logo
Advertisement

বিশেষ সাক্ষাৎকার/স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব প্রার্থীকে শতভাগ নিরাপত্তা দেবে সরকার: মীর শাহে আলম

আতিক হাসান
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব প্রার্থীকে শতভাগ নিরাপত্তা দেবে সরকার: মীর শাহে আলম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। ছবি: মীর শাহে আলমের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপও নিয়েছে সরকার। সংশোধন হয়েছে আইন, বাতিল হয়েছে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের পথ। বছরের শেষ নাগাদ প্রথম ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। এমন প্রেক্ষাপটে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

এশিয়া পোস্ট: আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী?

মীর শাহে আলম: বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার মানুষের মৌলিক অধিকার ও ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছিল। জাতীয় থেকে স্থানীয়—সব পর্যায়ে নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং আমাদের জনগণের সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, স্থানীয় সরকারের পাঁচটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

আমরা ইতোমধ্যেই সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্থানীয় সরকারের পাঁচটি সংশোধিত আইন (সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ সংশোধিত আইন ২০২৬) পাস করেছি। এই নতুন আইনের ফলে এবার কোনো দলীয় মনোনয়ন বা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে না। নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয় ও সাধারণ প্রতীকে। তবে দলগুলোর তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো থাকায় দলীয় আবহ থেকেই যায়। বিএনপি নির্দেশ দিয়েছে, উপজেলা বিএনপি প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থীকে সমর্থনের চেষ্টা করবে। এটি দলীয় মনোনয়ন নয়, সংবাদ সম্মেলন বা কর্মিসভা করে সমর্থিত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।

এশিয়া পোস্ট: দলীয় প্রতীক ছাড়া কেবল দলীয় সমর্থনে প্রার্থীরা মাঠে কী ধরনের সুবিধা পাবেন?

মীর শাহে আলম: একক প্রার্থী থাকলে দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পোড় খাওয়া নেতারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারবেন। এতে মাঠপর্যায়ে সরকারের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন ও জনসেবা সহজ হবে।

কোনো ইউনিয়নে যদি একাধিক প্রার্থী থাকেন, তবে উপজেলা ও জেলা বিএনপি সমঝোতার চেষ্টা করবে। সমঝোতা না হলে কেন্দ্রের অনুমতি সাপেক্ষে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা সরকারদলীয় প্রার্থীর পক্ষে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করবে।

এশিয়া পোস্ট: স্থানীয় নির্বাচনে সচরাচর সরকারি দলের সমর্থকরা অন্য দলের প্রার্থীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। এ ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ কী হবে?

মীর শাহে আলম: আমরা সব প্রার্থীকে নির্বাচনি প্রচারে শতভাগ নিরাপত্তা দেব। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশন যে সহযোগিতা চাইবে, তা দেওয়া হবে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে নিরাপদে ফল নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ইচ্ছা, নির্বাচন যেন ঈদের মতো উৎসবমুখর হয়। গ্রামের চা-দোকান ও পাড়া-মহল্লায় যেন আনন্দের আমেজ থাকে।

এশিয়া পোস্ট: নির্বাচন আয়োজনের উপযুক্ত সময় কখন হতে পারে বলে মনে করছেন?

মীর শাহে আলম: চলতি অর্থবছরেই নির্বাচন হবে, তবে তা যেন শুষ্ক মৌসুমে (ডিসেম্বর, জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি) হয়, সে বিষয়ে আমরা ভাবছি। শুষ্ক মৌসুমে ঝড়বৃষ্টি থাকে না, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা শেষ হয়ে নতুন ক্লাসের সূচনা হয়, ফলে প্রচারে বিঘ্ন ঘটে না। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে, তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। ছবি: এশিয়া পোস্ট
এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এশিয়া পোস্ট: নির্বাচন কমিশনের কারিগরি ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি কেমন দেখছেন?

মীর শাহে আলম: জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনের কেন্দ্র বিন্যাসের পার্থক্য রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি কেন্দ্র লাগে। কারণ প্রতি ওয়ার্ডে একজন সাধারণ সদস্য ও তিনটি ওয়ার্ড মিলে একজন সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচিত হন। ইউপিতে ব্যালট পেপার থাকে তিনটি। আবার উপজেলা নির্বাচনে কেন্দ্র সংখ্যা কিছুটা কম হয়। সেখানেও চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের জন্য তিনটি ব্যালট থাকে।

যেহেতু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে না, তাই ইসি ১০টি করে সাধারণ প্রতীক দিয়ে আগাম ব্যালট পেপার ছেপে রাখতে পারছে। যেসব স্থানে প্রার্থীর সংখ্যা ১০-এর বেশি হবে, কেবল সেখানেই ভোটার সংখ্যা অনুযায়ী আলাদা ব্যালট ছাপা হবে। ইসি অমোচনীয় কালি সংগ্রহ ও কেন্দ্র নির্ধারণের কাজ শেষ পর্যায়ে এনেছে।

আইন পাসের পর নির্বাচন কমিশন একটি পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা তৈরি করে ভ্যাটিংয়ের (আইনি ও কারিগরি বৈধ্যতা যাচাই) জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভ্যাটিং শেষে এটি গেজেট আকারে প্রকাশ হলেই বুঝতে হবে নির্বাচনের ৯৫% প্রস্তুতি সম্পন্ন।

এশিয়া পোস্ট: এই পাঁচটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেমন ব্যয় হতে পারে?

মীর শাহে আলম: মাঠপর্যায় থেকে পাঁচটি নির্বাচন সম্পন্ন করতে সরকারের মোট খরচ হবে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। ৪ হাজার ৯৮৫টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ব্যয় হবে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। উপজেলা পরিষদে খরচ হবে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় হবে ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ৬৪টি জেলা পরিষদ নির্বাচনে।

এশিয়া পোস্ট: পাঁচ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা কেমন হবে?

মীর শাহে আলম: সবার শেষে অনুষ্ঠিত হবে জেলা পরিষদ নির্বাচন। কারণ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়। আর জেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটার হন ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান, পৌরসভার কাউন্সিলর, মেয়র, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। তাই বাকি চার নির্বাচন শেষ করে ভোটার তালিকা প্রকাশের পরই জেলা পরিষদ নির্বাচন করা সম্ভব।

এশিয়া পোস্ট: স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সম্প্রতি যে আলোচনা চলছে, সে বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করবেন কি?

মীর শাহে আলম: সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো হয়েছিল যে ইউপি নির্বাচনে মেম্বার ও চেয়ারম্যানদের ন্যূনতম এসএসসি পাস হতে হবে। এটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছর ধরে যে আইন বলবৎ আছে, এখনও সেটাই রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যে কোনো পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে যে কোনো পদে প্রার্থী হতে বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর হতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রার্থিতার ক্ষেত্রে নিয়ম কী?

মীর শাহে আলম: আইনের বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের বা স্থানীয় সরকারের কোনো ‘লাভজনক পদে’ অধিষ্ঠিত থাকলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যায় না। বর্তমান কোনো ইউপি চেয়ারম্যান স্বপদে থেকে উপজেলা নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। তাকে আগের পদ থেকে পদত্যাগ করে প্রার্থী হতে হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘এমপিওভুক্ত নীতিমালা ২০২৫’-এর ১৭.১ (খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এমপিওভুক্ত পদকে লাভজনক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আইন ও এই নীতিমালার আলোকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নির্বাচন কমিশন তাদের বিধিমালার প্রার্থীর ‘যোগ্যতা ও অযোগ্যতা’ অংশে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে।

এশিয়া পোস্ট: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবার জাতিসংঘ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সেই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

মীর শাহে আলম: এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিরাট মাইলফলক। একটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এক বছরের জন্য সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। জাতিসংঘ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন। একজন বাঙালি হিসেবে এটি আমাদের জন্য গর্বের।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ভাষণ দেবেন। এটি বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আমি প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাই।

এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মীর শাহে আলম: আপনাকে এবং এশিয়া পোস্ট পরিবারকেও ধন্যবাদ।