‘দরিদ্র সন্তানদের স্বপ্ন বড়, তারাই সফল হয়’

কবীর আহমেদ আকন্দ- তেঁতুলিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকার শিশুদের কাছে তিনি পরিচিত ‘কবীর আংকেল’ নামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী ২০০৮ সালে চাকরির সুবাদে তেঁতুলিয়ায় যান। সেখানে চা শ্রমিকদের সন্তানদের অবহেলিত জীবন দেখে নিজের বেতনের ১০ শতাংশ দিয়ে শুরু করেন একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ। সেই উদ্যোগই আজ ‘শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশন’। গত ১৬ বছর ধরে সীমান্ত এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে কাজ করছেন তিনি। চাকরি আর সমাজসেবা, দুটোই সামলাচ্ছেন একসঙ্গে। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে এসেছিলেন তিনি। জানিয়েছেন দীর্ঘ এই পথচলার গল্প ও নানা অভিজ্ঞতার কথা। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।
এশিয়া পোস্ট: তেঁতুলিয়ার স্থানীয় মানুষ ও বিশেষ করে শিশুরা আপনাকে ‘কবির আঙ্কেল’ নামেই চেনে। এই নামের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল এবং যখন এই নামে আপনাকে তারা ডাকে, আপনার অনুভূতি কেমন হয়?
কবীর আহমেদ আকন্দ: অনুভূতিটা নিঃসন্দেহে অসাধারণ। ২০০৮ সালে প্রথম যখন চাকরির সুবাদে আমি তেঁতুলিয়ায় যাই, তখন একটি চা বাগানে কর্মরত ছিলাম। সেখান থেকেই মূলত বাচ্চাদের সঙ্গে আমার একধরনের ঘনিষ্ঠতা ও আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
বাগানে কাজের দায়িত্বে থাকার সময় আমি লক্ষ্য করতাম, চা শ্রমিকদের ছোট ছোট সন্তানেরা স্কুল চলাকালীন মা-বাবার সঙ্গে বাগানে চলে আসত। তারা গাছের ছায়ায় বসে থাকত অথবা চা পাতা যেখানে জমা রাখা হয়, সেই পাতার ঘরে শুয়ে থাকত। মা-বাবারা কাজ করছেন আর ছোট ছোট শিশুরা সেখানে অলস সময় পার করছে। দৃশ্যটি আমার কাছে অত্যন্ত অমানবিক মনে হতো।
আমি যখন তাদের বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করতাম, স্কুল চলাকালীন কেন বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না? তখন দেখতাম, পড়াশোনার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহই ছিল না। তারা ভাবত, এত ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা করে কী হবে, চাকরি তো আর পাবে না! এই চিন্তাভাবনা থেকেই তারা বাচ্চাদের শিক্ষার বাইরে রাখত।
তখন আমি এই শিশুদের নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে শুরু করি এবং ভাবি, এদের জন্য কিছু করা যায় কি না। আমাদের চা বাগানের পাশেই ‘দর্জিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামে একটি স্কুল ছিল। আমি সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করে আলোচনা করি, এই বাচ্চাদের কীভাবে স্কুলমুখী করা যায়।
এরপর আমি একটি উদ্যোগ নিলাম। স্কুলে যারা প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করত, তাদের ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে বৃত্তি দেওয়া শুরু করলাম। উদ্দেশ্য ছিল মূলত পুরস্কার বা সামান্য এই টাকার আকর্ষণে যাতে তারা এবং তাদের অভিভাবকরা স্কুলমুখী হতে আগ্রহী হয়। এভাবেই আমার কাজের সূচনা।
তখন অবশ্য আমার কোনো ধারণা ছিল না যে, এই সামান্য উদ্যোগটি একদিন ‘শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশন’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। আমি শুধু ভেবেছিলাম, যত দিন এখানে আছি, এই বাচ্চাদের পাশে থাকি। আর সেই সময় থেকেই মূলত বাচ্চারা আমাকে ‘কবির আঙ্কেল’ বলে ডাকতে শুরু করে।
এশিয়া পোস্ট: ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আপনাকে ‘হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা’ ডেকেছিলেন। এটার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ আছে কি?
কবীর আহমেদ আকন্দ: হ্যাঁ, অনেকেই আমাকে এই নামে ডাকেন। এর কারণ হলো, আমি কর্মক্ষেত্রে সাধারণত মোটরসাইকেল নিয়ে যাতায়াত করি। যখনই আমি মোটরসাইকেল নিয়ে সীমান্ত এলাকার রাস্তাগুলো দিয়ে যাই, দূর থেকে আমাকে দেখেই বাচ্চারা দল বেঁধে ছুটে আসে।
এটি আমার মনে এক বিশাল অনুপ্রেরণা জোগায়। বাচ্চারা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে, গায়ে হাত দেয় এবং পরম ভালোবাসায় জিজ্ঞেস করে, ‘আংকেল, খেয়েছেন কি না?’ কিংবা ‘কোথায় যাচ্ছেন?’
ছোট ছোট বাচ্চারা বিভিন্ন আবদার করে বসে। কেউ বলে, ‘আংকেল, আমাদের একটা খেলার বল দিন’, কেউ ব্যাটের আবদার করে, কেউবা অন্য কিছু। যার যেটা প্রয়োজন, সে সেটাই অবলীলায় চেয়ে বসে।
আমি কখনোই কোনো বাচ্চার আবদার সরাসরি নাকচ করি না। হয়তো দিতে একটু দেরি হয়, কিন্তু আমি আমার সাধ্যমতো তাদের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করি। বাচ্চাদের মনেও এই আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, আংকেলে কাছে কিছু চাইলে তা পাওয়া যাবেই। তারা তাই সবসময় অপেক্ষায় থাকে।
সবচেয়ে চমৎকার অনুভূতি হয় যখন আমি বাইক নিয়ে যাই এবং পুকুরে গোসল করতে থাকা বাচ্চারাও দূর থেকে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘আংকেল যাচ্ছে, আংকেল যাচ্ছে!’ তারা চায়, যেভাবেই হোক আমি যেন তাদের দিকে তাকাই এবং হাত নাড়ি।
এই নিষ্পাপ বাচ্চাদের অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণেই আমি আমার জীবনকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে নিতে পেরেছি। ভালোবাসা যে আসলে কী, তা আমি এই বাচ্চাদের কাছ থেকেই শিখেছি।
এশিয়া পোস্ট: আপনার শৈশব ও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে শিশুদের নিয়ে কাজ করার আগ্রহের কোনো সম্পর্ক আছে কি?
কবীর আহমেদ আকন্দ: আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমার বাবা মারা যান। স্বাভাবিকভাবেই সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি চলে যাওয়ায় আমাদের পরিবারে একধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। তখন পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে আমার মায়ের ওপর। তবে আমার বড় ভাই ছিলেন। আমরা সবাই মিলে বাবার রেখে যাওয়া কৃষিজমি ও সম্পত্তিকে কাজে লাগিয়ে কোনো না কোনোভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাই। প্রতিটি ভাইবোনই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার চেষ্টা করি। বাবার মৃত্যুর সময় আমার বয়স হয়তো আনুমানিক ১২ থেকে ১৪ বছর ছিল।
আমি শৈশবে পড়াশোনা করেছি বারহাট্টা সিকেপি হাই স্কুল এবং গোপালপুর প্রাইমারি স্কুলে। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে ভর্তি হই। জাহাঙ্গীরনগর তো এক প্রাকৃতিক স্বর্গ। সেখানে আমার খুব সুন্দর সময় কেটেছে। শৈশবে আমি সবার আদরের ছিলাম এবং বেশ ভালোভাবেই কেটেছে।
তবে আমার শৈশবের দুঃখবোধ বা কষ্টের সঙ্গে তেঁতুলিয়ার বাচ্চাদের জন্য কাজ করার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। এমন নয় যে, আমি নিজের শৈশবের কষ্টকে অনুকরণ করে বা কোনো অতৃপ্তি থেকে এদের জন্য কাজ করছি। আসলে এই বাচ্চারাই তাদের অপার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দিয়ে আমাকে নমনীয় করে তুলেছে। ওরাই আমাকে প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করেছে, যেন আমি ওদের জন্য আরও বেশি কিছু করি। ওরা আমার কাছে একটি পরিবারের মতো।
এশিয়া পোস্ট: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব এবং দর্শনেও সুযোগ পেয়েছিলেন। তবুও শেষ পর্যন্ত ভূগোল ও পরিবেশ বেছে নেওয়ার কারণ কী ছিল?
কবীর আহমেদ আকন্দ: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় আমি আসলে তিনটি বিষয়ে সুযোগ পেয়েছিলাম, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব, দর্শন এবং ভূগোল ও পরিবেশ। আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছিল নাটক ও নাট্যতত্ত্বে পড়ার, কারণ ওটা আমার প্রিয় বিষয় ছিল। কিন্তু আমার পারিবারিক সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা ছিল, যেন আমি ভূগোলে পড়াশোনা করি। তাই শেষ পর্যন্ত পরিবারের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগেই ভর্তি হই।
এশিয়া পোস্ট: বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে যখন তেঁতুলিয়ায় গেলেন, তখন জায়গাটি আপনার কাছে কেমন লেগেছিল?
কবীর আহমেদ আকন্দ: যেহেতু আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, তাই প্রকৃতির প্রতি আমার এমনিতেই একটা গভীর প্রেম ছিল। তেঁতুলিয়া একটি সীমান্তবর্তী এলাকা, যেখানে ভারত ও বাংলাদেশের চা বাগানগুলো একদম পাশাপাশি অবস্থিত। সেখানকার শান্ত, নীরব পরিবেশ এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য আমার ভেতর অন্যরকম এক অনুভূতি তৈরি করেছিল। সেখানে কোনো রাজনৈতিক কোন্দল বা ঝামেলা ছিল না। মানুষের মন ছিল অত্যন্ত সরল ও হৃদ্যতাপূর্ণ।
যদিও আমি সম্পূর্ণ বহিরাগত হিসেবে সেখানে গিয়েছিলাম, কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমি স্থানীয় মানুষের মন জয় করতে পেরেছি। তারা আমাকে এতটাই ভালোবেসেছে ও আপন করে নিয়েছে যে, পুরো এলাকাটিকে আমার নিজের এলাকা মনে হয়েছে।
আমার জন্ম নেত্রকোনার বারহাট্টায় হলেও, আমি নেত্রকোনার চেয়ে তেঁতুলিয়ার মানুষের কাছে বেশি কৃতজ্ঞ। কারণ তারা আমাকে যে সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছে, তা মানুষের ভেতর-বাহিরকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আমি নিজেই সেই পরিবর্তনের সাক্ষী।
এশিয়া পোস্ট: আপনার ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে ‘শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশন’ গড়ে ওঠার গল্পটা জানতে চাই।
কবীর আহমেদ আকন্দ: শুরুতে আমি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বেতনের টাকা দিয়ে কয়েকটি বাচ্চাকে মাসিক বৃত্তি দিতাম। এর মধ্যে একটি ঘটনা আমার চিন্তাভাবনাকে বদলে দেয়।
আমার অফিসে কর্মরত এক নারী কর্মীর ছেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়। ছেলেটির পড়াশোনার খুব আগ্রহ থাকলেও তার বাবা-মা তাকে পড়াতে চাচ্ছিলেন না। আসলে তারা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য কিংবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে পড়ার গুরুত্ব বুঝতে পারছিলেন না। ছেলেটি আমাকে এসে বলে, ‘আঙ্কেল, আমার পড়ার খুব ইচ্ছা, কিন্তু বাবা তো চায় না।’ তখন আমি তার মায়ের সঙ্গে কথা বলি এবং সাহস জুগিয়ে বলি যে, আমি প্রতি মাসে তাকে ২ হাজার টাকা করে দেব।
সেই ২০১০ সালের দিকে চা বাগানের শ্রমিকদের বেতন খুবই কম ছিল। আমি ওই নারী কর্মীকে অফিসে নিয়ে এসে একটি ওভারটাইমের ব্যবস্থা করে দিই, যাতে তিনি তার ছেলেকে আর্থিক সহায়তা করতে পারেন। সে সময় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকাতেই পুরো মাস ভালোভাবে চলে যেত।
ছেলেটি যখন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারল, তখন আমার মনে হলো, আমি তো এভাবে আরও অনেক মেধাবী কিন্তু অসচ্ছল ছেলেমেয়েকে সহায়তা করতে পারি। যারা সুযোগ পেয়েও কেবল পারিবারিক বা আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা করতে পারছে না, তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। এভাবেই মূলত কাজের পরিধি বাড়তে শুরু করে।
পরবর্তীতে আপনারা যারা সংবাদমাধ্যমের কর্মী, আপনাদের লেখার কারণে এই কাজের খবর বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তা দেখে আমার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুবান্ধব, সিনিয়র ও জুনিয়ররা আমাকে ফোন করে এবং অনুপ্রাণিত করে। তারা বলে, ‘তুমিও তো একা অনেক ভালো কাজ করছ, আমরাও চাইলে তোমার সঙ্গে যুক্ত হয়ে দুই-একটা বাচ্চার পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে পারি।’
এভাবেই মূলত একটি সংগঠনের আইডিয়া মাথায় আসে। আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা মিলে এই সংগঠনটি পরিচালনা শুরু করি। বর্তমানে আমাদের ১৫০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ইতিমধ্যে অনেকেই পাস করে বের হয়েছে। পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার এক ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুযোগ পেয়েছে।
আর নামকরণের বিষয়টি খুব সহজ ছিল। আমার বিভাগের এক ছোট ভাই, যে আমার সহকর্মীও ছিল এবং আমরা একই কোম্পানিতে চাকরি করতাম, সে আমাকে বলল, ‘ভাইয়া, যেহেতু আপনি শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন, এর নাম আমরা ‘শিশুস্বর্গ’ দিতে পারি। কারণ আপনার এখানে আসলে একটি স্বর্গীয় অনুভূতি কাজ করে।’ সেখান থেকেই ‘শিশুস্বর্গ’ নামটি চূড়ান্ত হয়।
সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা সব সময় আমার পাশে থেকেছেন।
এশিয়া পোস্ট: ‘শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশন’ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদেরও উচ্চশিক্ষায় সহায়তা করছে। বুশরা, ইতি বা মারিয়ার মতো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগ কীভাবে হলো?
কবীর আহমেদ আকন্দ: গণমাধ্যমের প্রচারণার কারণেই মূলত তারা আমাদের খোঁজ পায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক অসাধারণ মেলবন্ধন রয়েছে, যা সারা দেশে প্রশংসিত।
এমনকি আমার জন্মের আগে, অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের দিকে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তারাও মিডিয়ার মাধ্যমে আমার এই কাজের খবর পেয়ে আমাকে খুঁজে বের করেছেন। তারা গর্ববোধ করেন যে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছোট ভাই এই কাজ করছে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল আদর্শই হলো, একা ভালো থাকায় কোনো সার্থকতা নেই, চারপাশের সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে হবে। নিজের একটু ত্যাগের কারণে যদি অন্য কেউ ভালো থাকে, তবেই প্রকৃত আনন্দ পাওয়া যায়। এই ভাবনা থেকেই আমরা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছি এবং তাদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করছি।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশনের কাজের পরিধি কেমন? প্রতিবছর শীতকালীন প্রোগ্রাম করেন, এর অর্থের জোগান কীভাবে আসে?
কবীর আহমেদ আকন্দ: আমাদের মূল কাজ হলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া। এ ছাড়া আমরা প্রতিবছর পঞ্চগড় জেলায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি বড় ইভেন্ট করি। শুরুতে আমরা ৫০০ শিশুকে নিয়ে শীতবস্ত্র, স্কুল ব্যাগ ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ কর্মসূচি করতাম। বর্তমানে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজারে!
পঞ্চগড় জেলার প্রতিটি প্রশাসনিক স্তরের মানুষ, পুলিশ বিভাগ এবং সাধারণ মানুষ আমাদের নিঃস্বার্থ কাজ সম্পর্কে জানেন। এই একটি ইভেন্ট করতেই প্রতিবছর প্রায় এক কোটি টাকা খরচ হয়।
আর্থিক জোগানের বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকার। ২০২৪ সালে আমি চা বাগানের চাকরি ছেড়ে এভারেস্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘এভারেস্ট এগ্রো অ্যান্ড হর্টিকালচার’-এ প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিই। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় এর প্রজেক্ট। এই কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) ও ডিরেক্টররা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই।
তারা আগে থেকেই আমার সংগঠনকে ১-২ লাখ টাকা করে সাহায্য করতেন। কিন্তু আমি যখন তাদের সঙ্গে কর্মজীবনে যুক্ত হলাম, তারা আমার কাজের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে এই শীতকালীন ইভেন্টের পুরো খরচের দায়িত্ব নেন। তারা এখন প্রতিবছর এক কোটি টাকারও বেশি এই প্রোগ্রামে অনুদান দিচ্ছেন এবং আমাকে বলেছেন, অন্য কারও কাছে হাত না পাততে। তারা অত্যন্ত উদার মনের মানুষ, কিন্তু নিজেদের প্রচার করতে চান না।
এই অনুদানের মাধ্যমে আমরা পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্কুলের শিশুদের স্কুল ব্যাগ, খাতা-কলম ও দুপুরের খাবার দিই। আমরা প্রতিবছর স্কুলগুলো পরিবর্তন করি, কারণ একটি উপহার দেওয়া ব্যাগ দুই-তিন বছর চলে যায়। আমাদের লক্ষ্য পঞ্চগড় জেলার প্রতিটি প্রত্যন্ত স্কুলের প্রতিটি শিশুর হাতে এই উপহার পৌঁছে দেওয়া।
এখন আমাদের এই কার্যক্রম কেবল চা বাগানের শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পঞ্চগড়ের সকল সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জন্য এটি উন্মুক্ত। আমরা শিক্ষার্থীর পারিবারিক কন্ডিশন বিবেচনা করে সাহায্য করি, কারণ অসচ্ছল পরিবারের কাছে ২ হাজার টাকার মূল্য অনেক বেশি।
এশিয়া পোস্ট: তেঁতুলিয়ায় নিজের বাড়ি করার জন্য কেনা জমিতে পরে স্কুল করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ‘রওশন আরা মেমোরিয়াল শিশুস্বর্গ বিদ্যানিকেতন’ প্রতিষ্ঠার গল্পটা জানতে চাই।
কবীর আহমেদ আকন্দ: আমি তেঁতুলিয়া শহরের ভেতরে নিজের বাড়ি করার জন্য ২০ শতাংশ জমি কিনেছিলাম এবং বাড়ির কাজও শুরু করেছিলাম। কিন্তু পরে আমার মনে হলো, আমি তো এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নই। আমার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এবং ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে। ওদের বিয়ে হয়ে গেলে হয়তো ওরা এখানে থাকবে না।
তখন স্থানীয় শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেন যে, জমিটিতে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করলে শিশুদের অনেক উপকার হবে। আমি তো নিজে স্কুল চালাতে পারব না, তাই আমার জায়গাটি স্কুলের জন্য ছেড়ে দিই এবং একটি টিনের ঘর তৈরি করে পাঠদান শুরু করি।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ অগমেডিক্সের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাশেদ মুজিব নোমান ভাই তেঁতুলিয়া ঘুরতে আসেন আমার এক আপুর রেফারেন্সে। তিনি টিনের ঘরে স্কুলটি দেখে আমাকে বলেন, স্কুলের ভবনটি বড় করার জন্য। আমি যখন অর্থের সংকটের কথা জানালাম, তিনি বললেন, টাকার চিন্তা না করতে।
প্রথম দেখাতেই তিনি এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং ঢাকায় গিয়ে আর্কিটেক্ট পাঠিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে চমৎকার একটি স্কুল ভবন নির্মাণ করে দেন। তার এই অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমি প্রস্তাব করি যে, স্কুলটি তার মায়ের নামে নামকরণ করা হোক। সেখান থেকেই স্কুলটির নাম রাখা হয় ‘রওশন আরা মেমোরিয়াল শিশুস্বর্গ বিদ্যানিকেতন’।
শুধু ভবন নির্মাণই নয়, আজ পর্যন্ত স্কুলের ১০ জন শিক্ষকের বেতন, বিদ্যুৎ বিলসহ সমস্ত পরিচালনা খরচ রাশেদ মুজিব নোমান ভাই নিয়মিত পাঠিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে প্লে থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের স্কুলে ১৭০ জন শিক্ষার্থী অত্যন্ত যত্নসহকারে পড়াশোনা করছে।
এশিয়া পোস্ট: ১৬ বছরের এই পথচলায় কোন স্মৃতি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?
কবীর আহমেদ আকন্দ: অনেক স্মৃতি আছে। এর মধ্যে একটি বিষয় হলো, আমি কেবল বৃত্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকিনি। গ্রামের যেসব ছেলেমেয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বা ফেল করে বেকার বসে থাকত এবং নানারকম মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ত, আমি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করতাম। সরাসরি শাসন না করে তাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে মোটিভেট করতাম, সময় নষ্ট না করে কোনো টেকনিক্যাল কাজ শেখার জন্য।
আমার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই আইডিবিতে কাজ করেন। তার সহযোগিতায় আমি বেশ কয়েকজন মেট্রিকে (এসএসসি) অকৃতকার্য হওয়া তরুণের কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দিই। তারা এসি বা ফ্রিজ মেকানিকের কাজ শিখে এখন প্রত্যেকেই স্বাবলম্বী হয়েছে, বিয়ে করে সুখে সংসার করছে।
আরেকটি স্মৃতি আমার খুব মনে পড়ে। একবার আমি পঞ্চগড় শহর থেকে লোকাল বাসে চড়ে তেঁতুলিয়া যাচ্ছিলাম। সন্ধ্যার পরের বাস হওয়ায় প্রচণ্ড ভিড় ছিল। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে একজন খুব অস্থির হয়ে আমাকে ডাকল, ‘আঙ্কেল, আঙ্কেল এদিকে আসুন।’
ভিড় ঠেলে তার কাছে যাওয়ার পর সে তার বসার সিটটি আমাকে ছেড়ে দিল। আমি অনেকক্ষণ ভেবেও তাকে চিনতে পারছিলাম না। তখন সে হাসিমুখে বলল, ‘আঙ্কেল, আপনি আমাকে চিনতে পারেননি তো? আপনার সুপারিশে ঢাকায় আমার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি হয়েছিল। আজ আমি ছুটি কাটিয়ে বাড়ি ফিরছি।’
সে আমাকে মনে রেখেছে এবং বাসের সেই ভিড়ের মধ্যে আমাকে যে সম্মান দেখিয়েছে, তা আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তখন মনে হয়েছে, আমি সমাজকে যা দিয়েছি, সমাজ আমাকে তার চেয়ে বেশি ফিরিয়ে দিয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: করোনার সময়ও ‘শিশুস্বর্গ’ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি অক্সিজেন সিলিন্ডারও সরবরাহ করেছেন। সেই সময় কীভাবে কাজগুলো করেছেন?
কবীর আহমেদ আকন্দ: করোনাকালীন আমরা পঞ্চগড়ে প্রায় ৬ হাজার পরিবারের কাছে রাতের আঁধারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছি। এই শিশুস্বর্গ সংগঠন যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তা মানুষ এখনও স্মরণ করে।
এ ছাড়া পঞ্চগড়ের তৎকালীন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী ভাইয়ের সঙ্গে আমার গভীর সখ্য তৈরি হয়েছিল। তিনি অত্যন্ত সৎ একজন মানুষ এবং আমাকে পুরো জেলায় কাজ করার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা ও উৎসাহ জুগিয়েছেন।
অক্সিজেন সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে আমার বর্তমান কোম্পানির এমডি সাহেব, যিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং একজন ফার্মাসিস্ট, আমাকে অভাবনীয় সাহায্য করেছিলেন। আমাদের যত অক্সিজেন সিলিন্ডার লাগত, সব তিনিই সরবরাহ করতেন।
আমরা সেই সিলিন্ডারগুলো এসপি অফিস, স্থানীয় ফার্মেসি এবং হাসপাতালে রেখে দিতাম, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই প্রয়োজনের সময় পেতে পারে। এলাকার মানুষ আমাদের বলত যে, সরকারি বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে আমাদের ‘শিশুস্বর্গ’ অনেক বেশি তৎপর ছিল।
তবে আমাদের সুযোগ এবং বড় একটি বন্ধু সার্কেল থাকার কারণেই কাজটি সহজে করা সম্ভব হয়েছিল।
এশিয়া পোস্ট: আপনি চাকরি করছেন, একই সঙ্গে একটি বড় ফাউন্ডেশন পরিচালনা করছেন এবং পরিবারের প্রতিও আপনার দায়িত্ব রয়েছে। এতগুলো দায়িত্বের মধ্যে কীভাবে কাজ করেন?
কবীর আহমেদ আকন্দ: আমার আগের চাকরিতেও কাজের কোনো জটিলতা ছিল না, আর বর্তমানে যেখানে আছি, সেটিও আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইদের প্রতিষ্ঠান। তারা আমাকে সামাজিক কাজে সব সময় উৎসাহ দেন। যেমন, আমাদের কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর জাকির স্যার এবং ডিরেক্টর অঞ্জন মালিক স্যার আমার সামাজিক কাজে অত্যন্ত বড় সহযোগী।
একদিন করতোয়া নদীর পাড়ে বসে আমরা গল্প করছিলাম। তখন জাকির স্যার আমাকে বললেন, ‘কবির, আপনি তো অনেক সামাজিক কাজ করেন, এই নদীতে কিছু মাছের পোনা ছেড়ে দিন।’
আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘নদীতে মাছ ছাড়লে আমার লাভ কী?’
স্যার তখন হেসে বললেন, ‘আপনি সামাজিক কাজ করেন, অথচ নিজের লাভের চিন্তা করছেন কেন? এই নদীতে এক লাখ টাকার পোনা ছেড়ে দিলে কত জেলের জীবিকার ব্যবস্থা হবে, তা কি ভেবেছেন? এটি সম্পূর্ণ গোপন থাকবে, কে ছেড়েছে কেউ জানবে না, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আপনার প্রতি খুশি হবেন।’
স্যারের কথা শুনে আমি লজ্জিত হয়েছিলাম। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখান থেকে ফিরেই এক লাখ টাকার মাছের পোনা কিনে মৎস্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতে করতোয়া নদীতে ছাড়ব এবং পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়ায় এই ইভেন্টটি সম্পন্ন করব।
আসলে প্রতিদিন মেসেঞ্জারে নানাজন নানা আবদার নিয়ে আসে। যেমন, তিন দিন আগে এক শিক্ষার্থী আমাকে মেসেজ দিয়ে জানায়, তার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার ফরম ফিলাপের টাকা নেই, অথচ হাতে মাত্র দুই দিন সময়। আমি তাকে চিনি না, কিন্তু সাহায্য করি।
দুদিন আগে সে ফোন দিয়ে জানাল যে, সে অনার্সে প্রথম শ্রেণি পেয়েছে। সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে আমি তাকে বললাম, ‘কৃতজ্ঞতা আল্লাহর কাছে জানাও। আমি তো শুধু একটি অসিলামাত্র।’
আমি কাউকে প্রতিদিন টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারব না। কিন্তু যদি কারও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারি, তবে সেই পরিবারটি দীর্ঘকাল ভালো থাকবে। এভাবেই আমি কাজগুলোর মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাই এবং ভারসাম্য রক্ষা করি।
এশিয়া পোস্ট: ১৬ বছরের এই পথচলায় আপনার এসব কার্মকাণ্ডে কোনো রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল কি?
কবীর আহমেদ আকন্দ: সৌভাগ্যবশত আমি এ ধরনের কোনো বড় রাজনৈতিক জটিলতায় পড়িনি। তবে শুরুর দিকে, যখন মানুষ আমাকে অনেক ভালোবাসতে শুরু করেছিল, তখন এলাকার যারা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মেম্বার বা এমপিরা ছিলেন, তারা একটু ঈর্ষাবোধ (জেলাস) করতেন। তারা ভাবতেন, আমি হয়তো কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।
এই ধরনের কথাবার্তা আমাকে মানসিকভাবে বেশ চাপে ফেলেছিল, কারণ আমার উদ্দেশ্য ছিল কেবল সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন করা, ক্ষমতার লোভ নয়। তাই আমি কিছুদিন কাজ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছিলাম।
পরবর্তীতে যমুনা টেলিভিশনের একটি টকশোতে আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আমি ভবিষ্যতে নির্বাচন করব কি না। আমি সেখানে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, আমার এ ধরনের কোনো ইচ্ছা কখনোই ছিল না এবং ভবিষ্যতেও নেই।
এমনকি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনেও আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি না। কারণ যেখানে সবাই বড় ভাই বা ছোট ভাই, সেখানে আমি কারও প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাই না। আমি কারও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে চাই না।
এশিয়া পোস্ট: আপনি নিজের হাতে ‘শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছেন। আপনার অনুপস্থিতিতে এই কাজ কীভাবে চলবে? সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও অর্থায়ন নিয়ে কী ব্যবস্থা করেছেন?
কবীর আহমেদ আকন্দ: আমার পূর্ণ বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাস আছে যে, ‘শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশন’ আমার অবর্তমানেও সচল থাকবে। এর জন্য আমি পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়ার কিছু নিবেদিতপ্রাণ তরুণকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছি। যেমন মুরাদ, শাহীন এবং তেঁতুলিয়ার মিন্টু, যে সাংবাদিকতা করে। তারা আমাকে কথা দিয়েছে যে, আমার অনুপস্থিতিতেও তারা এই কাজ কখনও বন্ধ হতে দেবে না।
এ ছাড়া আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ডোনার আছেন, তাদের সঙ্গে আমি এই স্থানীয় তরুণদের সরাসরি যুক্ত করে দিয়েছি, যাতে অর্থায়নের ধারা সচল থাকে।
পাশাপাশি আমাদের কোম্পানির এমডি ও ডিরেক্টররা, যারা শুরু থেকেই আমার সংগঠনকে বড় অঙ্কের সাহায্য করে আসছেন, তারাও তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) থেকে আমার অবর্তমানে এই কাজের দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই আমি নিশ্চিত যে, কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হবে না।
এশিয়া পোস্ট: বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম বা পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ার মতো সমস্যাগুলো নিয়ে আপনি মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। এসব সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
কবীর আহমেদ আকন্দ: সামাজিক সমস্যাগুলো দূর করতে রাষ্ট্রের অনেক কিছু করার আছে এবং সরকার চেষ্টা করছে। তবে সরকারি প্রক্রিয়ায় অনেক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকে। যেমন একজন সাধারণ মানুষের জন্য ইউএনও বা ডিসি স্যারের কাছে সহজে পৌঁছানো কঠিন। সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারি। আমি চাইলে এখনই ৫ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারি, যা সরকারি পর্যায়ে সম্ভব নয়।
রুট লেভেলে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা বিতরণের ক্ষেত্রে কখনো কখনো রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও দলীয় প্রভাব দেখা যায়। কে কোন দল করে বা কাকে ভোট দেবে, তা বিবেচনা করে অনেক সময় বিধবা ভাতা বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা দেওয়া হয়, যা প্রান্তিক মানুষকে বঞ্চিত করে। রাজনীতিবিদদের আরও উদার হওয়া উচিত। তারা চাইলে এ দেশকে স্বর্গে পরিণত করতে পারেন।
আর শিশুশ্রম বন্ধ করার আগে আমাদের সেই শিশুদের পরিবারের আর্থিক চাহিদার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। একটি শিশু যদি হোটেলে কাজ না করে বা রিকশা না টানে, তবে তার পরিবারের আহার জুটবে কীভাবে? রাষ্ট্রকে অবশ্যই সেই বয়স পর্যন্ত শিশুর পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব নিতে হবে।
অন্যদিকে, সীমান্তবর্তী এলাকায় এখন শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে। আমি দেখেছি, দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের স্বপ্ন অনেক বড় থাকে এবং তারা অনেক বেশি সফল হয়।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পঞ্চগড়ে আপনার কাজ বা মানুষের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি?
কবীর আহমেদ আকন্দ: না, আল্লাহর রহমতে আমার কাজের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। আমি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, পঞ্চগড়ের কোনো রাজনৈতিক দলই আমাকে অপছন্দ করে না। আমি যখন কোনো প্রোগ্রামের আয়োজন করি, সব দলের মানুষ সেখানে উপস্থিত থাকেন। এমনকি দাওয়াত না দিলে তারা রাগ করেন।
যেহেতু আমি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকভাবে মানুষের কল্যাণে কাজ করি, তাই সবাই আমাকে সহযোগিতা করেন।
এশিয়া পোস্ট: সমাজসেবার নামে অনেক সংগঠন তৈরি হলেও সব সংগঠন বাস্তবে কাজ করে না। এ ধরনের সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে সরকারের কী ধরনের নজরদারি থাকা উচিত?
কবীর আহমেদ আকন্দ: অবশ্যই সরকারের কঠোর নীতিমালা ও তদারকি থাকা উচিত। থানা বা উপজেলা পর্যায়ে যেসব সরকারি কর্মকর্তা আছেন, তাদের উচিত এই সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত মনিটর করা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের খতিয়ে দেখা দরকার, কোন সংগঠন বাস্তবে কাজ করছে এবং কারা কেবল অনুদানের অপেক্ষায় আছে। কাজের ইচ্ছা থাকলে সরকারের টাকার জন্য বসে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।
এশিয়া পোস্ট: এত দীর্ঘ সময় ধরে এই কাজ চালিয়ে যেতে আপনার পরিবারের সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল? বিশেষ করে আপনার স্ত্রীর ভূমিকা কেমন ছিল?
কবীর আহমেদ আকন্দ: পরিবারের সমর্থন না থাকলে এত দীর্ঘ সময় ধরে এই কাজ করা অসম্ভব ছিল। আমার ও আপনার ভাবীর পছন্দ করে বিয়ে (অ্যাফেয়ার ম্যারেজ) হয়েছিল, তাই তিনি আমার মেন্টালিটি বা মানসিকতা খুব ভালোভাবে জানতেন। তিনি সবসময় আমার পাশে থেকেছেন।
মাঝে মাঝে হয়তো অভিমান করে বলেন, ‘তুমি তো সমাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকো, ঘরের খোঁজ নেওয়ার সময় পাও না।’ সংসার জীবনে এই সাধারণ অভিমানটুকু তো থাকবেই। কিন্তু তিনি আমার কাজের জন্য অত্যন্ত গর্ববোধ করেন। কারণ যখন সমাজ আমাকে ভালোবাসে, সেই সম্মান ও গর্বের অংশীদার তিনিও হন।
এশিয়া পোস্ট: আগামী দিনে শিশুস্বর্গ ফাউন্ডেশনের কাজকে কোন দিকে নিতে চান? বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
কবীর আহমেদ আকন্দ: বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা হলো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ২৫ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। আমরা এই সংখ্যাটি আরও বাড়াতে চাই।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েরা নিজেদের সমাজের বোঝা হিসেবে দেখতে চায় না, তারা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চায়। তারা ব্রেইল সিস্টেমে আউটসোর্সিং বা কম্পিউটার লার্নিং শেখার আবদার করেছে। আমি আমাদের কোম্পানির এমডি সাহেব ও অন্যান্য শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমরা খুব শিগগিরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০টি কম্পিউটার দিয়ে একটি ল্যাব তৈরি করে দেব, যাতে তারা ছাত্রজীবন থেকেই আইটি স্কিল ডেভেলপ করতে পারে এবং স্বাবলম্বী হতে পারে।
এছাড়া তারা আমাকে একদিন বলেছিল যে, তাদের কেউ কখনো ঘুরতে নিয়ে যায় না। আমি তাদের ঢাকার কাছে ফ্যান্টাসি কিংডমে নিয়ে গিয়েছিলাম। তারা সারাদিন সমস্ত রাইডে চড়ে অত্যন্ত আনন্দ পেয়েছে। এখন তারা সমুদ্র দেখার আবদার করেছে। আল্লাহ যদি তৌফিক দেন, আমি অবশ্যই তাদের সমুদ্র দেখার স্বপ্ন পূরণ করব।
এশিয়া পোস্ট: যারা একা সমাজসেবামূলক কাজ শুরু করতে চান, কিন্তু কীভাবে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
কবীর আহমেদ আকন্দ: আমার পরামর্শ হলো, আপনি একাই শুরু করুন। নিজেকে প্রমাণ করুন, দেখবেন চারপাশের মানুষ কীভাবে আপনার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আপনার মনে যদি মানুষের কল্যাণের সৎ চিন্তা থাকে, তবে সৃষ্টিকর্তাই আপনাকে পথ দেখিয়ে দেবেন।
শুরুতেই দল বা বড় কমিটি গঠন করতে যাবেন না। কারণ পদের লোভ নিয়ে শুরুতেই কোন্দল বা ঝামেলা তৈরি হতে পারে, যা আপনাকে নিরুৎসাহিত করবে।
আমি কখনো ভাবিনি যে, তেঁতুলিয়ায় আমার এই কাজ দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে চলবে। আমি আমার মেয়েদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সম্প্রতি চাকরি পরিবর্তন করেছি এবং পঞ্চগড়ে এসেছি, যার কারণে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি।
আপনি পৃথিবীর সবার দায়িত্ব নিতে পারবেন না। অন্তত একটি মানুষের দায়িত্ব নিন, তাকে সাহায্য করুন। দিনশেষে সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার চেষ্টা করুন, তাহলে আপনার হৃদয় সব সময় অনাবিল শান্তিতে ভরে থাকবে।






