জামায়াতের ব্র্যাকেট থেকে এনসিপি আর বেরোতে পারবে না: শামীম হায়দার পাটোয়ারী

শামীম হায়দার পাটোয়ারী রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সাবেক সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মহাসচিব। তিনি দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে প্রেসিডিয়াম সদস্য ও অতিরিক্ত মহাসচিব হন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি নির্বাচন, জাতীয় পার্টির অবস্থান, নতুন সরকার ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিষয়ে নিজের মতামত জানান। সুদীর্ঘ এই আলাপচারিতার প্রথমার্ধ গতকাল প্রকাশিত হয়েছে। আজ পড়ুন এর শেষ অংশ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সামি আল মেহেদী।
এশিয়া পোস্ট : আপনি অনেক দিন ধরেই অনেক মন্ত্রিসভা দেখেছেন। নতুন মন্ত্রিসভা যে গঠিত হলো, এর বিষয়ে আপনার অবজারভেশন কী।
শামীম হায়দার পাটোয়ারী: ওনাদের অনেককেই ব্যক্তিগতভাবে আমি চিনি। অনেকের মধ্যেই কাজ করার উদ্যম আছে, অভিজ্ঞতা আছে। অনেকেই আগে সফল মন্ত্রী ছিলেন। অনেকে তরুণদের মধ্যে থেকে এসেছেন। তারা ভালো কাজ করবেন বলেই আমার মনে হয়। তবে তাদের প্রত্যেককেই ১৬-১৭ বছরের যে জিঘাংসা, সেটা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দেশ গঠন করতে হবে, মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে এবং মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন করতে হবে। বাংলাদেশ চালানো খুব কঠিন কাজ। এখানে একটা সময় খাদ্যশস্যের খুব সমস্যা ছিল। এখন খাদ্যশস্যের সমস্যা নাই, কিন্তু চাকরি নাই। বহু মানুষ রাস্তায় রাস্তায় এখন বেকার হিসেবে ঘুরছে। ইকোনমির অবস্থা ভালো না, বাজেট কমে আসবে বিভিন্ন সেক্টরে বলে আমি অনুভব করি। কম বাজেটে কীভাবে উন্নত সেবা দেওয়া যাবে—জনমুখী সেবা, সেটার জন্যই তাদেরকে কাজ করতে হবে। তারা সবাই অনেক অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, আমার বিশ্বাস তারা সবাই অ্যাটলিস্ট সফল হওয়ার চেষ্টা করবেন, জনবান্ধব কাজ করবেন এবং আমরাও তাদের সহায়তা করব। তবে যেটি আমি সব সময় বলব, ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপির যে অভিজ্ঞতা, যে ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা, যে স্বেচ্ছাচারিতা বা যে একনায়কতন্ত্রের নিদর্শন সে সময় ছিল—সেখান থেকে বিএনপিকে শিক্ষালাভ করতে হবে।
এশিয়া পোস্ট : আগামীতে জামায়াতে ইসলামী কি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে?
শামীম হায়দার পাটোয়ারী: প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির ওভারহোয়েলমিং মেজরিটি পেয়েছে, তাদের ধারেকাছেও কেউ নাই। সেখান থেকে আমারও মনে হয়েছিল জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত জিতে যেতে পারে। তবে তরুণদের মধ্যে যেভাবে ইসলামাইজেশনটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে, হয়তোবা সার্বিক ভোটারে সেই হারে বৃদ্ধি পায়নি। জামায়াতের মধ্যে এখনও একাত্তরের ব্যাগেজ আছে। বিগত সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানের বারবার বাংলাদেশে আসা, জামায়াতের পাকিস্তানপ্রীতি দৃশ্যমান করা—এটা থেকে সবাই কিন্তু একাত্তরকেই মনে করছে এবং কথাবার্তার টার্মেও কিন্তু অনেকটা প্রি-একাত্তর টাইপ কথাবার্তা শোনা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সেটলড কিছু ন্যারেটিভকেও বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে, জামায়াত বা এনসিপির কিছু নেতারা—এবং জনগণ সেটাকে ভালোচোখে নেয়নি। এখনো এ দেশের নারীরা মনে করে তাদের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে জামায়াত প্রতিবন্ধকতা হতে পারে, একটা বিশাল অংশের নারী মনে করে। আবার বিশাল অংশের নারী কিন্তু জামায়াতকে ভোট দেয় (মনে করে) যে জান্নাতে যাওয়া যাবে, এটা কিন্তু (তারা) বিশ্বাস করে। বাঙালি খুব অদ্ভুত ডিলেমার একটা জাতি। সেখান থেকে আমি মনে করি জামায়াত তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল আন্দোলনের পরে। এই আন্দোলনে জামায়াত যতটা কনট্রিবিউট করেছে এবং যতটা সফলতা পেয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো আন্দোলনে তারা এতটা সফলতা পায়নি, এতটা কনট্রিবিউটও করেনি। লাস্ট যে সরকারটা ছিল সেটা জামায়াতেরই সরকার ছিল, টোটালি—সেটা আমরা বলব। ইউনূস সরকার জামায়াতের সরকার, ইউনূস সরকার এনসিপির সরকার। তারপরও ভোটে তারা (জামায়াত) জয়লাভ করতে পারেনি। কারণ শেষ মুহূর্তে অনেক মাইনরিটি ভোটার অ্যান্টি-জামায়াতকে ভোট দিয়েছে।
আমরা শুনতে পেয়েছি আওয়ামী লীগও বিএনপিকে ভোট দিয়েছে, জামায়াতকে ঠেকানোর জন্য। সামনের ভোটে গিয়ে জামায়াত শক্তিশালী থাকবে, তবে অনেক বড় আকার ধারণ করবে এমনটি আমার মনে হয় না। কারণ প্রত্যেকের রাজনীতিতে একটা নিজস্ব পরিধি থাকে, জামায়াত তার পূর্ণাঙ্গ পরিধিতে প্রস্ফুটিত হয়ে গেছে। সে আওয়ামী লীগকে হটিয়েছে। তার সরকারকে সে নিয়ে এসেছিল। তার সরকারে তার লোকজন ছিল। ভোট হয়েছে, ভোটে সে ৭০টি আসন পেয়েছে। এখন যখন ভবিষ্যতে সব দল মিলে একসঙ্গে ভোট হবে, তখন যদি নতুন কোনো জোট না হয়, তখনও জামায়াত এর থেকে অনেক ভালো করবে—এর সম্ভাবনা আমরা দেখি না। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা যেটি ছিল গত দেড় বছর, ধারণা করতে পারি এখন সেটি কমে যাবে। কমে গেলে সেটিও জামায়াতের রাজনীতিতে কিছু ইমপ্যাক্ট ফেলবে। তবে জামায়াত একটি আদর্শিক দল, ক্লাস ফাইভ থেকে ছেলেপেলেদের তারা নার্সিং করে, গার্জিয়ানশিপ করে, মেন্টরশিপ করে, সেটার ফলাফল তারা পাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে। তাদের অসংখ্য ইনস্টিটিউশন আছে, বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং সেন্টার আছে, মেডিকেল কলেজ আছে, মেডিকেল কোচিং সেন্টার আছে—ইটস আ হিউজ এস্টাবলিশমেন্ট। অনেককে তারা ডেলিভারি দিতে পারছে। অ্যাকচুয়াল সার্ভিস দেওয়ার ক্ষেত্রে জামায়াত এগিয়ে থাকে সব সময়ই। তো সেক্ষেত্রে জামায়াত শক্তিশালী থাকবে, তবে ক্ষমতায় আসাটা আমি মনে করি যখন সকল দল ভোটে আসবে, তখন জামায়াতের ক্ষমতায় আসাটা স্তিমিত হতে পারে, যদি না আওয়ামী লীগ-জামায়াত কখনও জোট হয়!
এশিয়া পোস্ট : জাতীয় পার্টি একটি পুরোনো দল। সরকার হিসেবে এবং বিরোধী দলে লম্বা সময়ে থেকেছে। তারপরও এটি এখন অনেক দলের সাপেক্ষে সেভাবে প্রাসঙ্গিক নয়। এ ক্ষেত্রে তরুণদের জন্য দলটির চিন্তা কী, কোনো রিফর্মেশনের বিষয়ে কি চিন্তাভাবনা রয়েছে?
শামীম হায়দার পাটোয়ারী: আসলে জেন-জি, তরুণ, বা ইয়ংদের সাইকোলজি বুঝতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এটা আমি স্বীকার করব। তাদের মধ্যে অনেকেই ইসলাম পেয়েছে, ইসলামকে ধরেছে। অনেকে একাত্তরকে ধরেছে। অনেকে সেক্যুলারিজমকে ধরেছে। ইসলামকে ধরেছে, এ অংশটাই বেশি মনে হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে। জাতীয় পার্টি ২০১৪ সালে শেষ সাহসী কাজ করেছিল। ২০২৪ সালেও আমরা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলাম, অনেক রেকর্ড আছে। ২০১৪ সালে ভোটের শেষ মুহূর্তে জাতীয় পার্টি ভোট বর্জন করে। আমরা প্রায় ২৭০ জন মনোনয়ন প্রত্যাহার করি। কিন্তু জামায়াত-বিএনপি সহযোগিতা না করার কারণে ২০১৪ সালের ওই অ্যাটেম্পটটা ফেইল হয়। একটা রাজনৈতিক দল যখন অসম্ভব সাহসী একটা কাজ করে ফেইল্ড হয়, সেটা কনসিকোয়েন্সটা ওই দলের জন্য ড্রাস্টিক হয়। প্র্যাকটিক্যালি ওইটা ফেইল্ড হওয়ার পর থেকে জাতীয় পার্টি আর স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারেনি। এরশাদ স্যার এবং অনেক দিন পর্যন্ত জিএম কাদের—তাদের দল ঠিক রাখার জন্য সরকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হয়েছিল, সামঞ্জস্যপূর্ণ কথা বলতে হয়েছে।
লোকাল গভর্নমেন্ট ইলেকশনে ২০১৯ সালে আমরা মাত্র দুটো উপজেলা চেয়ারম্যানে জিতেছিলাম, ২০২৪ সালে একটা বা দুটোতে জিতেছিলাম। আমাদের দলটাকে সংকুচিত করে ফেলা হয়েছিল সে সময়। একদিকে অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ যারা তারা আমাদেরকে অপছন্দ করছে, কারণ আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংসদে আছি। আবার আওয়ামী লীগ আমাদেরকে বিকশিত হতে দিচ্ছে না। আমরা এই ট্র্যাপে পড়ে গিয়েছিলাম। সেখানে যারা তরুণ, তরুণ তুর্কি, তরুণ কম্যুনিস্ট, বা তরুণ বিপ্লবী যারা—একটা গ্রুপ সরকারি দলের সঙ্গে ছিল চাকরি-বাকরির সুবিধার জন্য, একটা গ্রুপ ইসলামকে বেছে নিয়ে ইসলামী দলগুলোতে চলে গেছে, এই সংখ্যাটা অনেক; একটা গ্রুপ কম্যুনিজমে চলে গেছে। গত এক দশকে তরুণদের জন্য কোনো সঠিক আদর্শ প্রস্তুত করতে পারিনি, এটা আমাদের দিক থেকে ব্যর্থতা। এখন আমরা এদিকে কাজ করব, তরুণদের সঙ্গে নিয়ে। ডেফিনিটলি নতুন আলোকেই জাতীয় পার্টিকে সাজাতে হবে, নতুন চেতনা নিতে হবে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি, এ বিষয়ে আমাদের একটা পুরোনো ঐতিহ্য আছে, আর এটাকে আঁকড়ে ধরেই আমরা সামনে আগাতে চাচ্ছি।
এশিয়া পোস্ট : তরুণদের জন্য, তাদের জন্য জাতীয় পার্টি অন্যান্য দলগুলোর মতো নিজস্ব ন্যারেটিভ সৃষ্টির চেষ্টা করবে?
শামীম হায়দার পাটোয়ারী: জামায়াতে ইসলামীর প্যাট্রোনাইজ করার একটা স্ট্রাকচার আছে, একদম শুরু থেকে ভার্সিটি পর্যন্ত, হলে প্লেসমেন্ট করা পর্যন্ত, চাকরি পর্যন্ত পাইপলাইন আছে। এই পাইপলাইনটা আর কোনো দলেরই নাই। সেটার সুফল তারা পাচ্ছে। একটা সময় দেখেছি সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিবিরকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সেই শিবির এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বদম্ভে, মোটামুটি গণতান্ত্রিকভাবে জয়ী হয়েই তারা কমিটিতে আছে। সেটার তুলনায় অন্য কোনো দলই সেভাবে ডেলিভারি দিতে পারেনি। বিগত আওয়ামী লীগের সময় দেশটা দুই ভাগ হয়ে ছিল – একটা প্রো-আওয়ামী লীগ, আরেকটা এক্সট্রিম অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টি সামহাউ এই দুটোর মধ্যে কোনোটাতেই ফিট হয়নি। আমরা এক্সট্রিম অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ হতে পারছিলাম না কারণ আমরা বারবার ভোটে যাচ্ছি; আবার প্রো-আওয়ামী লীগ হওয়ার প্রশ্নই আসে না কারণ আমরা আওয়ামী লীগের দুর্নীতি, গণহত্যা কোনোকিছুর সঙ্গে জড়িত না। সেই খানে একটা তৃতীয় শক্তি হিসেবে আমরা মনে করি আমাদের একটা নতুন ন্যারেটিভ দেওয়া উচিত ছিল। নতুন তত্ত্ব, নিউ ডকট্রিন। এক্ষেত্রে যে আন্দোলনটি হলো, আন্দোলনের পর তরুণদের যে ব্যাপক অ্যাস্পিরেশন ছিল, সেখানেও এখন ভাটা পড়ে গেছে। তরুণরাও এখন নতুন দল, নতুন মতবাদ খুঁজবে। পলিটিক্সে মতবাদ বা দর্শন আন্দোলনের সাঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যখন একটা সরকারকে হটাতে হবে, তখন দর্শনগুলো খুব বেশি কাজে লাগে। এ ছাড়া ফেস দেখে দেখেই কিন্তু মানুষ আসবে। অধিকসংখ্যক তরুণকে আমরা মনোনয়ন দেব, অধিকসংখ্যক যুবককে আমরা উচ্চপদে আসীন করব এবং তারা যেন আরও তরুণদের অ্যাট্রাক্ট করে, এ রকম একটি কাঠামো আমরা তৈরি করব।
এশিয়া পোস্ট : এনসিপি যে নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে গেল, তাদের রোল নিয়ে, বা সামগ্রিকভাবে তাদের বিষয়ে আপনার মতামত কী।
শামীম হায়দার পাটোয়ারী: এনসিপিতে কিছু অসাধারণ সাহসী নেতা আছে, যারা ৩৬ দিন অ্যাট লিস্ট পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনটা করে গেছে। তবে তাদের একটা বড় অংশ ঢাকা ভার্সিটিকেন্দ্রিক। ঢাকা ভার্সিটিতে দাঁড়িয়ে সাহস দেখানো খুব একটা কঠিন কাজ না। আমি ঢাকা ভার্সিটিতে (এলাকায়) বড় হয়েছি, আমি জানি। কিন্তু ঢাকা ভার্সিটির বাইরেও বহু ছেলেপেলে কিন্তু সাহস দেখিয়েছে। তারা কিন্তু অনেকেই এনসিপির ফ্রন্টলাইনে নাই। ২৪ জন প্রাইভেট ভার্সিটি থেকে মারা গেছে। ঢাকা ভার্সিটি থেকে একজনও মারা যায়নি। কারণ ঢাকা ভার্সিটির আন্দোলনরত কোনো ছাত্রকে গুলি করে মেরে ফেলা—এটা অনেক বড় বিষয়। ঢাকা ভার্সিটি সবার নিজের ক্যান্টনমেন্টের মতো, ওউন হোমের মতো। এনসিপি প্রথমদিকে, সবাই মনে করেছিল তারা প্রো-লিবারেশন হবে, উদার হবে। তবে পরে আস্তে আস্তে দেখা গেল যে তাদের একটা বড় অংশ আসলে শিবিরের বা জামায়াতের আচ্ছাদনে ছিল এবং আমরা সব সময়ই বলেছি তারা জামায়াতের বি-টিম। আমি একটা টকশোতে বলেছিলাম, তারা জামায়াতের জামাতা। শেষ মুহূর্তে তারা যখন জামায়াতের সঙ্গে জোট করল, তখন সকলে কনফার্ম হয়ে গেল, যে আশঙ্কাগুলো ছিল, তার সবগুলোই সত্যি।
মাহফুজ সাহেব যেটা চমৎকার বলেছেন, এত অল্পতেই ছাত্ররা সব বিক্রি হয়ে গেল। ছয়টি আসনের জন্য এত বড় আন্দোলনের যে টোটাল ক্রেডিট (সেটি তারা হারাল), ছয়টি বা দশটি ছেলে কিন্তু বিএনপির চেয়েও বেশি লাইমলাইটে ছিল, ফোকাসে ছিল। অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ মুভমেন্ট, ওই ৩৬ দিন বা তার পরবর্তী দিনগুলোয়; সেটাকে আমি মনে করি এনসিপি পুরোপুরি ক্যাশ করতে পারেনি। তারা জামায়াতের ব্র্যাকেটে চলে গেল, এই ব্র্যাকেট থেকে তারা আর বেরোতে পারবে না। এনসিপির ভোট ব্যাংক আর জামায়াতের ভোট ব্যাংক এখন সমার্থক হয়ে গেল। সো, ভবিষ্যতে এনসিপি বড় হবে, বেটার করবে—এই সম্ভাবনাটা কম। তবে এটাও ডিপেন্ড করবে তাদের অ্যাক্টিভিটিজের ওপর, তারা এমপি হিসেবে কতটা সফল হয়, পার্লামেন্টে কত সফলভাবে কথা বলে। এই আন্দোলনের পর কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কিন্তু এনসিপি জোরালোভাবে অংশগ্রহণ করেনি। অর্থাৎ তারা ছদ্মবেশী জামায়াত ছিল, তারা আবার ছদ্মবেশে জামায়াত-বিএনপিকেই সমর্থন করেছে। সেদিক থেকে আমি মনে করি ন্যাশনাল একটা লস হয়ে গেছে। বিপুল পরিমাণ ছাত্র তাদের কথায় রাস্তায় নেমেছিল। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগও ছিল, ইসলামিস্ট ছিল, কমিউনিস্টও ছিল, সব ছিল। সবার নেতৃত্ব কিন্তু অটোমেটিক্যালি এই ছয় থেকে দশজনের মধ্যে চলে গিয়েছিল। কিন্তু তারা আস্তে আস্তে নিজেদেরকে জামায়াতের মধ্যেই আবদ্ধ করে ফেলল। এটা আসলে এনসিপি নেতারাই বলতে পারবে এটা তাদের জন্য মঙ্গলকর হলো কি না। আমি মনে করি, তাদের জন্য ওয়াইড ওপেন থাকা ভালো ছিল, তাদের জন্য ভবিষ্যতে অনেক ধরনের সম্ভাবনার দরজা খুলে যেত। কিন্তু একটি দলের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ওই দলের বাইরে আর কোনো সম্ভাবনা তাদের কাছে আসবে বলে আমি মনে করি না।
এশিয়া পোস্ট : সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবার পূরণ হবে কি?
শামীম হায়দার পাটোয়ারী: একটা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের চলে যাওয়াটা, পরিবর্তনটাই প্রয়োজনীয় ছিল, অ্যাটলিস্ট সেটা হয়েছে। আরেকটা হচ্ছে গণতন্ত্র, জনগণের ক্ষমতায়ন, প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা, সুশাসন—সেগুলোতে আমি খুব একটা আশার আলো দেখি না। সেটিতে আমি মনে করি কোনো সরকার সেভাবে সচেষ্টও না। ইউনূস গভর্নমেন্ট সেটা পারত, কারণ তাদের কোনো ব্যাগেজ ছিল না। খুব দ্রুত তারা অনেক সংস্কার করতে পারত, তারা সে সংস্কারগুলো করেনি। তাদের ক্যাবিনেটে যে অ্যাডভাইজররা ছিলেন তারা প্রত্যেকেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ড ফেমাস। কিন্তু যে ক্ষেত্রে তারা ফেমাস ছিলেন, দক্ষ ছিলেন—সেগুলোও তারা ইমপ্লিমেন্ট করেননি। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি একটা ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি হয়ে গেছে। বর্তমান সরকারও এগুলো বিষয়ে খুব সচেষ্ট থাকতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। হ্যাঁ, জনগণ আশাহত হতে পারে। তবে যেহেতু ইলেকশন হলো, একটা গভর্নমেন্ট এলো, রাষ্ট্রটা বেঁচে গেল হয়তো। ইলেকশন না হলে, আগের সরকার থাকলে, আমরা ভয় পেয়েছিলাম কোনো একটা সময় আলট্রা-ইসলামিক রেভল্যুশন হতে পারে, আলট্রা-ইসলামিক টেক ওভার হতে পারে। তো সেখান থেকে একটা ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন, এটা মন্দের ভালো।
এশিয়া পোস্ট : নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে শঙ্কা কি কেটেছে?
শামীম হায়দার পাটোয়ারী: একটা ইলেকশন হয়ে যাওয়ার পর, একটা দায়বদ্ধ সরকার থাকার পর, একটা প্রশাসনিক কাঠামো স্ট্যাবলিশড হওয়ার পর—সেখানে বিপ্লব করার জাস্টিফিকেশন কমে আসে। সে রকম কোনো বিপ্লব ভবিষ্যতে হলে সেটাকে জঙ্গিবাদ হিসেবে টার্ম করা যাবে, সেটার জন্য তখন আইনমাফিক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। যে কাঠামোটা বিগত সরকার বা ইউনূস সরকারের সময় ছিল না বলে আমাদের মনে হচ্ছিল, অবশ্যই আমরা বিএনপির সময়েও দেখেছিলাম জঙ্গিবাদ হয়েছিল, তারা কিন্তু পরে সেটাকে দমন করেছে। কর্নেল গুলজারের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স করে স্বল্প সময়ের মধ্যে জেএমবিসহ সব জঙ্গিবাদকে তারা নির্মূল করেছিল। অবশ্যই একটা ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট জঙ্গিবাদের দায় নিয়ে থাকতে পারে না। তারা সেক্ষেত্রে কঠোর হবে বলে আমার মনে হয়। ইসলামিক উদারতার রাজনীতি, আর ইসলামিক জঙ্গিবাদের রাজনীতি—এই দুটোর মধ্যে অবশ্যই ডিফারেন্স আছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এটা ভাগ করে ফেলতে হবে। যারা ভোটের রাজনীতিতে যায়, আমরা ধরে নিতে পারি তারা ইসলামিক উদারতার রাজনীতির দল। আর যারা ভোট ছাড়া অন্যভাবে ইমপ্লিমেন্ট করার চেষ্টা করবে, তারা জঙ্গিবাদ বা অন্যদিকে যাবে। এই দুই দলের মধ্যে আবার নেক্সাস থাকলে, সেটা জাতির সামনে উন্মোচন করতে হবে।