‘৬৪ জেলার ডিসি-এসপি প্রতিজ্ঞা করলে দেশের চিত্র বদলে যাবে’

মাহবুব কবির মিলন—রেল মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনে কাজ করেছেন আরও নানা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে। পাশাপাশি সুযোগ পেলেই রাষ্ট্রীয় নানা সমস্যা নিয়েও ভেবেছেন। চাকরির পাট চুকিয়ে রেলের অব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা, ভোক্তা অধিকার, দুর্নীতি নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। এশিয়া পোস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘আলাপনে’ অতিথি হয়ে এসেছিলেন তিনি। শুনিয়েছেন নিজের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের ব্যক্তিগত গল্প। সঞ্চালনায় ছিলেন এশিয়া পোস্ট সম্পাদক পলাশ মাহমুদ
এশিয়া পোস্ট: আপনি বিজ্ঞান বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না। তবুও নিরাপদ খাদ্যের মতো কারিগরি বিষয়ে এই গভীর আগ্রহ কীভাবে তৈরি হলো?
মাহবুব কবির মিলন: আমি সবসময় বলি এবং বহুবার লিখেছি যে, বর্তমান যুগটা হচ্ছে তথ্যের বা ইনফরমেশনের যুগ। আমাদের প্রত্যেকের ইনফরমেটিভ হওয়াটা খুব জরুরি। আমরা আগে শিখতাম, নলেজ ইজ পাওয়ার বা জ্ঞানই শক্তি। জ্ঞান এবং তথ্যের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পার্থক্য আছে। আপনার অনেক জ্ঞান থাকতে পারে, কিন্তু সেই জ্ঞান যদি আপনি প্রয়োগ না করেন তবে তার ফলাফল শূন্য হতে পারে। তথ্যের শক্তি তখনই প্রকাশিত হয় যখন সেই তথ্যকে কাজে লাগিয়ে আপনি কোনো সমস্যার সমাধান করেন।
উদাহরণ হিসেবে রেলওয়ের কথা বলা যায়। আমরা জানি যে কোনো নির্মাণকাজে দুর্নীতি বা নয়ছয় হতে পারে—এটি হলো সাধারণ জ্ঞান। কিন্তু তথ্য হলো যখন আমি সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারি যে, একটি রেললাইন নির্মাণে যেখানে ১০ ইঞ্চি পাথর দেওয়ার কথা, সেখানে পাথর কম দেওয়া হচ্ছে। তখন একজন দায়িত্বশীল হিসেবে আমাকে সরেজমিনে স্পটে যেতে হবে। আমি কারিগরি মানুষ না হলেও আমি সেখানে গিয়ে কোদাল দিয়ে পাথর সরিয়ে একটি স্কেল বা রড দিয়ে মেপে দেখতে পারি সেখানে আসলে কত ইঞ্চি পাথর দেওয়া হয়েছে। এই যে তথ্য সংগ্রহ করে তার প্রয়োগ করা, এটাই হলো ইনফরমেটিভ হওয়া। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেছি, কিন্তু ২০১৪-১৫ সাল থেকে আমি এই তথ্যের সন্ধানে নামি। আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ফরমালিনবিরোধী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সেই সময় আমরা তথ্য পেলাম যে ফরমালিন ফলমূল বা আম সংরক্ষণে আসলে কাজ করে না, তবুও এটি নিয়ে ভুল ভীতি ছড়ানো হচ্ছিল। আমরা তথ্যের গভীরে গিয়ে দেখলাম ফরমালিন আমদানি নীতিতে সমস্যা আছে। আমরা সরাসরি আমদানি নীতিতে হাত দিলাম এবং বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফরমালিনের যত্রতত্র আমদানি বন্ধ করার ব্যবস্থা করলাম। এভাবেই ধীরে ধীরে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, কীটনাশক এবং নিরাপদ খাদ্যের পুরো চেইনটি নিয়ে আমার কাজ শুরু হয়।
এশিয়া পোস্ট: রেলওয়ে বছরের পর বছর লোকসান গুনছে। দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে কি এটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে?
মাহবুব কবির মিলন: দুর্নীতিমুক্ত হলে উন্নয়নের গতি যে বহুগুণ বাড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে রেলের লোকসান বা লাভের হিসাবটা কীভাবে করা হয়। প্রায়ই লাভের যে কথা বলা হয়, সেটি আসলে স্রেফ আয়। কিন্তু সেই আয়ের বিপরীতে বেতন, ভাতা, ইউটিলিটি বিল, নির্মাণ এবং উন্নয়নের বিশাল ব্যয়গুলো সামনে আনা হয় না। রেল শুধু টিকিট বিক্রি করে কখনো লাভ করতে পারবে না। সারা পৃথিবীতে রেল লাভের মুখ দেখে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে। অথচ বাংলাদেশে আমাদের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা বা গুডস ক্যারিং প্রায় ধ্বংসের মুখে।
আমাদের ইঞ্জিন স্বল্পতা একটা ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে। অথচ এই ইঞ্জিন কেনা নিয়েও কী ভয়ানক দুর্নীতি হয়েছে তার একটা উদাহরণ দিই। ১০০০ কোটি টাকা দিয়ে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন কেনা হলো। কোরিয়ান কোম্পানি হুন্দাই রোটেম এই ইঞ্জিনগুলো সরবরাহ করেছিল। চুক্তিতে যে মানের যন্ত্রাংশ বা কম্পোনেন্ট দেওয়ার কথা ছিল, তারা তা দেয়নি। সম্পূর্ণ স্পেসিফিকেশন ভেঙে নিম্নমানের জিনিস দেওয়া হলো। রেলের নিজস্ব তদন্ত কমিটিও কিন্তু রিপোর্টে লিখেছিল যে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই রিপোর্টের শেষে লিখে দেওয়া হলো ‘তবে এই ইঞ্জিনগুলো চলতে কোনো সমস্যা নেই’। এই যে ‘ম্যানেজ’ করার সংস্কৃতি, এটিই রেলকে শেষ করে দিচ্ছে। আজ দুই-তিন বছরের মাথায় সেই ইঞ্জিনগুলো প্রায় অকেজো হওয়ার পথে। ১০০০ কোটি টাকা জনগণের পকেট থেকে গেল কিন্তু সার্ভিস মিলছে না। দুর্নীতি শুধু টাকা চুরি নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ এবং জনকল্যাণকে ধ্বংস করে দেয়।
এশিয়া পোস্ট: রেলে ঠিক কোন কোন খাতে নিয়মিত দুর্নীতি হয়?
মাহবুব কবির মিলন: দুর্নীতির সবচেয়ে বড় জায়গা হলো কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণ খাত। আমি যখন মন্ত্রণালয়ে ছিলাম, তখন আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত প্রায় ৭২-৭৮ কিলোমিটার ডাবল লাইন নির্মাণের কাজ চলছিল। আমি তথ্য পেলাম সেখানে নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। আমি তৎকালীন রেল সচিবকে বারবার অনুরোধ করেছি যে, এই পাথরগুলো বুয়েটে টেস্ট করানো হোক। কিন্তু কারিগরি কর্মকর্তারা প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করেন। আমি এক বছর চেষ্টা করেও বুয়েটে পাথর টেস্ট করাতে পারিনি। তারা সাপ্লাইয়ারের দেওয়া সেই পুরোনো টেস্ট রিপোর্ট বারবার দেখাতেন যেটা টেন্ডারের সময় দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত যখন কমিটি গঠন করে পাথর সংগ্রহ করা হলো, দেখা গেল কর্মকর্তারা কৌশলে যেখানকার পাথর ভালো সেই লাকসাম অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। আমি যখন ধরিয়ে দিলাম যে সমস্যা কুমিল্লা-আখাউড়া অংশে, তখন সবাই চুপ হয়ে গেলেন। এমনকি আমাকে এই কথাও শুনতে হয়েছে যে আমি বিজ্ঞানের ছাত্র না হয়ে কেন কারিগরি বিষয়ে কথা বলছি। আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছে আমি কীভাবে বিসিএস ক্যাডার হলাম! অথচ আজ প্রমাণিত যে সেই পাথরগুলো আসলেই স্যান্ডস্টোন বা নিম্নমানের ছিল যা ভারী ট্রেন চলাচলের জন্য উপযুক্ত নয়।
এ ছাড়া মেরামত বা রিনোভেশনের নামেও প্রচুর টাকা অপচয় হয়। ১০ হাজার কোটির কাজ অনায়াসে ১৫ হাজার কোটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আসে টিকিট কালোবাজারি। আমি ‘টিকিট যার ভ্রমণ তার’ এই স্লোগান নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। বর্তমানের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থায় এনআইডি তথ্য নেওয়ার যে সিস্টেম করা হয়েছে, সেখানেও বিশাল ফাঁকি। রেল এনআইডি সার্ভার থেকে ছবি ছাড়া তথ্য নিচ্ছে। যদি যাত্রীর ছবিসহ গার্ড রিপোর্ট তৈরি হতো, তবে কালোবাজারি বন্ধ করা সম্ভব হতো। কিন্তু রেলের ভেতরের একটি চক্র এটি চায় না, কারণ এতে তাদের অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। আবার আইনত নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও রেল কর্তৃপক্ষ ‘যাত্রীর অনুরোধে’ নাম দিয়ে স্ট্যান্ডিং টিকিট দিচ্ছে স্রেফ আয় বাড়ানোর জন্য। পুরো রেল ব্যবস্থাটা এখন একটা রমরমা অবৈধ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে আপনাকে হঠাৎ সরিয়ে ওএসডি করা হলো। এর পেছনে মূল কারণ কী ছিল?
মাহবুব কবির মিলন: আমি যখন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে ছিলাম, আমি কোনো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেটের তোয়াক্কা করিনি। আমি বড় বড় কোম্পানির খাদ্যে ভেজাল পেয়ে তাদের কারখানা সিলগালা করেছি, মামলা করেছি। এমনকি মন্ত্রীদের তদবিরও আমি শুনিনি। আমার সিনিয়র কর্মকর্তারা আমাকে বারবার সতর্ক করেছিলেন যে আমি বিপদে পড়ব, কিন্তু আমি কোনো আপস করিনি। আমাকে প্রথমে নিরাপদ খাদ্য থেকে রেল মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হলো। আমি চেয়েছিলাম আর মাত্র একটি বছর সময় যাতে সিস্টেমটা পুরোপুরি দাঁড় করাতে পারি। এমনকি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে ৩ লাখ টাকা বেতনের পোস্টিংয়ের প্রস্তাব ছেড়ে দিয়েও আমি নিরাপদ খাদ্যে থাকতে চেয়েছিলাম দেশের মানুষের স্বার্থে। কিন্তু তারা শোনেনি। রেলে গিয়েও যখন আমি দুর্নীতির ফাইলগুলো নাড়াচাড়া শুরু করলাম এবং ১০ জন সৎ লোক চেয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি চ্যালেঞ্জ করলাম, সেটিকেই বড় অপরাধ হিসেবে ধরা হলো। আমাকে ওএসডি করা হলো এবং আমার বিরুদ্ধে দুটি মামলা দেওয়া হলো এই অভিযোগে যে আমি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছি এবং বিনিয়োগ ব্যাহত করছি। অথচ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নিজেই জনসমক্ষে স্বীকার করেছিলেন যে তার পিয়ন ৪০০ কোটি টাকার মালিক। সেই পিয়নের দায় কে নেবে? আমি দুর্নীতিমুক্ত করতে চেয়ে অপরাধী হলাম আর দুর্নীতিবাজরা বীরদর্পে ঘুরে বেড়াল।
এশিয়া পোস্ট: মাত্র ১০ জন সৎ ও দক্ষ লোক নিয়ে পুরো সিস্টেম বদলানো সম্ভব—এই চ্যালেঞ্জ আপনি করেছিলেন। সত্যিই সেই সুযোগ পেলে আপনার কর্মপরিকল্পনা কী হবে?
মাহবুব কবির মিলন: প্রথম এবং প্রধান শর্ত হতে হবে ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’। আমার কাজে কোনো মন্ত্রণালয় বা আমলা হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আমি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দায়বদ্ধ থাকব। কারণ আমলারা অনেক সময় মাঝখানে তথ্যের দেয়াল তৈরি করে রাখেন। আমি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে আমেরিকার এফডিএর মতো শক্তিশালী এবং স্বাধীন হিসেবে দেখতে চাই। বর্তমানে এটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে, যা একটি বড় ধরনের স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। খাদ্য মন্ত্রণালয় যখন নিজেই চাল বা গম আমদানি করে, তখন তাদের কোনো গাফিলতি হলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ তাদের শোকজ করার সাহস পায় না। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে সরাসরি সংসদ বা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীনে থাকতে হবে। আমাদের দেশে অনেক সৎ কর্মকর্তা আছেন যারা শুধু মেরুদণ্ডের অভাবে কাজ করতে পারেন না। এমন মানুষকে দায়িত্বে বসাতে হবে যাদের মাথা কেনা যায় না। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক ক্ষমতায়ন করলে এক বছরের মধ্যে রেল এবং নিরাপদ খাদ্য উভয় খাতেই দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এশিয়া পোস্ট: নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে থাকাকালীন কোন কাজগুলো আপনি সবচেয়ে গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন?
মাহবুব কবির মিলন: আমার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল প্রায় সোয়া দুইশ লোকবল নিয়োগ দেওয়া। সেই নিয়োগ ছিল শতভাগ স্বচ্ছ। আমার টেবিলে বস্তা বস্তা তদবিরের চিঠি এবং ডিও লেটার এসেছিল, আমি একটিও খুলে দেখিনি। আমি সেগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলাম। আমার নিজের আত্মীয়স্বজন বা পরিবারের কেউ জানত না যে আমি এই নিয়োগের সভাপতি। তৎকালীন মন্ত্রী মহোদয় আমাকে বারবার বলেছিলেন ফলাফল প্রকাশের আগে তাকে দেখাতে, কিন্তু আমি তা করিনি। রাত ১১টায় অনলাইনে রেজাল্ট পাবলিশ করে পরদিন সকালে তার টেবিলে কপি দিয়েছি। এ ছাড়া একটি বড় কোম্পানির গুঁড়া দুধে বা অন্য পণ্যে ক্ষতিকর উপাদান পেয়ে যখন আমি মামলা করলাম, তখন মন্ত্রী আমাকে এক ঘণ্টা ধরে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেছিলেন এবং রেজাল্ট ছিঁড়ে ফেলতে বলেছিলেন। আমি তা না করে পণ্যটি আন্তর্জাতিক ল্যাব এসজিএস-এর মাধ্যমে চেন্নাই পাঠিয়ে পুনরায় টেস্ট করিয়েছি এবং আগের রিপোর্টই সঠিক পেয়েছি। সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলে কেউ আপনাকে দমাতে পারবে না।
এশিয়া পোস্ট: এখন আমের মৌসুম। বাজারে প্রচুর মৌসুমি ফল। ফরমালিন বা রাসায়নিক নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক, সেটা কি আসলে সত্যিকারের কোনো ভিত্তি আছে?
মাহবুব কবির মিলন: আমি সবাইকে দায় নিয়ে বলছি, আপনারা নিশ্চিন্তে দেশি ফল খাবেন। আমাদের দেশে ফরমালিন নিয়ে যে আতঙ্ক, তার কোনো ভিত্তি এখন নেই। ফরমালিন আসলে ফলের ওপর কাজ করে না এবং এটি এখন বাজারে সহজে পাওয়াও যায় না। তবে একটা ভীতি কাজ করে ইথোফেন বা গ্রোথ হরমোন নিয়ে। ইথোফেন কোনো বিষ নয়, এটি একটি হরমোন যা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে যায় বা ডিগ্রেড হয়ে যায়। বাগান থেকে ফল পেড়ে আপনার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে, তাই এতে ভয়ের কিছু নেই। এমনকি আমি টমেটো নিয়েও পরীক্ষা করেছি। স্প্রে করা টমেটোতে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর কোনো রাসায়নিকের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তবে হ্যাঁ, মৌসুমের একেবারে শুরুর দিকের ফল বা সময়ের আগে পাকার জন্য রং মাখানো ফল এড়িয়ে চলাই ভালো। আমের ক্যালেন্ডার মেনে ফল কিনলে কোনো ঝুঁকি থাকে না। আপেলের গায়ের মম বা ওয়াক্স কোটিং নিয়েও অনেকে ভয় পান, এটিও ভোজ্য বা এডিবল, ধুয়ে নিলেই চলে। ফল আমাদের দেশের সবচেয়ে নিরাপদ খাবারগুলোর মধ্যে একটি।
এশিয়া পোস্ট: দুধ ও মাংসের ক্ষেত্রে কি একই কথা বলা যায়? দুধে হেভি মেটালের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। এর সমাধান কী?
মাহবুব কবির মিলন: দুধ এবং মাংসের বিষয়টি বেশ জটিল। আমাদের পুরো ফুড চেইন বা খাদ্য শৃঙ্খল আসলে দূষিত হয়ে পড়েছে। মাটিতে প্রচুর রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক দেওয়ার ফলে সেই মাটি থেকে ঘাসে এবং খড়ে ভারী ধাতু বা হেভি মেটাল চলে আসছে। গরু যখন সেই খড় বা ঘাস খাচ্ছে, তখন তার দুধ এবং মাংসে লেড বা ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ধাতু জমা হচ্ছে। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও আমাদের এখানে এর ভয়াবহতা বেশি। একবার যখন ল্যাব রিপোর্টে দুধে হেভি মেটাল পাওয়া গেল, তখন তো রীতিমতো হুলুস্থুল পড়ে গেল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই রিপোর্টগুলো জনস্বার্থে প্রকাশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। যদি সরকার এবং কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ না করে, তবে শুধু অভিযান চালিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমাদের পশুখাদ্য বা ফিড উৎপাদন থেকে শুরু করে গোড়া থেকেই কাজ করতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: রাস্তার ধারের ফুচকা, চটপটি বা জারের পানি—এগুলোর গুণগত মান নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
মাহবুব কবির মিলন: এটি খুবই দুঃখজনক বিষয়। আমরা ফুচকা পরীক্ষা করে তাতে মলের জীবাণু বা ই-কোলাই পেয়েছি। এর কারণ হলো ফুচকার টক তৈরিতে যে পানি ব্যবহার করা হয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনিরাপদ উৎস থেকে আসা। ডেমরা বা যাত্রাবাড়ী এলাকায় অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে ফুচকা তৈরি হয় যেখানে তেলাপোকা ও ইঁদুরের অবাধ বিচরণ থাকে। জারের পানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ওয়াসার পানিকে কোনো রকম ফিল্টার না করেই জারে ভরে বিক্রি করা হচ্ছে। মানুষের সচেতনতা ছাড়া এটি বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, সস্তা খাবারের মূল্য আমরা অনেক সময় আমাদের জীবন দিয়ে দিই।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে কিডনি রোগ বাড়ছে, শিশুদের রক্তে ভারী ধাতু পাওয়া যাচ্ছে। খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে এর কোনো সরাসরি সম্পর্ক আছে কি?
মাহবুব কবির মিলন: এর সঙ্গে শতভাগ সম্পর্ক আছে। আমি বিভিন্ন হাসপাতালের উপাত্ত দেখেছি, শিশুদের ব্লাড প্লাজমা টেস্টে হেভি মেটাল পাওয়া যাচ্ছে। এর কারণ হলো আমরা প্রতিদিন যে সবজি বা মাছ-মাংস খাচ্ছি, তার সঙ্গে অবশিষ্টাংশ হিসেবে কীটনাশক বা ভারী ধাতু আমাদের শরীরে ঢুকছে। আজ থেকে ২০ বছর আগে শিশুদের মধ্যে এত ক্যানসার বা কিডনি রোগ ছিল না। অথচ এখন হাসপাতালগুলো এসব ছোট ছোট রোগীদের ভিড়ে ঠাসা। আমাদের আইনগত সীমাবদ্ধতাও অনেক। ভোক্তা অধিকার আইনের সংশোধনী আট বছর ধরে মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। নিরাপদ খাদ্য আইনের সংশোধনীও পাঁচ বছর ধরে পড়ে আছে। ফাইল বারবার হারিয়ে যায়। এগুলো আসলে একটি সভ্য রাষ্ট্রের চিত্র হতে পারে না।
এশিয়া পোস্ট: এই হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী? সাধারণ মানুষ ও সরকারের উদ্দেশে আপনার শেষ কথা কী?
মাহবুব কবির মিলন: উত্তরণের জন্য প্রয়োজন শুধু দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যদি এক দিনের জন্যও ঘোষণা দেওয়া হয় যে, জনগণের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে কেউ তোমাদের বাধা দিতে পারবে না, তবে এক বছরের মধ্যে পুরো দেশ বদলে যাবে। আমাদের দেশে ৬৪ জন ডিসি এবং এসপি আছেন। তারা যদি প্রতিজ্ঞা করেন যে তাদের জেলায় কোনো মাদক, কোনো দুর্নীতি বা খাদ্যে ভেজাল থাকবে না এবং তাদের যদি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা হয়, তবে এক মাসেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন সম্ভব। আমাদের মেধাভিত্তিক পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে এবং আমলাতন্ত্রকে দলবাজি থেকে মুক্ত করতে হবে। দেশপ্রেম এবং নৈতিকতা ছাড়া কোনো সংস্কারই স্থায়ী হবে না।
এশিয়া পোস্ট: জনাব মাহবুব কবির মিলন, আপনার মূল্যবান সময় এবং নির্ভীক মতামতের জন্য এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
মাহবুব কবির মিলন: আপনাদেরও ধন্যবাদ। আশা করি, এশিয়া পোস্ট এভাবেই সাধারণ মানুষের কথা বলবে। সবাই নিরাপদ খাদ্য খাবেন এবং সচেতন থাকবেন। ধন্যবাদ।
.png)

