চোখের সামনেই নবীন মারা যায়, মিল্লাতের হাত উড়ে যায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির পরিচিত মুখ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মনজুরুল আলম রিয়াদ। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বর্তমান ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতা, আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এশিয়া পোস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘আলাপন’-এ কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাহাত রূপান্তর
এশিয়া পোস্ট: কেমন আছেন?
মনজুরুল আলম রিয়াদ: আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।
এশিয়া পোস্ট: পটুয়াখালীর দশমিনা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছাত্রনেতা হওয়া, এই দীর্ঘ পথচলার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
মনজুরুল আলম রিয়াদ: শুরুটা পারিবারিকভাবেই। আমার মামা, চাচারা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আমার নানা সরাসরি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যদিও তারা পেশায় শিক্ষক ছিলেন, তাই ওয়ান-ইলেভেন সরকারের পর তাদের সরাসরি রাজনীতি অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। তাদের দেখেই বিএনপি বা জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতি আমার আকর্ষণ তৈরি হয়। আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি, তখনই নেহালগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রথম পদ পাই। আমার এলাকা পটুয়াখালী-৩, অর্থাৎ দশমিনা-গলাচিপা, সবসময় আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত ছিল। সেখানে আওয়ামী লীগের দাপট এবং তাদের রাজনীতির ধরন আমার মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। যেমন—আমার স্কুলে ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে এমন একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, যিনি শিক্ষিত ছিলেন না। শুধু হারের ভয়ে তাকে দাঁড় করানো হয়েছিল যাতে সম্মানহানি না হয়। এসব দেখেই আমার ছাত্রদলে আসা।
এশিয়া পোস্ট: ছোটবেলায় প্রথম মিছিল বা আন্দোলনের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?
মনজুরুল আলম রিয়াদ: আমার মা-বাবা বলতেন, ছোটবেলায় আমি ধানের শীষের স্লোগান দিয়ে প্রথম মিছিলে গিয়েছিলাম, যদিও সেটা আমার নিজের মনে নেই। তবে ২০০৪ সালে ছাত্রদলের মিছিলে যাওয়ার কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে। আমি যখন ক্লাস নাইনে প্রথম পদ পাই, তখন সাংগঠনিক কাঠামোতে থাকলেও নিয়মিত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ খুব বেশি ছিল না। যেহেতু পরিবার জাতীয়তাবাদী ছিল, তাই সেখান থেকে কোনো বাধা আসেনি।
এশিয়া পোস্ট: আপনি অমর একুশে হলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, আবার এখন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। এই দুই পর্যায়ের নেতৃত্বের পার্থক্য কী?
মনজুরুল আলম রিয়াদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল রাজনীতি অনেক বৈচিত্র্যময়, কারণ এখানে সব ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তৎকালীন ছাত্রলীগের বাধার কারণে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে যাওয়ার মতো প্ল্যাটফর্ম পাইনি। আমাদের হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, সিট কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমাদের সঙ্গে কথা বলার কারণে বন্ধুদেরও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। আমি হল রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে নিজের আদর্শ তুলে ধরার সুযোগ না পাওয়ায় এক ধরনের অতৃপ্তি রয়ে গেছে। তবে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে এসে বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ পেয়ে আমি তৃপ্ত।
এশিয়া পোস্ট: বিগত ১৭ বছরের রাজনীতিতে অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছেন। আপনার ব্যক্তিগত তৃপ্তির জায়গা কোনটি?
মনজুরুল আলম রিয়াদ: সামগ্রিকভাবে আমাদের স্বপ্ন ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা বা তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা। এসব অর্জন হওয়া বড় তৃপ্তির বিষয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার তৃপ্তির জায়গা হলো, যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মী বলে, ‘রিয়াদ ভাই ভালো মানুষ’ বা ছাত্রদলের রিয়াদ, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এশিয়া পোস্ট: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কোনো বিশেষ ঘটনা কি এখনো আপনাকে তাড়িয়ে বেড়ায়?
মনজুরুল আলম রিয়াদ: ২০১৫ সালে বুয়েট ক্যাম্পাসে আমাদের মিছিলে ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানীর নেতৃত্বে যে হামলা হয়েছিল, সেখানে আমার সহযোদ্ধা শাহাদাত হোসেন এবং গোলাম কিবরিয়া নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিল। সেই ঘটনা আমাকে খুব পীড়া দেয়। এছাড়া ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কালভার্ট রোডের কর্মসূচির কথাও ভুলতে পারি না। সেদিন পুলিশ গুলি করলে প্রথমে কয়েকটি ছররা গুলি আমার কানে ও পিঠে লাগে। আমার সামনেই মিল্লাতের হাত উড়ে যায়, ফখরুলের চোয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমার পাশের উপজেলা বাউফলের নবীন তালুকদার ঘটনাস্থলেই মারা যান। সেদিনই আমার এলাকার এক ছোট ভাই জিহাদ, যিনি ছাত্রদলের এক নেতার আত্মীয়, যাত্রাবাড়ীতে নিহত হন। আমাকে তার লাশ শনাক্ত করতে হয়েছিল। সে সময় আমার ফোন বন্ধ থাকায় এবং আমাদের নাম ও এলাকা কাছাকাছি হওয়ায় আমার পরিবারও চরম আতঙ্কে ছিল।
এশিয়া পোস্ট: এত হামলা-মামলার শিকার হয়ে কখনো কি মনে হয়েছে, রাজনীতিতে না এলেই ভালো হতো?
মনজুরুল আলম রিয়াদ: না, কখনোই মনে হয়নি। সবসময় মনে হয়েছে আমি সঠিক পথেই আছি। তবে পরিবারের জন্য খারাপ লাগত, কারণ তাদের উদ্বেগের মধ্যে রেখেছি। আমি যখন প্রথম গ্রেপ্তার হই, তখনকার এক সহকারী পুলিশ কমিশনার আমাকে অনেক মারধর করেন এবং পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেন। এই খবর শুনে আমার দাদি স্ট্রোক করেন। আমি যখন ৮৭ দিন কারাগারে ছিলাম, তখন দাদির অসুস্থতা এবং পরিবারের কষ্ট আমাকে খুব পীড়া দিত।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলনের পর ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে যে বিভেদ দেখা যাচ্ছে, সে সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
মনজুরুল আলম রিয়াদ: ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আমাদের আদর্শিক ও নৈতিক বিভেদ সবসময় ছিল। ৫ আগস্টের পর পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা হয়েছিল যে, ছাত্রদলের কোনো অবদান নেই, যা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ছাত্রদলের ১৪৪ জন সরাসরি শাহাদাত বরণ করেছেন, যা যে কোনো একক সংগঠনের জন্য বড় সংখ্যা। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জোট থাকলেও ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক বা নিয়মিত বৈঠক ছিল না। ঐতিহাসিক কারণেই এই দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: রাজনীতিতে ‘ট্যাগিং কালচার’, যেমন কাউকে শিবির বা আওয়ামী লীগ হিসেবে চিহ্নিত করা, এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?
মনজুরুল আলম রিয়াদ: আওয়ামী লীগ এই ট্যাগিংয়ের রাজনীতি শুরু করেছিল সমাজকে বিভক্ত করার জন্য। কেউ যদি সত্য কথা বলে, তাকে যে কোনো ট্যাগ দেওয়া হলেও তার বক্তব্যের সত্যতা নষ্ট হয় না। আমি ছাত্রদল করি, কেউ আমাকে ছাত্রদলের রিয়াদ বললে আমি গর্ববোধ করি। কিন্তু যারা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে রাজনীতি করে, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নগুলো সামনে আসে।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির প্রধান সংকটগুলো কী কী?
মনজুরুল আলম রিয়াদ: আমার মতে তিনটি বড় সংকট রয়েছে। প্রথমত, আমরা কখনো সঠিক কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে পারিনি। দ্বিতীয়ত, রাজনীতিতে নারীদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি। তৃতীয়ত, বর্তমান সময়ে গুজব, প্রোপাগান্ডা এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার। এছাড়া শুধু মেধাবী হওয়াই যথেষ্ট নয়, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমও জরুরি।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলের আগামী কমিটি এবং আপনার নেতৃত্বের পরিকল্পনা নিয়ে কিছু বলুন।
মনজুরুল আলম রিয়াদ: ছাত্রদলের কমিটিতে ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করা হয়। আমি যদি নেতৃত্বে আসি, তবে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তন করতে চাই। সংগঠনকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও গতিশীল করতে চাই। আগামী দশ বছরে আমি ছাত্রদলকে এমন একটি অবস্থানে দেখতে চাই, যেখানে ‘ছাত্রদল করা’ মানেই সমাজে একজন ভালো মানুষ ও দেশপ্রেমিক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া। ব্যক্তিগতভাবে আমি ভবিষ্যতে জাতীয়তাবাদী দলের যে কোনো পর্যায়ে থেকে মানুষের সেবা করতে চাই।
এশিয়া পোস্ট: তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?
মনজুরুল আলম রিয়াদ: তরুণদের বলব মাদক থেকে দূরে থাকতে। কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া বিশ্বাস বা শেয়ার করা উচিত নয়। গুজব না ছড়ানো একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। নিজের বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
মনজুরুল আলম রিয়াদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।