‘প্রত্যেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ থাকা উচিত’

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পদমর্যাদা) এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. রাজিবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দু। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই নেতা আন্দোলন, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। রাজনৈতিক জীবনে হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক আয়োজন আলাপনে এসেছিলেন অতিথি হয়ে। কথা বলেছেন ছাত্ররাজনীতি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমস্যা, আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আগামী দিনের তারুণ্যের নেতৃত্ব নিয়ে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।
এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের আগে এবং পরে ছাত্ররাজনীতির পরিবেশের মধ্যে আপনি কী ধরনের গুণগত পরিবর্তন দেখছেন?
রাজিবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দু: ৫ আগস্টের আগে আমাদের সবসময় গুম, খুন এবং হামলার শিকার হওয়ার এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে পথ চলতে হতো। সেই ভয়কে জয় করেই আমরা রাজপথে থাকার চেষ্টা করতাম। আমরা সঠিকভাবে বাসায় থাকতে পারতাম না, ঘুমাতে পারতাম না। এমনকি একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের যে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম বা খেলাধুলা করার কথা, সেগুলো আমরা পরিচালনা করতে পারতাম না। ৫ আগস্টের পর আমরা সেই একাডেমিক কার্যক্রমগুলো পুনরায় শুরু করতে পেরেছি এবং শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি পালন করছি। এখন আমরা শিক্ষার্থীদের সেবায় নিয়োজিত আছি এবং তাদের কল্যাণে কাজ করার ব্যাপক সুযোগ পাচ্ছি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমাদের বাকস্বাধীনতা ফিরে এসেছে এবং আমরা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি। বাসায় ঘুমানো বা তিনবেলা ঠিকমতো খাবার খাওয়ার মতো সাধারণ বিষয়গুলো গত সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমাদের কাছে বিলাসিতা ছিল। এমনও পরিস্থিতি হয়েছে যে, আমাদের বা আমাদের সহযোদ্ধাদের বাবা-মা অসুস্থ হলে বা মারা গেলেও আমরা জানাজায় যাওয়ার সুযোগ পেতাম না। সেই দুঃসহ সময়ের তুলনায় বর্তমান সময়টি আমাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।
এশিয়া পোস্ট: আপনার রাজনৈতিক জীবনের শুরুর গল্পটা জানতে চাই। গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্বে আসার পথটা কেমন ছিল?
বিন্দু: আমি মূলত একটি জাতীয়তাবাদী আদর্শের পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি আমার বড় ভাই এবং বাবা-মা বিএনপি ও ধানের শীষ প্রতীককে ভীষণ পছন্দ করতেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম, আদর্শ এবং নীতি-নৈতিকতা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। ২০০৩ সালে আমার ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার মাধ্যমে রাজনীতির সূচনা হয়। মূলত পরিবারের ঐতিহ্য এবং শহীদ জিয়ার আদর্শ থেকেই আমার এই পথচলা শুরু।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি ভবিষ্যতে কি আপনি পুরোদমে রাজনীতিতেই থাকবেন, নাকি পেশাগত অন্য কোনো পরিকল্পনা আছে?
বিন্দু: আমি ছোটবেলা থেকেই সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখতাম। আপনি যখন বৃহত্তর পরিসরে মানুষের জন্য কিছু করতে চাইবেন, তখন একা কাজ করা কঠিন। এর জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠন। আমি মনে করি, এই সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং জনগণের সেবা করা অনেক সহজ। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমি ছাত্রদলে যোগ দিয়েছি এবং আজও রাজপথে আছি।
এশিয়া পোস্ট: প্রথমবার কোনো রাজনৈতিক মিছিলে যাওয়ার অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
বিন্দু: আমি যখন ছাত্ররাজনীতিতে আসি তখন অনেক ছোট, সম্ভবত ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। রাজনীতি খুব একটা না বুঝলেও শহীদ জিয়া এবং বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেমের প্রতি এক ধরনের টান অনুভব করতাম। আমি যখন ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হিসেবে প্রথমবার মিছিল নিয়ে কর্মী সম্মেলনে যাই, তখন আমি সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। মিছিলে আমার অংশগ্রহণ দেখে সবাই খুব উৎসাহ দিচ্ছিলেন। সেখানেই আমি প্রথম জনসম্মুখে বক্তব্য দিই। আমার সিনিয়র নেতারা বলেছিলেন যে, সবার মিছিল ও বক্তব্যের মধ্যে আমারটি সবচেয়ে চমৎকার ছিল। সেই শুরু থেকেই বড়দের অনুপ্রেরণা আমাকে রাজনীতির প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলে।
এশিয়া পোস্ট: আপনি ২০০৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন, কিন্তু এক বছর পিছিয়ে ২০০৭ সালে পাস করেছেন। এই বিলম্বের কারণ কী ছিল?
বিন্দু: ওয়ান-ইলেভেনের পর আমাদের দল ও ছাত্রদলের ওপর চরম আঘাত এসেছিল। সেই সময় তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী হিসেবে আমরাও নির্যাতনের শিকার হই। বিশেষ করে ছাত্রলীগের হামলায় আমি গুরুতর আহত হই। আমার হাতে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ১৭টি রগ ও রক্তনালি কেটে দেওয়া হয়েছিল। সেই জখমের কারণে দীর্ঘ সময় আমার হাতে কলম ধরার মতো অবস্থা ছিল না। এই শারীরিক সমস্যার কারণেই মূলত আমার একটি বছর নষ্ট হয় এবং ২০০৭ সালে আমি এসএসসি পরীক্ষা দিই।
এশিয়া পোস্ট: শরীরের ১৭টি রগ কেটে দেওয়ার মতো ভয়াবহ নির্যাতনের পরও কি রাজনীতি নিয়ে আপনার মনে কখনো দ্বিধা তৈরি হয়েছিল?
বিন্দু: দেখুন, আপনি যদি লক্ষ্য স্থির করেন যে জনগণের সেবা করবেন, তবে হামলা ও মামলার শিকার হওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয়। সারা বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, কোনো নেতাই চড়াই-উতরাই ছাড়া নেতৃত্বে আসতে পারেননি। আমি যেহেতু একটি রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠেছি, তাই এগুলোকে জীবনের অংশ হিসেবেই মেনে নিয়েছি। সুস্থ হওয়ার পরপরই আমি আবারও সক্রিয় হয়েছি। ২০১৩-১৪ সালের আন্দোলনেও আমি গ্রেপ্তার হয়েছি। তৎকালীন ‘দলকানা’ পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের ওপর অনেক নির্যাতন চালিয়েছে। এমনকি ২০২২ সালে যখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর সারা দেশে কমিটি করার কাজ শুরু করি, তখন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে আমার ওপর হামলা হয়। আমাকে মাথায় কুপিয়ে জখম করে ড্রেনে ফেলে রাখা হয়েছিল। কিন্তু এই আঘাতগুলো আমাকে দমাতে পারেনি, বরং আরও শক্তিশালী করেছে।
এশিয়া পোস্ট: আপনারা দীর্ঘ সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এখন সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কি আপনারা প্রতিশোধের রাজনীতি এড়িয়ে চলছেন?
বিন্দু: আমরা কোনো ধরনের প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। যারা আমার ওপর ব্যক্তিগতভাবে হামলা করেছে, আমি তাদের প্রতিও কোনো প্রতিহিংসা দেখাইনি। আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লুসিভ) বাংলাদেশ গড়তে চাই। আমাদের নেতা তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়েছেন। যদি আমরা প্রতিহিংসা রাখি, তবে তো সেই পুরোনো নোংরা রাজনীতিই ফিরে আসবে। আমরা গত চার-পাঁচ মাস ধরে দায়িত্বে আছি, কিন্তু আপনি দেখাতে পারবেন না যে ছাত্রদল কোনো ক্যাম্পাস বা হল দখল করেছে কিংবা কোনো ছাত্র সংগঠনকে আঘাত করেছে। বরং আমাদের মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা এখনও বিরোধী দলেই আছি। কারণ, আমরা ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছি না। আমরা চাই শিক্ষার্থীদের সেবক হয়ে কাজ করতে।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে সহিংসতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, এর মূল কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
বিন্দু: এই সহিংসতার মূলে রয়েছে ফ্যাসিবাদ এবং ছাত্রলীগ। আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ কখনোই অহিংস কার্যক্রমে বিশ্বাসী ছিল না। তবে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে যে জনগণ এই সহিংসতা আর পছন্দ করছে না। যদি শিক্ষার্থীরা সহিংসতা পছন্দ করত, তবে এই অভ্যুত্থান হতো না। আমরা একটি অহিংস রাজনীতির প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চাই। জুলাই আন্দোলনের পর তরুণদের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার যে স্পৃহা তৈরি হয়েছে, আমরা সেটাকেই ধারণ করছি।
এশিয়া পোস্ট: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির ক্ষেত্রে আপনাদের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
বিন্দু: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোনো সেশনজট নেই এবং তারা নিয়মিত পড়াশোনার মধ্যে থাকে। শুরুতে এখানে রাজনীতি পরিচালনা করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে এখন সারা দেশে আমাদের শক্তিশালী কমিটি রয়েছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমাদের পছন্দ করে। বর্তমানের বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ট্রাস্টি বোর্ড। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত হলেও তারা প্রফিটেবল অর্গানাইজেশনের মতো কাজ করে। হঠাৎ করে টিউশন ফি বাড়িয়ে দেওয়া বা হিডেন চার্জ আরোপ করা হয়। শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রায়ই একাডেমিক শাস্তির ভয় দেখানো হয়। আমরা যখন এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, তখন আমাদের ব্যক্তিগত শিক্ষা জীবন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। আমরা মনে করি, শিক্ষার পরিবেশ বজায় রেখে প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি থাকা জরুরি। নেতৃত্ব তৈরি ছাড়া দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ বা ‘ডাকসু’ স্টাইল ইলেকশনের দাবি জানাচ্ছি আমরা।
এশিয়া পোস্ট: অনেকে মনে করেন ছাত্র সংসদ থাকলে বিজয়ী সংগঠনের আধিপত্য বাড়বে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
বিন্দু: গত চার মাসে আমরা প্রমাণ করেছি যে ছাত্রদল আধিপত্য বিস্তারে বিশ্বাসী নয়। আমরা হল দখল বা সিট বাণিজ্যের সংস্কৃতি বন্ধ করেছি। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যেই জয়ী হোক—তা ছাত্রদল হোক বা অন্য কোনো সংগঠন, তারা শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিকতা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় ভিন্ন। তারা কোয়ালিটি এডুকেশন, আধুনিক লাইব্রেরি, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং ন্যায্য টিউশন ফির মতো বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে চায়। এই দাবিগুলো তোলার জন্য একটি বৈধ প্ল্যাটফর্ম দরকার। শিক্ষার্থীরা যাকে খুশি ভোট দিক, কিন্তু তাদের কথা বলার জায়গা থাকা উচিত।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলের নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াটি কি সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে?
বিন্দু: ছাত্রদল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় সংগঠন হওয়া প্রমাণ করে যে আমাদের প্রক্রিয়া কার্যকর। তবে আমি মনে করি, বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও উন্নত করা উচিত।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্রলীগও নিজেদের দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সংগঠন দাবি করত। আপনারা কোন যুক্তিতে এই দাবি করছেন?
বিন্দু: আমরা কর্মী সংখ্যা এবং জনসমর্থনের ভিত্তিতে এটা বলি। সারা দেশে ছাত্রদলের ৩০ লক্ষাধিক সক্রিয় কর্মী রয়েছে। কোনো সংগঠনের সঙ্গে যখন এত বিপুল সংখ্যক ছাত্র সম্পৃক্ত থাকে, তখন তাকে জনপ্রিয় ও বৃহৎ সংগঠন বলাই যায়। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের সেবক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং দুর্বল দিকগুলো কী কী?
বিন্দু: ছাত্রদলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর আদর্শ এবং শৃঙ্খলা। এই সংগঠন কখনো তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি। আর দুর্বলতার কথা যদি বলি, সত্যি বলতে আমার চোখে এখনও বিশেষ কোনো দুর্বলতা ধরা পড়েনি, তাই এটি নিয়ে আমি চিন্তিত নই।
এশিয়া পোস্ট: নিজের দল বলে কি আপনি দুর্বলতাগুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন, নাকি গঠনমূলক সমালোচনা করার সুযোগ আপনাদের দলে আছে?
বিন্দু: আমরা অবশ্যই আত্মসমালোচনা করি। আমাদের কোনো নেতা বা মন্ত্রী ভুল করলে আমরা সেটা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা করার সাহস রাখি, যা অন্য অনেক দলে দেখা যায় না। আপনি যদি দায়িত্বশীল নেতাদের ফেসবুক প্রোফাইল দেখেন, তবে দেখবেন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নেতা নিজ দলের বা সরকারের ভুল পদক্ষেপের গঠনমূলক সমালোচনা করছেন। এই বাকস্বাধীনতা আমাদের দলে আছে।
এশিয়া পোস্ট: দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে ছাত্রদল কোন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি লাভ করেছে?
বিন্দু: আমরা বড় শিক্ষা পেয়েছি যে ছাত্রলীগ যা করেছে, আমরা তা করব না। ছাত্রলীগ অন্য কোনো সংগঠনকে রাজনীতি করতে দেয়নি, কিন্তু আমরা সবাইকে সুযোগ দেব। আমরা গেস্টরুম বা গণরুম কালচার রাখব না, টেন্ডারবাজি বা সহিংসতায় যাব না। ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও বাকস্বাধীনতা বজায় রাখব। গত কয়েক মাসে আমরা প্রমাণ করেছি যে আমরা ফ্যাসিবাদের চর্চা করি না। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনেক সংগঠন ‘মব কালচার’ তৈরি করলেও ছাত্রদল এর সম্পূর্ণ বাইরে ছিল।
এশিয়া পোস্ট: অভিযোগ আছে অতীতে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন ছাত্রদলও একই ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। এই অভিযোগ আপনি কীভাবে দেখছেন?
বিন্দু: ১৭ বছর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রদলকে মেলানো ঠিক হবে না। তাছাড়া ছাত্রদলের নামে অনেক সময় মিথ্যা প্রোপাগান্ডাও ছড়ানো হয়। তবে আমাদের কোনো কর্মী ভুল করলে আমরা সরাসরি সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিই এবং প্রশাসনকে বলি তাদের গ্রেপ্তার করতে। আমরা ফেরেশতা নই, ভুল হতে পারে। কিন্তু সেই ভুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সৎ সাহস একমাত্র ছাত্রদলেরই আছে।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি গঠন প্রক্রিয়া এবং প্যানেল নিয়ে যে বিতর্ক হয়, সে বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
বিন্দু: আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক জনাব তারেক রহমান অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়—কখনো কাউন্সিলিং আবার কখনো সিলেকশনের মাধ্যমে কমিটি গঠন করেন। প্যানেলের বিষয়টি সুস্থ প্রতিযোগিতার অংশ হতে পারে, কিন্তু এটি প্রতিহিংসা নয়। আমরা সবাই জিয়া পরিবারের সদস্য এবং আমাদের সবার নেতা তারেক রহমান। নেতৃত্বে আসতে হলে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয় এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা থাকতে হয়।
এশিয়া পোস্ট: শীর্ষ পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের ঘাটতি কেন? ছাত্রদলে কি নারীরা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছেন?
বিন্দু: কেন্দ্রীয় সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পথে বাংলাদেশে কিছু সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা এখনও বিদ্যমান। তবে আমরা স্পেস দিচ্ছি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী নেত্রীরা আছেন। যোগ্য নেতৃত্ব থাকলেও পারিবারিক বা সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকে শীর্ষ পদের কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে পারেন না। তবুও আমরা চেষ্টা করছি তাদের এগিয়ে দিতে। যেমন আমাদের পপুলার মেডিকেল কলেজের সভাপতি একজন নারী। এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনেও আমরা দক্ষ নেত্রীদের মূল্যায়ন করছি।
এশিয়া পোস্ট: যারা পদ ছাড়াই বিদায় নেন বা পদ পান না, তাদের মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়?
বিন্দু: ছাত্রদল কোনো প্রফিটেবল অর্গানাইজেশন নয়। এখানে সবাই পদের জন্য নয়, আদর্শের টানে আসে। সবাই পদ পাবে না—এটিই স্বাভাবিক। তবে যারা একনিষ্ঠভাবে কাজ করে, দল তাদের পরিশ্রম মনে রাখে। ছাত্রদলে পদ না পেলেও অনেকে পরবর্তীতে যুবদল বা স্বেচ্ছাসেবক দলে বড় দায়িত্ব পান।
এশিয়া পোস্ট: সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজনীতি বিমুখ হওয়া নিয়ে আপনি কী ভাবছেন?
বিন্দু: ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ শব্দটাকে ইদানীং অপব্যবহার করা হচ্ছে। দেখা গেছে, যারা ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলেছে, কিছুদিন পরই তারা ছাত্রশিবিরের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শিক্ষার্থীরা আসলে রাজনীতি বিমুখ নয়, তারা গত ১৫ বছরের সহিংসতা ও দখলদারত্বের
রাজনীতিবিমুখ। তারা গোপন রাজনীতি বা মুনাফিকি পছন্দ করে না। জুলাই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি রক্ত দিয়েছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা, প্রায় দেড় শতাধিক কর্মী শহীদ হয়েছেন। শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলের স্বচ্ছ রাজনীতি চায়।
এশিয়া পোস্ট: অন্যান্য ছাত্র সংগঠন এবং সাম্প্রতিক সময়ের নেতৃত্ব নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
বিন্দু: আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, ছাত্রশিবিরের উচিত মুনাফিকি ও অপপ্রচারের রাজনীতি ছেড়ে প্রকাশ্যে আসা। তারা বট বাহিনী দিয়ে প্রোপাগান্ডা চালায় এবং এখনও অনেক ক্যাম্পাসে তাদের কমিটি গোপন রেখেছে। ২০১২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তারা কেন কমিটি প্রকাশ করেনি? কারণ তাদের অনেক নেতা আসলে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এ ছাড়া বর্তমান সময়ে কিছু ‘বেয়াদব’ ও ‘শিষ্টাচারহীন’ নেতৃত্বের জন্ম হয়েছে, যারা তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতি থেকে বিমুখ করছে। সমন্বয়কদের কেউ কেউ হঠাৎ কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, দামি ফ্ল্যাটে থাকছেন—এসব শিক্ষার্থীরা পছন্দ করছে না। দুর্নীতিবাজ ও ধান্দাবাজদের ছাত্ররাজনীতি শিক্ষার্থীরা চায় না।
এশিয়া পোস্ট: বিএনপির বর্তমান কর্মকাণ্ড এবং সরকারের বাজেট নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
বিন্দু: তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে অনেক ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। ইশতিহার বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত শুরু হয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আছে এবং বাজেটের পর দাম বাড়েনি, যা বিরল। তবে কিছু সংগঠন মদের দাম বা সিগারেটের দাম নিয়ে অযৌক্তিক প্রতিবাদ করছে। আমরা মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই। যদি ভবিষ্যতে সরকার কোনো ভুল করে, আমরা সচেতন নাগরিক ও ছাত্রনেতা হিসেবে অবশ্যই তার সমালোচনা করব।
এশিয়া পোস্ট: আগামী ১০ বছরে ছাত্রদলকে কোথায় দেখতে চান এবং আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী?
বিন্দু: আমি চাই ছাত্রদল একটি আইকনিক আধুনিক ছাত্র সংগঠনে রূপান্তরিত হোক। আমাদের গঠনতন্ত্রকে সময়োপযোগী করা, মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম, লিডারশিপ কোর্স এবং জব ফেয়ার চালু করার পরিকল্পনা আমার আছে। প্রতিটি ক্যাম্পাসে হেল্প ডেস্ক এবং লিগ্যাল এইড সেল গঠন করতে চাই। ব্যক্তিগতভাবে আমি জিয়া পরিবারের একনিষ্ঠ কর্মী হয়ে থাকতে চাই। পদের চেয়ে দলের প্রতি অনুগত থাকাই আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
এশিয়া পোস্ট: ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
বিন্দু: আপনাকে এবং এশিয়া পোস্টের দর্শকদেরও অনেক ধন্যবাদ। আল্লাহ হাফেজ।





