logo

‘কারও অনুগ্রহ নিয়ে রাজনীতি করতে চাই না’

‘কারও অনুগ্রহ নিয়ে রাজনীতি করতে চাই না’
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির শুরু। দায়িত্ব পালন করেছেন ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে। পরবর্তীতে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ১৬ বছর মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সবশেষ চলতি বছরের জুন মাসে দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার বিশেষ অধিবেশনে তাকে দলের মহাসচিব মনোনীত করা হয়। গাজী আতাউর রহমান সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। কথা বলেছেন দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শাসনতান্ত্রিক সংস্কার, মানবাধিকার ও সমসাময়িক নানা জাতীয় ইস্যুতে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতি কতটা উপযোগী?

গাজী আতাউর রহমান: এশিয়া পোস্টকে ধন্যবাদ এবং এর মাধ্যমে দেশবাসী ও সম্মানিত দর্শক-শ্রোতাদের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যে ধরনের রাজনীতি চর্চা হয়ে আসছে, তা আমাদের রাজনীতির জন্য খুব একটা অনুকূল নয়। আমরা একটি প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই রাজনীতি করছি। কারণ, আমাদের বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোয় ইসলামকে সেভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামকে কেবল একটি ধর্ম হিসেবে দেখা হয়, যা অন্য আট-দশটি ধর্মের মতোই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ইসলাম যে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, এর নিজস্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা রয়েছে, তা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে সেভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা হয় না। ফলে আমাদের বিকল্প উপায়ে সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হয়। সাধারণ মানুষ মনে করে ইসলাম শুধু একটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, এটি কীভাবে রাষ্ট্র ও সমাজে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে সচেতনতা বা কালচার গড়ে ওঠেনি। আমরা সেই পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছি।

বাংলাদেশে যদি সামাজিকভাবে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের সুফল ও সৌন্দর্য সঠিকভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা যায়, তবে এটি ইসলামি রাজনীতির জন্য একটি চমৎকার ক্ষেত্র হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ একটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশ, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের হাহাকার রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি; বরং মানুষের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা করেছে। যে অঙ্গীকার করে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় এসেছে, তা তারা বাস্তবায়িত করেনি। অর্থনৈতিকভাবে মানুষ বৈষম্যের শিকার এবং দেশে যে বিশাল সম্ভাবনা ছিল, কোনো সরকারই তা কাজে লাগাতে পারেনি। উল্টো যারা ক্ষমতায় গেছে, তারা লুটপাট করে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে।

অতএব, মানুষ পরিবর্তন চায়। বাংলাদেশে যেহেতু অধিকাংশ মানুষ ইসলামে বিশ্বাসী এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে ইসলামি সংস্কৃতি পালন করে, তাই আমরা মনে করি ইসলামের আদর্শকে কেন্দ্র করেই একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমরা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও কাজ করে বিপুল সাড়া পাচ্ছি এবং প্রতিনিয়তই দেশে ইসলামী রাজনীতির বিকাশ ঘটছে ও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

এশিয়া পোস্ট: আপনারা ইসলামি রাজনীতি করছেন, অথচ একটি পক্ষ অভিযোগ করে আপনারা ‘ধর্ম নিয়ে রাজনীতি’ করছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে যে বিভ্রান্তি রয়েছে, তা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

গাজী আতাউর রহমান: ‘ধর্ম নিয়ে রাজনীতি’ কথাটি মূলত ইসলামি আন্দোলন ও ইসলামী রাজনীতিকে চেপে রাখার জন্য একটি ইসলামবিরোধী শক্তির অপপ্রচার। তারা বোঝাতে চায় যে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা অনৈতিক, যা মোটেও সত্য নয়। মূলত ইসলাম থেকে রাজনীতি বাদ দিলে সেটিকে আর পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বলা যায় না। কারণ, রাজনীতি না থাকলে রাষ্ট্র থাকে না, রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান ও অর্থনীতি থাকে না। তাহলে ইসলাম কি থাকে? ইসলাম তো মানুষের ইহজাগতিক ও বৈষয়িক সমস্যা সমাধানের জন্যই এসেছে।

আমরা যে রাজনীতি করি, তা মহান আল্লাহর নির্দেশিত দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ববোধ থেকে করি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য জীবনব্যবস্থা হলো ইসলাম। এখানে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ হাসিলের বিষয় নেই। ইসলাম এসেছে দুনিয়াকে কল্যাণময় ও সুশৃঙ্খল করার জন্য। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করা হয়। কোরআন ও হাদিসে ‘ধর্ম’ শব্দের চেয়ে ‘দ্বীন’ শব্দটি এসেছে, যার বাংলা অর্থ জীবনব্যবস্থা। যদি আমরা ইসলামকে একটি জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করি, তবে তা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক, সব ক্ষেত্রেই মেনে চলতে হবে। এটি বাস্তবায়ন না করলে কেবল আখেরাতে নামাজ-রোজার সওয়াব পাওয়া যাবে, কিন্তু দুনিয়াতে এর কোনো সুফল মিলবে না।

এশিয়া পোস্ট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনারা ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিলেন এবং আপনাদের শীর্ষ একজন নেতা ১৪৩টি আসনকে ‘এ গ্রেড’ বলে বিজয়ের প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র একটি আসনে জয় এসেছে। এই ফলাফলকে আপনারা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

গাজী আতাউর রহমান: প্রথমত, ‘এ গ্রেড’ বিষয়টি আমাদের শীর্ষনেতা ও নায়েবে আমির একটি অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার ভিত্তিতে বলেছিলেন। আমরা নির্বাচনি প্রস্তুতির সুবিধার্থে ৩০০ আসনকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করেছিলাম। এর অর্থ এই নয় যে সেসব আসনে শতভাগ জয়ের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্যই থাকে জয়লাভ করা; আমরা কোনো আসনে হেরে যাওয়ার নিয়তে প্রার্থী দিইনি।

আমাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি একরকম ছিল, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে নির্বাচন করতে হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে। ফলে প্রত্যাশা অনুযায়ী আসন আসেনি। তবে অতীত যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে আমাদের মোট প্রাপ্ত ভোট ও সার্বিক অবস্থান অনেক উন্নত হয়েছে। আমরা বিজয়ের দিকে এগিয়েছি। নির্বাচনকালে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয়েছে, কর্মীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, যখন আমাদের ঐক্য ভেঙে গেল, তখন আমরা একা হয়ে পড়লাম এবং সব পক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেল। এমনকি গণমাধ্যমও আমাদের প্রতি কিছুটা অবিচার করেছে। যে কারণে আমাদের অর্জিত সম্ভাবনাকে আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমরা ২০০৮ সালে নিবন্ধিত হওয়ার পর এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। এবারের নির্বাচনে দুটি বড় রাজনৈতিক মেরু বা জোট ছিল, একদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট। এই দুই বৃহৎ শক্তির মাঝে এবং জাতীয় পার্টি কিংবা বামপন্থীদের মতো প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর মধ্যে একক দল হিসেবে কেবল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশই একটি আসন লাভ করতে পেরেছে এবং প্রায় ৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্য কোনো দল এককভাবে নির্বাচন করে ১ শতাংশ ভোটও পায়নি। যদি সংখ্যানুপাতিক (পিআর) প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা থাকত, তবে আমাদের অন্তত ৯ জন সংসদ সদস্য থাকতেন।

রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখবেন, ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামীও এককভাবে নির্বাচন করে মাত্র ১টি আসন পেয়েছিল, অথচ তাদের রাজনীতির ইতিহাস ছিল ৮৫ বছরের। ১টি আসন পাওয়ায় তাদের রাজনীতি শেষ হয়ে যায়নি, বরং পরবর্তীতে তারা আরও শক্তিশালী হয়েছে। তাই একটি আসন পেয়েছি বলে ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতি দুর্বল হয়ে গেছে, এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের সম্ভাবনার জায়গাটি আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনে আপনারা কোনো বড় জোটের সঙ্গে যাননি। বর্তমানে আপনারা কি বিএনপি সরকারের বিরোধী শক্তি হিসেবে কাজ করছেন, নাকি তাদের সমর্থক হিসেবে আছেন? আর সংসদে একক আসন নিয়ে আপনারা রাজনীতিতে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারবেন?

গাজী আতাউর রহমান: আমরা সরকারে নেই এবং সরকারের সঙ্গে আমাদের কোনো রাজনৈতিক সমঝোতাও হয়নি। সুতরাং আমরা নীতিগতভাবে বিরোধী দলে আছি। বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শপথ নেওয়ার আগের দিনও আমাদের আমির চরমোনাই পীর সাহেবের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি যে, সরকার যদি দেশবিরোধী, জনস্বার্থবিরোধী কিংবা ইসলামবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে আমরা নিয়ম অনুযায়ী রাজপথে তার প্রতিবাদ জানাব। আর যদি জনকল্যাণকর কোনো কাজ করে, তবে তাকে অবশ্যই সমর্থন করব। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে এটাই হওয়া উচিত। আমরা একটি নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছি।

সংসদে ১টি আসন থাকা বা না থাকা নিয়ে বলতে চাই, সংসদে ১ জন সংসদ সদস্য থেকেও নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা সম্ভব। আমরা একক দল হিসেবে জনগণের ভোটের যে সম্মান পেয়েছি, তা রাজপথে ও সংসদে জনস্বার্থে সোচ্চার রাখতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ইসলামি দলগুলোর ‘এক বক্স নীতি’ করার একটি আলোচনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল হেফাজত কিংবা ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে কৌশলগত পার্থক্য রয়ে গেছে। ভিন্ন আদর্শ নিয়ে ইসলামি দলগুলোর ‘এক বক্স নীতি’ কি আদৌ সম্ভব?

গাজী আতাউর রহমান: ইসলামি দলগুলোর মধ্যে দলগত দৃষ্টিভঙ্গি বা কর্মসূচির ভিন্নতা থাকতে পারে, এটি স্বাভাবিক। তবে ইসলামের মৌলিক ইস্যুতে আমরা সবাই এক। ভোটের রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শরিয়াহভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ইসলামি নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের মূল প্রশ্নে যদি আমরা একমত হতে পারি, তবে ‘এক বক্স নীতি’ বা একক ঐক্য গঠন করা সম্পূর্ণ সম্ভব। অধিকাংশ ইসলামি দলই এই মূল চিন্তা লালন করে। নির্বাচনি রাজনীতিতে যুক্ত দলগুলো যদি একমত হতে পারে যে, আমরা ক্ষমতায় গেলে কোরআনিক আইনি কাঠামো ও ইসলামি জীবনব্যবস্থা কায়েম করব, তবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের আগে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে ছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে আপনারা বের হয়ে এলেন। সেখানে কি আসন সমঝোতা নিয়ে সমস্যা হয়েছিল নাকি আদর্শিক বিষয় ছিল?

গাজী আতাউর রহমান: এখানে একটি বিষয় সংশোধন করা প্রয়োজন, ওই জোটটি ‘জামায়াত নেতৃত্বাধীন’ ছিল না। এই জোট বা ঐক্যের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির পীর সাহেব চরমোনাই। প্রথমে আমরা ৬টি দল মিলে ঐক্য প্রক্রিয়ার সূচনা করি। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীসহ আরও ২টি দল যুক্ত হয়ে এটি ৮ দলীয় জোটে রূপ নেয়। এরপর আমাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই আরও ৩টি দল (এলডিপি, এনসিপি ও এবি পার্টি) যুক্ত হয়ে এটি ১১ দলীয় জোটে পরিণত হয়।

প্রথমত, জামায়াত বড় দল হিসেবে পরবর্তীতে পুরো জোটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। পীর সাহেব চরমোনাই যে উদ্দেশ্য নিয়ে ‘ইসলামি এক বক্স’ নীতির ডাক দিয়েছিলেন, তা থেকে জোটটি বিচ্যুত হতে থাকে। তারা সেক্যুলার ধারার ৩টি দলকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করে, যা আমাদের সঙ্গে আগে থেকে আলোচনা করা হয়নি। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বস্ততা ও আস্থার জায়গা নষ্ট করে তারা নিজেদের মতো আসন বণ্টন করে ফেলে। নিছক ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ঐক্যকে ব্যবহার করা হতে থাকে।

ইসলামী আন্দোলন কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা সাময়িক ক্ষমতার লোভে রাজনীতি করে না। সারা দেশে আমাদের লাখ লাখ ত্যাগী নেতাকর্মী রয়েছেন। আমরা তাদের ক্ষমতার লোভে ব্যবহার করতে পারি না। আসন সমঝোতার বিষয়টি গৌণ ছিল, মুখ্য ছিল নীতিগত বিচ্যুতি। তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল যেখানে ইসলামী আন্দোলনের ভূমিকা বা প্রভাব খর্ব করা হচ্ছিল। আমরা তো কারও অনুগত বা অনুগ্রহের রাজনীতি করতে পারি না। ফলে নীতিগত কারণেই আমরা সেই জোট থেকে বের হয়ে আসি।

এশিয়া পোস্ট: জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের মূল আদর্শিক ও রাজনৈতিক পার্থক্য কোথায়? ভবিষ্যতে কি তাদের সঙ্গে কোনো ঐক্যের সম্ভাবনা রয়েছে?

গাজী আতাউর রহমান: রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের সাথে আমাদের দুটি মৌলিক বিষয়ে গভীর দূরত্ব ও পার্থক্য রয়েছে।

প্রথমত, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সেই মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী দলগতভাবে বিরোধী ভূমিকা পালন করেছিল। তারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এই ঐতিহাসিক দায় তারা আজও এড়াতে পারেনি এবং তাদের এই বোঝা বহন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে পুরোপুরি ধারণ করে রাজনীতি করে।

দ্বিতীয়ত, ইসলামি আকিদা ও মৌলিক আদর্শিক জায়গা। বাংলাদেশে যারা ঐতিহ্যগতভাবে সঠিক ধারায় ইসলাম চর্চা করেন, হকপন্থি ওলামায়ে কেরাম ও বুজুর্গরা, তারা কখনোই জামায়াতের আদর্শকে সঠিক বলে মনে করেননি। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদির চিন্তাধারা ও সাহিত্যগুলোয় সাহাবায়ে কেরামকে (রা.) ‘সত্যের মানদণ্ড’ বা সর্বজনীন অনুসরণযোগ্য হিসেবে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিচ্যুতি রয়েছে। অথচ আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর পর সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমেই আমরা দ্বীন পেয়েছি। সাহাবায়ে কেরামকে সত্যের মানদণ্ড না মানলে ইসলামের মৌলিক শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই দুটি বড় প্রতিকূলতা ও ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলনের আমির কেবল ইসলামপন্থি শক্তির বৃহত্তর উত্থান ও দেশের স্বার্থে ছাড় দিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসেছিলেন। কিন্তু তারা নিজেদের আচরণের কারণে সেই সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দিয়েছে। তাই বর্তমানে তাদের সঙ্গে আদর্শিক ও কৌশলগত দূরত্ব বজায় রয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: আপনারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, কিন্তু আপনাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করা। গণতন্ত্র এবং ইসলামি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক ও পার্থক্যকে আপনারা কীভাবে দেখেন? ক্ষমতায় গেলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বজায় থাকবে নাকি পরিবর্তন হবে?

গাজী আতাউর রহমান: আমরা নির্বাচনকে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার একটি পদ্ধতি বা ‘টুলস’ হিসেবে গ্রহণ করেছি। কোনো আদর্শ রাষ্ট্রীয়ভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়েই ক্ষমতায় যেতে হয়। বর্তমান বিশ্বে নির্বাচনে অংশগ্রহণই সরকার পরিবর্তনের স্বীকৃত ও শান্তিপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অর্থ এই নয় যে, আমরা পুরো পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মতাদর্শকে চোখ বন্ধ করে গ্রহণ করেছি।

গণতন্ত্রের কিছু ভালো দিক রয়েছে, যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার রক্ষা ইত্যাদি। এগুলো ইসলামের সুমহান আদর্শের সঙ্গে মোটেও সাংঘর্ষিক নয়, বরং ইসলামেই এসব অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে গণতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের মূল সাংঘর্ষিক জায়গা হলো আইনের সার্বভৌমত্বে। সাধারণ গণতন্ত্রে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের ভিত্তিতে যে কোনো ভালো বা খারাপ বিষয়কে আইনে পরিণত করা যায়। এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে যদি মদ, জিনা বা সুদকে বৈধ করার আইন পাস হয়, গণতান্ত্রিক কাঠামোয় তা আইন হয়ে যায়। কিন্তু ইসলামে তা অসম্ভব। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) যে বিষয়গুলোকে হারাম বা হালাল ঘোষণা করেছেন, দুনিয়ার শতভাগ মানুষ একমত হলেও তা পরিবর্তনের কোনো এখতিয়ার মানুষের নেই।

আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, জনগণ যদি ভোটে রায় দিয়ে আমাদের ক্ষমতায় পাঠায় এবং সংবিধান পরিবর্তনের ম্যান্ডেট দেয়, তবে আমরা নিয়মতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক উপায়েই জনগণের কল্যাণার্থে শরিয়াহভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করব। এতে কোনো গোপনীয়তা নেই, সংবিধানেই জনগণের রায়ে পরিবর্তনের পথ খোলা রয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংস্কার ও গণভোট নিয়ে আপনাদের অবস্থান কী?

গাজী আতাউর রহমান: আমরা জাতীয় ঐক্যমত কমিশনে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি এবং আমরা এই জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম অংশীদার ও পক্ষের শক্তি। জুলাই সনদে স্পষ্ট বলা রয়েছে, সংবিধানের ‘সংস্কার’ করতে হবে। আমরা সেই অঙ্গীকারে অটল আছি। আমাদের দলীয় সংসদ সদস্যও সংবিধান সংস্কারের শপথ নিয়েছেন। অথচ বিএনপি সংবিধান সংস্কারের বদলে ‘সংশোধন’ চাইছে। তারা কৌশল করে তাদের গঠিত কমিটিতে আমাদের এমপির নাম অন্তর্ভুক্ত করলেও, আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। ফলে আমাদের এমপি সেই প্রতিবাদস্বরূপ তাদের কোনো কমিটিতে বা বৈঠকে অংশ নেননি।

এ ছাড়া গণভোটের বিষয়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর যে অঙ্গীকার ছিল, তা থেকে অনেকে সরে আসছে। গণভোটে জনগণ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনে জয়ের পর দেখা যাচ্ছে, সরকার এখন নানা অজুহাতে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও সংস্কার প্রস্তাব থেকে পিছিয়ে আসার চেষ্টা করছে। দুদক, মানবাধিকার কমিশন ও বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা, সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আলাদা সচিবালয় গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করার বিষয়ে যে সম্মতি ছিল, তা থেকে সরে আসা জনগণের আমানতের সঙ্গে খেয়ানত করার শামিল। ক্ষমতার মোহে ওয়াদা ভঙ্গ করলে দেশে আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে।

এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের কাজের মূল্যায়ন কীভাবে করবেন?

গাজী আতাউর রহমান: সত্যি বলতে, অন্তর্বর্তী সরকার এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে দেড় বছর দেশ পরিচালনা করেছে। আমরা আশঙ্কা করেছিলাম, দেশ হয়তো গৃহযুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষের দিকে যাবে, কিন্তু তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। তবে নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের যে ব্যাপক প্রত্যাশা ছিল, গত আট মাসে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

প্রশাসনে ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা দ্বিগুণ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিএনপি নেতারা বলতেন, ক্ষমতায় এলে ও হাতে প্রশাসন থাকলে তারা সব চাঁদাবাজ-দুর্নীতিবাজ দূর করবেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, চাঁদাবাজির দায়ে নেতাকর্মীদের বহিষ্কার করার প্রবণতাও বন্ধ হয়ে গেছে। উপরন্তু, নোটিশ ছাড়াই কয়েক দফায় তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষি কার্ড বিতরণের নামে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। ফলে নির্বাচিত সরকারের পারফরম্যান্স মানুষকে মারাত্মকভাবে হতাশ করেছে।

এশিয়া পোস্ট: সাম্প্রতিক সময়ে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে কিছু অনৈতিক ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার হচ্ছে। দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন কেন ঘটছে এবং এতে ইসলামী আন্দোলনের দৃষ্টিভঙ্গি কী?

গাজী আতাউর রহমান: প্রথমত, সমাজে সার্বিক নৈতিক অবক্ষয়ের যে চিত্র, মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এই সমাজের বাইরে নন। মানুষের কিছু মানবিক দুর্বলতা থাকে, মানুষ তো ফেরেশতা নয়। তাই মাদ্রাসায় সামান্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও মানুষ তা অত্যন্ত স্পর্শকাতরভাবে দেখে। কারণ, কওমি মাদ্রাসার শুভ্র লেবাসের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

তবে আমাদের দুঃখের বিষয় হলো, মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমাজের অন্যান্য বড় বড় অপরাধকে আড়াল করে মাদ্রাসার বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে অতিমাত্রায় প্রচার করে পুরো ইসলামি শিক্ষার প্রতি একটি নেতিবাচক জনমত (পাবলিক পারসেপশন) তৈরির চেষ্টা করা হয়। এটি মোটেও দায়িত্বশীল আচরণ নয়। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, বেফাক ও হাইয়াতুল উলয়ার উচিত, চারিত্রিক গঠন ও শৃঙ্খলার বিষয়ে আরও কঠোর হওয়া। রাজনীতিবিদের চেয়েও কওমি বোর্ডের দায়িত্ব বেশি। সরকারের উচিত আলেমদের সাথে আলোচনায় বসে এসব প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের অধীনে সহায়তা দেওয়া। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নিজের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ বিষয়ে কঠোর তদারকি বজায় রেখেছে।

এশিয়া পোস্ট: মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার সাক্ষী মানিক পশারীর দাফন-কাফনে বাধার যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে আপনাদের মন্তব্য কী?

গাজী আতাউর রহমান: এটি একটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অমানবিক কাজ। যে মানুষই হোক না কেন, তিনি কোনো অপরাধ করে থাকলেও মৃত্যুর পর তার দাফন-কাফন ও জানাজায় বাধা দেওয়া ইসলামি ও মানবিক নীতিবিরোধী। শত্রুর মরদেহের প্রতিও সম্মান দেখানো ও দাফনে সহযোগিতা করা একজন মুসলমানের দায়িত্ব। যদি কেউ ভীতি সৃষ্টি করে দাফনে বাধা দিয়ে থাকে, তবে তা চরম অন্যায় হয়েছে। আমাদের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে ইতোমধ্যেই বিবৃতি দিয়ে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীরও এমন ঘটনা সমর্থন করার কথা নয়।

এশিয়া পোস্ট: অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি-জামায়াতের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চললেও আপনাদের ওপর সেরকম হামলা-মামলা বা গুমের ঘটনা ঘটেনি। অনেকে অভিযোগ করেন যে আপনাদের সঙ্গে সরকারের আপস ছিল। এই বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা কী?

গাজী আতাউর রহমান: এটি আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য বিরোধীদের একটি অপপ্রচার। আমরা শুরু থেকেই রাজপথে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম। আমাদের শত শত নেতাকর্মী জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমনকি ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অর্ধশতাধিক কর্মী জীবন দিয়ে শহীদ হয়েছেন।

যেহেতু আমরা ওই সময় প্রধান বিরোধী দল ছিলাম না, তাই আমাদের ওপর আক্রমণের মাত্রা হয়তো প্রধান বিরোধী দলের মতো ছিল না। সরকার আমাদের সক্ষমতাকে কিছুটা কম গুরুত্ব দিয়েছিল বলে তাদের দমন-পীড়নের কৌশল ভিন্ন ছিল। কিন্তু আমরা কখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করিনি কিংবা কোনো সুবিধাও নিইনি। কেউ এর বিন্দুমাত্র প্রমাণ দিতে পারবে না। এখন আবার বলা হচ্ছে যে বিএনপির সঙ্গে আমাদের সমঝোতা হয়েছে, এগুলো সবই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রচারণা। আমরা কোনো সহিংসতায় বিশ্বাস করি না, আমরা নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক রাজনীতি চর্চা করি।

এশিয়া পোস্ট: ইসলামী আন্দোলনকে অনেকেই ‘চরমোনাই পীরের দল’ বলেন। এ ছাড়া দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এক পরিবারের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়ার যে অভিযোগ ওঠে, সেটিকে কীভাবে দেখেন?

গাজী আতাউর রহমান: আমাদের নিবন্ধিত দলের নাম ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’। পীর সাহেব চরমোনাই আমাদের প্রধান নেতা। পীর সাহেবের দেশব্যাপী সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও ঐতিহ্য রয়েছে, যা আমাদের দলের জন্য একটি বড় শক্তি ও ঐক্যের প্রতীক।

আর পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের অভিযোগের বিষয়ে বলতে চাই, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যোগ্যতা ও সমর্থনের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়। পরিবারে যদি যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব থাকে এবং তারা দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেন, তবে তা দলের জন্য মঙ্গলজনক। আমাদের দলে স্থায়ী প্রেসিডিয়াম, মজলিসে শুরা ও নির্বাহী পরিষদ রয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শুরার ফোরামেই গৃহীত হয়। আমির একচ্ছত্রভাবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না, বরং তিনি শুরার কাছে জবাবদিহি করেন। দলে দীর্ঘদিন ধরে কোনো অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা না থাকা প্রমাণ করে, দলটি একটি গণতান্ত্রিক ও সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে চালিত হয়।

এশিয়া পোস্ট: আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং আগামী ৫ বছর নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পরিকল্পনা কী?

গাজী আতাউর রহমান: আমরা দেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছি। যদি নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তবে অতীত যে কোনো সময়ের চেয়ে ইসলামী আন্দোলন চমকপ্রদ ভালো ফলাফল করবে। তবে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ হবে, সে বিষয়ে আমাদের যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

আগামী ৫ বছরে আমরা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে দেশের প্রথম দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের একটি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আমরা কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রিক আন্দোলন নয়, বরং গণমুখী সমাজসেবা ও ‘আদর্শ মানুষ গড়ার’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। নেতৃত্বের গুণগত পরিবর্তন আনাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মুক্তির জন্য ক্ষমতায় যাওয়া জরুরি, তবে নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে কোনো অসৎ উপায়ে আমরা ক্ষমতায় যেতে চাই না। যদি আদর্শ রক্ষার জন্য আমাদের আরও ১০০ বছরও অপেক্ষা করতে হয়, তবে আমাদের নেতাকর্মীরা তা করতে প্রস্তুত রয়েছে। কারণ আমরা রাজনীতিকে কেবল বৈষয়িক বিষয় নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্যতম এবাদত হিসেবে গণনা করি।

এশিয়া পোস্ট: দেশবাসী ও মিডিয়ার উদ্দেশে যদি কিছু বলতে চান।

গাজী আতাউর রহমান: এশিয়া পোস্টের মতো নতুন গণমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে দেশ ও ইসলামের কল্যাণে কাজ করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আমরা এ দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসি। দেশকে সুন্দর করতে হলে আগে নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে, সৎ হতে হবে। আর রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আসুন আমরা হিংসা-সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করে চরিত্রগঠন ও সুস্থ ধারার নীতি-আদর্শের রাজনীতি চর্চা করি। তাহলেই একটি আলোকিত, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

রায়হান রাশেদ

সম্পাদনা

রায়হান রাশেদ

সহ-সম্পাদক | এশিয়া পোস্ট