logo

রাজনীতি আসলে এক ধরনের যুদ্ধ: তৌহিদুর রহমান আউয়াল

রাজনীতি আসলে এক ধরনের যুদ্ধ: তৌহিদুর রহমান আউয়াল
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

ছাত্ররাজনীতির বর্তমান ধারা, নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ ও নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সহসভাপতি তৌহিদুর রহমান আউয়াল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাহাত রূপান্তর

এশিয়া পোস্ট: কেমন আছেন?
তৌহিদুর রহমান আউয়াল: আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্ররাজনীতিতে আপনার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? প্রথম মিছিল বা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা বা স্মৃতি কেমন ছিল?

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: আমার রাজনৈতিক দীক্ষা বা গ্রুমিংটা মূলত পরিবার থেকেই এসেছে। আমার বাবা-মা রাজনৈতিকভাবে সচেতন। ২০০১ সালে যখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি, তখন থেকেই দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে আমার আদর্শ হিসেবে দেখা শুরু করি। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের শেষ দিকে লগি-বৈঠার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় স্লোগান দেওয়ার স্মৃতি আছে। পরে ২০০৮ সালে যখন মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পাই, তখনকার আন্দোলনের স্মৃতিগুলো এখনও মনে আছে।

এশিয়া পোস্ট: রাজনীতি নিয়ে কখনো হতাশ হয়েছেন? 

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব আশাবাদী মানুষ, তাই হতাশ হওয়ার প্রবণতা নেই। তবে রাজনীতি আসলে এক ধরনের যুদ্ধ। এখানে ধৈর্য ধরে থাকতে হয়। আমি একজন চিকিৎসক, এমডি ডিগ্রি আছে। চাইলে অন্যভাবে ক্যারিয়ার গড়তে পারতাম। আমার সমসাময়িক অনেক বন্ধু এখন সুন্দর পারিবারিক জীবনযাপন করছে। কিন্তু রাজনীতির কারণে আমার ব্যক্তিগত জীবন বলতে তেমন কিছু নেই। পরিবারকে সময় দিতে না পারার একটা আফসোস মাঝে মাঝে কাজ করে।

এশিয়া পোস্ট: পরিবার থেকে কখনও রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার চাপ এসেছে?

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: আগে হয়তো পরিবারে এ ধরনের ভাবনা ছিল। কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আমার ভূমিকা দেখার পর তারা এখন গর্ববোধ করে। তারা বিশ্বাস করে যে, আমি চাঁদাবাজি করব না বা মানুষের ক্ষতি করব না। এই আস্থার জায়গা থেকেই এখনও আমার বাবা-মা আমাকে পকেট মানি দেন।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্ররাজনীতি কি আজকাল আদর্শের চেয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে? 

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যেই ছাত্রদল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই জায়গা থেকেই ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য মেধাবী নেতৃত্ব তৈরি করা। কিন্তু ফ্যাসিবাদী আমলে ছাত্ররাজনীতি শুধু শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের বন্দনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল।

এশিয়া পোস্ট: আগামী দিনে ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
তৌহিদুর রহমান আউয়াল: বড় চ্যালেঞ্জ হলো তরুণ প্রজন্মকে সুযোগ-সুবিধার জন্য নয়, বরং আদর্শিক রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করা। ক্যাম্পাসগুলোতে আবার শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং মেধাবীদের রাজনীতিতে নিয়ে আসা আমাদের লক্ষ্য।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলে নেতাদের বয়স নিয়ে সবসময় সমালোচনা হয়ে থাকে। শিগগিরই ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব আসবে শোনা যাচ্ছে। নতুন কমিটির নেতৃত্ব নির্বাচনেও কী আগের ধারাবাহিকতা থাকবে নাকি নতুনদের সামনে নিয়ে আসা হবে? 

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতাকে আমি অনেকটা সেগুন গাছের সঙ্গে তুলনা করি। এটি বড় হতে সময় লাগে, কিন্তু একবার বড় হলে দীর্ঘস্থায়ী হয়। আমার নিজের ছাত্র রাজনীতির বয়স এখন প্রায় আঠারো বছর। তবে নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে আসার সুযোগ অবশ্যই তৈরি করতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্ররাজনীতিতে অভিজ্ঞ ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা যেতে পারে? 

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: আমরা একটি সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ চাই। অভিজ্ঞতার একটা মূল্য আছে। আবার নতুনদেরও সুযোগ দিতে হবে। যারা আন্দোলনে সক্রিয় ছিল, তাদের সমন্বয় করেই নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ক্ষোভের সবচেয়ে বড় কারণ কী ছিল?

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: হাসিনার ফ্যাসিজমই মূল কারণ। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এক সময় বিস্ফোরণে রূপ নেয়। আমি এটাকে অনেকটা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানো পানির মতো বিস্ফোরণ বলি। আমরা ৯৯%-এ উঠিয়েছি। যখন ছাত্রসমাজ এসেছে, তখন শতভাগ হয়ে বিস্ফোরণ হয়েছে।

এশিয়া পোস্ট : জুলাই আন্দোলনের এমন কোনো স্মৃতি আছে যা এখনও মনে নাড়া দেয়?

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: আমার যে স্বাভাবিক দিনযাপনে ফিরতে পারব, এটা তখন ভাবতে পারিনি। ১৯ জুলাই আমার নির্দেশে কালো পতাকা আনতে গিয়ে ছাত্রদলের এক ছোট ভাই রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর সরকারি গোয়েন্দা বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে দল ও দেশের স্বার্থে রাজি হয়নি। পরে কৌশলে ওয়ার্ড বয়ের পোশাক পরে ট্রলি টেনে সেখান থেকে বের করা হয়। সে ঘটনাটা এখনো মনে হলে গা শিউরে ওঠে।

এশিয়া পোস্ট: জুলাইয়ের সময় যে ঐক্য দেখা গিয়েছিল, এখন সেখানে ফাটল কেন মনে হচ্ছে?

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: সংকটের সময় মানুষ এক থাকে। তখন সবাই একই লক্ষ্য নিয়ে এগোয়। কিন্তু ভালো সময় এলে মানুষের পছন্দ আলাদা হয়ে যায়। ফ্যাসিবাদের পতনের পর এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সেই পার্থক্যগুলো স্পষ্ট হচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতি থেকে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা কী রয়েছে? 

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: সমঝোতার ক্ষেত্রে কিছু নীতিগত জায়গায় স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। শিবিরের অনেক নীতি আইসবার্গের মতো গোপন থাকে। যেমন নারীদের অংশগ্রহণ বা কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাদের অবস্থান কী, সেটা অস্পষ্ট। আমার মনে হয়, তাদের এই বিষয়গুলো স্পষ্ট থাকা উচিত।

এশিয়া পোস্ট: অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা কতোটা পূরণ হয়েছে বলে মনে করেন? 

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। অতীতে কোনো গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্ররা সরাসরি সরকারের অংশ হয়েছে এমন উদাহরণ নেই। এখন কিছু ছাত্র উপদেষ্টা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা নিয়ে ঠিকভাবে কাজ করছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

এশিয়া পোস্ট: বাকি প্রত্যাশাগুলো বিএনপি সরকার পূরণ করতে পারবে বলে আপনি মনে করেন কি?

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: আমাদের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। তিনি সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন।

এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনের পর দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হচ্ছে। তারেক রহমান প্রটোকল কমানো এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মতো বিষয়েও নির্দেশ দিয়েছেন। এসব উদ্যোগ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট: বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটা পরিবর্তন আসবে? 

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: ইতোমধ্যে পরিবর্তনের কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তারেক রহমান বিরোধী মতের নেতাদের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। আগে বিরোধী মতের মানুষকে অনেক সময় অচ্ছুৎ মনে করা হতো। এখন সেই সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট: রাজনীতি না করলে নিজেকে কোথায় দেখতে পেতেন?

তৌহিদুর রহমান আউয়াল: ইহকালে আমাদের সব স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব নয়। রাজনীতি না করলে একজন চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা করতাম। এখন চেষ্টা করছি রাজনীতি ও চিকিৎসা দুই ক্ষেত্রেই মানুষের জন্য কাজ করতে। ছাত্রদলে গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই।