logo

ইউনূস সরকার ইঞ্জিনিয়ারিং করে জাতীয় পার্টিকে এক শতাংশের নিচে ভোট দিয়েছে: শামীম হায়দার পাটোয়ারী

ইউনূস সরকার ইঞ্জিনিয়ারিং করে জাতীয় পার্টিকে এক শতাংশের নিচে ভোট দিয়েছে: শামীম হায়দার পাটোয়ারী

শামীম হায়দার পাটোয়ারী রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সাবেক সংসদ সদস্য এবং বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মহাসচিব। তিনি দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং অতিরিক্ত মহাসচিব হন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি নির্বাচন, জাতীয় পার্টির অবস্থান, নতুন সরকার ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিষয়ে মতামত জানান। সুদীর্ঘ এ আলাপচারিতার প্রথমার্ধ আজ প্রকাশ হচ্ছে। আগামীকাল প্রকাশ হবে এর শেষ অংশ।  
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সামি আল মেহেদী।

এশিয়া পোস্ট:  ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আপনার বা দলের মতামত বলুন। আপনার বিশ্লেষণ জানতে চাই।

শামীম হায়দার পাটোয়ারী: বিগত আন্দোলনের পর যখন ইউনূস স্যার ক্ষমতা নিলেন তখন আমরা ভেবেছিলাম উনি শান্তি ফিরিয়ে আনবেন, ঐক্য স্থাপন করবেন, দেশের স্বার্থে কাজ করবেন। কিন্তু আমার মনে হয়েছে ওনার ক্যাবিনেট দুর্বল ছিল এবং তাদের মধ্যে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। সরকার আসলে দেশ চালাতে পারছিল না। প্র্যাকটিক্যালি গত দেড় বছর বাংলাদেশে কোনো গভর্নমেন্ট ছিল না, একটা মবের গভর্নমেন্ট ছিল। মব যা ইচ্ছা তাই করেছে, গভর্নমেন্ট চেয়ে চেয়ে দেখেছে। একটা নাভিশ্বাস অবস্থা ছিল, আমরা যে কোনো মূল্যে সেই সরকারের পরিবর্তন চেয়েছিলাম। একটা সেমি ডেমোক্রেটিক বা আধা ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন হলেও আমরা মনে করেছিলাম ওই রেজিমের থেকে বেটার হতো, কারণ ওই রেজিমের কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। সেখান থেকে ইলেকশনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, আমরা এটাকে সাধুবাদ জানাই। নির্বাচনে ইউনূস সরকার তার প্রশাসনের সহযোগিতায় জাতীয় পার্টিকে একটিও আসন সংসদে দেয়নি এবং পুরো দেশে ভোটে লেস দ্যান ওয়ান পারসেন্ট করে ইঞ্জিনিয়ারড করে নামিয়ে নিয়ে এসেছে। এটি আর্টিফিশিয়ালভাবে করা হয়েছে, এটি অর্গানিক্যালি হতে পারে না। আমাদের অতীত যে ভোটের ট্রেন্ডস, এখন পর্যন্ত ৯টা ভোটে অংশগ্রহণ করেছি, খুব সম্ভবত এটা দশম ভোট। ৯টা ভোটের রেজাল্ট এক রকম হবে, ১০ নম্বর ভোটের রেজাল্ট সম্পূর্ণ আরেক রকম হবে, বাংলাদেশে কখনও এ রকম হয় না। আমরা হেরে যেতে পারি, কিন্তু আমরা তৃতীয় হব? আমাদের অনেক জায়গায় যারা রানিং এমপি, তারা জামানত হারিয়েছেন। তাদের নিজস্ব ফিক্সড ভোট ব্যাংক আছে, নিজস্ব এরিয়া আছে, নিজস্ব উপজেলা আছে, নিজস্ব ইউনিয়ন আছে, তারা অনেকবারের এমপি। এর মধ্যে একজন এমপি আছেন, তার লোকাল ইন্ডাস্ট্রি আছে, তার ইন্ডাস্ট্রিতেই ৩০-৪০ হাজার লোক চাকরি করে।

তিনি এর আগেরবারও স্বতন্ত্র এমপি হয়েছেন। তিনি এখন তৃতীয় হয়েছেন। আমাদেরকে তৃতীয় করা এবং লেস দ্যান ওয়ান পারসেন্ট ভোটে নামিয়ে আনার ব্যাপারটা গভর্নমেন্টের কৌশলে হয়েছে। যেহেতু লাস্ট গভর্নমেন্টের সঙ্গে আমাদের অ্যাডজাস্টমেন্ট ভালো ছিল না, তারাও আমাদেরকে ডাকেনি। আমরাও খুব ক্রিটিসাইজ করেছি এবং এ বিষয়ে হয়তো জামায়াত-বিএনপিরও কোনো অনাপত্তি ছিল না—মানে জাতীয় পার্টিকে আউট অব পার্লামেন্ট করে দেওয়ার ব্যাপারেও হয়তো তাদের কোনো আপত্তি ছিল না। সব মিলিয়ে অবশ্যই আমরা একটা ভোটে বিপর্যয় ফেস করছি, তবে রাজনৈতিক বিপর্যয় এটা না। আমরা মনে করি আমাদের রাজনীতি আছে এবং শক্তিশালীভাবেই ফিরে আসবে। কারণ আমরা কিছু আদর্শের ধারক-বাহক। আরেকটি ব্যাপার, ২০০৮ সালের পর এই প্রথমবার জাতীয় পার্টি সারা বাংলাদেশে ভোট করেছে। মার্কাটা ছিল, সারা বাংলাদেশে আমরা ভোট করেছি, কিন্তু জোট করিনি। আমরা জোট করতে পারতাম না তা কিন্তু না। আমরা জোট করে কিছু আসন নিয়ে বাকি আসনগুলোতে আমাদের প্রার্থীদের বসিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আমরা চেয়েছিলাম দেশব্যাপী ভোটের মাধ্যমে একটি সংগঠন হিসেবে ফিরে আসতে। ২০০১ এর মতো, বা ৯৬ বা ৯১ এর মতো। সে যাত্রাটায় প্রথমবারের মতো খুব সফল হয়েছি বলতে পারব না। কিন্তু আমাদের প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত ছিল, আমাদের মার্কাটা ছিল এবং এই যে এতগুলো আসনে আমাদের প্রার্থীদের এই যে থাকা—এটার লং টার্মে বেনিফিট আমরা পাব। সংগঠনটাকে এখন একটু গুছিয়ে শক্তিশালী করার সময়ও এখন আসছে। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করব।  

এশিয়া পোস্ট: ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনে আপনাদের অবস্থানের কারণে কি ভোট কমে গেছে? আপনারা বিষয়টি কীভাবে দেখেন।

শামীম হায়দার পাটোয়ারী: এটা সত্য যে আমরা আঠারোর (২০১৮) ভোটে গিয়েছিলাম, সবাই সেখানে গিয়েছিল। চৌদ্দর (২০১৪) ভোটে আমরা অনেকেই যাইনি, অনেকেই গিয়েছিল। সেই ভোটে এরশাদ, জিএম কাদের, আমি- সবাই সরাসরি ভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলাম। সে কারণে জিএম কাদের ৫ বছর সংসদের বাইরে ছিলেন। চব্বিশের ভোট নিয়ে অনেকে বলতে পারেন, কারণ সেখানে জামায়াত বা বিএনপি সেখানে অংশগ্রহণ করেনি, সেখানে আমরা অংশগ্রহণ করেছিলাম। এটা নিয়ে অবশ্যই জামায়াত-বিএনপির ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকবে। সেটার জন্য জাতীয় পার্টির কোর (মূল) ভোট যেটা, যারা জাতীয় পার্টিকে ৫-৬ বার ভোট দিয়েছে, সেই ভোটটা কমে যেতে পারে না। জিএম কাদের রংপুর সদরে ২০ হাজার ভোট পেতে পারেন না, কারণ তার নিজস্ব কর্মী বাহিনী আছে। একানব্বই সালেই তো জাতীয় পার্টি সেখানে লাখেরও বেশি ভোট পেয়েছিল। সেই জায়গা থেকে আমার মনে হয় যে ভোট কমতে পারে, কিন্তু এত ড্র্যাস্টিক্যালি কমে যেতে পারে না। তরুণ ভোটারদের আমরা কম ভোট পেয়েছি, কিন্তু পুরোনো ভোটারদের ভোটগুলো তো আমরা পাব।

আমি মনে করি ১৪, ১৮, ২৪ এ আমাদের ভূমিকা নিয়ে অনেকের মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। মিশ্র প্রতিক্রিয়া ইউনূস সরকারের ভূমিকা নিয়েও অনেকের আছে। জামায়াতের ভূমিকা নিয়েও আছে। বিএনপিরও ২০০৬ পর্যন্ত ভূমিকা নিয়ে আছে। বিএনপি সেই ২০০৬ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত ভিকটিম ছিল। এত বছর ভিকটিম থাকার পর মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। আমি মনে করি আমাদের প্রতিও মানুষের মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, কিন্তু সেটার জন্য আমাদের ভোট ১% এর নিচে নেমে আসতে পারে না। ১% এর নিচে নেমে আসার কারণ হচ্ছে, যারা ইলেকশনটি ইঞ্জিনিয়ারিং করছে, তারা নিশ্চিত ছিল যে আপার হাউস হচ্ছে, আর জাতীয় পার্টি ১% ভোট পেলেও আপার হাউসে তারা একটা সিট পাবে। সেই পথটাও বন্ধ করার জন্য তারা এটা করেছে। এখন তো গণপরিষদে যেহেতু শপথ নেয়নি বিএনপি সরকার, সেক্ষেত্রে তাদের জুলাই সনদ মানার ব্যাপারে কতটুকু বাধ্যবাধকতা আছে, আপার হাউস করার বাধ্যবাধকতা কতটুকু আছে, এটা একটা কনস্টিটিউশনাল ডিবেট। আমি এখন আপার হাউস না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি দেখছি। 

এশিয়া পোস্ট: পরবর্তীতে ৫ বছর পর আপনাদের দলের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে আপনারা কোনো পরিকল্পনা করেছেন?

শামীম হায়দার পাটোয়ারী: প্রথম পর্যায়ে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যদি পরিবেশ থাকে তাহলে আমরা প্রার্থী দেব এবং তাদের পক্ষে প্রচারণা করব। আমরা আমাদের ১ পারসেন্টকে বাড়িয়ে আস্তে আস্তে ২০-২৫% এ নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। আমি মনে করি বর্তমানে যে সরকার আছে, সামনের দিনে গিয়ে তারাও জনপ্রিয়তা হারাতে পারে, কারণ বাংলাদেশে সকল নির্বাচিত সরকারই একটা সময় জনপ্রিয়তা হারায়। জামায়াতে ইসলামী তাদের কোর ভোটের বাইরে কিছু ফ্লোটিং ভোট পেয়েছে। সে ভোটটা তারা ধরে রাখতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। আর স্বাধীনতার স্বপক্ষের অনেক ভোট আছে যারা কোনো প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছে না। আমরা এই সকলকে নিয়ে সামনে হয়তো একটা বড় প্ল্যাটফর্ম করব।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, জাতীয় পার্টির ভোট ফিরে আসবে, কারণ জাতীয় পার্টি একসময় দেশ শাসন করেছে, সুশাসনের মাধ্যমে করেছে। জাতীয় পার্টি সামনে কী করবে, এটার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তারা দিতে পারবে। পাশাপাশি, এই মুহূর্তে জাতীয় পার্টির আর কোনো পলিটিক্যাল ব্যাগেজ নাই। আমরা ভোটে অংশগ্রহণ করব কী করব না, তা নিয়ে অনেকের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু আমরা বলেছি যে আমরা ১৪-১৮-২৪ করেছি, কাজেই আমরা ২৬ এও (নির্বাচন) করব। যাতে কেউ বলতে না পারে যে আওয়ামী লীগ নাই, তাই তারা (জাতীয় পার্টি) ভোটে নাই। আমরা নিজস্ব স্বতন্ত্র অবস্থানে এখন দাঁড়িয়েছি। অবস্থানটা খুব শক্তিশালী তা আমি বলব না, তবে শক্তিশালী করে তোলার সম্ভাবনা এর আছে, এটা আমাদের রাজনৈতিক প্রেডিকশন। এ দেশের রাজনীতিটা বায়বীয় এবং সব সময়ই রাজনীতিতে ফ্লোটিং অনেক ভোট থাকে, ফ্লোটিং অনেক সমর্থন থাকে। যদি আমরা সঠিকভাবে সংগঠন করতে পারি, সরকারি নির্যাতনের শিকার না হই, সরকার যদি গণতান্ত্রিক থাকে, জাতীয় পার্টি আবার প্রস্ফুটিত হবে। 

এশিয়া পোস্ট: গত ১৪-১৫ বছরে আপনারা বিরোধী দলে ছিলেন। এই সময়ে নিজেদের পার্টি ভালোভাবে গোছাতে পারেননি কেন?

শামীম হায়দার পাটোয়ারী: এ বিষয়ে আমি মনে করি আমাদের পার্টির ব্যর্থতা আছে, দুর্বলতা আছে। আমি মনে করি ২০০৮ সালের পরই আমাদের জোটে না গিয়ে এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল। তবে এটাও সত্য, ২০১৪ সালের পর দেশে কোনো স্বাভাবিক রাজনীতি ছিল না। আপনি সরকারি আচ্ছাদনে থাকলে কিছু আসনে জিততে পারবেন, অন্য জায়গায় কোনোভাবেই জিততে পারবেন না। স্থানীয় এমপিরাও আমাদের সংগঠনকে দাঁড়াতে দেয়নি—আমাদের অফিস দখল করেছে, আমাদের লোকজনকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে, ভয় দেখিয়েছে, মামলা দিয়েছে। কাজেই আওয়ামী লীগের আমলে আমরা গ্রো করার সুযোগ পাইনি। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকার কারণে অ্যান্টি-আওয়ামী টোটাল ব্যাগেজটা আমাদের ওপর ছিল।

সরকারি প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় আওয়ামী লীগ সেখানে ভোটের ক্ষেত্রে রক্ষা পেত, কিন্তু জাতীয় পাার্টি সেভাবে পেত না। ফলে পার্টি ছিল গুটিকয়েক আসনের। সেখান থেকে পার্টিটি আবার ২০০-৩০০ আসনের দিকে যাচ্ছে। আমি মনে করি অতীতের দোষ-ত্রুটিগুলো মেনে নিয়ে ভুলগুলো বুঝে আমরা যদি ঠিকঠাক কাজ করি তাহলে আমাদের পার্টি আবার ভালোভাবে ফিরে আসবে। এ দেশে যারা ইসলামিস্ট না, তারা জামায়াত করবে না। এ দেশে যারা প্রো-লিবারেশন, তারা স্বাভাবিকভাবেই জামাত করবে না, যদিও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা জামায়াতে গিয়েছে। এ রকম বিপুলসংখ্যক ভোট ফ্লোটিং থাকবে, ফ্র্যাজাইল থাকবে, তারা একটা প্ল্যাটফর্ম খুঁজবে, আমরা তাদেরকে আমাদের প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসব। হ্যাঁ, আট থেকে চব্বিশ (২০০৮-২৪) আমাদের কিছু ব্যর্থতা ছিল, কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। কিছু বাধ্যবাধকতাও ছিল। একটা রেজিম ছিল সে সময়। একটা রেজিমের আন্ডারে আরেকটা দল প্রস্ফুটিত হতে পারে না। সে সময়ের রেজিম জাতীয় পার্টিকে নিয়ন্ত্রিত করে সীমিত রেখেছিল। সেখান থেকে জাতীয় পার্টি কিন্তু বের হয়ে গেছে। কাজেই আমরা মনে করি এটা আমাদের জন্য একটা অপরচুনিটি।

এশিয়া পোস্ট: গত দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন।

শামীম হায়দার পাটোয়ারী: সংস্কারের সাবস্ট্যান্টিভ আইডিয়াগুলোকে আমি খারাপ বলব না। এগুলোর প্রতি জাতীয় পার্টির পূর্ণ সমর্থন ছিল। কিন্তু আসলে সংস্কার তো হতে হবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে এবং কনসেন্সাসের ভিত্তিতে। আপনি দেশের সংস্কার করছেন, দেশের সকল মানুষের প্রতিনিধিকে নিয়েই সেটা করতে হবে। সেখানে আপনি যখন ৩০টি নিবন্ধিত দলকে বাদ দিয়ে সংস্কার করলেন, সেখানে যতই ভালো ভালো কথা থাকুক, সেটি গোড়া থেকেই ঐকমত্য সৃষ্টিতে ব্যর্থ হলো। পাশাপাশি এক-তৃতীয়াংশ ভোটার না-ভোট দিয়েছে। ৭৩ লাখ ভোট বাতিল হয়েছে হ্যাঁ-না ভোটে, আর  হ্যাঁ-না ভোট গণনার সময় সেভাবে পোলিং এজেন্ট ছিল না অনেক জায়গাতেই। ধারণা করা হচ্ছে যে, ’হ্যাঁ’ ভোটটি ইনফিলট্রেট করা হয়েছে, স্টাফিং করা হয়েছে, বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মানে ’হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, গণভোটের পক্ষে, জুলাই সনদের পক্ষে, সংস্কারের পক্ষে যে ঐকমত্যটি হওয়ার কথা ছিল— সেটি ভোটেও হয়নি, সেটি রাজনীতির মাঠেও হয়নি, ঐকমত্য কমিশনও করেনি। ঐকমত্যবিহীন একটি সংস্কার প্রস্তাব বিএনপি কতটুকু মানতে বাধ্য? এই প্রস্তাবগুলো বিএনপিকে সীমাবদ্ধ করবে।

ঐকমত্য থাকলে বিএনপি এটা মানতে বাধ্য হতো। যেহেতু ঐকমত্য হচ্ছে না, বিএনপি কেন নিজের ক্ষমতা কার্টেইল করবে অনৈক্যের একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে? আমরা সে সময় বলেছিলাম—আমাদেরকে ডাকেন, আমাদের মতামত নেন। আমরা এটাও বলেছিলাম, সংশোধিত আওয়ামী লীগকে নেন, একটা ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটা সনদ বা যেটাই হোক তৈরি করেন। এখানে আরও কিছু লিগ্যাল ইস্যু আছে। প্রেসিডেন্ট তার অর্ডিন্যান্স জারি করে সনদ করেছেন, প্রেসিডেন্ট তার অর্ডার জারি করেছেন। প্রেসিডেন্ট অর্ডার জারি করবেন কখন? যখন সংবিধান থাকবে না, যখন সংসদ থাকবে না। যখন সংসদ থাকবে, সংবিধান থাকবে, তখন সংবিধান অনুযায়ী অর্ডার হবে। যখন সংবিধান থাকবে না, তখন প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার হতে পারে। ১৯৭২ সালে হয়েছিল। ১৯৪৯-৫০-৫১ সালেও হয়েছিল। এখন প্রেসিডেন্ট একটি অর্ডার দিয়েছেন এই জুলাই সনদ সংক্রান্ত, এটি উনি কী ভিত্তিতে দিলেন? এটা দেওয়ার ক্ষমতা তার কোথায় আছে? তখন তো সংবিধান সাসপেন্ডেড না। তখনও সংবিধান আছে। তাহলে উনি অর্ডিন্যান্স দিতে পারেন, সেটাও সংবিধানের আলোকে। অর্ডিন্যান্সের ক্ষমতা আর্টিকেল ৯৩-এ বলেছে, যে বিষয়ে পার্লামেন্ট আইন পাস করতে পারবে না, সে বিষয়ে অর্ডিন্যান্স জারি করা যাবে না। অর্থাৎ আপনি জুলাই সনদ দিয়ে যে জিনিসগুলো নিয়ে আসলেন, তার অনেকগুলোই পার্লামেন্ট সে সময়ে পাস করতে পারত না। সংবিধানের কোনো সংস্কার আপনি অর্ডিন্যান্স দিয়ে করতে পারবেন না।

আপনি দেখবেন, রাষ্ট্রপতির অর্ডার যেটা দেওয়া হয়েছে, সেখানের বিষয়গুলো সরাসরি সংবিধানকে অ্যামেন্ডমেন্ট করার কথা বলা আছে। তাহলে আপনি সংবিধান সংশোধনের জন্য অর্ডিন্যান্স দিয়ে পারবেন না, কিন্তু অর্ডার দিয়ে করলেন, যখন সংবিধান ছিল! ইউ ক্যান নট ইট দ্য কেক অ্যান্ড হ্যাভ ইট অ্যাট দ্য সেম টাইম। অর ইউ ক্যান নট ব্লো হট অ্যান্ড কোল্ড অ্যাট দ্য সেম টাইম। আপনি সংবিধান রাখবেন, আবার সংবিধান মানবেন না—এটা হতে পারে না। এই বিষয়গুলোতে আমি মনে করি বিগত অন্তর্বর্তী সরকার একটা হচপচ সংস্কার করেছে এবং অনৈক্যের ভিত্তিতে করেছে—যেটি রাজনৈতিক সংকট তো কমালোই না, বরং আরও বাড়াল বলে আমি মনে করি। আর এ কারণে বর্তমান সংস্কারের যে ভবিতব্য সরকার, তারা যে এগুলো মেনে নেবে, এ সম্ভাবনাও কমে এলো। 

এশিয়া পোস্ট: সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নিয়েছে। এটা নিয়ে কি কোনো বিরোধ তৈরির শঙ্কা রয়েছে?

শামীম হায়দার পাটোয়ারী: এগেইন, এখানে কনস্টিটিউশনাল ইস্যু চলে আসে। নির্বাচন কমিশন শপথ নেয় সংবিধান সমন্বিত রেখে নির্বাচন করার জন্য। যে গণভোট সংবিধানে নাই, নির্বাচন কমিশন কি সেই গণভোট করতে পারে? নির্বাচন কমিশন যে গণভোট করল, এটা কোন সংবিধানের আন্ডারে? এটা অর্ডারের আন্ডারে—যে অর্ডারের লিগ্যাল ডিফেক্টটা আমি একটু আগেই বললাম। এখন সংবিধান সংস্কার কমিশনের কথা গণভোটে পাস হয়েছে। এখন গণভোট কি সংসদকে বেঁধে ফেলতে পারে? আমি বলেছিলাম আগে, বিয়ের আগে কি বাচ্চার আকিকা করা যায়? বিয়ে হবে, রেজিস্ট্রি হবে, বাসররাত হবে, তারপর বাচ্চা হবে, তারপর আকিকা হবে। গণভোটের মাধ্যমে সংসদীয় ভোটের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সংসদকে আপনি বেঁধে ফেলতে চাচ্ছেন।

পার্লামেন্ট ক্যান নট বাইন্ড ফিউচার পার্লামেন্ট। পার্লামেন্টের সভরেন্টি এটা বলে না। ঐকমত্য কমিশন সভেরিন না। রাষ্ট্রপতি সভেরিন না। পার্লামেন্ট সভেরিন। সেই সভেরিন পার্লামেন্ট এখন গণপরিষদে কিংবা কনস্টিটিউশনাল অ্যাসেম্বলিতে শপথ নেবে কি না। কনস্টিটিউশনাল অ্যাসেম্বলি কখন হয়— যখন সংবিধান থাকে না। একটা সংবিধান থাকা অবস্থায় সংবিধান সংস্কার গণপরিষদ হয়, এমনটা আমি শুনিনি। এটা আনইউজুয়াল। এগেইন, আপনি সংবিধান রাখছেন, আবার গণপরিষদ করছেন। সাধারণত বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যে গণপরিষদ হয়, সংবিধানকে সাসপেন্ড করেই হয়। আপনি শপথ নিলেন—সংবিধান সমুন্নত রাখিব আমি, এমপি হিসেবে, আর পরের শপথটা গণপরিষদের শপথটা হবে সংবিধানের বাইরে। তাহলে আপনি সংবিধান সমুন্নত রাখার শপথ নিয়ে আবার সংবিধান ভঙ্গের  শপথ নিতে পারবেন? সেখান থেকে আমি মনে করি বিএনপি সাংবিধানিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে অবশ্যই আমি বলব, বিএনপি কিছুটা ছলচাতুরী করেছে। বিএনপি তার এই মনোভাবটা ভোটের আগে দেখায়নি, ভোটের পরে দেখাচ্ছে। এটাও জনগণ কিছুটা বিরূপভাবে নেবে। আমার ব্যক্তিগত আন্ডারস্ট্যান্ডিং, সংসদীয় পদ্ধতিতে সংস্কার হবে—ঠিক গণভোটের ভিত্তিতে হবে না। হয়তোবা এই সংস্কারগুলো আবার অ্যামেন্ডমেন্ট হিসেবে আসবে, অ্যামেন্ডমেন্ট হিসেবে পাস করবে, তারপর আবার গণভোটে যাবে। ভবিষ্যতে আরও গণভোট হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি আমি। 

এশিয়া পোস্ট: সংস্কার নিয়ে এখন তাহলে কী হতে পারে।

শামীম হায়দার পাটোয়ারী: ছয় মাসের একটা বাধ্যবাধকতা গণভোটে ছিল। ছয় মাস পরে আসলে কী হবে সেটা ওখানে বলা নাই। ছয় মাস পরে এটা ‘ফাংকটাস অফিশিও’ হতে পারে, অটোমেটিক্যালি ল্যাপস হয়ে যেতে পারে, গণভোটটার এফেক্ট চলে যেতে পারে। যেমনটি আমি বলেছি, পার্লামেন্ট সভেরিন এবং বিএনপি অ্যাবসিলিউট মেজরিটি পেয়েছে। এখন বিষয়গুলো বিএনপির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে। 

এশিয়া পোস্ট: নতুন কোনো সংকট কি তৈরি হতে পারে?

শামীম হায়দার পাটোয়ারী: এটা নিয়ে ক্রাইসিস করলেও আমার মনে হয় জামায়াত বা এনসিপি এটা নিয়ে বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারবে না। কারণ ঐকমত্যটা তো সৃষ্টি হয়নি—সংস্কারের পক্ষে, গণভোটের পক্ষে, জুলাই সনদের পক্ষে। যেটা আসলে সেই সময় অনায়াসে করা যেত। এখন দেখা যাবে বিপুল অংশের লোক, দল এর বিরুদ্ধেই দাঁড়াবে। জামায়াত এবং এনসিপি যখন এর পক্ষে আন্দোলন করবে, এর বিপক্ষের সব শক্তি তখন আবার এক হবে। তখন দেখা যাবে, নিক্তির পাল্লায় জামায়াত-এনসিপির জোটের থেকে এর বিপক্ষের শক্তিটাই ভারী হবে। বিএনপি খুব ভাগ্যবান যে তারা এ রকম একটি রাজনৈতিক অবস্থানে চলে গেছে। জিয়াউর রহমানও এমন ছিলেন। তার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি এমন ছিল যে, উনি সৌভাগ্য ডেকে আনতেন না, সৌভাগ্য তার কাছে চলে আসত। পদ নিজেই ওনার কাছে আসত। তারেক জিয়া (তারেক রহমান) এখন এমন একটি অবস্থানে আছেন যে বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান তার মধ্যেই আছে। একটা আলট্রা ইসলামিক ট্র্যানজিশন থেকে ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন, একটা প্রো-লিবারেশন ট্রানজিশন, যারা সংস্কার চাচ্ছে না, যারা গণভোটকে খুব একটা ওউন করে না; তাদের জন্যও তারেক জিয়া এখন হচ্ছে এমবডিমেন্ট অব ইউনিটি। তো তারেক জিয়া সাহেব এখন এটাকে কতটা ইউজ করবেন বা কতটা অ্যাবিউজ করবেন না (সেটি দেখার বিষয়)।

আমাদের দেশে সমস্যা হচ্ছে প্রাইম মিনিস্টার পদটি এত পাওয়ারফুল, এখানে আপনি একই সঙ্গে সংসদের প্রধান, ক্যাবিনেটের প্রধান, একইসঙ্গে আপনি সেনাপ্রধানদের নিয়োগ দিচ্ছেন, স্পিকার নিয়োগ দিচ্ছেন, চিফ জাস্টিসও ডি-ফ্যাক্টো আপনিই দিচ্ছেন—সবকিছুই। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি ওনার অবশ্যই ইনক্লুসিভ অ্যাপ্রোচে দেশ চালাতে হবে। অ্যাবসিলিউট মেজরিটির ফ্লেভার দিয়ে উনি যদি চালান, তাহলে সেটা আস্তে আস্তে একটা টাইর‌্যানির দিকেই যাবে। বাংলাদেশের সমস্ত ইনস্টিটিউশন সরকারকেই তোষামোদ করে, এবং সরকারের টাইর‌্যান্ট হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো রক্ষাকবচ নাই। জুডিশিয়ারি, মিডিয়া—কেউ পারে না। তো সেইটা জনাব তারেক জিয়ার নিজস্ব উপলব্ধি, ১৭ বছর উনি নির্যাতিত ছিলেন, ওনার মা দুই বছর জেলে ছিলেন এবং উনি নির্বাসিত ছিলেন। কাজেই তাকে দেশ রক্ষার জন্য সকলের সঙ্গে কথা বলে, তোষামোদ থেকে দূরে থেকে, ক্ষমতার অ্যাবিউজ থেকে দূরে থেকে দেশ চালাতে হবে।