৫ হাজার টাকা নিয়ে যাত্রা শুরু করা মামুনের এখন শত কোটির ব্যবসা

বাংলাদেশের প্রযুক্তি, টেক্সটাইল ও আবাসনসহ বহুমাত্রিক শিল্প খাতের সফল উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তি নেতা আব্দুর রহমান মামুন। ২০১৩ সালে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘নেটিজেন আইটি লিমিটেড’-এর ‘এডুমেন’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে দেশের প্রায় পাঁচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ডিজিটালাইজ করার পাশাপাশি ৩০ লাখ শিক্ষার্থী ও ১ লাখ শিক্ষকের কাছে প্রযুক্তি সেবা পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। পরবর্তীতে ড্রিম টেক্সটাইল, ওয়ে হাউজিং ও নেটকম লার্নিং-এর মাধ্যমে টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারিং, লো-কস্ট আবাসন, গ্লোবাল এআই ও সাইবার সিকিউরিটির মতো ভিন্ন ভিন্ন খাতে সফল ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ আদর্শ স্কুল ও নারায়ণগঞ্জ কলেজে পড়াশোনা শেষে লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সিসিএন ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ সম্পন্নকারী আব্দুর রহমান মামুন তার উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি, সাহসিকতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের জন্য সুপরিচিত। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘বিয়ন্ড বিজনেস’-এ তিনি কথা বলেছেন তার শৈশব, অষ্টম শ্রেণিতে প্রথম অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা শুরু, নেটিজেন আইটি ও এডুমেন সফটওয়্যারের বিকাশ, বহুমাত্রিক ব্যবসার চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছেন রিয়াজুল করিম। প্রযোজনা করেছেন জায়েদ আল মাহবুব।
এশিয়া পোস্ট: আপনাকে বিয়ন্ড বিজনেসে স্বাগতম। শুরুতেই জানতে চাই, আপনি এ পর্যন্ত কোন কোন খাতে ব্যবসা করেছেন এবং ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির সার্বিক চিত্র বা রেভিনিউ কেমন ছিল?
আব্দুর রহমান মামুন: আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। শুরুতেই বলি, আমি খুবই ক্ষুদ্র একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার শুরুর দিকে বড় সাফল্যের কথা বললে, ২০১৩ সালে নেটিজেন আইটি লিমিটেড নামে আমাদের প্রযুক্তি ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। আমরা মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটালাইজ করার কাজ করতাম। এর জন্য ‘এডুমেন’ নামের একটি ইআরপি সফটওয়্যার আমরা ডেভেলপ করি। সম্পূর্ণ লাইফসাইকেলে আমরা প্রায় পাঁচ হাজার স্কুলকে ডিজিটালাইজ করেছি, যেখানে প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী এবং এক লাখের মতো শিক্ষক আমাদের অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করতেন। আমি এই প্রযুক্তি উদ্যোগের কো-ফাউন্ডার ছিলাম। বাকি যেসব ব্যবসার কথা বললেন, সেগুলোতে আমি পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছি।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৩ সালে নেটিজেন আইটি যখন শুরু করেন, তখন আপনাদের ব্যক্তিগত ইনভেস্টমেন্ট কেমন ছিল এবং টোটাল কত রেভিনিউ জেনারেট করতে পেরেছিলেন?
আব্দুর রহমান মামুন: ইনভেস্টমেন্ট ছিল খুবই সামান্য- মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম। তখন তো মাত্র স্টুডেন্ট লাইফ শেষ করেছি। আর রেভিনিউয়ের কথা বললে, আমরা সম্পূর্ণ লাইফসাইকেলে একটি বড় অঙ্কের রেভিনিউ জেনারেট করতে পেরেছিলাম।
এশিয়া পোস্ট: এত বড় একটা প্রজেক্টে আপনার সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল এবং আপনাদের টিমে কারা ছিলেন?
আব্দুর রহমান মামুন: আমার ব্যাকগ্রাউন্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং। আমি মূলত টেকনোলজি পার্টটা দেখতাম। শুরুতে আমি সিটিও এবং পরবর্তীতে সিইওর দায়িত্ব পালন করি। একদম স্ক্র্যাচ লেভেল কোডিং করা, ডাটাবেজ ডিজাইন এবং সার্ভার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন- সবই দেখতে হতো। আমার সাথে অন্য পার্টনাররা অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট সামলাতেন। শুরু করেছিলাম রায়হান নোবেলকে সাথে নিয়ে। পরবর্তীতে জাকারি আশিক খান এবং শাহিদ ভাই আমাদের সাথে যুক্ত হন। আমরা চারজন মিলে ব্যবসাটিকে পরের ধাপে নিয়ে যাই।
এশিয়া পোস্ট: আইটি খাতের পাশাপাশি আপনাকে আমরা ড্রিম টেক্সটাইল-এ ডিরেক্টর হিসেবে দেখছি। আইটি থেকে টেক্সটাইলে আসার গল্প ও আয়ের চিত্রটি কেমন?
আব্দুর রহমান মামুন: ড্রিম টেক্সটাইলের মূল প্রতিষ্ঠাতা আমি নই। আমার স্কুলের বন্ধু তনু কুমার সাহা ও শাহিন এটি শুরু করে, পরবর্তীতে আমি তাদের সাথে যুক্ত হই। আমার একটি ব্যক্তিগত রূপকল্প বা ভিশন রয়েছে- মানুষের মৌলিক ছয়টি চাহিদা: অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করা। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রেখে আমি তৃপ্ত ছিলাম। এরপর বস্ত্রখাতে অবদান রাখার ইচ্ছা থেকে টেক্সটাইলে যুক্ত হওয়া। গত ছয় মাসে এই টেক্সটাইল খাত থেকে আমাদের ১৮৩ কোটি টাকার টার্নওভার ছিল।
এশিয়া পোস্ট: বাসস্থান বা আবাসন খাত নিয়েও তো আপনি কাজ করছেন। সেটির অগ্রগতি সম্পর্কে বলুন।
আব্দুর রহমান মামুন: আবাসন খাতের জন্য ওয়ে হাউজিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে আমি যুক্ত হই। সেটির মূল উদ্যোক্তা আমি নই, তবে পরবর্তীতে যুক্ত হয়ে ডিএমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। আমার পার্টনার বাপি ভাইয়ের সাথে আমরা ঢাকার বাইরে গ্রাম পর্যায়ে সাশ্রয়ী মূল্যে লো-কস্ট হাউজিং নিয়ে কাজ করি, যাতে আবাসন বিকেন্দ্রীকরণ করা যায়। গত বছর এই আবাসন খাত থেকে আমাদের প্রায় ৬৫ কোটি টাকার রেভিনিউ ছিল।
এশিয়া পোস্ট: আপনার শিক্ষাজীবন এবং একদম শুরুর অনানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক ব্যবসার প্রথম অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আব্দুর রহমান মামুন: আমি নারায়ণগঞ্জ আদর্শ স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং নারায়ণগঞ্জ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করি। এরপর লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির (ভুই আইটি) মাধ্যমে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিস্টেন্স লার্নিং করি। পরবর্তীতে ব্যবসা ভালোভাবে বোঝার সুবিধার্থে সিসিএন ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ সম্পন্ন করি। একদম শুরুতে, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় মোমবাতি বানিয়ে বিক্রি করতাম। ওই সময়ে প্রচুর লোডশেডিং হতো, আমরা মোমবাতি বানিয়ে স্থানীয় এলাকায় বিক্রি করতাম- সেটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা। আর ২০১৩ সালে নেটিজেন আইটির মাধ্যমে আমাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক ব্যবসার সূচনা হয়।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৩ সালে নেটিজেন আইটি লিমিটেডের শুরুর দিকের প্রোডাক্ট ও স্কুল ডিজিটালাইজেশনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আব্দুর রহমান মামুন: সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে শুরুতে আমরা পস (POS) সিস্টেম বানিয়ে আজিজ সুপার মার্কেট ও সায়েন্স ল্যাবের দোকানগুলোতে ট্রাই করি। তবে শিক্ষা খাতের প্রতি ভালো লাগা থেকে পেন্সিল (পরবর্তীতে এডুমেন) নামে সফটওয়্যারটি তৈরি করি। ২০১৩ সালে অধিকাংশ স্কুলে কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। শিক্ষকদের ক্ল্যারিক্যাল কাজ অনেক বেশি করতে হতো। আমরা সফটওয়্যার দিয়ে এটেন্ডেন্স, রেজাল্ট প্রসেসিং ও অ্যাকাউন্টসের কাজ সহজ করে ফেলি।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৩ সালের প্রেক্ষাপটে যখন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার বা ইন্টারনেট পৌঁছায়নি, তখন স্কুল প্রধানদের রাজি করানো ও প্রযুক্তি শেখানোর ক্ষেত্রে কী কী চ্যালেঞ্জ ফেস করেছেন?
আব্দুর রহমান মামুন: সে এক বড় চ্যালেঞ্জের গল্প। ঢাকার ভিকারুন্নেসা বা মনিপুর স্কুলের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অলরেডি সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু করেছিল, ফলে ঢাকা মার্কেট কিছুটা স্যাচুরেটেড ছিল। তখন আমার পার্টনার নোবেল ভাই ও আমি চিন্তা করলাম—ঢাকার বাইরের স্কুলগুলো প্রযুক্তির আলো থেকে একেবারেই বঞ্চিত। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকার বাইরের প্রান্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকনোলজির আওতায় আনব। কিন্তু ঢাকার বাইরের শিক্ষকদের কম্পিউটার শেখানো এবং সফটওয়্যার ডেপ্লয় করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। অনেকে মাইক্রোসফট ওয়ার্ডও চালাতে পারতেন না, তারা বলতেন সফটওয়্যারের জন্য কেন টাকা দেব।
এশিয়া পোস্ট: ঢাকার বাইরের প্রান্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সফটওয়্যার পৌঁছাতে আপনারা কী ধরনের মডেল ব্যবহার করেছিলেন?
আব্দুর রহমান মামুন: ঢাকার বাইরের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা প্রচলিত মার্কেটিং বা সেলস এক্সিকিউটিভ নিয়োগ না করে ভিন্ন পথ বেছে নিই। সারা বাংলাদেশ থেকে যাদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা আছে, তাদের খুঁজে বের করি। টানা চার বছরে প্রায় ৬ হাজার তরুণকে সফটওয়্যার ও সেলস বিষয়ে ট্রেনিং দিই। সেখান থেকে বাছাই করে এক হাজার ২০০ প্রতিনিধি স্থায়ী করি। দেশের ৪৯২টি উপজেলার মধ্যে ৪৯০টিতেই আমাদের প্রতিনিধি ছিল। তারা রুট লেভেলে গিয়ে টিচারদের ট্রেইন্ড করাত এবং সফটওয়্যার ডেপ্লয় করত। প্রতিটি স্কুল থেকে ছাত্রপ্রতি ৫, ১০ বা ২০ টাকা মাসিক চার্জ নেওয়া হতো এবং আয়ের একটি বড় অংশ ওই স্থানীয় প্রতিনিধিদের দেওয়া হতো। এতে তাদের নিজস্ব ইনকাম হতো এবং একটি টেকসই উইন-উইন মডেল তৈরি হয়েছিল।
এশিয়া পোস্ট: যাদের ট্রেইন আপ করলেন, তাদের অন্য প্রতিযোগীদের কাছে চলে যাওয়ার বা নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার একটা ঝুঁকি থাকে। এই ঝুঁকি আপনারা কীভাবে সামলেছেন?
আব্দুর রহমান মামুন: প্রথমত, আমরা তাদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা ও সার্ভিস ফি দিতাম। দ্বিতীয়ত, একটি বড় অ্যাপ্লিকেশন সামলানো এবং লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ডেটা প্রসেস করা কারিগরিভাবে অত্যন্ত জটিল। আগে দেখা যেত এসএসসির রেজাল্টের দিন সরকারি সার্ভার ডাউন হয়ে যেত। কিন্তু ২০১৯ সালে আমরা একসাথে ২২ লাখ শিক্ষার্থীর রেজাল্ট প্রসেস করেছি এক ন্যানো সেকেন্ডের জন্যও সার্ভার ডাউন হওয়া ছাড়া। এই ধরনের উচ্চমানের টেকনিক্যাল সাপোর্ট তৈরি করা সবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে তারা ঝুঁকি না নিয়ে আমাদের সাথে থেকেই স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করেছে।
এশিয়া পোস্ট: নেটিজেনের ব্যবসার গোল্ডেন টাইম কোন সময়টি ছিল এবং এর পেছনে মূল কারণ কী ছিল?
আব্দুর রহমান মামুন: ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল ছিল আমাদের সবচেয়ে সেরা সময়। এই সময়ে আমাদের প্রশিক্ষিত প্রতিনিধি টিম মাঠপর্যায়ে দারুণ পারফর্ম করতে শুরু করে। একই সাথে স্কুলগুলোও ডিজিটালাইজড হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে এবং সরকারের ডিজিটাল এজেন্ডাও এতে সহায়তা করে।
এশিয়া পোস্ট: বাজারে একটি কথা প্রচলিত আছে, সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের সাথে নেটিজেনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক কেমন ছিল বা উনি ব্যবসায় কীভাবে ইনফ্লুয়েন্স করেছিলেন?
আব্দুর রহমান মামুন: উনি মূলত আমাদের কোম্পানির একজন ডিরেক্টর ছিলেন। শিশুদের (শ্রেণি ০ থেকে ৫) জন্য তৈরি উনার লার্নিং সফটওয়্যার এবং আমাদের এডুমেন সফটওয়্যার- এই দুটি প্যাকেজ করে আমরা স্কুলে বিক্রি করতাম। উনি মূলত আমাদের উইন-উইন প্রোডাক্ট পার্টনার ছিলেন। এ ছাড়া চাইনিজ কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপে আমরা ডিজিটাল অ্যাটেনডেন্স ডিভাইসও স্কুলে সরবরাহ করতাম।
এশিয়া পোস্ট: ১০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব জেনারেট করা একটি সফল ও লাভজনক আইটি ব্যবসা ছেড়ে হঠাৎ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নেটকম লার্নিংয়ে যোগ দেওয়ার কারণ কী ছিল?
আব্দুর রহমান মামুন: কোভিডের সময় টানা প্রায় দুই বছর স্কুল বন্ধ থাকায় আমাদের প্রচুর ক্যাশ বার্ন হয়। আমরা ভেবেছিলাম এক-দুই মাস পর স্কুল খুলে যাবে, তাই প্রায় দেড় বছর পুরো অপারেশন সচল রাখায় বড় ধরনের লিকুইডিটি ক্রাইসিসে পড়ি। এর পাশাপাশি আমার অন্যান্য খাত এক্সপ্লোর করার পরিকল্পনা ছিল। ঠিক ওই সময়ে ইউএসএভিত্তিক নেটকম লার্নিং বাংলাদেশ থেকে এআই ও ফিউচার স্কিলস নিয়ে কাজ করার প্রস্তাব দেয়। নেটকম হচ্ছে ইউএসএর শীর্ষ টেক প্রোভাইডারদের একটি, যাদের ক্লায়েন্ট তালিকার ৮০ শতাংশই ফরচুন ১০০০ কোম্পানি। ফলে আন্তর্জাতিক মানের বিজনেস শেখার ও বড় পরিসরে গ্লোবাল কাজ করার সুযোগ হিসেবে আমি এটি গ্রহণ করি।
এশিয়া পোস্ট: নেটকম লার্নিং বাংলাদেশে এআই ও দক্ষতা উন্নয়নে কী কী ভূমিকা রাখছে?
আব্দুর রহমান মামুন: গত ৩ বছরে আমরা বাংলাদেশে প্রায় ৬০০টির বেশি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে (যেমন বেক্সিমকো, গ্রামীণফোন, রবি) বিটুবি মডেলে প্রযুক্তি আপস্কিলিং ট্রেনিং দিয়েছি। এ ছাড়া মাইক্রোসফটের সাথে যৌথভাবে ৮৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘এজেন্টেক্স’ (AgentX) প্রোগ্রাম চালুর মাধ্যমে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীকে ট্রেইন করা হয়। আমাদের এই প্রোগ্রামটি মাইক্রোসফট হেডকোয়ার্টারে প্রশংসিত হয় এবং পরবর্তীতে আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও এটি বাস্তবায়ন করা হয়। বর্তমানে আমরা সাইবার সিকিউরিটি নিয়েও কাজ শুরু করেছি।
এশিয়া পোস্ট: সাইবার সিকিউরিটির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বর্তমান নিরাপত্তা ঝুঁকিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আব্দুর রহমান মামুন: এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জনেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে সাইবার অ্যাটাক, স্ক্যাম বা ডেটা ব্রিজের শিকার হচ্ছেন। আমরা মনে করি শুধু ব্যাংক অ্যাকাউন্টের টাকা চুরি হওয়াই ক্রাইম; কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত ডেটা চুরি হওয়া আরও বড় অপরাধ। বর্তমানে ডেটা লিক হওয়ার কারণে প্রচুর তরুণ-তরুণী ব্ল্যাকমেলের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। ব্যাংকে টাকা থাকার চেয়ে ব্যক্তিগত ডেটার মূল্য এখন অনেক বেশি। পৃথিবীর কোনো সিস্টেমই শতভাগ হ্যাক-প্রুফ নয়, ফেসবুকও ডেটা লিক থেকে নিরাপদ নয়। তাই কারিগরি সুরক্ষার চেয়েও বেশি প্রয়োজন জনসাধারণ ও শিশুদের মধ্যে সাইবার সচেতনতা তৈরি করা।
এশিয়া পোস্ট: বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এআইয়ের যে সুফল পাচ্ছে, বাংলাদেশ কি তা সেভাবে গ্রহণ করতে পারছে?
আব্দুর রহমান মামুন: আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, আমরা এখনও এআইয়ের প্রকৃত সুফল নিতে পারিনি। আমরা মূলত এআইয়ের সাধারণ ইউজার বা ব্যবহারকারী হিসেবে রয়ে গেছি। এআই ব্যবহার করে ট্রিলিয়ন ডলার ভ্যালুয়েশনের বৈশ্বিক প্রোডাক্ট বা স্টার্টআপ আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে উবার বা এয়ারবিএনবির মতো গ্লোবাল স্টার্টআপ গড়ে না ওঠার মূল কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
আব্দুর রহমান মামুন: প্রধান কারণ হলো উপযুক্ত ইকোসিস্টেমের অভাব। সিলিকন ভ্যালির মতো স্টার্টআপবান্ধব পরিবেশ আমাদের এখানে তৈরি হয়নি। আমাদের দেশে কিন্তু মেধাবী তরুণের অভাব নেই। তবে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোকে ব্যাংক সহজে ঋণ দেয় না, আলাদা কোনো ভেঞ্চার ফান্ডিংয়ের সুব্যবস্থা নেই এবং ফান্ড রেইজ করতে প্রচুর স্ট্রাগল করতে হয়।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা রিস্ক ক্যাপিটালের অভাব দূর করতে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?
আব্দুর রহমান মামুন: আমাদের দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক বড় দেশের মতো অতটা সলভেন্ট নয়, প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। তাই সরকার একা সব করতে পারবে না। আমাদের ফরেন ফান্ড বা বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা ও সহজে মুনাফা ফেরত নিয়ে যাওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য পলিসি নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে প্রচুর মেধাবী তরুণ রয়েছে, উপযুক্ত ইকোসিস্টেম পেলে মেধা পাচার বন্ধ হবে এবং বাংলাদেশেই বৈশ্বিক উদ্যোগ গড়ে উঠবে।
এশিয়া পোস্ট: আপনার আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ে হাউজিং’ নিয়ে ভবিষ্যতের মূল পরিকল্পনা কী?
আব্দুর রহমান মামুন: সবাই ঢাকামুখী হওয়ায় ঢাকার ওপর চরম আবাসন চাপ পড়ছে। আমাদের পরিকল্পনা হলো পপুলেশন ডিসেন্ট্রালাইজ করা। ঢাকার বাইরে প্রতিটি জেলা শহরে যদি ঢাকার মতো সমান নগর সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে কেউ গ্রাম বা জেলা ছেড়ে ঢাকায় আসবে না। বর্তমানে ১০টি জেলায় আমাদের প্রায় ৪৮টি প্রজেক্ট চলমান রয়েছে। আমরা একক ইউনিট টাওয়ার ও ল্যান্ড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে কাজ করছি। ভবিষ্যতে নোয়াখালীতে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ একটি বড় সমন্বিত হাউজিং প্রজেক্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: আবাসন খাতের জমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ বা চাঁদাবাজির মতো চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে সামলান?
আব্দুর রহমান মামুন: এগুলো এ খাতের নিত্যদিনের চ্যালেঞ্জ। আমাদের প্রতিষ্ঠানে আলাদা ডিপার্টমেন্ট রয়েছে এবং আমার পার্টনার বাপি ভাই সরাসরি মাঠপর্যায়ের এসব জটিলতা হ্যান্ডেল করেন।
এশিয়া পোস্ট: মৌলিক চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ খাত ‘বস্ত্র’ নিয়ে ড্রিম টেক্সটাইলের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী?
আব্দুর রহমান মামুন: ড্রিম টেক্সটাইল নিয়ে আমাদের লক্ষ্য- ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য বস্ত্রের সংস্থান করা, যাতে প্রতিটি পরিবারে আমাদের কোনো না কোনো পণ্য (থান কাপড়, গজের কাপড়, থ্রি-পিস বা পর্দার কাপড়) থাকে। এ ছাড়া ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ৫০টি দেশে পণ্য রপ্তানির লক্ষ্য রয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: ইউরোপ বা আমেরিকার বাজারে না গিয়ে আফ্রিকার বাজারকে রপ্তানির মূল টার্গেট হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ কী?
আব্দুর রহমান মামুন: বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ গার্মেন্টস ইতোমধ্যে ইউরোপ-আমেরিকার স্যাচুরেটেড মার্কেটে প্রতিযোগিতা করছে, যেখানে বায়াররা প্রাইস নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু আফ্রিকার বাজার এবং কম জিডিপির দেশগুলোতে (যেমন- ঘানা, মালি, সেনেগাল, নেপাল, ভুটান) প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আফ্রিকান মার্কেটে আমরা নিজস্ব বিশ্বমানের পোশাক সরাসরি তাদের দিতে পারি এবং পণ্যের প্রাইসিং আমরা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।
এশিয়া পোস্ট: টেক্সটাইলে বর্তমানের প্রোডাকশন চ্যালেঞ্জ এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা কেমন?
আব্দুর রহমান মামুন: বর্তমানে জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের উৎপাদন কিছুটা কমেছে। তবে আমাদের উৎপাদিত পণ্য লাক্সারি নয়- এক কালার থান কাপড়, গজের কাপড় বা থ্রি-পিস যা সাধারণ মানুষের নিয়মিত প্রয়োজন হয়। বর্তমানে ১৮৩ কোটি টাকার পুরোটাই লোকাল মার্কেট থেকে আসছে। স্যাম্পল পছন্দ হওয়ায় আশা করছি ২০২৫ সালের জুনের পর থেকে আফ্রিকায় ছোট পরিসরে রপ্তানি শুরু করব।
এশিয়া পোস্ট: ভবিষ্যতে খাদ্য, চিকিৎসা ও পরিবেশ খাত নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
আব্দুর রহমান মামুন: ২০৩০ সালের পর থেকে চিকিৎসা, খাদ্য ও পরিবেশ—এই তিনটি খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে কন্ট্রিবিউট করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজেকে কোথায় দেখতে চান এবং আপনার জীবনের মূল সন্তুষ্টি কিসে?
আব্দুর রহমান মামুন: কত রেভিনিউ জেনারেট করলাম বা কত টাকা লাভ হলো, তা আমার মূল লক্ষ্য নয়। যেমন সমুদ্রে আটকে পড়া হাজার হাজার জেলিফিশের মধ্যে বৃদ্ধ লোকটি একটি একটি করে জেলিফিশকে পানিতে ফেলে জীবন বাঁচাচ্ছিলেন- সবাইকে না হলেও কিছু মানুষের জীবন তো রক্ষা পাচ্ছে। তেমনি জীবনের শেষ বয়সে আমার সন্তুষ্টি হবে যদি আমি অন্তত কিছু মানুষের জীবনে পজিটিভ ইমপ্যাক্ট ফেলতে পারি এবং তাদের জীবনকে একটু সহজ করতে পারি।
এশিয়া পোস্ট: এতগুলো ব্যবসার মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কীভাবে সামলান?
আব্দুর রহমান মামুন: ফুটবল খেলতে গেলে পায়ে চোট লাগতেই পারে; তাই বলে ফুটবল খেলা বন্ধ করা যাবে না। স্ট্রেস হলো এই যাত্রার একটি স্বাভাবিক অংশ এবং আমি এটি উপভোগ করি।
এশিয়া পোস্ট: পরিবার ও সন্তানদের কীভাবে সময় দেন এবং কাজের ব্যস্ততার সাথে কীভাবে ব্যালেন্স করেন?
আব্দুর রহমান মামুন: সপ্তাহে সাত দিনই আমাকে কাজ করতে হয়, কোনো ছুটির দিন পাই না। জীবনের সব কিছু একসাথে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই আমি পরিবার ও আমার স্ত্রীকে সেভাবে মেন্টালি প্রিপেয়ার্ড ও ট্রেইন্ড করেছি। তারাও বিষয়টি মেনে নিয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: আপনার যথেষ্ট সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিদেশে স্থায়ী না হয়ে দেশে থাকার কারণ কী?
আব্দুর রহমান মামুন: আমার বংশের বা আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই বিদেশে থাকেন। কিন্তু আমার দেশের প্রতি একটি আলাদা টান রয়েছে এবং আমার মা-বাবা দেশেই থাকেন। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে স্বজনদের কাছাকাছি থাকার যে তৃপ্তি, তা বিদেশে গিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়।
এশিয়া পোস্ট: দেশের মেধাবী তরুণদের বিদেশমুখিতা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
আব্দুর রহমান মামুন: তরুণরা যখন দেখে দেশে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, আর্থিক নিরাপত্তা বা কাঙ্ক্ষিত জীবনমান পাচ্ছে না, তখনই তারা বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার ও সমাজকে তাদের ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত ইকোসিস্টেম ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: দেশে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে ছোট কাজ করতে অনেকে দ্বিধা করে। এ বিষয়ে আপনার বার্তা কী?
আব্দুর রহমান মামুন: আমাদের সমাজে ছোট কাজকে নেগলেক্ট করার একটি অসুস্থ সংস্কৃতি রয়েছে। যে ছেলেটি দেশে ছোট কাজ করতে লজ্জা পাচ্ছে, সে-ই বিদেশে গিয়ে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করছে। এছাড়া আমাদের সামাজিক মিডিয়াগুলোতে টিকটক বা সস্তা সেলিব্রেটিদের এপ্রিশিয়েট করা হচ্ছে, অথচ যে খামারি ১০টি মুরগি থেকে ১০০টি মুরগির খামার বানিয়ে ১০ জন মানুষের কর্মসংস্থান করছে, তাকে সেলিব্রেট করা হচ্ছে না। এই জায়গা থেকে বের হয়ে এসে সত্যিকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারীদের হিরো বানাতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: নতুন যারা উদ্যোক্তা হতে চায়, তাদের জন্য আপনার মূল পরামর্শ কী?
আব্দুর রহমান মামুন: ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে সঠিক মাইন্ডসেট, অসীম সাহস ও ধৈর্য। মূলধন, দক্ষতা, নেটওয়ার্ক এগুলো অন্যকে হায়ার করে বা আস্তে আস্তে জোগাড় করা যায়। কিন্তু ধৈর্য ও মানসিক সাহস নিজের ভেতর না থাকলে ব্যবসায় টিকে থাকা সম্ভব নয়।
এশিয়া পোস্ট: অনাগত দিনে আপনার চূড়ান্ত লক্ষ্য কী?
আব্দুর রহমান মামুন: ড্রিম টেক্সটাইলকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৮ কোটি মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং ৫০টি দেশে পণ্য এক্সপোর্ট করা। সেই সাথে ২০৩০ সালের পর থেকে পরিবেশ, খাদ্য ও চিকিৎসা খাতে অবদান রাখা।

