে মূল্যায়নের জন্যই আমি ৫ তারিখের পরে ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছি। ব্যাপারটা এরকমই। এখানে প্রত্যেকটি মানুষের একটা কন্ট্রিবিউশন থাকে।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের আগে বিশেষ কোনো দায়িত্ব কী আদৌ পেয়েছিলেন?
নুরুল ইসলাম মনি: না ওই বিশেষ—প্রত্যেকটি মানুষের যেমন একটা ঘর তৈরি করতে হলে রড লাগবে, সিমেন্ট লাগবে, বালু লাগবে, ইট লাগবে, পাথর লাগবে, তারপর মিস্ত্রি লাগবে, কাঠমিস্ত্রি লাগবে—অনেক বিষয় মিলিয়ে তারপর একটা ঘর হয়। আমাদের আন্দোলনটাও কিন্তু তেমন। কেউ রাজপথে থাকবে, কেউ হয়তো বুদ্ধি দেবে, কেউ হয়তো লিখবে, কেউ হয়তো চিন্তা করবে, কেউ হয়তো সম্পর্ক তৈরি করবে—সব মিলিয়েই কিন্তু এটার একটা ফলাফল হয়। আমি মনে করি, আমি তার একটা অংশবিশেষ। সব মিলিয়েই আমি মনে করি আমাদের মাননীয় নেতা তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, আমাকে ভাইস চেয়ারম্যান করলে ভালো হয়, তো তিনি আমাকে ভাইস চেয়ারম্যান করেছেন।
এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের পর শোনা গেল, বড় কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন। কিন্তু তার বদলে আপনাকে দেওয়া হলো সংসদে সরকারদলীয় কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব। কেন?
নুরুল ইসলাম মনি: বললাম না, মিসইনফরমেশন আর ডিজইনফরমেশনের হাইওয়েতে আছি আমরা! আমাদের ২১৯ জন নতুন সংসদ সদস্য এখন, আরও ৪ জন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ৩০০ জনের মধ্যে ২২৩ জনই নতুন হলে সংসদ চালানো তো একটা বিরাট জটিলতার ব্যাপার। কাজেই আমাদের নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মনে করেছেন, আমি এখানে থাকলে বেশি কন্ট্রিবিউট করতে পারব এবং আমার পক্ষে সংসদটাকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করা সম্ভব হবে মনে করেই এ দায়িত্ব দিয়েছেন।
এশিয়া পোস্ট: সংসদ সদস্য হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে আপনি সবসময় সংসদ অধিবেশনে সরব থাকতেন বলে শুনেছি।
নুরুল ইসলাম মনি: সঠিক শুনেছেন। ১৯৮৮ থেকে শুরু করে বিএনপিতে যোগদানের আগ পর্যন্ত আমি তো স্বতন্ত্র সদস্য ছিলাম। আপনারা দেখবেন, এমন কোনো বিষয় নেই পার্লামেন্টে যে বিষয়ে আমি একটা ফ্রুটফুল ইফেক্টিভ আলোচনা করিনি। ১৯৮৮ সাল থেকে সংসদ অধিবেশনের প্রশ্নপত্র খুললেই দেখবেন আমার প্রশ্ন আছে। সিদ্ধান্ত প্রস্তাব দেখবেন, প্রথমটাই আমার। পার্লামেন্টে স্বাধীনতার পরে বিরোধী দল থেকে একটি বিলই পাস হয়েছে—কোস্টগার্ড সংক্রান্ত সেই বিলটি আমার তোলা।
আমি আরও অনেক কাজ করেছি, অনেক বিল এনেছি। ল্যান্ড রিফর্মের কোশ্চেনে আমি কিছু বিল নিয়ে এসেছিলাম, মানে কথা বলেছি। আর যত পার্লামেন্টে ল’ পাস হয়েছে আমার ওই সময়ের মধ্যে এর কোনো ল’তে আমি পার্টিসিপেট করিনি এরকম কোনো ল’ নেই। আমি চেষ্টা করেছি। দ্যাট ওয়াজ মাই ড্রিম যে, আমি একজন ভালো সংসদ সদস্য হবো বা ভালো পার্লামেন্টারিয়ান হওয়ার চেষ্টা করব। আমি চেষ্টা করেছি।
আজকে নতুনদের উদ্দেশ্যেও আমার কিন্তু একটা বক্তব্য আছে—তারা যদি ভালো পার্লামেন্টারিয়ান হতে চান। একজন তো এখানে থেমে থাকবে না, সবাই ওপরে যাবে এটা প্রত্যাশা করি। কাজেই তাদের ভালো পার্লামেন্টারিয়ান হওয়া খুবই জরুরি দরকার। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেখবেন প্রথম মেম্বার হলে তারা কিন্তু অধিকাংশ সময় কোনো কন্ট্রিবিউট করতে পারেন না। বাইরে থাকেন, দেখেন সিনিয়ররা কী করে, এগুলো শেখেন। সেকেন্ড পার্লামেন্টে কিছু কন্ট্রিবিউট করার চেষ্টা করেন। থার্ড পার্লামেন্টে গিয়ে বেশি কন্ট্রিবিউট করেন। আমাদের দেশে একেবারে উল্টোটা হয়। প্রথম পার্লামেন্টে পল্টনের মতো বক্তৃতা দিয়ে ফেলে। বাইরে বক্তৃতা দেয়, বিরাট বক্তৃতা। সেকেন্ড ইয়ারে যদি কোনো সময় আসে তো দেখবেন সে লোক কথা অর্ধেক কমিয়ে ফেলেছে। থার্ড বছর এসে কোনো বক্তৃতা দেয় না, একদম বন্ধ হয়ে যায়।
এশিয়া পোস্ট: অনেকে সংসদে যথাযথ আচরণ করেন না বা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে সময়ক্ষেপণ করেন।
নুরুল ইসলাম মনি: (অনেকে) বুঝতে পারে না। গল্প করতে করতে হয়তো সময় চলে যায়। তাদের প্রোগ্রাম হয় অন্যটা। পার্লামেন্ট তখন প্রোগ্রামের মধ্যে থাকে না। পার্লামেন্টে আপনি দাঁড়াবেন যদি কথা বলতে পারেন। পার্লামেন্টে সেন্স মেক যদি না করে, কোনো কথা একবার হাসির পাত্র হলে তা কিন্তু ফেরানো সম্ভব না এবং হাসির পাত্র হতে হয়। পার্লামেন্টে যা সেন্স মেক করে (যৌক্তিক) কেবল তেমনই কথা বলা উচিত, নইলে কম কথা বলা ভালো।
এশিয়া পোস্ট: দীর্ঘদিন কার্যকরী বিরোধী দল না থাকায় জনআকাঙ্ক্ষার পার্লামেন্ট তো স্রেফ আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। সে অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাবেন কীভাবে?
নুরুল ইসলাম মনি: এটা হলো দুর্ভাগ্য আমাদের যে, গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। একবার পঁচাত্তর সালে বাকশাল করে, আরেকবার এই শেখ হাসিনা গভর্নমেন্টে বসে। কাজেই গণতন্ত্র হত্যা করার একটা প্রতিযোগিতা চলে এখানে। সেটা হত্যা করার পরও আমরা যেটুকু রুডিমেন্টারি ফর্মে বা যে ফর্মে আমরা পাই না কেন, আমরা এটা পূর্ণ বাস্তবায়ন কারার চেষ্টাটা আমরা করব।
বিরোধী দলকে বলব বা প্রত্যাশা করব তাদের কাছ থেকে, তারা গণতন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করুক। কারণ আমরা ভোটে গেছি, ভোটের পরে এরকম সংসদ প্রতিষ্ঠিত হবে।
এশিয়া পোস্ট: সংসদে এবার প্রধান বিরোধী দল হিসেবে পাচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে। এবারের নির্বাচনে জামায়াতের উত্থান এবং সংসদের বিরোধীদল হয়ে ওঠার বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
নুরুল ইসলাম মনি: এবার একটা পরিবর্তিত পরিস্থিতি। বিগত সরকার একটা ফ্যাসিস্ট সরকার ছিল। সেই সরকারে থাকা দলকে নিয়ে নির্বাচন করা যায়নি বা নির্বাচন করার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। সঙ্গত কারণে আমরা বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতকে পাব। আমি মনে করি যে, জামায়াতে অনেক মানুষ আছেন যারা লার্নেড। অনেক মানুষ আছেন যারা প্রতিশ্রুতিশীল, যারা এখন শিখবেন। যেমন এনসিপির যারা আছেন তারা অনেকেই শিখবেন, শিখতে চেষ্টা করেন এবং দেশের সমস্যা নিয়ে তারা কথা বলেন।
এশিয়া পোস্ট: বিরোধী দল থেকে কী রকম সহযোগিতা চাচ্ছেন?
নুরুল ইসলাম মনি: সংসদকে কার্যকর করার জন্য যা সহযোগিতা দরকার তা সবটাই চাই। বিরোধী দল সমালোচনা করবে সরকারের এটা প্রত্যাশা এবং এটা সঙ্গত। সেটা করুক এবং সরকার যেন রাইট ট্র্যাকে থাকে সেটা হলো (তাদের) প্রথম কাজ। আমরা ভালো কাজ করতে চাই। বিরোধী দলের কাছে প্রত্যাশা করব তারা যেন ভালো কাজের সমর্থন দেয়।
এশিয়া পোস্ট: অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র প্রতিনিধিদের মধ্যে কয়েকজন এবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। তারা সংসদে সরকারকে খুব চাপে রাখবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
নুরুল ইসলাম মনি: সংসদে বিরোধী দল চাপে রাখবে এটাই স্বাভাবিক এবং তারা চাপে রাখুক সেটা আমরা প্রত্যাশা করি।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপির পক্ষ থেকে ডেপুটি স্পিকার পদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল জামায়াতকে, কিন্তু তারা বলেছে জুলাই আন্দোলন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এটা করার সুযোগ নেই। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
নুরুল ইসলাম মনি: পলিটিক্যাল রেটোরিক থাকে, পলিটিক্যাল বক্তব্য থাকে। আমি যদি ইলেকশনে বক্তব্য দেই যে আমার প্রতিপক্ষ নেই—তাহলে আমি কী কথা বলব? আমার একটা কথা থাকতে হবে। রাজনীতিবিদরা ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে, এটা রাজনীতিবিদদের বাস্তবতা। কিছু একটা কথা না বললে মানুষের কাছে বলবে কী? যেমন ধরেন জামায়াত বলছে যে, আমরা প্রথম লোয়ার টায়ারের নির্বাচন চাই। ইউনিয়ন পরিষদ চাই, উপজেলা চাই, তারপর পৌরসভা চাই। এগুলা বলছে প্রথম। তারপর বলছে কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি চাই। এটা বলার পরে তারপর বলছে যে, কন্সটিটিউশন ভেঙে নতুন করে লিখব এটা চাই। এর পর বলছে যে, আমরা শেখ হাসিনার বিচার চাই। এরপরে বললেন যে, তার সঙ্গের লোকজনের বিচার চাই। তারপর বললেন যে, আমরা পিআর চাই। পিআরের ব্যাপারে তো কঠিন কথাও বলেছে যে পিআর যদি না হয় দেশে নির্বাচন হতেই দেব না। আমি নির্বাচন করব না তা নয়, হতেই দেব না! এরকম কথা মানে আঙুল সোজা রাখব না আঙুল দরকার হলে বাঁকা করব। এগুলো তো অনেক কথা বলছে। এটা পলিটিক্যাল রেটোরিক। এটা রাজনীতির জন্য।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, উচ্চকক্ষ—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত কীভাবে হবে?
নুরুল ইসলাম মনি: আমরা একটা কার্যনির্বাহী কমিটি করছি, পার্লামেন্টের প্রথম সেশনেই করব ইনশাল্লাহ। সেই কার্যনির্বাহী কমিটি সিদ্ধান্ত নিবে কী কী বিষয় আলোচনা হবে, কেমন হবে, কতক্ষণ আলোচনা হবে।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। বিরোধী দলের এমপিরা শপথ নিয়েছেন। এটা নিয়ে সংসদে কোনো জটিলতা হতে পারে?
নুরুল ইসলাম মনি: পৃথিবীতে যত মুশকিল আছে তত আসান আছে। সমস্যা না হলে সমাধান করব কী? সমস্যা তো হবেই। সমস্যা আমরা ওয়েলকাম করি না। সমস্যার যৌক্তিক সমাধান আমরা প্রত্যাশা করি। বিরোধী দল একবারে নিঃশেষ হয়ে যাবে যদি যৌক্তিক সমাধানে না আসে। আমরাও নিঃশেষ হয়ে যেতে পারি যদি আমরা যৌক্তিক সমাধানে না আসি।
তারা (জামায়াত-এনসিপি) শপথ নিতে পারেন। আমরা শপথ নিইনি, হয়তো এর টেকনিক্যাল কোনো কারণ আছে আমাদের। আমাদের পলিটিক্যাল আরও বোঝাপড়া থাকতে হবে, অন্যদের সঙ্গে আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের ব্যাপার আছে। সবমিলিয়েই আমরা শপথ নেইনি। এ বিষয়টির বাস্তবায়ন তো করবে পার্লামেন্ট। কাজেই আমরা পার্লামেন্টে আলোচনা করে এর একটি সমাধানের পথ বের করব ইনশাল্লাহ।
এশিয়া পোস্ট: এবার স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া কী হবে?
নুরুল ইসলাম মনি: স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়াটা হবে, আমরা যখন হাউজে ঢুকব এই প্রথমবারের মতো দেখব যে একটি শূন্য চেয়ার। কাউকে দেখব না। কোরআন তিলাওয়াতের পরই আমরা শুরু করব। আমাদের সংসদ নেতা প্রস্তাব করবেন যেমন তেহাত্তর সালে শেখ মুজিব করেছিলেন, একজন সিনিয়র মেম্বারকে বলবেন, আজকের সংসদ কনভেন করবেন তিনি, প্রিসাইডিং অফিসার করবেন। তো তিনি বসবেন। বসার পর তিনি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করবেন। নির্বাচন করার পর তারা শপথ নেবেন। সেজন্য হাউজ কিছু সময়ের জন্য অ্যাডজর্ন হবে। শপথ নেওয়ার পর আবার আমরা হাউজ শুরু করব। অ্যাজ ইউজুয়াল যেসব কাজ আছে সেসব চলতে থাকবে।
এশিয়া পোস্ট: কেমন ব্যক্তিকে আমরা স্পিকার হিসেবে দেখব?
নুরুল ইসলাম মনি: আমাদের স্পিকারের ক্রাইটেরিয়া কী? পার্লামেন্ট ভালো চালাতে পারবেন, অভিজ্ঞতা আছে এবং পার্লামেন্ট বোঝেন, যার সেন্স অব হিউমার ভালো। এরকম মিলিয়ে একজন সিনিয়র মানুষের মধ্য থেকে স্পিকার করার আমাদের চেষ্টা। সেই চেষ্টা থেকে আমাদের নেতা তারেক রহমান খুব ভালো জানেন যে, কাকে দিয়ে মূলত কাজটা হবে। সিদ্ধান্তটা তিনিই দেবে
এশিয়া পোস্ট: সংসদ অধিবেশনের শুরুতে কি রাষ্ট্রপতির বক্তব্য থাকবে?
নুরুল ইসলাম মনি: অবশ্যই থাকবে। রাষ্ট্রপতির বক্তব্য থাকবে।
এশিয়া পোস্ট: রাষ্ট্রপতির বক্তব্য তো দলীয়ভাবে তৈরি হবে, তো সেই বক্তব্যে কী থাকবে?
নুরুল ইসলাম মনি: অ্যাডভান্স তো কিছু বলা যাবে না। আমরা খুবই সংগত কারণে প্রত্যাশা করব গণতন্ত্রের কথা থাকবে, দেশের স্বাধীনতার কথা থাকবে, সার্বভৌমত্বের কথা থাকবে, স্বাবলম্বী হওয়ার কথা থাকবে। এগুলো থাকাই উচিত। এগুলো যদি না থাকে তবে সেটা তো বক্তৃতাই হলো না।
এশিয়া পোস্ট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। নিরাপদ এবং সুস্থির ক্যারিয়ারের সুযোগ থাকলেও বরগুনার মতো প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে কেন রাজনীতিতে জড়ালেন?
নুরুল ইসলাম মনি: আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন আব্বার সাথে একটা খালের কাছে আসি খেয়া পারাপার হতে। আব্বার সাথে যাচ্ছি, সেখানে খেয়া পার হবো। শীতের এক সকালে দেখি খেজুর গাছের পাশে একটা সাঁকো। সেটি দিয়ে পার হয়ে নিচে নামতে হয় খেয়ায় যাওয়ার জন্য। তার পাশে একটি বাচ্চা ঘুমিয়ে আছে। তার বয়স হয়তো চার বা পাঁচ হতে পারে। মশারি কাপড়ের মতো পাতলা একটা কাপড় পরা। শীতের শিশির তার গায়ে পড়ছে। সেটি আমি ভুলি নাই কখনো। বলতে গেলে এখন আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে। ফিল করি যে এরকম মানুষ আছে, এরকম শীতের সকালে আমরা লেপের মধ্য থেকেও শীতকাতর থাকি, আর এক শিশু খেজুর গাছের পাশে শুয়ে আছে যাতে বাতাস না লাগে। আবার একটা মশারি কাপড়ের মতো ত্যানা উপরে ঝোলানো। সে একটা ছোট লাঠি জোগাড় করে ধরেছে। সেটা আমার খুব খারাপ লেগেছে। তো আমি মনে মনে ডিসাইড করি, যদি কোনো দিন সুযোগ হয় আমি এসব মানুষের পাশে দাঁড়াব। সেটা আমাকে রাজনীতিতে উদ্ধুদ্ধ করেছে।
চাকরি করার অনেক সুযোগ থাকলেও আমি চাকরির দরখাস্ত করি নাই কোনোদিন। আমার মন টানত না। মনে মনে ভাবতাম মানুষের যদি কিছু কল্যাণ করতে পারি। একটা কাজ তো করলাম। এইরকম চিন্তাভাবনা থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন শুরু করি। দ্বিতীয়বার যখন মানুষের কাছে যাই আমি, প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে, আমি যদি আপনাদের কোনো টাকা আত্মসাৎ করে থাকি, কিছু নষ্ট করি বা বেশি কাজ না করে থাকি, চাকরি না দিয়ে থাকি তবে আমাকে ভোট দেবেন না। সেবারও মানুষ আমাকে জয়ী করেছে।
এশিয়া পোস্ট: স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দুবার এমপি হওয়ার পর কেন বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন?
নুরুল ইসলাম মনি: আমি বিএনপিতে যোগ দিয়েছি কারণ আমার কাঙ্ক্ষিত কাজ করার জন্য একটা দলের সাপোর্ট দরকার। আমি একা সব পারি না। সব মন্ত্রণালয়ে আমাকে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। দৌড়াদৌড়ি করতে করতে আমার গ্যাস্ট্রিক হয়ে গেছে।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপিতে যোগ দিয়ে প্রথম নির্বাচন করলেন ২০০১ সালে। তারপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ফের প্রার্থী হলেন ২০১৮ সালে। এই দীর্ঘ বিরতির কারণ কী ছিল?
নুরুল ইসলাম মনি: দেশে তো গণতন্ত্রই ছিল না। দেশে একটা টোটাল অটোক্রেটিক গভর্নমেন্ট ছিল। একটা কর্তৃত্ববাদী সরকার ছিল—সেখানে আপনি আমি নির্বাচন করলে করতাম কী? ধরুন আমি স্বতন্ত্র নির্বাচন করলাম, কী করতে পারতাম তাতে? বরং পার্লামেন্টে বক্তৃতা দিলে আরও বিপদে পড়তাম।
এশিয়া পোস্ট: সব মিলিয়ে নতুন পার্লামেন্ট কেমন হবে বলে প্রত্যাশা করেন?
নুরুল ইসলাম মনি: আমাদের ট্র্যাডিশন হলো পার্লামেন্ট বয়কট করা। আমি মনে করি জামায়াত থেকে যারা এসেছেন দে আর ভেরি সেন্সিবল। আমি এটা বিশ্বাস করি। সাম লার্নেড পিপল আর দেয়ার। তাদের বক্তৃতা শুনতে ভালো লাগে এবং ভালো কথা বলেন। আমি মনে করি গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং দেশের স্বার্থে আমরা এমন কিছু করব যাতে পেছনের ট্র্যাডিশন আমরা ভাঙব। সেটি সম্ভব বলেই আমি আশাবাদী।
এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
নুরুল ইসলাম মনি: এশিয়া পোস্টকেও ধন্যবাদ।