Advertisement

‘ছাত্রশিবিরের সিলেবাসে বাংলাদেশের সংবিধান পড়া বাধ্যতামূলক’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘ছাত্রশিবিরের সিলেবাসে বাংলাদেশের সংবিধান পড়া বাধ্যতামূলক’
ছবি : এশিয়া পোস্ট

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় পেশাদার স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত। সংগঠনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই নেতা কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত বছর সদস্যদের ভোটে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ‘আলাপন’-এ তিনি ছাত্র রাজনীতি ও সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর

Advertisement

এশিয়া পোস্ট: কেমন আছেন আপনি?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: আলহামদুলিল্লাহ, আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনার মাধ্যমে এশিয়া পোস্টের সকল দর্শকদেরকে আন্তরিক সালাম ও অভিনন্দন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের আগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতিকে অনেকে ‘সুপ্ত’ বা ‘গোপন’ রাজনীতি হিসেবে অভিহিত করতেন। বর্তমানে আপনারা প্রকাশ্যে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছেন। এই দুই সময়ের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আপনি কী ধরনের পার্থক্য অনুভব করছেন?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: আমাদের মূলত ৫ আগস্টের আগেও সাংগঠনিক কার্যক্রম যেভাবে চলতো, ৫ আগস্টের পরে সেগুলো একই রকম স্টাইলেই চলছে। এমন হয়নি যে ৫ আগস্টের আগে আমরা এই প্রোগ্রামগুলো করতাম না আর ৫ আগস্টের পরে আমরা সুযোগ পেয়ে সেগুলো করছি। হতে পারে যে ৫ আগস্টের আগে যেগুলো করা হয়েছে এগুলোর মিডিয়া এক্সপোজারটা ছিল না। কোনো মিডিয়া আমাদেরকে কখনো ডাকত না, আমাদের নিউজ কভারেজ দিত না। যেমনিভাবে এখন আবার মিডিয়াগুলো ‘আওয়ামী’ থেকে ‘বিএনপি’ হয়ে গেছে এবং আমাদের কোনো নিউজগুলো এখন আবার রিসেন্টলি তারা কাভার দিচ্ছে না। ৫ আগস্টের পরে তারা আমাদের সঙ্গে বেশ সখ্যতা দেখিয়েছে, যা ছিল একটি সুবিধাবাদী পজিশন। এখনও পর্যন্ত আমাদের বড় বড় ইভেন্টগুলো হচ্ছে। ৫ আগস্টের পরে কিছু কিছু ইভেন্ট মিডিয়াগুলো কাভারেজ দিলেও এখন আবার ব্ল্যাকআউট করে দিয়েছে। হয়তো বিএনপি বা কারও ইন্ধনের কারণে সেটা করেছে। আমাদের কার্যক্রমগুলো আপনি যদি আমাদের ফেসবুক বা ইউটিউব চ্যানেল অথবা এক্স হ্যান্ডেল (টুইটার) অথবা ইনস্টাগ্রাম ফলো করেন, তাহলে দেখবেন আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে আমাদের যে কোনো ইস্যুতেই আমরা মিছিল করেছি। আমরা রাজপথে থেকেছি। হয়তো প্রতিটা মিছিলে গ্রেপ্তারের পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করে, সেটা ১৬ ডিসেম্বর হোক বা ২৬ মার্চ হোক, এই জাতীয় দিবসগুলোকে কেন্দ্র করে সারা দেশেই আমাদের সরব উপস্থিতি ছিল এবং আমরা মাঠে প্রোগ্রাম করতাম। ওই সময়ের মিছিলগুলোতেও এত বাধা-বিপত্তির পরেও উপস্থিতির পরিমাণ এখন যেভাবে দেখছেন, ঠিক তার সেরকম পরিস্থিতিই ছিল। অর্থাৎ সংগঠনের কার্যক্রমগুলো আমরা সবসময়ের জন্যই ওপেনলি করার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্নটা আসছে ক্যাম্পাসের ক্ষেত্রে। ক্যাম্পাসে তো আসলে ছাত্রদলও কাজ করতে পারেনি, অন্য কোনো ইসলামিক ছাত্র সংগঠনও কাজ করতে পারেনি। ছাত্রলীগ সেখানে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং কেউ কাজ করতে গেলেই তাদের ওপর আক্রমণ করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলামী ছাত্রশিবির তো সব জায়গায় কাজ করেছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আসার পরে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ক্যাম্পাসে আমরা কাজ করেছি।

এশিয়া পোস্ট: কিন্তু দীর্ঘ সময় আপনারা ক্যাম্পাসে এখনকার মতো অবাধে রাজনীতি করতে পারেননি। ক্যাম্পাসের সেই রুদ্ধশ্বাস পরিবেশ এবং বর্তমান পরিস্থিতির মূল পার্থক্যের জায়গাটা আসলে কোথায়?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: আমি এই পয়েন্টেই আসছিলাম। ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে যেভাবে থাকা উচিত ছিল, ইসলামী ছাত্রশিবিরের ক্ষেত্রে সেটাকে একটি ‘পরিবেশ পরিষদ’ গঠন করে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। ক্যাম্পাস থেকে আমাদেরকে ধরলে সারারাত নির্যাতন করা হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা রাজশাহী ইউনিভার্সিটিসহ প্রতিটি ইউনিভার্সিটিতে একই অবস্থা ছিল। যখন সিচুয়েশন এমন করা হয়েছিল যে ক্যাম্পাসে আমাদের কাউকে মারলে বিচার হতো না—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ছাত্রশিবিরের কাউকে হত্যা করলেও তার কোনো বিচার নেই। ছাত্রদল আঁতাত করে একটা স্কোপ পেয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ছাত্রশিবিরকে কোনোভাবেই সরকার স্কোপ দিতে রাজি ছিল না। আমাদের নেতাকর্মীদের হত্যা করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে। আমাদের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতিরা দায়িত্ব নিলে চিন্তা করতেন যে কতশত মামলার আসামি হতে হবে। গ্রেপ্তারের পর টানা ৫০-৬০ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন করা হতো। এমনকি সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতিদেরকেও ছাড় দেওয়া হতো না। আর লোকাল লেভেলের জনশক্তিরা তো আছেই। এরপরেও ক্যাম্পাসে ভিজিবল থাকাটা একেবারেই অসম্ভব ছিল।

তখন আমাদের পলিসি ছিল—যারা ক্যাম্পাসে ভর্তি হবে, তারা ক্যাম্পাসে থাকাকালীন ভিজিবল প্রোগ্রাম যেহেতু করতে পারছে না, তাই ছাত্রজীবন কন্টিনিউ করার জন্য অ্যাক্টিভিজম ক্যাম্পাসের বাইরে করতে হবে। সবাই সামহাউ মিছিল-মিটিংয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে রাজপথে অংশগ্রহণ করতো। ৫ আগস্টের পরে সিনারিওটা ভিন্ন হয়ে গেল। স্টুডেন্টদের আগ্রহে আমরা আসলাম। আমাদের যে কার্যক্রমগুলো প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বাভাবিকভাবে করতাম, সেগুলো স্টুডেন্টদের সামনে এবং মিডিয়ার সামনে নিয়ে আসলাম। তখন স্টুডেন্টরা এগুলো গ্রহণ করল। আমাদের নামে যে রগ কাটার মিথ্যা বয়ান, জঙ্গি বা সন্ত্রাসী অপবাদ দেওয়া হতো, স্টুডেন্টরা তখন আর সেগুলো বিশ্বাস করল না। কারণ, আমার ক্লাসমেট বা বন্ধুবান্ধবরা আমাকে খুব ভালোভাবে চেনে। আমি কেমন, সেভাবেই তারা ছাত্রশিবিরকে বিবেচনা করছে।

আলটিমেটলি ইসলামী ছাত্রশিবিরের আইডিওলজিগুলো আমরা স্টুডেন্টদের সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছি, যা আগে করতে দেওয়া হতো না। তার ফলশ্রুতি আপনারা দেখেছেন—প্রতিটি ক্যাম্পাসের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিরঙ্কুশ বিজয়। এখানে তো ইসলামী ছাত্রশিবির কোনো পেশিশক্তি খাটায়নি, অর্থের ছড়াছড়ি ছিল না, ক্ষমতার প্রভাব বা দাপট আমরা দেখাইনি। কারও গায়ে আমরা একটা আঁচড়ও কাটিনি। তাহলে স্টুডেন্টরা এত ম্যান্ডেট আমাদের কেন দিল? আবার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ ছাত্রদল তো ইলেকশন চায়নি। এক পর্যায়ে নির্বাচনের এক দিন আগে তারা মব ক্রিয়েট করল, ইলেকশন কমিশন ঘেরাও করল, হাইকোর্টে রিট করল। সকল বিএনপিপন্থি আইনজীবী এক হয়ে রায়ের পক্ষে অবস্থান নিল এবং ইলেকশন তিন সপ্তাহের জন্য স্টে করল। এখন তো বিএনপি ক্ষমতায়, এখন ছাত্র সংসদ দিতে সমস্যা কী? তারা ভালো কাজগুলো জাতির সামনে দেখাক। কিন্তু ছাত্রশিবিরকে চ্যালেঞ্জ করার মতো যোগ্যতা বা অবস্থান এখন ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেই। যার ফলে তারা ডেমোক্রেসির এই স্বাভাবিক চর্চা ক্যাম্পাসে চায় না। তারা ছাত্রশিবিরকে নিয়ে ভিন্ন ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। তারা বলছে আমরা নাকি ‘গুপ্ত’। আলটিমেটলি আমরা যদি গুপ্তই হতাম, তবে ছাত্ররা ছাত্র সংসদগুলোতে শিবিরের ওপর আস্থা রাখত না। তারা আমাদের ভোট দিয়েছে। কারণ, আমরা তাদের সঙ্গে ছিলাম। তাদের অপপ্রচার তাদেরকেই বিপর্যস্ত করেছে।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল রয়েছে। এই ঐতিহাসিক আন্দোলনে আপনাদের সংগঠনের সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং অবদান সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: ভূমিকা নিয়ে আমরা শুরু থেকেই বলেছি—এটি ছাত্র-জনতার একটি স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে হওয়া বিপ্লব। সেখানে ইসলামী ছাত্রশিবির অংশগ্রহণ করেছে। পলিসি মেকিংয়ের টেবিলে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কন্ট্রিবিউশন ছিল এবং স্টুডেন্টদের সঙ্গে থেকে রাজপথে আমরা আন্দোলনে কোথাও লিডিং দিয়েছি, কোথাও পলিসি মেকিং করেছি, কোথাও হেল্প করেছি। আলটিমেটলি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কন্ট্রিবিউশন কতটুকু, সেটা আমরা এখনও সেভাবে বলিনি। আমরা এখনও বলিনি যে আমাদের শহীদের সংখ্যা কত। আমি মনে করি যে ১৪০০ বা ১৫০০ মানুষ শাহাদাতবরণ করেছেন, তারা সবাই এই জুলাই বিপ্লবের অংশ এবং ইসলামী ছাত্রশিবির সবাইকে ধারণ করছে—সেটা শহীদ আলী রায়হান হোক, ওয়াসিম হোক, মুগ্ধ হোক অথবা আবু সাঈদ হোক।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভূমিকাটা আমরা নিজেরা বলতে নারাজ, এটি মানুষই বলছে। আমরা যাদের সঙ্গে ছিলাম, তারাই বলুক আমরা কোথায় ছিলাম। ওনাদের কাছে প্রমাণ দিয়ে আমাদের আন্দোলন করার কোনো প্রয়োজন নেই। আর এটা আমার দায়বদ্ধতা হচ্ছে ছাত্রদের কাছে ও জনগণের কাছে। আমি কতটুকু করেছি, জনগণই আমাকে তার জন্য অ্যাপ্রিশিয়েট করছে এবং রিকগনিশন দিচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে বিএনপি বা ছাত্রদলের রিকগনিশনের কোনো প্রয়োজনীয়তা আমরা মনে করছি না। আমি আবারও বলছি, পলিসি মেকিং থেকে শুরু করে রুট লেভেল পর্যন্ত সব জায়গায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের কন্ট্রিবিউশন ছিল। যেমন উত্তরায় বিএনএস সেন্টারের সামনে আমি যখন ছিলাম, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা আমাদের চিনতো। তারা বলতো যে আপনারা সামনে থাকলে আমরা সাহস পায়। সেখানে হয়তো আমাদের পার্টিসিপেশন ৫ শতাংশ বা ৭ শতাংশ ছিল, বাকি ৯০ শতাংশই ছিল সাধারণ মানুষ। এই মানুষগুলো একসঙেআগ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আমরা তাদের সঙ্গে ছিলাম, কেউ আহত হলে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেছি।

এশিয়া পোস্ট: আপনাদের প্রতিপক্ষরা প্রায়ই দাবি করেন যে আন্দোলনে আপনাদের সক্রিয়তার যথেষ্ট ছবি বা ভিডিও নেই। আন্দোলনের কৃতিত্বের ক্ষেত্রে এই ‘ভিজ্যুয়াল এভিডেন্স’ বা ছবির গুরুত্বকে আপনি কীভাবে দেখেন?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: ওই সময় ছবির রাজনীতি ইসলামী ছাত্রশিবির টোটালি করতো না। এই অভ্যুত্থানে ছবির ক্রেডিট নেওয়া—এগুলো ছাত্রদলের ক্ষেত্রে হয়। কারণ, তাদের নেতাকে ছবি দেখাতে হয়, এরপরে পদ নিতে হয়। যেহেতু তারা লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি করে, তাদের রাজনীতি টিকে আছে ছবির ওপর। সে যদি একটি কলমও বিতরণ করে, তবে ছবি তুলে পোস্ট দিতে হয়, না হলে পদ আসে না। ইসলামী ছাত্রশিবিরে ছবির রাজনীতি করে কোনো পদ পাওয়া যায় না। এজন্য তাদের মাথায় ছবির চিন্তা ঘুরপাক খায়। ইসলামী ছাত্রশিবির আসলে কতটুকু ফাংশনাল কাজ করল, সেটি নিয়েই আমরা চিন্তা করি।

এশিয়া পোস্ট: গত ১৫ বছরের তুলনায় বর্তমান ছাত্র রাজনীতির পরিবেশে আপনি কী ধরনের গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন এবং ভবিষ্যৎ সুস্থ ধারার রাজনীতি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে মনে হচ্ছে যথেষ্ট সহনশীল পর্যায়ে ক্যাম্পাস রাজনীতি চলছে। তবে কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। কিছুদিন আগে বাংলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, মিরপুর কলেজ—বিভিন্ন জায়গায় তারা অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। ইসলামী ছাত্রশিবির এখন পর্যন্ত সহনশীল ভূমিকা রাখছে এবং প্রশাসনের সঙ্গে মিলেমিশে ক্যাম্পাসে একটি স্থিতিশীল অবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। আমার ধারণা এই স্থিতিশীলতা কন্টিনিউ করবে। বর্তমান ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দের যদি শুভ বুদ্ধির উদয় হয়, তবে তারা বুঝবে যে গেস্টরুম বা গণরুম কালচার বাংলাদেশে আর চলবে না। ছাত্র রাজনীতি এখন ছাত্রদের কল্যাণের জন্যই করতে হবে। যারা ছাত্রদের সঙ্গে অ্যাফিলিয়েটেড অ্যাক্টিভিটিজ করবে, স্টুডেন্টরা তাদেরকেই গ্রহণ করবে। আর যারা চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব বা অর্থ উপার্জনের মেশিন হিসেবে রাজনীতিকে ব্যবহার করবে, তারা পরিত্যক্ত হবে।

আমি তাদের আহ্বান জানিয়েছি তাদের বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিগুলোর দিকে তাকাতে। আপনারা একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট করে দেখবেন, অনেক ক্যাম্পাসে ছাত্রদল নেতাদের বয়স ৩৫ বা ৪০-এর নিচে না। তাদের ছেলেমেয়ে হয়ে গিয়েছে, চুল পেকে গিয়েছে, কিন্তু তারা এখনও মহানগর বা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি হয়ে বসে আছে। তারা ওই পুরাতন বন্দোবস্তের মধ্যে আছে, কিন্তু জেনারেশন জেট বা নতুন প্রজন্ম যে ধরনের রাজনীতি চায়, সেটির সঙ্গে তারা মানিয়ে নিতে পারছে না। তারা চিন্তা করে রাজনীতি করলে পকেট ভরবে, কিন্তু ইসলামী ছাত্রশিবির রাজনীতি করে মানুষকে দেওয়ার জন্য।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে আপনাদের ‘বট বাহিনী’ তাদের নেতৃত্বের বয়স নিয়ে অনলাইনে প্রশ্ন তোলে। নেতৃত্বের বয়স কাঠামো নিয়ে আপনাদের সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গি কী এবং এই অভিযোগের বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: দেখুন, একজন একজন করে ধরে কথা বলাটা সমীচীন হবে না এবং সেটি রাজনৈতিক কালচারের সঙ্গেও যাবে না। আমি টোটাল স্ট্রাকচারের কথা বলছি। ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রাকচার বা থানা পর্যায়ের স্ট্রাকচার দেখলে সহজেই বুঝতে পারবেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে যারা থাকেন, তারা বড়জোর মাস্টার্স পর্যায়ে থাকেন এবং প্রতি বছর আমাদের সেটআপ চেঞ্জ হয়। কিন্তু অন্য ছাত্র সংগঠনে দেখবেন ১০-১৫ বছর ধরে একজনই দায়িত্ব পালন করছেন।

ইসলামী ছাত্রশিবির ক্যাডারভিত্তিক ছাত্র সংগঠন। এখানে হুট করে কোনো নেতার সিগনেচারে রাতের অন্ধকারে কেউ কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হয় না। ছাত্রলীগে দেখা যেত হলের পাঠচক্র সম্পাদকও কেন্দ্রীয় সভাপতি হয়ে যেতে পারে। আমাদের এখানে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে ওপরে উঠতে হয়। কেন্দ্রীয় সভাপতি বা কার্যকরী পরিষদের সদস্যদের বয়স আমরা সাধারণত ৩০-এর কাছাকাছি বা কিছুটা বেশি মেইনটেইন করি। আমাদের হাতে গোনা ৩০-৩৫ জন ছাড়া বাকি সবাই রানিং স্টুডেন্ট। আর কেন্দ্রে যারা দায়িত্ব পালন করেন, তারা কেউ একাধিক মাস্টার্স করছেন, কেউ পিএইচডি বা এমফিল করছেন। অর্থাৎ ছাত্রত্ব থাকতেই হয়।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি শেষ করে সরাসরি মূল রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সংস্কৃতি থাকলেও রাজনীতিবিদদের পেশাগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আপনার ব্যক্তিগত পরিকল্পনা কী? আপনি কি রাজনীতিকেই পেশা হিসেবে নেবেন নাকি অন্য কোনো পেশায় নিযুক্ত হবেন?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেউ রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নেয় না। আমরা আত্মগঠন এবং সোসাইটিতে কন্ট্রিবিউশন করার জন্য সংগঠন করি। রাজনীতি তখনই পেশা হয় যখন তা আয়ের উৎস হয়, যেমন চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজি। আমাদের এখানে সেই সুযোগ নেই। আমাদের জন্য দুটি পথ খোলা থাকে—হয় টিউশনি করে ইনকাম করা অথবা রিসার্চ বেসড কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে এর অনুমোদন আছে। প্রত্যেকেই নিজ উদ্যোগে আয় করে অথবা পরিবার থেকে সাপোর্ট নেয়। ছাত্রজীবন শেষ করার পর আমাদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বা অন্য দায়িত্বশীলদের কেউই ফুলটাইম রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নেন না। সবাই কোনো না কোনো পেশায় চলে যান—কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ব্যবসা বা শিক্ষকতায় যুক্ত হন। সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতিদের হিস্ট্রি যাচাই করলে দেখবেন তারা প্রফেশনাল লাইফ বেছে নিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর স্ট্রাকচারও একই রকম। আমিরে জামায়াতের নিজস্ব ব্যবসা আছে, তিনি দল থেকে টাকা নেন না। আমরা একাডেমিক বিষয়কে গুরুত্ব দিই এবং ছাত্রজীবন শেষে নিজ নিজ প্রফেশন বাছাই করি।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রশিবিরের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনকালীন বিয়ের ক্ষেত্রে অবহিত করতে হয় বলে জানা যায়। একে ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কি না?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: প্রতিটা প্রতিষ্ঠানের কিছু নিয়মশৃঙ্খলা থাকে। একজন আর্মি অফিসার যদি বলেন ডেকোরাম মানা ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, তবে সেটি যেমন অযৌক্তিক, এখানেও তাই। কেউ যখন অর্গানাইজেশনের স্ট্রাকচারে আসে, তাকে কিছু শৃঙ্খলা মানতে হয়। বিয়ের বিষয়ে আমাদের ‘অনুমোদন’ বলতে মূলত অবহিতকরণ বোঝায়। যারা সদস্য বা শীর্ষ পর্যায়ের লিডার, তাদের বিয়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সভাপতিকে অবহিত করতে হয়। এর কারণ হলো, আমরা দেখি যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়িত্ব পালন এবং আয়ের উৎসের মধ্যে ভারসাম্য আছে কি না। কারণ, ফ্যামিলি চালানোর জন্য আয়ের সোর্স প্রয়োজন। আবার সংগঠনের কাজেও অনেক সময় দিতে হয়। সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে আমরা হয়তো তাকে পরামর্শ দিই ছয় মাস বা এক বছর পরে করতে। তবে এটি এমন নয় যে আমরা কাউকে আটকে দিচ্ছি। দায়িত্ব পালনে যেন হ্যাম্পারিং না হয়, সেজন্যই এই ব্যালেন্স। ছাত্রদলে তো বিয়ে করলে সংগঠনই করা যায় না, আমাদের এখানে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির একটি অংশ বিবাহিত।

এশিয়া পোস্ট: আপনাদের বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ হলো—প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে আপনারা একটি সুসংগঠিত অনলাইন ‘বট ফোর্স’ তৈরি করেছেন। এই অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: এগুলো মিথ্যাচার। এত প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো সময়, সুযোগ বা অর্থ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেই। আমাদের ৯৫ শতাংশ কাজ হলো ব্যক্তি গঠন ও একাডেমিক উন্নয়ন। আমাদের পত্রিকা আছে, রিসার্চের জায়গা আছে। স্টুডেন্টদের ক্যারিয়ারের পেছনে আমাদের অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। এই জাতীয় অযাচিত কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। বরং বটবাহিনী কারা পরিচালনা করে সেটি এখন ফ্যাক্ট চেকাররা বের করছে। আওয়ামী লীগ এবং তাদের মিত্ররা বিলিয়ন ডলার খরচ করে বিশাল বট ফোর্স তৈরি করেছিল, যার প্রধান ছিলেন শেখ রেহানার ছেলে ববি। তারা এখনও সক্রিয় এবং অনলাইনে মিথ্যা বয়ান তৈরি করছে। তারা প্রথমে শিবিরের নামে পজিটিভ পেজ খোলে, পরে সেখান থেকে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালিগালাজ করে। আমরা আইডেন্টিফাই করেছি এবং মেটার কাছে ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েছি।

এমনকি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে একটি গ্রুপ চ্যাট ফাঁস হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে প্রত্যেক নেতাকে ১০টি করে বট আইডি খুলতে হবে এবং কেন্দ্রের কাছে রিপোর্ট দিতে হবে। তারা পরিকল্পিতভাবে কোটি কোটি টাকা খরচ করে গুজব ছড়াচ্ছে। তাদের কেন্দ্রীয় সভাপতির পেজ থেকে পর্যন্ত যাচাই না করে ভুল তথ্য শেয়ার দেওয়া হয়। কিন্তু ইসলামী ছাত্রশিবিরের ফেসবুক পেজ বা লিডারদের পেজ দেখলে দেখবেন আমরা একটি স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করি। আমাদের অনলাইন নীতিমালা আছে, কেউ গালিগালাজ বা অপব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ‘বিপ্লব বিক্রি হয়ে যাওয়া’ বা জুলাইয়ের চেতনা বিচ্যুত হওয়ার একটি আলোচনা শোনা যাচ্ছে। আপনাদের দৃষ্টিতে কারা বা কীভাবে এই অর্জিত বিপ্লবের সঙ্গে আপস করছে?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: জুলাইকে বিক্রি করছে বিএনপি এবং ছাত্রদল। শুরু থেকেই তারা গাদ্দারি করে যাচ্ছে। একে মুনাফিকি বললেও ভুল হবে না। ৫ আগস্টের আগে যারা কান্নাকাটি করতো যে ঘরে থাকতে পারে না, এখন সেই মজলুমরাই জালেম হয়ে গেছে। তারা গণভোটকে অস্বীকার করছে, সংস্কার কমিশন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তারা নিজেদের ৩১ দফার সঙ্গেই প্রতারণা করছে। তারা বলেছিল প্রশাসনিকভাবে কোনো দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে না, কিন্তু অলরেডি দিয়ে ফেলেছে।

শহীদের সংখ্যা নিয়েও তারা ব্যবসা করছে। প্রথমে ৮০ জনের তালিকা দিল, পরে দেখল সেখানে শিবিরের নেতাকর্মী আছে, তাই ডিলিট করল। এরপর বলল ১৫০ জন, এখন মুখে মুখে বলছে ৫০০ বা ১৪০০, কিন্তু তালিকা দেখাতে পারছে না। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি তারা। তারা চাচ্ছে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে। তারা রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন বা সংস্কার চায় না। অন্তর্বর্তী সরকার যে ২০টি অধ্যাদেশ তৈরি করেছিল, সেগুলোর কার্যকারিতা তারা বিল উত্থাপন না করে শেষ করে দিচ্ছে। তারা এমনকি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করছে এবং তাদের মামলার জামিন করে দিচ্ছে। তাজুল ইসলামের মতো দক্ষ চিফ প্রসিকিউটরকে অপসারণ করা হলো কোনো কারণ ছাড়াই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের অপসারণ করা হচ্ছে। কারণ, তারা দলীয় লেজুড়বৃত্তি করছেন না।

এশিয়া পোস্ট: আপনারা বর্তমান সরকারের কাছে গণভোটের দাবি জানাচ্ছেন। যদি শেষ পর্যন্ত গণভোট আয়োজন না করা হয়, তবে এর পরিণতি জাতীয় রাজনীতিতে কেমন হতে পারে বলে আপনি আশঙ্কা করছেন?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: এর পরিণতি মারাত্মক হবে। বিএনপি কেন এটা করছে জানি না। তারা মুচলেকা দিয়েই হয়তো ক্ষমতায় আসছে। তারা গণভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করে নিজের ভোটকে নিজেই অস্বীকার করছে। সালাহউদ্দিন আহমদ নিজে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছেন, এখন তিনি নিজের ভোটের সঙ্গে বেইমানি করছেন। বিএনপির জন্মই হয়েছিল ১৯৭৭ সালের গণভোটের মধ্য দিয়ে। তখন ৯৮ শতাংশ মানুষ জিয়াউর রহমানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ১৯৯০ সালের পরেও তারা গণভোটের কল করেছিল। পুরো রাজনীতিই যাদের গণভোটের ওপর দাঁড়িয়ে, তারা এখন জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে প্রতারণা করছে। তারা জনগণকে বোকা মনে করছে, কিন্তু এই জেনারেশন এত বোকা না।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা কারচুপির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আপনারা কেন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে পারেন না?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: ইঞ্জিনিয়ারিং তো কোনো ভালো কাজ না। এটি একটি প্রতারণা। জামায়াতে ইসলামী বা ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতারণার রাজনীতি করে না। এরশাদ বা আওয়ামী লীগ প্রতারণা করে টিকতে পারেনি। যারা লুটপাট করার জন্য ক্ষমতায় আসতে চায়, তারাই ইঞ্জিনিয়ারিং করে। তাদের কোনো আইডিওলজি নেই। ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদল যদি পুরাতন বন্দোবস্ত অর্থাৎ গণরুম-গেস্টরুম ফেরত আনতে চায়, তবে তারা প্রতিরোধের মুখে পড়বে। ২০০১ সালে টু-থার্ড মেজরিটি পাওয়ার পরও বিএনপির পতন হয়েছে। কারণ, তারা কথা রাখেনি। তারা এখনও ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও বাম ব্লকের ভূত মাথায় নিয়ে চলছে, যা দেশের জন্য ভালো হবে না।

এশিয়া পোস্ট: আপনাদের অনেক সাবেক নেতা এখন সংসদ সদস্য। তবে দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক তর্কে তারা প্রায়ই সরকারি পক্ষ বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পেরে উঠছেন না। ছাত্রশিবির রাষ্ট্রীয় চর্চায় কিছুটা পিছিয়ে আছে?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: না, আমি তা মনে করি না। এবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিতদের মধ্যে প্রায় ৬৪-৬৫ জন সাবেক ছাত্রশিবির নেতা আছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে যুক্তি দিচ্ছেন সেগুলো লেম এক্সকিউজ। তিনি ফ্লোর বেশি পাচ্ছেন এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাষায় কথা বলছেন। আমাদের সাবেক নেতারা শালীনতার মধ্যে থেকে কনস্টিটিউশনাল ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের সিলেবাসে বাংলাদেশের সংবিধান পড়া বাধ্যতামূলক। আমাদের নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা হয় সংবিধানের ওপর। রাষ্ট্রের মৌলিক আইন এবং মানবাধিকার বিষয়ে আমাদের জনশক্তিদের ট্রেনিং দেওয়া হয়। আমরা রুলস মানার ব্যাপারে সবসময় বদ্ধপরিকর।

এশিয়া পোস্ট: অতীতে ছাত্রদলের সঙ্গে আপনাদের সংঘাতময় ইতিহাস রয়েছে। ভবিষ্যতে আবারও সংঘাতের কোনো আশঙ্কা দেখছেন কি না? সহাবস্থানের রাজনীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে আপনাদের কৌশল কী?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: এটি নির্ভর করে মূল দলগুলোর পারসেপশনের ওপর। ছাত্র সংগঠনগুলো সাধারণত মূল দলের বাইরে কিছু করে না। আমরা আমাদের প্রোগ্রামে বাম থেকে শুরু করে ছাত্রদল—সবাইকে ইনভাইট করি। কিন্তু তারা আমাদের দাওয়াতে আসে না কারণ তাদের পলিটিক্যাল ব্যারিয়ার আছে। ইসলামী ছাত্রশিবির নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়। ছাত্রদল যদি আবার ছাত্রলীগ হতে চায়, তবে তাদের পরিণতিও ছাত্রলীগের মতোই হবে। আমরা চাই ক্যাম্পাসগুলো ‘মার্কেটপ্লেস অব ভ্যালুস’ হোক। চাপ প্রয়োগ করে কাউকে রাজনীতিতে আনা যাবে না। নেপালে বা ইউরোপ-আমেরিকায় ক্যাম্পাসে ভায়োলেন্স নেই। আমাদের দেশেও শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নোংরা রাজনীতি বন্ধ করে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা উচিত।

এশিয়া পোস্ট: ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক ঘটনার মতো পরিস্থিতিতে দেখা যায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির একে অপরের ওপর দোষারোপ করছে। দায় স্বীকার না করে একে অপরের ওপর দায় চাপানোর এই সংস্কৃতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: এটি উদার মানসিকতার সমস্যা। কিছু হলেই ছাত্রশিবিরের ওপর দায় চাপানোর এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত। বর্তমান টেকনোলজির যুগে সব প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে, তাই দায় না চাপিয়ে নিজেদের দোষ বিশ্লেষণ করা উচিত।

এশিয়া পোস্ট: আপনাদের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটা রহস্যাবৃত। কোন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আপনাদের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: আমাদের সম্মেলন প্রকাশ্যে হয়। প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয়। সদস্যরা প্রত্যক্ষ ভোটে কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত করেন। সারা দেশে শাখাগুলোতেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এখানে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা সিন্ডিকেটের সুযোগ নেই।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রশিবিরে নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধান্য বেশি দেখা যাওয়ার কারণ কী? এখানে কি কোনো ‘অঞ্চলভিত্তিক সিন্ডিকেট’ কাজ করে?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: ইসলামী ছাত্রশিবিরে সিন্ডিকেট বলতে কিছু নেই। থাকলে আমি খুলনা থেকে এসে কেন্দ্রীয় সভাপতি হতাম না। আমাদের আগের সভাপতিরা জগন্নাথ, রাজশাহী বা রংপুর থেকে এসেছেন। আমরা কোয়ালিটি এবং সদস্য ভোটের ওপর ভিত্তি করে নেতা নির্বাচন করি। অন্য দলে যেমন ‘সুপার ফাইভ’ বা ‘সুপার ফোর’ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিপত্য থাকে, আমাদের এখানে তা নেই। এটি বরং অগণতান্ত্রিক যে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য কেউ নেতা হতে পারবে না। আমাদের এখানে ভার্সাটাইল লিডারশিপ উঠে আসে।

এশিয়া পোস্ট: পহেলা বৈশাখ বা জাতীয় সাংস্কৃতিক দিবসগুলো পালনের ক্ষেত্রে ছাত্রশিবিরের অবস্থান অন্যদের চেয়ে আলাদা। আপনারা যদি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন, তবে এই প্রচলিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ধারা অব্যাহত থাকবে কি না?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: এখানে আইডিওলজিক্যাল বিষয় আছে। ইসলামী ছাত্রশিবির একটি ইসলামি সংগঠন। আমরা দেখি কোনো আচার শিরক বা বেদাত কি না। যেগুলো কোরআন ও হাদিসের পরিপন্থি, সেগুলো আমরা এড়িয়ে চলি। তবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব আসলে সংবিধান মেনেই আমাদের কাজ করতে হবে। ইসলাম যেগুলোকে হারাম বলে, একজন মুসলমান হিসেবে সেগুলো মেনে চলা আমাদের দায়িত্ব। মানুষ যখন ইসলাম বুঝবে, তখন তারা নিজ থেকেই এগুলো পরিবর্তন করবে। ডেমোক্রেটিক সিস্টেমে জামায়াতে ইসলামী যদি ম্যান্ডেট পায়, তবেই তারা ইসলামলাইজেশন করবে, তার আগে নয়।

এশিয়া পোস্ট: সাম্প্রতিক সময়ে মাজার বা মূর্তি ভাঙার মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অবস্থান কী?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: এগুলো আমরা কখনোই অ্যালাউ করি না। ধ্বংসাত্মক কাজের মাধ্যমে সমাধান আসে না। গোপনে হামলা করা বা মানুষকে হত্যা করা ইসলামের শিক্ষা নয়। আমরা মানুষকে সচেতন করার জন্য দাওয়াতের কাজ করি। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থাকলে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে এগুলো করা অপরাধ।

এশিয়া পোস্ট: গণভোট ইস্যু বা সাম্প্রতিক আন্দোলনে আপনারা কি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, নাকি জামায়াতে ইসলামীর নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকেন?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: আমরা অলরেডি আন্দোলন করছি। গণভোটের দাবিতে আমরা জামায়াতের কর্মসূচির আগেই মাঠে নেমেছি। ঢাকায় টানা চার দিন মিছিল করেছি, ক্যাম্পাসে মানববন্ধন ও সেমিনার করছি। এসব সিদ্ধান্তে জামায়াতের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। আমরা যা কল্যাণকর মনে করি, আমাদের ফোরামে আলাপ করে সেই সিদ্ধান্ত নিই।

এশিয়া পোস্ট: একজন সাধারণ শিক্ষার্থী যদি আপনাদের সংগঠনে যুক্ত হতে চায়, তবে তার জন্য কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়? এক্ষেত্রে কি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকগ্রাউন্ড জরুরি?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: প্রক্রিয়াটি খুবই সহজ। আমাদের হাজার হাজার উপশাখা আছে। যে কেউ চাইলে আমাদের প্রোগ্রামে আসতে পারে। এখানে কোনো বংশীয় পরিচয় লাগে না। একজন কৃষকের ছেলেও কেন্দ্রীয় সভাপতি হতে পারে। আমার নিজের পরিবারেও কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। আমাদের সাবেক সভাপতি রাজিবুর রহমান পলাশ ভাইয়ের বাবা ছিলেন আওয়ামী লীগ লিডার ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, অথচ তার ছেলেও সভাপতি হয়েছেন।

এশিয়া পোস্ট: আপনাদের সংগঠনে সরাসরি নারী সদস্যপদ নেই। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের মতামত গ্রহণের ক্ষেত্রে আপনাদের চিন্তাটি কী?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: ইসলামী ছাত্রশিবির শুধুমাত্র ছাত্রদের সংগঠন। তবে নারীদের জন্য স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ‘ছাত্রী সংস্থা’ কাজ করে। ইসলামি নর্মস ও পর্দা বজায় রেখে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। জামায়াতে ইসলামীর প্রায় ৪৫ শতাংশ রোকন এখন নারী। আমাদের রুট লেভেলের প্রোগ্রাম বা ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রোগ্রামে বোনেরা অংশগ্রহণ করে এবং তাদের লিখিত পরামর্শ আমরা গ্রহণ করি। আমাদের ফিল্ড স্পেসিফিক বলেই আমরা শুধু ছাত্রদের নিয়ে কাজ করি।

এশিয়া পোস্ট: যারা আগামীর দিনে ছাত্ররাজনীতিতে আসতে চান, সুস্থ ধারার রাজনীতির জন্য তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: প্রথমত দেশপ্রেম থাকতে হবে। দেশপ্রেম না থাকলে মানুষ টাকা পাচার করে বা দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করে। দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় অনুভূতি ও আমানতদারিতা থাকতে হবে। এ ছাড়া নিয়মিত পড়াশোনা ও সমসাময়িক বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হবে। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে না নিয়ে মানবতার সেবা এবং দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে কাজ করলেই দেশের কল্যাণ হবে।

এশিয়া পোস্ট: জনাব নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ব্যস্ততার মাঝে আমাদের সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম: আপনাকে এবং দর্শকদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ। আসসালামু আলাইকুম।