Advertisement

‘আমলারা আদেশ মানার বদলে কালক্ষেপণের কৌশল নেয়’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘আমলারা আদেশ মানার বদলে কালক্ষেপণের কৌশল নেয়’
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইউএনএসকাপ) প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ‘আলাপন’ অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে তিনি কথা বলেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা এবং আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর

এশিয়া পোস্ট: আপনি চট্টগ্রামে বড় হয়েছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং কর্মজীবনে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ও জাতিসংঘসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে কাজ করেছেন। বর্ণাঢ্য এই কর্মজীবনের কোন সময়টিকে আপনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: আমার জীবনের দুটি সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হলো—অন্তর্বর্তী সরকারে কাজ করার সুযোগ। এটি নিঃসন্দেহে আমার জীবনের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। দ্বিতীয়টি হলো—জাতিসংঘে কাজ করার অভিজ্ঞতা। আমি জাতিসংঘের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও প্রধান পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এই অঞ্চলটি তুরস্ক থেকে শুরু করে পুরো এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং ছোট ছোট দ্বীপরাষ্ট্র নিয়ে বিস্তৃত। আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য আলাদা কমিশন থাকলেও এই বিশাল অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করা ছিল একটি বিরল সুযোগ। শিক্ষকতা আমার নিয়মিত পেশা, কিন্তু এর বাইরে দেশের জন্য কিছু করার এই সুযোগটি আমার কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ১৯৭৮ সালে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর আবার দেশে ফিরে এসে জাতিসংঘে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে দেশের কাজে লাগাতে পারাটা আমার কাছে বড় প্রাপ্তি।

এশিয়া পোস্ট: আপনি যখন প্রথমবার উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে গেলেন, সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা যদি আমাদের বলতেন।

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: আমি প্রথমবার দেশের বাইরে যাই ১৯৭৪ সালে, নিউজিল্যান্ডে। সেটি ছিল একটি বিশেষ উদ্যোগের অংশ। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে শিক্ষা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সে সময় নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ক্যান্টারবেরির শিক্ষার্থীরা তহবিল সংগ্রহ করে আমাদের দুজনকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। তখনকার নিউজিল্যান্ড বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রত্যন্ত এবং ভিন্ন ধরনের ছিল। মোবাইল ফোনও ছিল না। অল্প বয়সে সেখানে গিয়ে আমি প্রচণ্ড গৃহকাতর হয়ে পড়ি। ভাত, মাছ ও ডালসহ আমাদের পরিচিত খাবারের অভাব খুব অনুভব করতাম। দুই-আড়াই মাস পর আর থাকতে পারিনি, দেশে ফিরে আসি। যদিও আমার সঙ্গে যাওয়া বন্ধুটি সেখানে থেকে গিয়েছিল। পরে মাস্টার্স শেষ করে যখন কানাডায় যাই, তখন আমি অনেক বেশি পরিপক্ব ছিলাম। সেখানে কিছু বাঙালি পরিবার ছিলেন, যারা অত্যন্ত সহযোগিতাপরায়ণ ছিলেন। পাশাপাশি তখন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেশ ভালো ছিল।

এশিয়া পোস্ট: আপনি প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় দেশের বাইরে কাটিয়েছেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সুদীর্ঘ এই প্রবাসজীবনে আপনার চোখে বাংলাদেশ কেমন ছিল?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: আমাদের মনে সবসময়ই দেশে ফিরে আসার একটি ইচ্ছা কাজ করত। আমি যখন কানাডায় ছিলাম, তখন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা বা বিভিন্ন দাওয়াতে প্রায়ই আলোচনা হতো, আমরা কোনোদিন দেশে ফিরব কি না। আমি সবসময়ই দেশে ফেরার পক্ষে কথা বলতাম। আমার এক বছরের সিনিয়র সাদিকুল ভাই এখনও কানাডায় আছেন। তিনি আমাকে বলতেন, ‘তুমিই সবার আগে দেশে যাবে।’ শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্য হয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে সেই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখতেন?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: আমরা যখন দেশ ছাড়ি, তখন থেকেই বাংলাদেশকে আমি একটি সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে দেখতাম। একটা উদাহরণ দিই। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি, তখন এই অঞ্চলের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। ১৯৭৪ সালে নিউজিল্যান্ড যাওয়ার পথে আমার প্রথম যাত্রাবিরতি ছিল সিঙ্গাপুরে এবং ফেরার পথে কুয়ালালামপুরে। তখন আমার কাছে সিঙ্গাপুর বা কুয়ালালামপুরের চেয়ে ঢাকাকে অনেক বেশি উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় মনে হয়েছিল। এটি হয়তো দেশপ্রেমের কারণেও হতে পারে।

পরে আমি যখন সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা শুরু করি, তখন সেখানে আমার এক সহকর্মী ছিলেন, যিনি অস্ট্রেলিয়া থেকে পিএইচডি শেষ করে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষক ছিলেন। দেশে ফেরার আগে কিছুদিন সিঙ্গাপুরে কাজ করতে চেয়েছিলেন। তিনিও বলতেন, তার কাছে সিঙ্গাপুরের চেয়ে ঢাকা অনেক বেশি সম্ভাবনাময় মনে হতো। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি। দেশে ফেরার সেই আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের প্রতি ভালোবাসাই আমাদের সবসময় তাড়িত করেছে। সে কারণেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন আমাকে দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানান, আমি তা গ্রহণ করি।

এশিয়া পোস্ট: বিদেশে আপনার জীবন ছিল অত্যন্ত স্থিতিশীল। সেখান থেকে এসে অস্থির সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়া আপনার কাছে কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: না, আমার কাছে এটি খুব একটা চ্যালেঞ্জিং মনে হয়নি। কারণ, প্রবাসে থাকলেও আমি সবসময় বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলাম। আমরা সপরিবারে নিয়মিত দেশে আসতাম। নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগ পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছরই পরিবার নিয়ে দেশে এসেছি। ফলে দেশের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি। সে কারণে এই পরিবর্তন বা দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়াটি আমার জন্য খুব কঠিন ছিল না।

এশিয়া পোস্ট: আপনি রাষ্ট্র কাঠামোর বাইরে থেকে দীর্ঘদিন নীতিনির্ধারণী বিষয় নিয়ে লিখেছেন ও কথা বলেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরাসরি রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে কাজ করছেন। এই দুই অবস্থানের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য দেখছেন?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: অবশ্যই পার্থক্য আছে। তবে রাষ্ট্রের ভেতরে কাজ করাটা আমার জন্য খুব বেশি আশ্চর্যজনক ছিল না। কারণ, জাতিসংঘে কাজ করার সময় বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার ছিল। ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকটের সময় ইন্দোনেশিয়ায় আমাকে জাতিসংঘ থেকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে পাঠানো হয়েছিল। ফলে সংকটকালীন অর্থনীতি পরিচালনার কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা আগে থেকেই ছিল। তবে বাংলাদেশে এসে আমলাতন্ত্রের যে রূপ দেখলাম, তা আমাকে কিছুটা অবাক করেছে। আমলাতন্ত্র স্বাভাবিকভাবেই রক্ষণশীল, কিন্তু এখানে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতিরোধের দেয়ালটা অনেক বেশি শক্তিশালী।

এশিয়া পোস্ট: দায়িত্ব গ্রহণের পর অর্থনীতির কোন বিষয়টি আপনাকে প্রথম ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছি আমাদের অর্থনৈতিক নীতিমালায় সমন্বয়ের অভাব দেখে। যে কোনো সফল অর্থনীতির জন্য তিনটি বিষয় জরুরি: সমন্বয়, সংহতি এবং একীকরণ। কিন্তু আমাদের এখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব রয়েছে। যেমন—একনেকের সভা হয় একেবারে শেষ পর্যায়ে। সেখানে যখন কোনো প্রকল্প যায়, সেটি প্রায় চূড়ান্ত অবস্থাতেই থাকে। দুয়েকজন প্রশ্ন তুললেও শেষ পর্যন্ত তা অনুমোদন পেয়ে যায়।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও এই সমস্যার প্রতিফলন দেখা যায়। এক দিন একটি রাস্তা সংস্কার করা হয়, পরদিন অন্য একটি সংস্থা এসে সেটি খুঁড়ে ফেলে। এই সমন্বয়হীনতা বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করছে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের নীতিমালাগুলোর মধ্যে সংহতির অভাব রয়েছে। প্রতিটি নীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় প্রভাব থাকে। কিন্তু সেগুলো বিশ্লেষণ ও সমন্বিতভাবে মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। অথচ একটি খাতের উন্নয়ন অন্য খাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন শিক্ষা খাতের অগ্রগতিতেও ভূমিকা রাখে।

তৃতীয় সমস্যা হলো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অভাব। এই শূন্যতার সুযোগে আমাদের অনেক জাতীয় নীতিই বিদেশি সংস্থাগুলো প্রভাবিত করছে। জাতীয় লজিস্টিক নীতি তৈরি করেছে এডিবি, আর জ্বালানি নিরাপত্তা নীতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে জাইকা। তারা দেশীয় পরামর্শক ব্যবহার করলেও সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকে।

এশিয়া পোস্ট: আপনি যখন দায়িত্ব নিলেন, তখন কী এমন কোনো পরিবর্তন আনতে পেরেছেন, যা আপনি বাইরে থেকে ভাবতেন সুযোগ পেলে করবেন?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: সত্যি বলতে, খুব বেশি পরিবর্তন আনতে পারিনি। এখানেই আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইকোনমিক রিলেশনস ডিভিশন আছে। একসময় এর নাম ছিল এক্সটারনাল রিসোর্স ডিভিশন। স্বাধীনতার পর সম্পদের ঘাটতির কারণে আমরা বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিলাম, তখন সেই কাঠামো প্রাসঙ্গিক ছিল। এখন নাম পরিবর্তন হলেও কাজের ধরন ও মানসিকতা অনেকাংশে একই রয়ে গেছে। পরিবর্তন আনতে না পারার অন্যতম কারণ হলো আমাদের মেয়াদের স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা। আমলারা জানেন, আমরা অল্প সময়ের জন্য এসেছি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা নির্দেশনা বাস্তবায়নের বদলে কালক্ষেপণের কৌশল নেয়। ‘দেখছি’ কিংবা ‘কমিটি করে দিচ্ছি’ বলতে বলতেই সময় চলে যায়।

এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন পরিচয়ের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এগোতে দ্বিধা বোধ করেন। তারা ভাবেন, ১৫ বা ২০ বছরের বিনিয়োগ পরিকল্পনা করলে এই সরকারের স্থায়িত্ব কত দিন থাকবে। সিরিয়ার বিপ্লবের পর সেখানে প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের জন্য পাঁচ বছরের সময় চাওয়া হয়েছিল। আমাদের দেশেও বহু প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়েছে বা কার্যকারিতা হারিয়েছে। সেগুলো পুনর্গঠন না করেই নির্বাচনের দাবি উঠছে।

অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা দায়িত্ব ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। বহু প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল অবস্থায় ছিল। এমন বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন না করে কেবল নির্বাচনকে সমাধান হিসেবে দেখা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এশিয়া পোস্ট: একটি কথা প্রচলিত আছে যে, ভুল বা বিকৃত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের আবেদন করেছিল। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: আমি বিষয়টি ঠিক এভাবে বলিনি। আমি বলেছি, তথ্যের সত্যতা যাচাই করে যদি সংশোধনও করা হয়, তবুও বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের যোগ্যতা রাখে। জাতিসংঘ মূলত তিনটি সূচকের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেয়: মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক। পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই কাজ করে। সদস্য রাষ্ট্রের সরবরাহ করা তথ্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার কোনো এখতিয়ার জাতিসংঘের নেই। তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কারও সংশয় থাকতে পারে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাজে সরকারিভাবে সরবরাহ করা তথ্যই ব্যবহার করতে হয়। আইএমএফ বা এডিবির তথ্যও মূলত সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর কাছ থেকেই আসে।

এশিয়া পোস্ট: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভিয়েতনাম বা দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়েও বেশি ছিল। অথচ এখন তারা অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ল কেন?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: এর প্রধান কারণ আমাদের ‘এইড মেন্টালিটি’ বা সাহায্যনির্ভর মানসিকতা। এলডিসিভুক্ত হওয়ার পর থেকেই আমাদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, বিদেশি সহায়তা ছাড়া চলতে পারব না। অথচ দক্ষিণ কোরিয়া একসময় পুরো আফ্রিকা মহাদেশের সমপরিমাণ মার্কিন সহায়তা পেয়েছিল। কিন্তু তারা কখনও নিজেদের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়নি। তারা বিদেশি অর্থ নিয়েছে, কিন্তু কাজ করেছে নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী। আমাদের ক্ষেত্রে জিডিপির মাত্র ১ শতাংশের সমপরিমাণ সহায়তা এলেও আমরা সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারিনি। বিদেশিরা যা বলছে, সেটাই সঠিক—এই মানসিকতা আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের কর আদায় জিডিপির তুলনায় অত্যন্ত কম। এর কারণ কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রধান কারণ হলো ঋণ নেওয়ার সহজ সুযোগ। যখন ঋণ নিয়ে বাজেট পরিচালনা করা যায়, তখন সরকার কর আদায়ের কঠিন পথে হাঁটতে আগ্রহী হয় না। কর আদায়ে কঠোর হতে গেলে জনগণের অসন্তোষের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

দ্বিতীয় বড় কারণ আস্থার সংকট। সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা নেই। মানুষ জানে না তার দেওয়া করের টাকা কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে। অথচ কর হলো নাগরিকত্বের মূল্য। এই আস্থার অভাবের কারণেই মানুষ কর দিতে অনাগ্রহী। একই সঙ্গে দেশ থেকে মেধা ও সম্পদ পাচারও বাড়ছে। উচ্চবিত্তদের মধ্যে বিদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। কর ফাঁকির প্রবণতা শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়, বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই এ ধরনের কাজ করছেন। রাষ্ট্র যখন করের বিনিময়ে কার্যকর জনসেবা নিশ্চিত করতে পারে, তখনই নাগরিকদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা এখনও সেই আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারিনি।

এশিয়া পোস্ট: দেশের বৈদেশিক ঋণের বোঝা বাড়ছে, আবার আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাবও মানতে হচ্ছে। এই ভারসাম্য বজায় রাখা কতটা টেকসই হবে?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: ঋণ নেওয়া নীতিগতভাবে খারাপ কিছু নয়। যে কোনো ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণের প্রয়োজন হয়। সমস্যা হলো ঋণের ব্যবহার নিয়ে। আপনি যদি ঋণ নিয়ে বেতন দেন বা অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করেন, তাহলে তা বিপজ্জনক। আমাদের দেশে রপ্তানিমুখী শিল্পে বেতন দেওয়ার জন্যও ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া হয়েছে, যা মৌলিক অর্থনৈতিক নীতির পরিপন্থি। উৎপাদনশীলতা না বাড়লে ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। আমরা সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছি, আবার ব্যাংক থেকে ঋণও নিচ্ছি। এই ঋণের টাকা কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে ঋণখেলাপি একটি বড় সংকট। অনেক সরকার অনেক উদ্যোগ নিলেও এটি সমাধান হচ্ছে না কেন?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: কারণ, এসব উদ্যোগ শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। ঋণখেলাপির এই হার বিশ্বে নজিরবিহীন। কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দেওয়া হচ্ছে এবং এর পেছনে অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ কাজ করছে। বলা যায়, ব্যাংকের মালিকরাই ব্যাংক ডাকাতি করছেন। মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, একটি নির্দিষ্ট সরকার যতদিন ক্ষমতায় আছে, তত দিন ব্যাংক লুট করলেও কোনো সমস্যা হবে না। এই রাজনৈতিক সংশ্রবের কারণেই ঋণখেলাপি সংকটের সমাধান হচ্ছে না।

এশিয়া পোস্ট: অর্থ পাচার রোধে আইন থাকা সত্ত্বেও তা থামানো যাচ্ছে না কেন? এর পেছনে কি রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: শুধু আইন করে অর্থ পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, নিউজিল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ায় ক্যাপিটাল কন্ট্রোল তুলে দেওয়ার পরও টাকা পাচার হয়নি। কারণ, সেসব দেশের প্রতি মানুষের আস্থা ছিল। আমাদের দেশের মানুষ বিচার বিভাগ বা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। যখন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা চিকিৎসা বা সন্তানদের পড়াশোনার জন্য বিদেশমুখী হন, তখন তারা পরোক্ষভাবে এই বার্তাই দেন যে দেশের ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা নেই। এই আস্থার অভাবই অর্থ পাচারের মূল কারণ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান অবনতির কারণে সম্পদশালীরা বিদেশে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন। বিদেশে টাকা পাঠাতে বিমানবন্দরে কড়াকড়ি থাকলেও ব্রিফকেসভর্তি টাকা চলে যাচ্ছে। এগুলো শুধু আইন দিয়ে ঠেকানো যাবে না। এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। এমনকি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য নিয়োগও দলীয় বিবেচনায় হয়, যা বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে আস্থার সংকট দূর হবে না।

এশিয়া পোস্ট: আপনারা তো পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এতে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। যেসব দেশে টাকা পাচার হয়েছে, তারা নিজেরাও এর সুবিধাভোগী। বিভিন্ন স্কিমের মাধ্যমে তারা পাচার হওয়া টাকাকে বৈধতা দেয়। যেমন—মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচি কিংবা অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগের মাধ্যমে রেসিডেন্সি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে এসব দেশ সহজে টাকা ফেরত দিতে চায় না। এজন্য মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট এবং এক্সট্রাডিশন ট্রিটির প্রয়োজন। আমরা সেই প্রক্রিয়াগুলো শুরু করেছি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া যে, আমরা এ বিষয়ে আন্তরিক। ভবিষ্যতে যেন কেউ অর্থ পাচারের সাহস না পায়। আমাদের আন্তর্জাতিক মর্যাদা এবং প্রফেসর ইউনূসের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি সরকারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছি। এটি সময়সাপেক্ষ হলেও অসম্ভব নয়।

এশিয়া পোস্ট: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বোয়িং বা তুলা আমদানির চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়েছে। এই চুক্তিগুলোর যৌক্তিকতা কী ছিল?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: এই চুক্তিগুলোর পেছনে বিভিন্ন যৌক্তিক কারণ ছিল। আমাদের হাতে সময় কম ছিল এবং সামনে নির্বাচন ছিল, তাই দ্রুত কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের মতো দেশ রাশিয়া থেকে তেল কিনতে পারলেও আমাদের সেই রাজনৈতিক শক্তি নেই যে, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করব। বোয়িং কেনার ক্ষেত্রে একটি সুবিধা হলো, একই কোম্পানির উড়োজাহাজ থাকলে সার্ভিসিং ও প্রশিক্ষণ সহজ হয়। আর তুলা বা গম আমদানির ক্ষেত্রে দাম কিছুটা বেশি মনে হলেও এর পেছনে রাজনৈতিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফার্ম লবি’ অত্যন্ত শক্তিশালী। আমরা তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনলে এই প্রভাবশালী লবি আমাদের পক্ষে কাজ করতে পারে। এটি আমাদের জন্য একটি বড় কৌশলগত সুবিধা। বর্তমান সরকার সেই সুবিধাকে কতটা কাজে লাগাতে পারবে, তা তাদের ওপর নির্ভর করছে। আমরা তাদের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার দিয়ে গিয়েছি।

এশিয়া পোস্ট: সবশেষে জানতে চাই, অন্তর্বর্তী সরকারের পর বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে বাজেট দেওয়া হয়েছে, সেটিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: বাজেটের বিস্তারিত খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ আমি এখনও করিনি। তবে মোটা দাগে বলতে পারি, এই বাজেট বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। কারণ, সরকারের পর্যাপ্ত রাজস্ব নেই। একদিকে ট্যাক্সে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে। বিষয়টি কিছুটা পরস্পরবিরোধী।

আমাদের দেশে ট্যাক্স না দেওয়ার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা ভাঙা জরুরি। এ ছাড়া বিদেশি সহায়তার ওপর যে নির্ভরতা দেখানো হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই সহায়তা প্রত্যাশিত মাত্রায় পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আবার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিলে তারও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সব মিলিয়ে এই বাজেট বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।