logo

আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোয় পুলিশ জনরোষের শিকার হয়েছে: জয়নাল আবেদীন শিশির

আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোয় পুলিশ জনরোষের শিকার হয়েছে: জয়নাল আবেদীন শিশির

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলটির রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাকারিয়া নূরী। 

এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। নির্বাচনকে কীভাবে মূল্যায়ন করছে এনসিপি?

জয়নাল আবেদীন শিশির : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আমাদের দলের ভেতরে, বাইরে, সুশীল সমাজ, তারপর আমাদের ভোটার সবারই একটা মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ বা ক্রিটিক্যাল ইভোলিউশন হয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা যে প্রত্যাশা করেছিলাম, তার চেয়ে একটু কম সাফল্য পেয়েছি। যদি প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকত বা শেষ দিকে যদি ভোট গণনায় সমস্যা না হতো এবং যদি ভোট ডিক্লিয়ারেশনটা ঠিকমতো হতো, তাহলে প্রত্যাশিত ফলাফল পেতাম। তারপরও শত বাধা, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সব পেশি শক্তি, কালো টাকার প্রভাব এবং মিডিয়া ব্ল্যাকআউটের পরেও জনগণের সাড়া পেয়েছি। দশ মাসে গড়ে ওঠা একটি সংগঠন আল্লাহর রহমতে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সংসদে গেছে। যারা সংসদে গেছে, বাংলাদেশের যে কেউ বলবেন, তারা সবচেয়ে দক্ষ, যোগ্য এবং তারা পরীক্ষিত নেতা। সে হিসেবে কিছু বিষয় এনসিপির আত্মতুষ্টি আছে। যে ছয়জন সংসদ সদস্য হয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই দেশের জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবেন। 

এশিয়া পোস্ট : জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি জোটে যাওয়ার কারণে এনসিপির ভেতরে এবং বাইরে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এনসিপি কী ভাবছে?

জয়নাল আবেদীন শিশির: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমরা নির্বাচনি ঐক্য করেছি, আসন সমঝোতা করেছি প্রকাশ্যে। এতে কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো হীনম্মন্যতা নেই। জামায়াতের দিক থেকেও কোনো হীনম্মন্যতা নেই। শুধু জামায়াতের সঙ্গে আমরা নির্বাচনি জোট করেছি ব্যাপারটা এমন নয়, আমরা ১১ দলীয় একটা নির্বাচনি ঐক্য করেছি। জামায়াতে ইসলামী সেখানে একটি বড় স্টেকহোল্ডার, এনসিপিও বড় স্টেকহোল্ডার। 

‘জুলাই বিপ্লব’-এর পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যখন গঠিত হয়, তখন রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য সব দল থেকেই প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল। তখন এই সংস্কার প্রস্তাবে যাদের সঙ্গে আমাদের বেশি মিল এবং যাদের সঙ্গে আমাদের সংস্কার প্রস্তাব মিলে যায়—তারাই ১১ দলীয় জোটে । জামায়াতের সঙ্গে আমাদের সংস্কার প্রস্তাবের ৮০-৯০ শতাংশ মিল। আর যাদের সঙ্গে আমাদের নির্বাচনি ঐক্য বা জোট হয়নি তাদের সঙ্গে আমাদের ৮০-৯০ শতাংশ অমিল। তারা আমাদের এই সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বেশির ভাগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে, নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। তার মানে আমাদের নির্বাচনি যে জোট বলেন, ঐক্য বলেন, সমঝোতা বলেন এটা মূলত হয়েছে জুলাইয়ের সনদ বাস্তবায়ন এবং জুলাইয়ের সংস্কার বাস্তবায়ন করা নিয়ে। এই বাস্তবায়নকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা জোট করেছি। 

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, বিএনপির সঙ্গে এনসিপির কেন জোট হলো না। সংস্কার প্রস্তাবের অনেক জায়গায় সিপিবির সঙ্গেও আমাদের মিল নেই। সিপিবির সঙ্গে বিএনপির অনেক মিল। বিএনপি যেসব জায়গায় নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, সেসব জায়গায় সিপিবিও দিয়েছে। 

আমি জুলাইয়ের সন্তান, এনসিপি জুলাইয়ের অগ্নিগর্ভ থেকে গড়ে ওঠা একটা রাজনৈতিক দল। জুলাইকে বাস্তবায়ন করতে হবে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে, জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করা যাবে না। 

অনেকেই আমাদের বিভিন্ন তকমা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যারা আমাদের এই তকমা দিচ্ছেন তাদের বলতে হবে—জিয়াউর রহমান কাদের সঙ্গে জোট করেছিলেন? জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করেছেন। বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছেন। তারেক রহমানও জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, কিন্তু তিনি ক্ষমতাসীন ছিলেন। তিনিও তখন জোট করেছেন। দুই দশকেরও বেশি বিএনপি-জামায়াতের আনুষ্ঠানিক জোট ছিল, আন্দোলন-সংগ্রামের জোট ছিল, রাজনৈতিক এবং নির্বাচনি জোটও ছিল। সুতরাং, জুলাইয়ের সংস্কারপন্থি দলগুলোর সঙ্গে জোট করা নিয়ে আমাদের কোনো হীনম্মন্যতা নেই। আমাদের মূল অগ্রাধিকার হচ্ছে জুলাই সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা এবং জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা।

এশিয়া পোস্ট: এনসিপি তো জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি জোট করেছিল। জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচনি জোট করার একটা উদ্দেশ্য থাকে; কিন্তু নির্বাচনের পরে রাজনৈতিক জোট গঠন করার ঘোষণা দিয়েছে এনসিপি। এই ঘোষণার কারণ কী?

জয়নাল আবেদীন শিশির: বিএনপিকে আমরা এখনও বন্ধু মনে করি, যারা আমাদের বিপ্লবের সহযোগী ও অংশীদার। এই বিপ্লবের বন্ধুরা যে জুলাই সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে একটা নির্বাচন পেল, সরকার গঠন করল, নির্বাচনের পরেই তারা জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতিকে ভঙ্গ করল, বেইমানি করল, গাদ্দারি করল।

বিএনপি বলছে, ১৯৭২ সালের মুজিব-ইন্দিরা সংবিধানের আলোকে দেশ চালাবেন। তারা জুলাইয়ের আলোকে দেশ চালাবেন না বা জুলাইয়ে যে প্রতিশ্রুতিগুলো রয়েছে তারা সেগুলোকে অগ্রাহ্য করছেন। তারা বলছেন, সংবিধানে গণভোট নেই। কোন সংবিধানে নেই? মুজিব-ইন্দিরার ৭২-এর সংবিধানে নেই। তারা বলছেন যে, জুলাই সাংবিধানিক আদেশ অনুযায়ী জুলাই সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের যে শপথ নেওয়ার কথা, দুইটা শপথ নেওয়ার কথা, তারা এটা নেবেন না। কেন নেবেন না? ওই মুজিব-ইন্দিরার ৭২-এর সংবিধানে এটা লিপিবদ্ধ নেই।

আমি বিএনপির বন্ধুদেরকে বলি—আপনারা যে মুজিব-ইন্দিরার ৭২-এর সংবিধান অনুযায়ী বলছেন যে, আপনারা সংবিধানের বাইরে যেতে পারবেন না। তাহলে ওই সংবিধান অনুযায়ী কি ২০২৬ সালে ইলেকশন হওয়ার কোনো সুযোগ আছে? ইলেকশন তো হওয়ার কথা ২০২৯ সালে। তারপরেও যদি আপনারা ওই সংবিধান মানেন, তাহলে কি এখনও আপনারা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী মানেন? না তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী মানেন? সংবিধান অনুযায়ী কি তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রী? নাকি আপনাদের ভাষায় শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী?

যদি মনে করেন আপনারা ওই মুজিব-ইন্দিরার ৭২-এর সংবিধান পুরোপুরি মানবেন, তাহলে আপনাদেরকে এই ব্যাখ্যা দিতে হবে। আর যদি আপনারা মনে করেন যে—না, জুলাই সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে একটা নির্বাচন হয়েছে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনটা বৈধ হয়েছে, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তারেক রহমান বৈধ প্রধানমন্ত্রী, তাহলে আপনাদেরকে অবশ্যই জুলাইয়ের সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে হবে। আর যদি আপনি একটা নেন, আরেকটা না নেন—তাহলে আপনি দ্বিচারিতা করলেন। তারেক রহমানকেও আপনি প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। যদি সাংবিধানিক আদেশ আপনি না মানেন তাহলে তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুললেন। এই নির্বাচনটা কীভাবে হলো? তারেক রহমান কি অবৈধভাবে ক্ষমতায় বসেছেন? নিঃসন্দেহে না। জুলাই সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে একটা নির্বাচন হয়েছে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে তিনি ক্ষমতায় বসেছেন। তারা এখন যে কুযুক্তি দিচ্ছে, এগুলো মূলত আওয়ামী লীগের রোগ, তাদের এখন ওই রোগে ধরেছে। ঠিক আওয়ামী লীগও একই কাজ করত। আওয়ামী লীগ নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে নির্বাচনে জিতে এসেছে। আসার পরে কী করল? সে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটা সংসদে বিল পাস করে উঠিয়ে দিল। যাতে তার কোনো প্রতিপক্ষ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে। 

ঠিক বিএনপি এখন চাচ্ছে, যে জুলাইয়ের রক্তের মধ্য দিয়ে সে ক্ষমতায় এলো, আসার পরে সে-ও ওই সাঁকোটা ভাঙার চেষ্টা করছে। সে-ও চায় সাঁকোটা ভাঙা থাকুক, আমি আর এটা মেরামত করব না। জুলাই সংস্কার আমি করব না। করলে অন্য কেউ এখানে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার চেষ্টা করবে।

ধরেন, তারেক রহমান—আমি এবং ডামি ইলেকশনের আগে যেটা শেখ হাসিনা ২০২৪ সালে করেছিল, তিনি কি অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেননি? ওই অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ার পরে আওয়ামী লীগ এত পরিমাণ নিপীড়ন করল, বিএনপি নেতাকর্মীরা রাস্তায় নামতে পারল না, সাধারণ জনগণ প্রশ্নই আসে না। ২০১৪ সালে যখন তারা বিনা ভোটে ইলেকশন করে ১৫৪ জন বিনা ভোটে এমপি হয়ে যায়, তারপরেও বিএনপি অনির্দিষ্টকালের অবরোধ দিয়েছে। ওই অবরোধ কিন্তু এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি এবং অসহযোগ আন্দোলন কিন্তু এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি। এগুলো কিন্তু এখনও চলে।

এখন বিএনপির বন্ধুদেরকে বলতে চাই আপনারা যে মুজিব-ইন্দিরার ৭২-এর সংবিধান দেখান, বর্তমান সংবিধান দেখান, ওই সংবিধান কি ১৭ বছর আপনাদেরকে ভোটাধিকার ফেরত দিতে পেরেছে? ওই সংবিধান কি আপনাদের একটা নির্বাচন দিতে পেরেছে? 

আপনাদেরকে মনে রাখতে হবে, আপনাদের একটা নির্বাচন উপহার দিয়েছে ২০০০ ছাত্র-জনতার রক্ত। এখানে সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে রক্ত। এই রক্তের ওপরে কোনো ম্যান্ডেট নেই। ৭২-এর সংবিধান আপনাকে এই নির্বাচন দিতে পারেনি, ১৭ বছর আপনার ভোটাধিকার ফেরত দিতে পারেনি। গণভোট বলেন, আর যাই বলেন সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে শহীদের রক্ত। শহীদরা যদি এখানে রক্ত না দিতেন ২০২৬ সালে আমরা ইলেকশন পেতাম না। ২০২৯ সালের ইলেকশন হলেও আপনি কি মনে করেন শেখ হাসিনা ছাড়া কেউ ভোটকেন্দ্রে যেতে পারত? আমরা এক প্রকার ভুলেই গিয়েছিলাম আমাদের ভোটাধিকার আছে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার কাছে আমরা শুধু সামান্য একটা অধিকার চেয়েছি সেটা হচ্ছে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার অধিকার। আমরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেও শেখ হাসিনা কী করত? ডিজিএফআই, এনএসআই দিয়ে আমাদেরকে ধরে নিয়ে আসত। বন-জঙ্গলে লুকিয়ে থাকলেও ধরে নিয়ে আসত। ভোটাধিকার দূরে থাক, একটা ফেসবুকের স্ট্যাটাস দিতে পারিনি। এই যে আপনি এখন ভোটাধিকার পেলেন, ২০২৬ সালে একটা নির্বাচন পেলেন, প্রধানমন্ত্রী হলেন, মন্ত্রী হলেন, এমপি হলেন, তারপরে শহীদের রক্ত ভুলে গেলেন? আপনারা এখন জুলাই চার্টার মানবেন না? জুলাই চার্টার অনুযায়ী যে দুইটা শপথ নেওয়ার কথা ছিল, একটা শপথ নিলেন না। শহীদের রক্তের সঙ্গে এই বেইমানিটা করতে পারলেন? 

এশিয়া পোস্ট: জুলাই সনদ রক্ষা করা হবে না বলে নতুন সরকারকে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করছেন এনসিপির নেতারা। বিএনপি যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে, তবে জুলাই স্পিরিট এবং জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এনসিপির পরিকল্পনা কী?

জয়নাল আবেদীন শিশির: আমি মোটেও বিএনপিকে অভিযুক্ত করছি না, বরং আমি বিএনপিকে বলছি তুমি জুলাইয়ের পক্ষে ছিলে, জুলাইয়ের শক্তি ছিলে, এখন তুমি জুলাই থেকে বের হয়ে যাচ্ছ কেন? বিএনপি তো বলেছে জুলাই সনদ এবং সাংবিধানিক আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। সে অনুযায়ী তো নির্বাচন হলো। বিএনপির চৌকস নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ প্রকাশ্যে জনসভায় বলছেন, আমরা দুইটা শপথ নেব, একটা সংসদ সদস্যের শপথ, আরেকটা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ। সালাহউদ্দিন ভাইয়ের বক্তব্যের ওই ফুটেজ এখনও আছে। তারা এখন যদি মনে করেন, শেখ হাসিনার পতন ঘটিয়ে আমরা ১৯৭২-এর সংবিধান লঙ্ঘন করেছি, আর্টিকেল-৭ অনুযায়ী তো আমাদের ফাঁসি হয়। তাহলে তারাও তো বলেন, তারা আন্দোলনে ছিলেন, তারেক রহমান জুলাই আন্দোলনের মহানায়ক। আমাদের যদি ফাঁসি হয়, তাদেরও তাই হবে।

পুলিশ কি আসলে হত্যা হয়েছে? পুলিশ এত পরিমাণে আন্দোলনকারীদের পাখির মতো গুলি করছে যে শেষ পর্যন্ত পুলিশের মনোবল ভেঙে গেছে, জনরোষের শিকার হয়েছে। আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য পুলিশ হত্যা করা ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা। এখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন ও পুলিশ। 

জুলাই আন্দোলনে কি শুধু পুলিশ মারা গেছে, আওয়ামী লীগের লোকজন মারা যায়নি? আমাদের সঙ্গে সম্মুখ সারিতে যুদ্ধ করে আওয়ামী লীগের লোকজন তো মারা গেছে। প্রকাশ্য যুদ্ধে আমরা বিজয় লাভ করেছি। তখন কি শুধু বিজয়ী শক্তির সৈন্য মারা গেছে, পরাজিত শক্তির সৈন্য মারা যায়নি? সবকিছু বিএনপিকে ব্যাখ্যা করতে হবে। দেশে এসে আপনি অন্য সুরে কথা বলছেন। তাহলে আমাদেরকে ভাবতে হবে জুলাই হয়তো শেষ হয়নি। 

 

অনেকেই ঐতিহাসিকভাবে সনদ, চুক্তি ও সন্ধির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে, বিশ্বাসঘাতকতা করে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। যারা এসব করে সনদ লঙ্ঘন করে তাদের পরিণতি কী হয়, তা আমাদের জানা। যেমন—ব্রিটেনের ম্যাগনা কার্টাকে বলা হয় মহাসনদ। ম্যাগনা কার্টা স্বাক্ষর করেন রাজা জন। ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে সনদ সই করার পর পরেই তা লঙ্ঘন করেন তিনি। তিনি বলেছিলেন, আমি এটা মানব না। তখন ব্রিটেনে দুই বছর চলে গৃহযুদ্ধ। পরে ১২১৭ খ্রিস্টাব্দে জনরোষে বাধ্য হয়ে তিনি তা মানতে বাধ্য হন। ক্ষমতাচ্যুত হন রাজা জন, আরেকজন রাজা আসেন। পরে বাস্তবায়ন হয় ওই সনদ।

আরেকটা ঐতিহাসিক সন্ধি হলো—হুদাইবিয়ার সন্ধি। ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে মক্কার কুরাইশদের এ হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়েছিল। হুদাইবিয়ার সন্ধিটা লঙ্ঘন করে কুরাইশরা। সে বছরই তারা তা লঙ্ঘন করে। এই লঙ্ঘনের দুই বছর পরে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয় হয়ে যায়। কুরাইশদের পতন হয়। পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব হয়ে যায়।

আমি বোঝাতে চাচ্ছি, ব্রিটেনের ম্যাগনা কার্টার ক্ষেত্রে দুই বছর পরে ওই সনদ মানতে বাধ্য হন রাজা জন। পরে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। হুদাইবিয়ার সন্ধি লঙ্ঘনকারীরাও কিন্তু দুই বছর পরে সমূলে উৎপাটন হয়। পরে পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবের মাধ্যমে তারা ভেসে যায়। যদি বাংলাদেশেও এই দুনিয়া কাঁপানো জুলাই বিপ্লবকে, জুলাই সনদকে এবং জুলাইয়ের রক্তকে অবমাননা কেউ করে, ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে তাদের। কারণ, এই জুলাইয়ে যারা জীবন দিয়েছে তারা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী না। তারা নিষ্পাপ, তাদের রক্ত পবিত্র। এই পবিত্র রক্তের হিসাব আল্লাহই বুঝে নেবেন।

আমরা যারা জুলাই যোদ্ধা, আমরা কিন্তু এখন বোনাস লাইফ লিড করছি। ৩ আগস্ট আমরা সংবিধান ভায়োলেশনের ঘোষণা দিয়েছিলাম। শেখ হাসিনাকে আমরা মানি না, শেখ হাসিনার পতন চাই। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে পতন করে আমরা সংবিধান ভায়োলেশন করে ফেলি। ওই সংবিধানের ভায়োলেশন দায়ে যতজন জুলাই যোদ্ধা সবার এখানে আর্টিকেল ৭ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড। তখন আমরা মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আমাদের আবার কীসের নিরাপত্তা, আমরা তো শহীদের কাতারের লোকজন, আমাদের জীবনটা এখন বোনাস। আমরা সহপাঠীর লাশ দেখছি, লাশের স্তূপ দেখছি। আমরা আসলে এই নিরাপত্তার জন্য খুব বেশি চিন্তিত না। আমরা মনে করি, দেশের সব মানুষের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। শুধু আন্দোলনকারীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এটা কোনো ভালো প্র্যাকটিস না।

এশিয়া পোস্ট: জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আপনারা (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোটের ঘোষণা দিলেন, কিন্তু সিটি নির্বাচনগুলোতে এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। এর কারণ কী?

জয়নাল আবেদীন শিশির: দেখেন আমরা কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি আসন সমঝোতা করে জাতীয় নির্বাচন করেছি। সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে এখনও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমাদের সমঝোতা হয়নি। তবে সমঝোতা হতেও পারে। এখনও এ ব্যাপারে কনক্রিট সিদ্ধান্তে আসেনি ১১ দল। এর আগ পর্যন্ত আমার দলের যে প্রস্তুতি, আমার দলের যে কর্মকাণ্ড তা আমাদের এককভাবে নিতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের মতো করে যদি আবার সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে তা সামগ্রিকভাবে দেখা হবে। 

এশিয়া পোস্ট: রাজনৈতিক দল গঠনের পর এনসিপি দীর্ঘ এক বছর অতিক্রম করেছে। এই এক বছরে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে এনসিপি প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট নিয়ে আপনাদের মূল্যায়ন কী?  

জয়নাল আবেদীন শিশির: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সবাইকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। বাংলাদেশের সব জনগণকে আমাদের দলের পাশে চাই। একটি বছর আমরা জনগণের পাশে বেশি বেশি থাকার চেষ্টা করেছি। যে দেশের ৩০০ এমপি পালিয়ে যায়, প্রধান বিচারপতিকে পালাতে হয়, প্রধান জাতীয় মসজিদের ইমাম পালিয়ে যায়—এ রমক একটি বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে একটা দল গঠন হয়। তারপর হাঁটি হাঁটি পা পা করে আজ আল্লাহর রহমতে সংসদেও যায়। সব মিলিয়ে আমরা মনে করব ব্যক্তি হিসেবে আমরা আত্মতৃপ্ত। কিন্তু আমরা অনেক বেশি অহংকারী না বা আমরা কোনো অতিরিক্ত খুব বেশি কিছু করে ফেলেছি এরকম মনে করি না।

শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরে ৭ আগস্ট বিএনপি নয়াপল্টনে একটি সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা দেন, ৩ মাসের মধ্যে ইলেকশন দিতে হবে। তখন বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ৬৩টি মিত্র দল দ্বিমত করেনি। একমাত্র বাদ সাধলাম আমরা। এখন ‘আমরা’ কারা? আমরা মানে শুধু এনসিপি না। আমরা মানে জুলাই যোদ্ধারা। ২০০০ ছাত্র-জনতা শুধু একটি নির্বাচনের জন্য জীবন দেয়নি। রাষ্ট্রের সংস্কার দরকার, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোতে পরিবর্তন দরকার। এ রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোটা যেভাবে বিদ্যমান, এখানে ফ্যাসিস্ট তৈরি হবেই। 

আমরা বললাম, সাবেক যুবলীগ নেতা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবউদ্দিনকে অপসারণ করা হোক। তিনি বিপ্লবীদের সঙ্গে বেইমানি করবে, গাদ্দারি করবে। যখন বাহিনীগুলোর কিছু দুষ্ট অফিসার হেলিকপ্টার দিয়ে আমাদের ভাই-বোনদেরকে হত্যা করে, তখন এ রাষ্ট্রপতি তো ৩ বাহিনীর প্রধান ছিলেন, বিভিন্ন বাহিনীর তিনি অভিভাবক। তিনি কি নিষেধ করেছেন—তোমরা এ কাজটা করতে পারো না, মাসুম বাচ্চাদের তোমরা হেলিকপ্টারে করে হামলা করতে পারো না, হামলা করে তাদেরকে হত্যা করতে পারো না, এ কথাটা কিন্তু তিনি বলেননি। তা বলেননি মানে কী? তিনি এ হত্যাকাণ্ডে সায় দিয়েছেন এবং তিনি খুনি, তিনি অপরাধী।

আমরা বললাম একটা সেকেন্ড রিপাবলিক করা হোক। যে বাংলাদেশ দুনিয়া কাঁপিয়ে জুলাই রেভল্যুশন করেছে, এ জুলাই রেভল্যুশনের জন্য সারা পৃথিবীর বড় বড় শহরগুলোতে এর পক্ষে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীগুলো আমাদের এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছে। তারাও কিন্তু কন্ট্রিবিউশন রাখে। আমরা বললাম, ১৯৭১ সালে যদি প্রথম রিপাবলিক হয়, তবে এবার দ্বিতীয় রিপাবলিক করি। তারা দিলেন না। কেন রিপাবলিক দিলেন না? কোনো ব্যাখ্যা নেই। অথচ, ফরাসি বিপ্লবের পরে ফ্রান্সে আজ পঞ্চম রিপাবলিক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড রিপাবলিক, থার্ড রিপাবলিক, ফোর্থ রিপাবলিক আছে। আমরা কি শুধু একটা রিপাবলিকেই থাকব? কেন আমরা সেকেন্ড রিপাবলিক করতে পারলাম না? সেকেন্ড রিপাবলিক করলে বিএনপির কী ক্ষতি হতো? অন্য পলিটিক্যাল পার্টিগুলোর কী ক্ষতি হতো? আমাদের কথা মানা হলো না। আমরা প্রতারিত অনুভব করলাম। আমরা দেখলাম— আমরা প্রতারিত হচ্ছি। 

আমরা চেয়েছি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হোক, বিএনপি বা বিএনপিমনা রাজনৈতিক দলগুলো তা হতে দেয়নি। আমরা দেখলাম, আমাদের কোনো কিছুই গ্রাহ্য হচ্ছে না। গ্রাহ্য হয়নি সেকেন্ড রিপাবলিক, গ্রাহ্য হয়নি খুনি রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ, গ্রাহ্য হয়নি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিষয়টি। 

পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাদের একটা পলিটিক্যাল পার্টি করা উচিত। কারণ, আমাদের কথাগুলো কেউ বলছে না। আমাদের সংসদে যাওয়া উচিত। মানুষের দ্বারে দ্বারে আমাদের যাওয়া উচিত। রাজনৈতিক দল করলে আমরা মানুষের কাছে বেশি যেতে পারব। রাজনৈতিক দল না করলে, সংগঠিত না হলে আমাদের কথা কেউ শুনবে না। জুলাই বিপ্লবীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। যার কারণে আমরা বাধ্য হয়ে জুলাই বিপ্লবীদের রক্ষা এবং ঐতিহাসিক সংস্কারের জন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠন করলাম। আমরা প্রতারিত হয়েছি, অসহযোগিতার সম্মুখীন হয়েছি এবং জায়গায় জায়গায় আমাদেরকে বাধা দেওয়া হয়েছে, তখন আমরা বাধ্য হলাম এ রাজনৈতিক দল গঠন করতে।

এশিয়া পোস্ট: প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আপনাদের কর্মসূচি কী?

জয়নাল আবেদীন শিশির: ঢাকার ধানমন্ডিতে আবাহনী খেলার মাঠে আলোচনা সভার পর ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি, অন্যান্য দলীয় নেতাদেরও দাওয়াত করা হয়েছে। এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা সারাদেশে ইফতার কর্মসূচি, আলোচনা সভার আয়োজন করেছি। সব মিলিয়ে আমরা ১০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। আমরা এ ১০ দিন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করব।