‘মানবাধিকার ও গুম কমিশন নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ প্রত্যাশিত হয়নি’

আসিফ বিন আলী। তিনি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী কলাম লেখেন নিয়মিত। সম্প্রতি এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। কথা বলেছেন বাংলাদেশ ও ভূরাজনীতি ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে। সঞ্চালনা করেছেন এশিয়া পোস্টের কনসালন্টেন্ট শফিকুল ইসলাম সবুজ।
এশিয়া পোস্ট: আপনি স্বল্প সময়ের সফরে বাংলাদেশে এসেছেন। তবে প্রবাসে থাকলেও বাংলাদেশ নিয়ে আপনার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ আমরা বিভিন্ন লেখনি ও বক্তব্যে দেখি। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পার হয়েছে। এই ছয় মাসকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আসিফ বিন আলী: আমার মনে হয় এই ছয় মাস ছিল অনেকগুলো চড়াই-উতরাইয়ের সমাহার। অনেক ক্ষেত্রে যেমন আশার সঞ্চার হয়েছে, আবার কিছু কিছু জায়গায় খানিকটা হতাশাও তৈরি হয়েছে। আমি ইতিবাচক দিকগুলো দিয়ে শুরু করি। ৫ আগস্টের পর গোটা দেশে যে বিশাল বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তার একটি বড় কারণ ছিল রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে পড়া এবং রাষ্ট্রের ওপর থেকে মানুষের আস্থা প্রায় চলে যাওয়া। সরকার উপস্থিত থাকলেও তখন কার্যকর ছিল না। নির্বাচনের মাধ্যমে এই সরকার গঠন করার ফলে জনগণের মধ্যে খানিকটা ভরসা ফিরে এসেছে। রাষ্ট্র এখন শুধু উপস্থিতই নয়, অনেক ক্ষেত্রে সক্রিয়ও, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ তৈরি করছে। মব জাস্টিস বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির খবর থাকলেও মনে হচ্ছে রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণ কিছুটা ফিরে পেয়েছে। এটি খুবই আশাব্যঞ্জক।
অন্যদিকে হতাশার জায়গাগুলো হচ্ছে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়া। যেমন—বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা, মানবাধিকার কমিশনকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা এবং গুমের ঘটনার বিচার ও গুম রোধে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইন প্রণয়ন করা। এই জায়গাগুলোতে সরকারের পদক্ষেপ প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। স্বাধীন বিচার বিভাগের যে অগ্রগতি আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে হয়েছিল, তা অনেকটা পিছিয়ে গেছে। তবে সামগ্রিকভাবে বলব, ছয় মাস খুব অল্প সময়। কোনো সরকারকে বিচার করার জন্য অন্তত এক বছর সময় দেওয়া উচিত। আমাদের দেখতে হবে তারা তাদের গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট এবং প্রতিশ্রুতিগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারে। তারপর আমরা আরও চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারব।
এশিয়া পোস্ট: দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ঘটছে এবং তা গণমাধ্যমের বড় শিরোনাম হচ্ছে। একজন বিশ্লেষক হিসেবে বর্তমান সময়ে এই সংঘাতকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আসিফ বিন আলী: এই সহিংসতাগুলোকে আমি চিন্তার বাইরের কিছু মনে করছি না। আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতে সহিংসতা সবসময়ই একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেখানে যে গোষ্ঠী শক্তিশালী, তারা তাদের বিরোধী পক্ষকে দুর্বল করতে বা নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠিত করতে সহিংসতার আশ্রয় নেয়। আমি দুটি উদাহরণ দিতে পারি। এনসিপির পদযাত্রায় স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মী হামলা করেছে, যেখানে কয়েকজন আহত হয়েছেন। আমি মনে করি না এটি বিএনপি কেন্দ্র থেকে নির্দেশিত কোনো হামলা, তবে স্থানীয় পর্যায়ের এই সহিংসতায় অংশগ্রহণ অনস্বীকার্য। এখানে ভিকটিম হচ্ছে এনসিপি। অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির মতো নিরাপদ জায়গায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে শিবির-সমর্থিত ডাকসু প্যানেলের প্রার্থী ও তার সহযোগীরা প্রকাশ্যে পিটিয়েছে। এমনকি ভুক্তভোগীকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে বের করেও পেটানো হয়েছে। ভিডিওতে অপরাধীদের স্পষ্ট দেখা গেলেও দেখা গেল ভিকটিমকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক করা হয়েছে এবং অভিযুক্তরা সংবাদ সম্মেলন করে সাংবাদিকদের হুমকি দিচ্ছে। এর মানে দাঁড়ায়, যে যেখানে বেশি ক্ষমতাবান সে তার শক্তি দিয়ে অন্যের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিতে চায়।
আমরা যদি মনে করি জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই সব পাল্টে যাবে, তবে তা ভুল হবে। পরিবর্তন তখনই সম্ভব যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা মামলা করতে গেলে পুলিশ তা নেয়নি। পরে আদালতের নির্দেশনায় পিবিআই তদন্ত শুরু করেছে। প্রশ্ন হলো—পুলিশ কেন মামলা নিল না? তারা কি বিরোধী দলের হুমকির মুখে ছিল? এনসিপির ওপর হামলায় যদি মামলা হতে পারে, তবে রাজশাহীতে কেন হবে না? রাজশাহী কি রাষ্ট্রের বাইরের কোনো অংশ? এসব ঘটনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর, বিশেষ করে পুলিশ বা বিচার বিভাগের নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।
এশিয়া পোস্ট: প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ পর্যায় থেকে যে ধরনের বক্তব্য আসছে, তাতে কি সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে, নাকি ৫ আগস্টের আগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই আবার ফিরে আসছে বলে মনে হচ্ছে?
আসিফ বিন আলী: রাজনীতি পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা পরিমাপ করা বেশ কঠিন। তবে ৫ আগস্টের পর কিছু পরিবর্তন অবশ্যই এসেছে। আগে থেকে কথা বলার সুযোগ বা সমালোচনা করার পরিসর বেড়েছে। তবে এই সুযোগ কি সবার জন্য সমানভাবে তৈরি হয়েছে? নাগরিক হিসেবে আমরা যখন রাষ্ট্রের কথা বলি, তখন সমালোচনা বা মতামত দেওয়ার অধিকার সবার থাকা উচিত—সেটি সরকারি দল হোক, বিরোধী দল হোক বা জুলাইয়ের যারা বিরোধী পক্ষ ছিল তাদেরও। এই মৌলিক ভিত্তিটুকুর ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। একটি বড় পরিবর্তন হলো, বিগত তিনটি নির্বাচনের (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) তুলনায় এবারের নির্বাচনটি অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়েছে। আমি শতভাগ নিখুঁত বলব না, তবে এটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি কার্যকর সংসদ উপহার দিয়েছে।
জনপ্রতিনিধিরা এখন ভোটারদের কাছে যেতে এবং তাদের কথা শুনতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ, তারা জানেন পরবর্তী নির্বাচনে আবার জনগণের কাছেই যেতে হবে। আগে তো এমপিরা মনে করতেন পুলিশ বা আমলাদের কাছে গেলেই হয়, জনগণের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এই জবাবদিহিতার জায়গাটি ইতিবাচক।
এশিয়া পোস্ট: ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? বিশেষ করে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তারেক রহমানের বিষয়ে ভারতের কোনো মন্তব্য না করাকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
আসিফ বিন আলী: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন একটি জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় পক্ষ থেকেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা ছিল। তবে নির্বাচিত সরকার আসার পর ভারতের পক্ষ থেকে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত বা ‘গুড জেসচার’ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বিজিবিপ্রধান এবং ডিজিএফআই প্রধানের ভারত সফর এর প্রমাণ। এমনকি ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং পার্লামেন্টে শেখ হাসিনার বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করা হয়েছে। সম্পর্কের এই স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগবে। বাংলাদেশের নিজস্ব কিছু দাবি আছে, যেমন পানিবণ্টন ও সীমান্ত নিরাপত্তা। অন্যদিকে ভারতেরও কিছু নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে, বিশেষ করে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা বা অনুপ্রবেশ ইস্যু। দুই দেশ প্রতিবেশী এবং তাদের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, তাই আলোচনার মাধ্যমেই স্বার্থ রক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সফররত মার্কিন দূতের একটি বৈঠক হয়েছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে অনেকে দাবি করেছিলেন যে, মার্কিন প্রভাবে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক কি নতুন কোনো বার্তা দিচ্ছে?
আসিফ বিন আলী: আমি ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী নই, বরং ফ্যাক্টস নিয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করি। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত একটি আঞ্চলিক শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি বৈশ্বিক শক্তি। বিগত অন্তত এক যুগে ভারত বাংলাদেশে তার আঞ্চলিক প্রভাব প্রবলভাবে প্রয়োগ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। ৫ আগস্টের পর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেছে। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত ও আমেরিকা এখন কাছাকাছি অবস্থানে আসার চেষ্টা করছে। তবে এর মানে এই নয় যে আওয়ামী লীগ প্রশ্নে তারা একই অবস্থানে। ভারতীয় হাইকমিশনার এবং মার্কিন প্রতিনিধির বৈঠকটি একটি সৌজন্য সাক্ষাৎও হতে পারে, যেহেতু তারা উভয়েই রাজনৈতিক নিয়োগ এবং এই অঞ্চলে নিজ নিজ দেশের স্বার্থ দেখাশোনা করেন। আবার এটি একটি ‘মেসেজিং’ও হতে পারে যে দুই দেশ একে অপরের গুরুত্ব স্বীকার করছে। সামাজিকমাধ্যমে চলা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে কান দেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশ সম্প্রতি সৌদি নেতৃত্বাধীন লোহিত সাগরের নিরাপত্তা জোটে যুক্ত হয়েছে। এই জোটে অংশগ্রহণের সুবিধা ও ঝুঁকি সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আসিফ বিন আলী: লোহিত সাগরের বাব-আল-মানদেব চেকপয়েন্টটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পোশাকশিল্প রপ্তানি এবং জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ এই পথে হয়। ইয়েমেনের বিদ্রোহী বা দস্যুদের কারণে এখানে নৌ-নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আমাদের অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। সৌদি আরব যে জোটটি করেছে সেটি একটি ‘ডিফেন্সিভ’ বা আত্মরক্ষামূলক জোট। এতে যুক্ত হওয়া আমাদের জন্য লজিস্টিক্যাল এবং নিরাপত্তার দিক থেকে উপকারী হতে পারে। তবে এর কিছু ঝুঁকিও আছে। মধ্যপ্রাচ্যে এখন আমেরিকা এবং ইরানপন্থি দুটি ব্লক যুদ্ধ করছে। এই আত্মরক্ষামূলক জোট কোনোভাবে ‘অফেন্সিভ’ হয়ে উঠবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ ছাড়া আমাদের নৌবাহিনীর সক্ষমতা মূলত চীনা প্রযুক্তিনির্ভর, আর এই জোটটি আমেরিকান সিস্টেমনির্ভর। এখানে চীনাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা-ও দেখার বিষয়। সব থেকে বড় কথা, এত বড় একটি সিদ্ধান্ত সংসদে আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া উচিত ছিল। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে সংসদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত।
এশিয়া পোস্ট: তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফর করেছেন মালয়েশিয়া ও চীনে। এই যে চীন, ভারত ও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য, এটি ভবিষ্যতে কোন পথে যাবে?
আসিফ বিন আলী: বাংলাদেশের উচিত হবে কারও দিকে এককভাবে ঝুঁকে না পড়ে নিজের স্বার্থ দেখা। আমেরিকার সঙ্গে আমাদের রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রার সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে আমদানির ওপর নির্ভরতা, রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ এবং ভারতের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সীমান্ত শান্তি জড়িত। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের এক ধরনের সক্ষমতা দেয়। যেমন—বঙ্গোপসাগরে এক্সেস। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত ‘প্রিডিক্টেবল’ বা আন্দাজযোগ্য। বড় শক্তিগুলো যেন আমাদের অবস্থান নিয়ে দ্বিধায় না থাকে। আমাদের মূল অগ্রাধিকার হতে হবে বাণিজ্য। কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা বা ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ে পক্ষ না নিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করাই হবে বুদ্ধিমত্তার কাজ।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের গত ১৬-১৭ বছরের রাজনৈতিক সহিংসতার যে ইতিহাস এবং বর্তমানে ভিকটিম-ভিক্টিমাইজার পরিবর্তনের যে চিত্র, তা থেকে উত্তরণের পথ কী?
আসিফ বিন আলী: ২০১৩-১৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগ যখন তার স্বৈরাচারী কাঠামো তৈরি শুরু করে, তখন থেকেই ভায়োলেন্সের একটি চক্র শুরু হয়। তখন বিএনপি, জামায়াত ও বামপন্থিরা ভুক্তভোগী ছিল। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই কাঠামোর পতন হয়েছে, কিন্তু আমরা দেখছি একটি নতুন ভায়োলেন্স সাইকেল তৈরি হয়েছে। এখন আওয়ামী লীগ ভুক্তভোগীর জায়গায়। এই চক্র চলতে থাকলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। ১৯৪০ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডে দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, গণহত্যা ও দেশভাগের কারণে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এত ত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে রাষ্ট্রটি পেয়েছি, তাকে বারবার ভেঙে নতুন করে শুরু করা বোকামি। আমাদের জীবনের অধিকার, ইজ্জতের অধিকার এবং আইনি সুরক্ষায় একমত হতে হবে। অপরাধ যার যতটুকু, শাস্তি ঠিক ততটুকুই হতে হবে। একজনের অপরাধে অন্যকে শাস্তি দেওয়া বা রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। ২০২৪ সালের ত্যাগের মূল্য তখনই থাকবে যখন আমরা আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারব।
এশিয়া পোস্ট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতির ঘটনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আসিফ বিন আলী: আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাংবাদিক, শিক্ষক, সামরিক বাহিনী ও আমলারা অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। যদি কেউ অপরাধ করে থাকেন, তবে তার শাস্তি হওয়া উচিত, কিন্তু অবশ্যই আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকতে হবে। আমি মনে করি, একটি ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল’ গঠন করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তদন্ত হওয়া উচিত ছিল। আমরা সেই পথে না গিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিশোধের দিকে ঝুঁকেছি। এমন অনেক ঘটনা ঘটছে যেখানে প্রতিহিংসামূলক মামলা হচ্ছে। যখন পেশাদারদের বা মত তৈরিকারকদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া হয়, তখন সমাজে অস্থিরতা তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যা হবে, তার প্রভাব সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়বে। প্রফেশনালিজম বা পেশাদারত্ব তখনই বজায় থাকবে, যখন আমরা প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে উঠে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করব।
এশিয়া পোস্ট: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নম্রতা ও ব্যবহার বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। তবে বাজারমূল্য বা অর্থনৈতিক সংকটের যে চাপ সাধারণ মানুষের ওপর আছে, তা মোকাবিলায় এই ইমেজ কতটুকু সহায়ক হবে?
আসিফ বিন আলী: প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে কাটিয়েছেন, সেখানকার সিভিল এথিক্স বা সামাজিক মূল্যবোধ তার আচরণে প্রতিফলিত হওয়া স্বাভাবিক। তার কথাবার্তায় যে হীনম্মন্যতাহীনতা বা হাম্বলনেস দেখা যাচ্ছে, তা একজন আধুনিক লিবারেল প্রধানমন্ত্রীর মতোই। তবে এই ব্যবহারের প্রভাব তৃণমূল পর্যায়ে যাওয়া কঠিন। কারণ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বা সামাজিক কাঠামোতে সেই চর্চা নেই। মন্ত্রিসভায় আমরা এমন ব্যক্তিদেরও দেখেছি যারা নিজ নামে নামকরণ বা পুরোনো অভ্যাসে মগ্ন। এই সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করবে তারেক রহমানের ব্যবহারের ওপর নয়, বরং অর্থনৈতিক সংকট থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়ার ওপর। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই জনগণ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে।
এশিয়া পোস্ট: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
আসিফ বিন আলী: আপনাকেও ধন্যবাদ।




