logo

‘ইংরেজি শিখতে হলে কিছুটা নির্লজ্জ হওয়া জরুরি’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘ইংরেজি শিখতে হলে কিছুটা নির্লজ্জ হওয়া জরুরি’
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী খালিদ মাহমুদ খান। সোশ্যাল মিডিয়ায় মজার ছলে লাখো মানুষকে ইংরেজি শেখান তিনি। মজার ছলে ইংরেজি শেখানোর এই উদ্যোগের কারণে বর্তমানে বেশ আলোচিত। পাশাপাশি বিভিন্ন আয়োজনে যোগাযোগ দক্ষতা নিয়েও মোটিভেশন দিয়ে থাকেন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ‘আলাপন’-এ অতিথি হয়ে এসেছিলেন খালিদ মাহমুদ খান। ইংরেজি শেখার সহজ কৌশল, সামাজিক নানা ট্যাবু কাটিয়ে ওঠার উপায় এবং তরুণদের স্কিল উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে অনেকেই ইংরেজিতে কথা বলতে চান, কিন্তু বিষয়টিকে বেশ কঠিন মনে করে পিছিয়ে যান। সেই জায়গায় আপনি সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে মজার ছলে কাজ করছেন। এই অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি কেমন?

খালিদ মাহমুদ খান: আলহামদুলিল্লাহ, আমার ভীষণ ভালো লাগছে। এমন একটি আয়োজনে যুক্ত হতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত ও উৎসাহিত। একটি বিষয় আমি দৃঢ়তার সঙ্গেই বলতে পারি, আজকের আলোচনাটি পুরোটা পড়লে যে কারও কাছে ইংরেজি শেখার বিষয়টি পানির মতো সহজ মনে হবে। ইংরেজির প্রতি ভয় কেটে গিয়ে সবাই সাবলীলভাবে কথা বলার আত্মবিশ্বাস পাবেন।

এশিয়া পোস্ট: আপনার ইংরেজি শেখার সূচনা কীভাবে হয়েছিল? এই পথচলা শুরুর গল্প শুনতে চাই।

খালিদ মাহমুদ খান: আমার বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে। আমার আব্বা ছিলেন একটি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল। আব্বা বাংলা, ইংরেজি, উর্দু ও আরবি, এই চারটি ভাষাতেই সমানভাবে সাবলীল ছিলেন। ২০০৭ সালের দিকে, যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল, তখন তো মোবাইল ফোন বা আধুনিক ডিভাইসের এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না। কিন্তু আব্বা বেশ দূরদর্শী ছিলেন। তিনি আমাকে ছোটবেলা থেকেই জোর করে ধরে ধরে ইংরেজি পড়াতেন। প্রথমে হয়তো খুব একটা ইচ্ছা করতো না, কিন্তু আব্বার সেই চেষ্টার কারণেই আমার মনের ভেতরে ইংরেজির প্রতি ভালোবাসাটা গভীরভাবে গেঁথে যায়। স্কুলে টিচাররা আমাকে একটু আলাদা চোখে দেখতেন। কারণ, গ্রামারের ছোটখাটো বিষয়গুলো আমি ভালোভাবে বুঝতে পারতাম এবং সবাই প্রশংসা করতো। এ ছাড়া ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আমার দারুণ ঝোঁক ছিল। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে ক্রিকেট, হকি, অ্যাথলেটিক্স ও ব্যাডমিন্টনসহ নানা খেলায় প্রতিনিধিত্ব করেছি।

এশিয়া পোস্ট: শুরুতে ইংরেজি চর্চা করতে গিয়ে কোনো কঠিন চ্যালেঞ্জ বা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল?

খালিদ মাহমুদ খান: ক্রিকেট খেলা দেখার সময় ধারাভাষ্য বা কমেন্ট্রি শুনে তা অনুকরণ করার চেষ্টা করতাম। ছোটবেলায় আসলে পঞ্চগড়ের মতো জায়গায় ইংরেজি শেখার আলাদা কোনো পরিবেশ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। তাই কোনটা কঠিন বা কোনটা সহজ, তা আলাদা করে বোঝার সুযোগ ছিল না। যা সামনে আসতো, তা-ই শেখার চেষ্টা করতাম।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটা ছোট ঘটনা ঘটেছিল। ক্লাসে ইংরেজিতে প্রেজেন্টেশন দেওয়ার চেষ্টা করতাম। শিক্ষকরা বিষয়টি খুব পছন্দ করতেন। কিন্তু এক-দুজন বন্ধু বা সহপাঠী একটু সমালোচনার সুরেই বলেছিল, ‘তুই অন্যদের মতো করে কেন বলতে যাচ্ছিস? এটা তোর স্বাভাবিক স্টাইল নয়, নিজের জায়গায় ফেরত আয়।’ ওই সময় সাময়িকভাবে একটু বিব্রত লেগেছিল বটে, কিন্তু পরে মনে হয়েছে—গাছে যখন ফল ধরবে, তখন সবাই সেই ফল খেতে চাইবে এবং তা পাড়তে চাইবে। তাই নিজের লক্ষ্য থেকে পিছু হটাইনি।

এশিয়া পোস্ট: আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী ছিলেন না, অথচ এখন কমিউনিকেশন কোচ। শিক্ষাগত বিষয়ের বাইরে এসে এই পেশায় আসার পেছনের গল্পটা কী?

খালিদ মাহমুদ খান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পড়ার বিষয় ছিল ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ। শিক্ষাদান পদ্ধতি কী হবে, কোন উপায়ে শিক্ষার্থীদের পড়ালে তা কার্যকর হবে, এই বিষয়গুলো আইইআর-এর পাঠ্যক্রমের মূল ভিত্তি। শুধু নামমাত্র টিচারদের ট্রেনিং দিলেই যে ভালো শিক্ষা দেওয়া যায় না, সেই কোর বিষয়গুলো আমি আমার বিভাগ থেকেই শিখেছি। আমি এখন সেগুলোই বাস্তবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করছি। এর পাশাপাশি আমি সাধারণ মানুষের মানসিকতা, তাদের পোশাক ও চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পছন্দ করি। আর কমিউনিকেশন একটি অনেক বড় বিষয়। ইংরেজি তো সেই বিশাল পরিমণ্ডলের একটি ছোট অংশ মাত্র।

এশিয়া পোস্ট: আপনার পেজ ‘খালিদ স্পিকস’ (Khalid Speaks) এর শুরুর গল্প জানতে চাই।

খালিদ মাহমুদ খান: এই বিষয়টি আগে কোথাও বলা হয়নি। ২০১৮ সালে ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিল হেরে যাওয়ার পর ২০১৯ সালের দিকে আমি ‘ব্রাজিল ফ্যান ক্লাব বাংলাদেশ’ নামে একটি ফেসবুক পেজ খুলেছিলাম। পরবর্তীতে মনে হলো, ফ্যান ক্লাবের চেয়ে আমি যা জানি তা মানুষকে শেখানোর চেষ্টা করি। তখন হুট করেই মাথায় নাম আসলো ‘খালিদ স্পিকস’। পেজের নাম পরিবর্তন করে দিলাম। শুরুতেই ভাবিনি যে এটি এতটা প্রসার লাভ করবে।

এশিয়া পোস্ট: সোস্যাল মিডিয়ায় শিক্ষামূলক ভিডিও সাধারণত অনেকে এড়িয়ে চলে। আপনি ‘মজার ছলে ইংরেজি শেখানো’র আইডিয়াটি পেলেন কোথায়? প্রথম ভিডিও বানানোর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

খালিদ মাহমুদ খান: আমাদের দেশের চিরাচরিত শিক্ষাদান পদ্ধতিতে কোনো ইন্টারঅ্যাকশন বা ডেমনস্ট্রেশন থাকে না। শিক্ষক ক্লাসে একমুখী লেকচার দিয়ে যান, আর ছাত্ররা শুধু শুনে যায়। কিন্তু শেখানোর আসল উপায় হলো দ্বিমুখী যোগাযোগ বা টু-ওয়ে কমিউনিকেশন। তাই আমার মনে হয়েছে, যত বেশি ইন্টারঅ্যাক্টিভ করা যাবে, মানুষকে তত বেশি যুক্ত করা সম্ভব হবে। সে কারণেই পোশাকে বৈচিত্র্য আনা, নিত্যদিনের কথাবার্তায় রুমি, করিম, অ্যাডলফ খান কিংবা স্যান্ডেল সাহার মতো মজাদার চরিত্রের অবতারণা করা। যাতে মানুষ বাস্তব জীবনের সঙ্গে মেলাতে পারে এবং অনুধাবন করে যে এভাবেও আনন্দ নিয়ে শেখা সম্ভব।

প্রথম ভিডিওর কথা বললে, তখন আমি নববিবাহিত। আমার স্ত্রী ভিডিওটি শুট করে দিয়েছিল। খুবই সোবার ও প্রাতিষ্ঠানিক একটি ভিডিও ছিল: ‘আসসালামু আলাইকুম, আজ আমরা পাঁচটি শব্দের ভুল উচ্চারণ শিখবো...’। এভাবেই শুরু হয়েছিল। এরপর আস্তে আস্তে পথ তৈরি হয়েছে, যাতে মানুষ মজা পেয়ে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে। কারণ, আনন্দময় পরিবেশই হলো প্রকৃত শিক্ষার উপযুক্ত মাধ্যম।

এশিয়া পোস্ট: আপনার তৈরি কোন কনটেন্ট প্রথম ভাইরাল হয়েছিল।

খালিদ মাহমুদ খান: প্রথম দিকে বেশকিছু কনটেন্ট সাড়া ফেলেছিল। তবে ব্যাপক জনপ্রিয়তার কথা বললে, ট্রেন লাইনে রাতে বসে করা একটি ভিডিওর কথা বলব। সেখানে বলেছিলাম, ‘আজকে থেকে থ্যাঙ্ক ইউ না বলে এই শব্দগুলো বলুন, আপনার ইংরেজি নেক্সট লেভেলে চলে যাবে।’ সব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে ভিডিওটি প্রায় দুই কোটির মতো ভিউ পেয়েছিল। এর পর থেকেই মানুষ আমাকে ব্যাপকভাবে চিনতে শুরু করে।

এশিয়া পোস্ট: অনেকেই ইংরেজিতে বলতে পারেন, কিন্তু ক্যামেরার সামনে এলে বা হঠাৎ বলতে গিয়ে থমকে যান। এর মূল সমস্যাটা কোথায়?

খালিদ মাহমুদ খান: নতুন কোনো কিছু করতে গেলে যদি ভয় বা শঙ্কা থাকে, তখন মানুষের মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘রেস্কিউ মোডে’ চলে যায়। বিষয়টি কমফোর্ট জোনের বাইরে হওয়ায় ব্রেন উৎসাহ দেয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজের ভয়। একটা ওয়ার্কশপে দেখেছিলাম, একটি বাচ্চা সুন্দর করে ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করছে; ছোট একটা গ্রামারের ভুল হওয়ায় শিক্ষক সঙ্গে সঙ্গে তা ধরিয়ে দিলেন এবং বাচ্চাটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে থেমে গেল। আমাদের সমাজে একবার আটকে দেওয়া হলে মানুষ সারাজীবনের জন্য থমকে যায়। এরপর চেতনার দোহাই দিয়ে বলা হয়, ‘বাংলাই ভালোমতো বলতে পারো না, আবার ইংরেজি বলছো কেন!’

আমি সবসময় বলি, বর্তমানে দুনিয়া যেখানে গেছে, তাতে ইংরেজি বলতে না পারলে পড়ালেখা ছেড়ে দেওয়াই ভালো। চেতনাকেন্দ্রিক চিন্তাকে পাশে রেখে যারা উৎসাহ দেয় না, তাদের থেকে দূরে থাকুন। ইংরেজি বলতে হলে কিছুটা ‘নির্লজ্জ’ হতে হয়। ভুল হবে, মানুষ কথা বলবে, এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: আমাদের দেশে ইংরেজি চর্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুলগুলো কোথায় হয়?

খালিদ মাহমুদ খান: প্রথম ভুল হলো, আমরা অনেক দেরিতে ইংরেজি বলা শুরু করি, যখন একদম দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। দ্বিতীয়ত, আমরা অতিরিক্ত গ্রামার ও বই মুখস্ত করার ওপর নির্ভর করি। একটা ১০-১২ মাসের শিশু কার্টুন দেখতে দেখতে যখন বলে ‘আই এম ভেরি হ্যাপি’, সে কি তখন সাবজেক্ট, অক্সিলারি ভার্ব বা জটিল গ্রামারের নিয়ম জেনে বলে? সে শুধু শুনে শুনে বলে ফেলে। পরবর্তীতে সে নিজেই গ্রামার আবিষ্কার করতে পারে। কিন্তু আমরা পিসি দাসের বই বা জটিল গ্রামারের নিয়ম নিয়ে পড়ে থাকি। বই তো কথা বলতে পারে না! ইংরেজি বলতে হলে বইয়ের খোসা থেকে বের হয়ে বলা শুরু করতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: ইংরেজি উচ্চারণের ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা হয় এবং উচ্চারণ উন্নত করার উপায় কী?

খালিদ মাহমুদ খান: আমাদের পাঠ্যবইগুলোতে ফোনেটিক্স যুক্ত নেই। বইয়ে লেখা থাকে ‘পটাশিয়াম’, ‘ক্যালসিয়াম’ কিংবা ‘এশিয়া’। এটিই সঠিক উচ্চারণ থেকে দূরে ঠেলে দেয়। আন্তর্জাতিক শুদ্ধ উচ্চারণ অনুযায়ী লেখা উচিত পোট্যাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম কিংবা এশিয়া পোস্ট। বাংলায় এগুলো সঠিক উচ্চারণে লেখা হলে মানুষ উৎসাহিত হতো।

এশিয়া পোস্ট: অনেকেই ভেবে থাকেন ইংরেজি বলতে গেলে সঠিক এক্সেন্ট বা বিদেশি টান থাকা জরুরি। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

খালিদ মাহমুদ খান: এক্সেন্ট কোনো জরুরি বিষয় নয়। ভারতের দিকে তাকালেই এটি স্পষ্ট হয়। মেটা, গুগল কিংবা আমাজনের মতো বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভারতীয় বা আফ্রিকানদের বিপুল উপস্থিতি রয়েছে। ওয়ার্ল্ডের সেরা সিইও তারা তৈরি করছে। তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক টানে যখন তারা কথা বলে, তাদের উচ্চারণ কিন্তু একদম ব্রিটিশ বা আমেরিকানদের মতো নয়। তবুও তারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, কারণ তাদের কাছে মূল বিষয় হলো স্পষ্ট কমিউনিকেশন ও ফ্লুয়েন্সি। আপনি সিলেট বা যে কোনো আঞ্চলিক টানেই বলেন না কেন, মূল কথা অন্যকে বোঝাতে পারাই হলো আসল। এক্সেন্ট কোনো বিষয়ই না, আগে বলা শুরু করাটাই আসল।

এশিয়া পোস্ট: কেউ যদি ইংরেজি চর্চা করার সময় ভুল ধরে বা মক করে, তখন সেটিকে কীভাবে সামলানো উচিত?

খালিদ মাহমুদ খান: সমাজে এমন কিছু অতিরিক্ত পণ্ডিত বা মাথামোটা মানুষ থাকে, যারা অন্যের ছোটখাটো ভুল ধরিয়ে দিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য নিজেকে মহৎ প্রমাণ করতে চায়। ভুল হওয়া খুব স্বাভাবিক। আজ যদি ১০টা ভুল আর ২টি সঠিক বাক্য বলেন, চর্চা চালিয়ে গেলে কিছুদিন পর ১০টি সঠিক হবে আর ২টি ভুল হবে। সেই দিনটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। মানুষের কথায় কান দেওয়া যাবে না। তিন বছর পর যখন আপনি অনর্গল ইংরেজি বলবেন, ভালো আয় করবেন, ক্যারিয়ারে উন্নতি হবে, তখন এই মক করা মানুষগুলোই আপনাকে এসে টেক্সট করবে।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে অসংখ্য কোচিং সেন্টার, কোর্স ও কনটেন্ট থাকা সত্ত্বেও মানুষ সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারে না কেন?

খালিদ মাহমুদ খান: মূল সমস্যা হলো মাইন্ডসেটের অভাব এবং একটি জায়গায় লেগে না থাকা। সাবলীল ইংরেজি বলতে হলে ‘3M’ ফর্মুলা মেনে চলতে হবে—

১. Mindset (মাইন্ডসেট): খাবার খাওয়া বা বাথরুমে যাওয়ার মতোই ইংরেজি শেখাকে দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য মনে করতে হবে। শিখতেই হবে—এই দৃঢ় মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

২. Mirror (আয়না): প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনুশীলন করতে হবে। আয়নার ভেতরের নিজেকে অডিয়েন্স কল্পনা করে চোখের দিকে তাকিয়ে, হাতের ভঙ্গি বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ঠিক করে রিহার্সেল করতে হবে।

৩. Microphone (মাইক্রোফোন): সবার কাছেই স্মার্টফোন আছে। ফোনের ওয়ায়েস রেকর্ডার অন করে প্রতিদিন এলোমেলোভাবে যা মনে আসে ইংরেজিতে রেকর্ড করতে হবে। ভুল হলেও বলতে হবে। ৭ দিন বা ১৫ দিন পর সেই রেকর্ড শুনলে নিজের পারফরম্যান্সের উন্নতি স্পষ্ট বোঝা যাবে। এতে অন্য কোনো দামি কোর্সেরই প্রয়োজন পড়বে না।

এশিয়া পোস্ট: আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে আপনি কেন ‘স্ক্যাম’ বলছেন এবং এখানে কী ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার?

খালিদ মাহমুদ খান: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবমুখী নয় বলেই এটিকে অনেক জায়গায় স্ক্যাম বলে থাকি। কারণ এখানে শুধু খাতা-কলমে টেন্স, পার্টস অব স্পিচ বা প্যারালালেজম মুখস্ত করানো হয়। কিন্তু বই তো আর কথা বলতে পারে না! আমার প্রস্তাব হলো, ইংরেজি প্রতিটি পরীক্ষায় অন্তত ৫০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ নম্বর ওরাল টেস্ট বা স্পোকেন ভাইভার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। ক্লাস থ্রি-ফোরের শিক্ষার্থীদের জন্য একটা নির্দিষ্ট বেঞ্চমার্ক সেট করা উচিত যেন তারা ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। এ ছাড়া ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগের সময় নিশ্চিত করতে হবে যে তারা নিজেরা ক্লাসে সাবলীলভাবে ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। এমনকি পরীক্ষা পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য তৈরি করতে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের মতো অন্যান্য বিষয়ের প্রশ্নপত্রও ইংরেজিতে রূপান্তর করার চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।

এশিয়া পোস্ট: ইংরেজি শিখতে চাওয়া একজন নতুন মানুষের প্রথম এক মাসের পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত? প্রতিদিন কতগুলো Vocabulary পড়া দরকার?

খালিদ মাহমুদ খান: এক মাসের দীর্ঘ কমিটমেন্ট না নিয়ে ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। প্রথমে ৩ দিনের একটি গাইডলাইন তৈরি করুন, প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০ মিনিট ভুলভাল হলেও ইংরেজিতে বলবেন। ৩ দিন সফল হলে ৭ দিন, তারপর ১৫ দিনের টার্গেট নিন। আর ভোকাবুলারির ক্ষেত্রে আলাদা করে কঠিন শব্দ মুখস্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা চাকরির পরীক্ষার জন্য যেসব কঠিন শব্দ মুখস্ত করি, তা সাধারণ কথাবার্তায় কখনো ব্যবহার হয় না। প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে যেসব সাধারণ শব্দ থাকে, তার ৬০ শতাংশ জানা থাকলেই সাবলীলভাবে কথা বলা সম্ভব। বাস্তব পরিস্থিতিতে আটকে গেলে (যেমন—‘সহ্য করা’ এর জন্য Tolerate) তখন সেই শব্দটি শিখে নেওয়া ভালো। আসল বাধা ভোকাবুলারি নয়, আসল বাধা হলো ভীতি ও কনফিডেন্সের অভাব।

এশিয়া পোস্ট: বাংলা কথার মাঝে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করাকে অনেকে স্মার্টনেস মনে করেন। এটি কি প্রয়োজনীয়?

খালিদ মাহমুদ খান: জাতীয় সংসদ বা জাতীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে যেখানে পুরো জাতি বার্তা পায়, সেখানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইংরেজি-বাংলার মিশ্রণ বা বিভ্রান্তিকর ভাষা ব্যবহার করা একটি ভুল অ্যাপ্রোচ। লোক দেখানো উদ্দেশ্যে এটি করা অনুচিত। তবে যারা নতুন ইংরেজি শিখছেন, তারা চর্চার খাতিরে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় একটি বাক্যে দু-একটি ইংরেজি শব্দ (যেমন— Evidence, Tolerate) ব্যবহার করতে পারেন। এতে শব্দটি চর্চায় থাকে এবং শেখা সহজ হয়।

এশিয়া পোস্ট: সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনীবিদ বা আলোচিত বিষয় নিয়ে মজা করে ইংরেজি শেখানোর সময় কি রাজনৈতিক 'ট্যাগিং'-এর ভয় কাজ করে না?

খালিদ মাহমুদ খান: সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম সাম্প্রতিক জনপ্রিয় বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়। আমি সেই ট্রেন্ডিং বিষয়গুলোকে বেছে নিয়ে ইংরেজি শিক্ষা যুক্ত করি, যাতে মানুষ আনন্দের সঙ্গে শেখে। আমি পুরোপুরি অরাজনৈতিক একজন মানুষ। এক জামায়াত নেতার বক্তব্য নিয়ে কনটেন্ট করায় জামায়াতপন্থিরা আমাকে বিএনপি ট্যাগ দেয়, আবার বিএনপিপন্থিরা আমাকে জামায়াত ট্যাগ দেয়! কিন্তু আমি স্পষ্ট করতে চাই, আমি কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করি না। ভালোকে ভালো এবং খারাপকে খারাপ বলি। কেবল মানুষকে শেখানোর ও আনন্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই কনটেন্ট বানাই।

এশিয়া পোস্ট: পুকুরে সাঁতার কাটতে কাটতে, লুঙ্গি-গামছা পরে কিংবা ডালঘুটনি হাতে ভিডিও বানানোর উদ্দেশ্য কী? এগুলো নিয়ে ট্রোল করা হলে কীভাবে সামলান?

খালিদ মাহমুদ খান: মানুষ ফেসবুকে ঢোকে মূলত বিনোদন ও মোটিভেশনের জন্য। সাধারণ গ্রামের মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ কিংবা মা-চাচিরা যেন নিজেকে আমার কনটেন্টের সঙ্গে মেলাতে পারেন, তাই একদম রুট লেভেলের গেটআপ ব্যবহার করি। সাঁতার কাটতে কাটতে জেরা্যান্ড ও পার্টিসিপল (যেমন—Swimming is a good exercise) শেখালে তা মানুষের মাথায় সহজে গেঁথে যায়। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই কনসেপ্টগুলো সমাজকে দেওয়ার চেষ্টা করি। কিছু সুশীল বা নেতিবাচক মানুষ ট্রোল করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভালোবাসার কাছে তা নগণ্য। তাই নেতিবাচক বিষয়গুলো পুরোপুরি এড়িয়ে চলি।

এশিয়া পোস্ট: এআইয়ের যুগে আপনারা যারা কমিউনিকেশন কোচ, তাদের ভবিষ্যৎ কী?

খালিদ মাহমুদ খান: মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি অনুভূতির যোগাযোগ (Human Connection) বা ইমোশন কখনো এআই দিয়ে প্রতিস্থাপিত হতে পারে না। একদম শিক্ষানবিশদের জন্য এআই এককভাবে কাজ করতে পারবে না। তাই এআই এর সহায়ক হিসেবে থাকবে, তবে হিউম্যান কানেকশনের গুরুত্ব সবসময়ই থেকে যাবে।

এশিয়া পোস্ট: কাল থেকে যারা ইংরেজি শুরু করতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

খালিদ মাহমুদ খান: ‘কাল থেকে শুরু করব’ এই চিন্তাটাই ভুল। কাল থেকে শুরু করতে গেলে আর কোনদিন হবে না। যা শুরু করার, আজ এবং এখনই করতে হবে। এখনই একটি বাক্য ইংরেজিতে বলে ফেলুন! ‘3M’ ফর্মুলা মেনে চর্চা শুরু করুন, নির্লজ্জ হয়ে মুখ খুলুন এবং মানুষের কথায় কান দেওয়া বন্ধ করুন।

এশিয়া পোস্ট: তরুণদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে কী কী বাধা রয়েছে? তাদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?

খালিদ মাহমুদ খান: আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় ট্যাবু হলো ‘আগে পড়ালেখা শেষ করো, তারপর অন্য কিছু’। অথচ উন্নত বিশ্বে ১৫-১৬ বছর বয়স থেকেই ছেলেমেয়েরা পার্টটাইম কাজ করে স্বাবলম্বী হতে শেখে। আমাদের শিক্ষার্থীদের পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই ছোটদের টিউশন দেওয়া, খেলাধুলা করা বা ছোট ছোট উদ্যোগ নিয়ে নিজের খরচ চালানো শেখানো উচিত। অল্প বয়স থেকে আয় করার সুযোগ পেলে তাদের মধ্যে রিস্ক নেওয়ার মানসিকতা ও উদ্যোক্তা হওয়ার গুণাবলী তৈরি হয়।

অন্য আরেকটি বড় ট্যাবু হলো ‘শিক্ষক বা মুরুব্বিদের চোখে চোখ রেখে কথা বলা যাবে না’। অথচ আই কনট্যাক্ট (Eye Contact) যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই কুসংস্কারগুলো থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তরুণদের প্রতি আমার উপদেশ, অল্প বয়স থেকেই শুধু পড়ালেখায় সীমাবদ্ধ না থেকে ইংরেজি, আন্তর্জাতিক ভাষা বা প্রযুক্তিগত স্কিল অর্জন করুন এবং স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করুন। তবেই আমাদের সমাজ ও ভবিষ্যৎ আমূল বদলে যাবে।

এশিয়া পোস্ট: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।

খালিদ মাহমুদ খান: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।