সাক্ষাৎকারে কামরুল হাসান/‘কঠোর পরিশ্রমই দীর্ঘমেয়াদে সফলতার একমাত্র পথ’

বাংলাদেশের এফএমসিজি, প্রথাগত বাণিজ্য ও ই-কমার্স খাতের অন্যতম সফল করপোরেট ব্যক্তিত্ব কামরুল হাসান। নেসলে ও নিউজিল্যান্ড ডেইরির মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পর তিনি ই-কমার্স ও বিটুবি খাতের বিকাশে এবং দেশের ৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ড ‘ইগলু’-র শীর্ষ নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তার উদ্ভাবনী ও কৌশলগত নেতৃত্বে বাজারে যুক্ত হয়েছে ‘পার্লার অ্যাট হোম’ এবং স্বাস্থ্যসচেতন গ্রাহকদের জন্য ‘জিরো অ্যাডেড সুগার’-এর মতো জনপ্রিয় সব ধারণা।
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্নের পর বহুজাতিক ও দেশীয় শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ কামরুল হাসান অর্জন করেছেন ‘দক্ষিণ এশিয়ার সেরা সিইও পুরস্কার’ এবং ‘আউটবক্স সিইও পুরস্কার’। করপোরেট নেতৃত্ব, ব্র্যান্ড বিল্ডিং, কাস্টমার সাইকোলজি এবং গ্রোথ মাইন্ডসেট-এর সফল প্রয়োগের জন্য তিনি ব্যবসায়িক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘বিয়ন্ড বিজনেস’-এ তিনি কথা বলেছেন তার শিক্ষাজীবন, ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা, ই-কমার্স ও এফএমসিজি খাতের রূপান্তর, গ্রোথ মাইন্ডসেট এবং দেশের অর্থনীতি ও তরুণদের কেরিয়ার সম্ভাবনা নিয়ে। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছেন রিয়াজুল করিম। প্রযোজনা করেছেন জায়েদ আল মাহবুব।
এশিয়া পোস্ট: আপনার শিক্ষাজীবন এবং করপোরেট খাতে কেরিয়ারের শুরুর দিনগুলোর কথা দিয়ে শুরু করা যাক।
কামরুল হাসান: আমি ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করি। সে সময় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষে তরুণদের সামনে দুটি প্রধান পথ খোলা থাকত- হয় বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া, না হয় বেসরকারি খাতে যোগ দেওয়া। তৎকালীন সময়ে বেসরকারি খাত আজকের মতো এতটা সক্রিয় ও বিস্তৃত ছিল না। আমি বেসরকারি খাতকেই বেছে নিই। ক্যারিয়ারের শুরুতে আমি নেসলে-তে ‘প্রমোশন অফিসার’ হিসেবে কাজ শুরু করি। শুরুতেই আমাকে মাঠপর্যায়ে সরাসরি ডাক্তারদের ভিজিট করাসহ কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্র্যান্ডের কাজ শিখতে হয়েছিল। কাজের প্রতিটি ক্ষেত্রই মানুষের জন্য শেখার এক একটি মাধ্যম এমনকি আপনারা যে সাংবাদিকতা বা উপস্থাপনা করছেন, এটাও একটা বড় লার্নিং। আর এফএমসিজি একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় বাজার, যেখানে প্রতিনিয়ত শেখার সুযোগ থাকে।
এশিয়া পোস্ট: নেসলে থেকে নিউজিল্যান্ড ডেইরি এবং পরবর্তীতে ই-কমার্স ও বিটুবি খাতে যুক্ত হওয়ার পেছনে কী চিন্তা ছিল?
কামরুল হাসান: নেসলেতে কাজ করার পর আমি নিউজিল্যান্ড ডেইরিতে যোগ দিই, যা ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক ও চ্যালেঞ্জিং একটি এফএমসিজি প্রতিষ্ঠান। সেখানে আমি চিফ মার্কেটিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। পরবর্তীতে দেশে যখন ই-কমার্স ও ডিজিটাল কমার্সের সূচনা ও ব্যাপক প্রসার হচ্ছিল, তখন আমি এই খাতের সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনা দেখতে পাই। আমার হাতে বেশ কয়েকটি ভালো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমি ই-কমার্সে আসার সিদ্ধান্ত নিই। এটি ছিল আমার ক্যারিয়ারের একটি পরিকল্পিত পরিবর্তন ও পরিমাপযোগ্য ঝুঁকি। কারণ ভবিষ্যৎ বাজার ডিজিটালের দিকেই যাচ্ছিল। নতুন এই স্টার্টআপ যাত্রায় যুক্ত হওয়ার পর অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা সিইও পুরস্কার এবং আউটবক্স সিইও পুরস্কার অর্জনে ভূমিকা রাখে।
এশিয়া পোস্ট: ই-কমার্স ও বিটুবি ব্যবসার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল এবং প্রথাগত ট্রেডিশনাল ব্যবসার সাথে এর মূল পার্থক্য কোথায়?
কামরুল হাসান: ই-কমার্স বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করার সময় কাস্টমার অ্যাকুইজিশন, কাস্টমারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং তাদের কেনাকাটার আগ্রহ তৈরি করার পদ্ধতিগুলো বেশ ভিন্ন ছিল। বিশেষ করে বিটুবি মডেলে আমরা দেখেছি ছোট ছোট খুচরা বিক্রেতারা কীভাবে পাইকারি পণ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে নানামুখী সমস্যায় পড়ত এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে তাদের সেই সমাধান দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। তবে আমার মূল উপলব্ধি হলো- মাধ্যম প্রথাগত হোক কিংবা ডিজিটাল, ব্যবসা দিনশেষে ব্যবসায়ী। ব্যবসার মৌলিক নীতি কিন্তু একই থাকে। ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো গ্রাহককে বোঝা এবং তার সমস্যার সঠিক সমাধান দেওয়া। প্রথাগত মাধ্যমে গ্রাহক আপনাকে কিছুটা সময় দিলেও ডিজিটাল মাধ্যমে গ্রাহকরা অত্যন্ত ব্যস্ত থাকে; ফলে তাদের সামনে সঠিক পণ্য, উপযুক্ত সমাধান ও আকর্ষণীয় উপস্থাপন বা ‘হুক’ দিতে না পারলে তারা মুহূর্তেই অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যায়। আমি সবসময় নিজেকে দ্রুত শেখার মানসিকতাসম্পন্ন একজন মানুষ মনে করি, যা আমাকে এই পরিবর্তনগুলোর সাথে দ্রুত মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছে।
এশিয়া পোস্ট: ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে বইয়ের নীতি-জ্ঞান বনাম বাস্তব বাজারের গ্রাহক অভিজ্ঞতার মধ্যে আপনি কোনটিকে বেশি প্রাধান্য দেন?
কামরুল হাসান: বইয়ের তত্ত্ব পড়ে শেখার চেয়ে বাস্তব বাজারের গ্রাহকদের আচরণ ও প্রতিক্রিয়া থেকে শেখা অনেক বেশি কার্যকর ও সমৃদ্ধ। আমি মনে করি গ্রাহকরাই হলো সবচেয়ে বড় বই। অনেক সময় ব্যবসায়ীরা নিজেদের ধারণাকেই চূড়ান্ত মনে করেন এবং গ্রাহকদের সরাসরি প্রতিক্রিয়া বা ফিডব্যাককে গুরুত্ব দিতে চান না- যা একটি মারাত্মক ভুল। আপনি যদি গ্রাহকের সঠিক ও গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করেন, তবে তা আপনার ব্যবসার গতিপথ এবং আপনার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। আমার প্রযুক্তি বা আইটি (হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার) বিক্রির কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না; কিন্তু শুধুমাত্র গ্রাহকদের প্রকৃত চাহিদা ও তাদের মনস্তত্ত্ব পড়ে আমি ব্যাংক ও বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সাথে সফল প্রযুক্তি ব্যবসা পরিচালনা করতে পেরেছি।
এশিয়া পোস্ট: সফলতা বা ‘সাকসেস মাইন্ডসেট’ এবং ‘গ্রোথ মাইন্ডসেট’-এর মধ্যে আপনি কীভাবে পার্থক্য করেন?
কামরুল হাসান: আমি কেবল ‘সাকসেস মাইন্ডসেট’-এ বিশ্বাসী নই, আমি মূলত ‘গ্রোথ মাইন্ডসেট’ বা প্রবৃদ্ধির মানসিকতায় বিশ্বাস করি। কারণ সফলতার মানসিকতা অনেক সময় মানুষকে এক জায়গায় স্থবির বা অহংকারী করে ফেলতে পারে। কিন্তু গ্রোথ মাইন্ডসেট মানুষকে শেখায় কীভাবে প্রতিদিন নতুন প্রতিকূলতা বা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়, নতুন কিছু শিখতে হয়, তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে হয় এবং নিজের ভুল শুধরে নিয়ে পুনরায় নতুন করে শিখতে হয়। আপনি যদি বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেরদের দিকে তাকান, দেখবেন তাদের অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তারা প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখা ও প্রবৃদ্ধির মানসিকতা ধরে রাখেন। আমার কাজের ক্ষেত্রেও আমি সবসময় নতুন কিছু শেখা, তা প্রয়োগ করা এবং পুনর্নবীকরণের মাধ্যমে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
এশিয়া পোস্ট: বিপণনের ক্ষেত্রে ‘AIDA’ মডেল এবং কাস্টমার ও কনজিউমারের পার্থক্যের গুরুত্ব কতটুকু?
কামরুল হাসান: যে কোনো ব্যবসার মৌলিক ভিত্তি হলো কাস্টমার এবং কনজিউমারের সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা। উদাহরণস্বরূপ, আমি যখন আমার মেয়ের জন্য কোনো খেলনা বা পণ্য কিনি, তখন আমি হলাম কাস্টমার আর আমার মেয়ে হলো কনজিউমার। আবার ক্ষেত্রবিশেষে কাস্টমার ও কনজিউমার একই ব্যক্তিও হতে পারেন। বিপণনের ক্ষেত্রে ‘AIDA’ মডেলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রথমত গ্রাহকের মনোযোগ আকর্ষণ করা, তারপর পণ্যের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি করা, এরপর ক্রয়ের প্রবল তীব্র ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করা এবং সর্বশেষে বিক্রয় সম্পন্ন করা বা সিদ্ধান্ত নেওয়া। আপনি যদি শুরুতেই গ্রাহকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে না পারেন, তবে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আর ব্যবসায়ের পরিচালনায় তদারকির গুরুত্ব বোঝাতে আমি বলি, রান্নার সময় যেমন তদারকির জন্য কিচেনে যেতে হয়- সরাসরি পর্যবেক্ষণ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায় না, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই উদ্যোক্তা বা লিডারের সরাসরি সম্পৃক্ততা অপরিহার্য।
এশিয়া পোস্ট: ইগলু আইসক্রিমে বহুল আলোচিত ‘পার্লার অ্যাট হোম’ ধারণাটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
কামরুল হাসান: এক দিন একটি রেস্তোরাঁয় বসে আমি লক্ষ্য করলাম, তারা আইসক্রিম পার্লারের মতো স্কুপ বানিয়ে পরিবেশন করে প্রতি স্কুপ আইসক্রিম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করছে। মানুষ সেখানে মূলত পরিবেশ বা অ্যাম্বিয়েন্স এবং পার্লার অভিজ্ঞতার জন্য অতিরিক্ত টাকা দিচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে আমার মাথায় চিন্তা এলো- গ্রাহককে কেন এই পার্লার অভিজ্ঞতার জন্য বাইরে গিয়ে চড়া দাম দিতে হবে? আমরা যদি এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরি করি যাতে প্রতিটি পরিবার ঘরে বসেই পার্লার কোয়ালিটির স্কুপিং আইসক্রিম সাশ্রয়ী মূল্যে ও সহজে উপভোগ করতে পারে, তবে কেমন হয়? এই চিন্তা ও পর্যবেক্ষণ থেকেই ইগলুর ‘পার্লার অ্যাট হোম’ কনসেপ্টের জন্ম। এরপর আমি আমাদের ফ্যাক্টরি টিম ও আরঅ্যান্ডডি টিমের সাথে কথা বলি, ছোট পরিসরে বাজার গবেষণা করি এবং কুকিজ ও বিভিন্ন উপাদানের নতুন কম্বিনেশন তৈরি করে এই পার্লার অভিজ্ঞতাকে গ্রাহকের ড্রয়িং রুমে পৌঁছে দিই।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে কি সরাসরি পণ্য বিক্রয় সম্ভব?
কামরুল হাসান: অনেকে মনে করেন বিশাল সংখ্যক অনুসারী বা ফলোয়ার (যেমন ৫০ হাজার বা ১ লাখ ফলোয়ার) থাকলেই যে ইনফ্লুয়েন্সারের কথা শুনে মানুষ দলে দলে পণ্য কিনে নেবে, বিষয়টি মোটেও সেরকম নয়। মূল বিষয় হলো ব্র্যান্ডের নিজস্ব ভ্যালু প্রপোজিশন এবং গ্রাহকের সাথে ব্র্যান্ডের মানসিক সংযোগ। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম তাদের দিনের বড় একটি সময় মোবাইল ডিভাইস ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিবাহিত করে। তাই ইনফ্লুয়েন্সারদের কেবল ব্যবহার করলেই হয় না, তাদের ব্র্যান্ডের মূল বার্তাটি সম্পর্কে স্পষ্টভাবে ব্রিফিং দিতে হয় যেন তারা গ্রাহকদের কাছে ব্র্যান্ডের সঠিক মূল্য ও আবেগীয় দিকটি তুলে ধরতে পারে।
এশিয়া পোস্ট: ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ড হিসেবে ইগলুর অবস্থান এবং বাজারে নতুন স্বাদ ও বৈচিত্র্য আনার প্রক্রিয়াটি কেমন?
কামরুল হাসান: ইগলু ৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো একটি অত্যন্ত পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ড। আমরা আইসক্রিম বাজারে আমাদের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি স্বাদের বৈচিত্র্য নিয়ে প্রচুর গবেষণা ও উন্নয়ন করি। একটা বিষয় বুঝতে হবে, বিশ্বের প্রতিটি দেশের মানুষের স্বাদের পছন্দ আলাদা- আমেরিকা, যুক্তরাজ্য বা মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের সাথে বাংলাদেশি গ্রাহকদের স্বাদের পছন্দ মেলে না। বাংলাদেশি গ্রাহকরা নির্দিষ্ট মিষ্টি ও স্থানীয় স্বাদের সমন্বয় পছন্দ করেন। তাই আমরা বৈশ্বিক আইডিয়ার সাথে স্থানীয় স্বাদের মেলবন্ধন ঘটিয়ে নিজস্ব পণ্য উদ্ভাবন করি।
এশিয়া পোস্ট: কৃত্রিম ফ্লেভারের পরিবর্তে আসল বা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারের পেছনে আপনাদের চিন্তাভাবনা কী ছিল?
কামরুল হাসান: আমরা শুধুমাত্র কেমিক্যাল ফ্লেভার বা কৃত্রিম স্বাদের ওপর নির্ভর না করে আসল ও প্রাকৃতিক উপাদান যুক্ত করে প্রোডাক্ট তৈরি করার ওপর জোর দিয়েছি। যেমন কেবল আমের ফ্লেভার না দিয়ে আসল আমের পাল্প ও স্লাইস ব্যবহার করে ম্যাঙ্গো আইসক্রিম তৈরি করেছি। এছাড়া আসল কফি ও হর্লিক্স যুক্ত করে নতুন আইসক্রিম বাজারে এনেছি, যা শিশু ও পরিবারগুলোর মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। মৌলিক দিক থেকে আইসক্রিমের প্রধান উপাদান হলো দুধ ও চিনি। এর পাশাপাশি মাখন বা কোকোনাট অয়েল/ভেজিটেবল অয়েলের সঠিক ফর্মুলেশনের ওপর ভিত্তি করে এক একটি ব্র্যান্ড তাদের স্বাদের আলাদা পরিচয় তৈরি করে।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ সংকট ও কাঁচামালের চড়া মূল্যের মধ্যে আইসক্রিম শিল্প কীভাবে টিকে রয়েছে?
কামরুল হাসান: ব্যবসায় সবসময় উত্থান-পতন থাকবেই, বাণিজ্য কখনো এক সোজা লাইনে চলে না। বর্তমানে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংকট আমাদের শিল্প খাতের জন্য অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কারখানা ও কোল্ড চেইনে বিকল্প হিসেবে ডিজেল জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন ও লজিস্টিক খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও স্থানীয় বাজারে চিনির দাম বৃদ্ধির এই সংকটে আমরা ‘ভ্যালু ইনোভেশন’-এর পথ বেছে নিয়েছি। যেমন ডায়াবেটিক ও স্বাস্থ্যসচেতন গ্রাহকদের কথা ভেবে আমরা ‘জিরো অ্যাডেড সুগার’ আইসক্রিম চালু করেছি। কারণ আইসক্রিম কেনাকাটা মূলত একটি আবেগভিত্তিক সিদ্ধান্ত; তাই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও গ্রাহকের সাধ্য ও চাহিদার কথা মাথায় রেখে উদ্ভাবন চালিয়ে যেতে হয়।
এশিয়া পোস্ট: দেশের জনসংখ্যা ও বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ব্যবসার দৃষ্টিকোণ থেকে কীভাবে দেখেন?
কামরুল হাসান: আমাদের দেশে ১৭-১৮ কোটিরও বেশি মানুষ রয়েছে, যার একটি বিশাল অংশ হলো মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণী। যেকোনো দেশের অর্থনীতির প্রধান ড্রাইভিং ফোর্স বা চালিকাশক্তি হলো এই মধ্যবিত্ত সমাজ, কারণ তারাই মূল কেনাকাটা বা খরচ করে থাকে। এই বিপুল জনসংখ্যার কারণে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ও দেশীয় উভয় ব্যবসার জন্যই অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও উদীয়মান একটি বাজার। চীন, ভারত বা আমেরিকার মতো দেশগুলো এই বাজারের ওপর সবসময় নজর রাখে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং বাজারে অর্থের প্রবাহ সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি। পরবর্তীতে বিদেশেও আমাদের পণ্য রপ্তানি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: দেশের শিক্ষিত বেকারত্ব এবং তরুণ প্রজন্মের কেরিয়ার ও উদ্যোক্তা হওয়া নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
কামরুল হাসান: বর্তমান তরুণ প্রজন্ম অত্যন্ত মেধাবী, চটপটে ও প্রযুক্তিসচেতন। তারা এখন কেবল প্রথাগত সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ওপর নির্ভর না করে ছাত্রাবস্থা থেকেই ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, স্ন্যাক্স বিজনেস, ব্লগিং কিংবা গ্রাফিক্স ডিজাইনের মতো নানামুখী স্বাধীন উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছে। চাকরির বাজারের ক্ষেত্রে একটি কথা স্পষ্ট বলা দরকার- বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ভালো সিজিপিএ (যেমন ৪.০০-এর মধ্যে ৩.৯৫) পাওয়া মানেই যে ক্যারিয়ারে চমৎকার সাফল্য আসবে, তা নয়। ভালো সিজিপিএ কেবল সিভি দেখে ইন্টারভিউ বোর্ডে ডাকার একটি মাধ্যম হতে পারে। একজন তরুণ ২৫ বছর বয়সে চাকরিতে প্রবেশ করে পরবর্তী ৩০-৪০ বছরের পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘সম্পদ’ হবেন নাকি ‘বোঝা’ হবেন, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে তার সততা, কাজের পেশাদারিত্ব, বাস্তব বুদ্ধি এবং পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতার ওপর।
এশিয়া পোস্ট: সফল ক্যারিয়ার ও জীবন গঠনের ক্ষেত্রে তরুণদের জন্য আপনার মূল পরামর্শ কী থাকবে?
কামরুল হাসান: ক্যারিয়ারের সাফল্যের জন্য শর্টকাট বা সহজ কোনো পথ নেই। কঠোর পরিশ্রম, স্মার্ট ওয়ার্ক, অধ্যাবসায়, কাজের প্রতি প্যাশন এবং সঠিক নেতৃত্বই হলো উন্নতির মূল চাবিকাঠি। জীবনে চলার পথে সামনে বাধা বা ট্র্যাফিক এলে মানুষ যেমন বিকল্প রাস্তা বেছে নেয়, ক্যারিয়ার বা ব্যবসাতেও ঠিক তেমনি বিকল্প পরিকল্পনা ও পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় স্থবির বা একগুঁয়ে না হয়ে নতুন কিছু শেখা এবং সততার সাথে নিজের লক্ষ্য নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে যাওয়াই দীর্ঘমেয়াদে সফলতার একমাত্র পথ।

