logo

প্রবাসী শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে চাই: নুরুল হক নুর

প্রবাসী শ্রমিকদের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে চাই: নুরুল হক নুর

পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। বর্তমানে নুরুল হক গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি। সমসাময়িক রাজনীতি, প্রবাসী শ্রমিক ও দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন রাহাত রূপান্তর

এশিয়া পোস্ট: দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ে আপনার প্রথম অগ্রাধিকার কী?

নুরুল হক নুর: বাংলাদেশ জনবহুল দেশ। বিদেশের শ্রমবাজার ধরে রাখতে না পারলে বা আগের বাজারগুলো ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হব। তাই আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার করা হবে আমার প্রথম অগ্রাধিকার। মন্ত্রণালয়ের কাজের অভিজ্ঞতা এখন পর্যন্ত খুব বেশি দিন হয়নি। কারণ এখনো বলা চলে আমরা শিখন প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছি, বুঝছি ও দেখছি। আগে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তারাও প্রত্যেকে আমাদের জন্য একটি নোট রেখে গেছেন। তারা কী করেছেন, সামনে কী করা দরকার এবং আমাদের ইশতেহারের সঙ্গে তালমিলিয়ে করণীয় নির্ধারণের চেষ্টা করছি। এই মুহূর্তে অভিজ্ঞতা খুব বেশি হয়নি। কাজের যেটুকু হয়েছে, সেটি হলো—প্রাথমিক ধারণা নেওয়া এবং এখানকার সহকর্মীদের বোঝা। সেখান থেকে এটিকে মিশ্র অভিজ্ঞতাই বলা যায়।

এশিয়া পোস্ট: প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোনটি বলে মনে করেন?

নুরুল হক নুর: মন্ত্রী হওয়ার আগে প্রবাসীদের নিয়ে যেভাবে সরাসরি আন্দোলন, সংগ্রাম এবং তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরার ক্ষেত্রে‘প্রবাসী অধিকার পরিষদ’নামক সংগঠন থেকে যে ভূমিকা নিয়েছিলাম, অন্য কোনো সংগঠন সেভাবে করেনি। সব সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। 

আমার পূর্বের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান মন্ত্রণালয়ের জায়গা থেকে, প্রথম বিষয় হলো—আমাদের বেশ কিছু বড় বা সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। নানা কারণে এটি হয়েছে। যার মধ্যে কিছু রাজনৈতিক ও দেশের কিছু অভ্যন্তরীণ ইস্যু রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ওই দেশগুলোতে অবস্থানরত আমাদের নাগরিকদের কিছু আচরণও দায়ী। যেমন—বাহরাইনে একজন মুয়াজ্জিন ইমামকে হত্যার ঘটনা। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া অভিবাসীদের নিয়ে গবেষণা করে তারা অপরাধ সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে। সেখানে বাংলাদেশের বিষয়ে নেতিবাচক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণেও শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে। বাহরাইন, মালয়েশিয়া এবং আরও কিছু দেশে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এগুলো পুনরায় চালু করা আমাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। 

দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশ থেকে যারা কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যায়, তারা অধিকাংশই সাধারণ পরিবার থেকে আসেন। অনেকে স্ত্রীর গয়না ও জমিজমা বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে বিদেশে যান। অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রতারণার শিকার হন। একটি কাজের কথা বলে অন্য কাজ দেওয়া হয়, আবার কখনো কোনো কাজই দেওয়া হয় না। এই প্রতারণা বন্ধ করা আমাদের অগ্রাধিকার। 

পাশাপাশি প্রবাসে যাওয়ার ব্যয় অত্যন্ত বেশি। এই ব্যয় কমানোও আমাদের লক্ষ্য। ব্যয় কমাতে আমরা মন্ত্রণালয় থেকে একটি নির্ধারিত খরচ বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছি।  এছাড়া এজেন্ট বা লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয় বা চতুর্থ পক্ষের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে একজন প্রবাসীকে বাড়তি খরচ ও প্রতারণার ঝুঁকিতে পড়তে হয়। আমরা একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির চিন্তা করছি। যেখানে প্রবাসে যেতে আগ্রহীদের তথ্য থাকবে, তারা কোন দেশে যেতে চায়, তাদের দক্ষতা কী এবং কী ধরনের কাজ করতে পারবে ইত্যাদি। যখন দেশি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠান জনবল চাইবে, তখন এই ডাটাবেজ থেকে মিলিয়ে জনবল পাঠানো যাবে। এতে হয়রানি, প্রতারণা ও ব্যয় কমবে। অভিবাসন ব্যয় কমানো আমাদের অগ্রাধিকার।

বিদেশে যারা ভালো কোম্পানিতে চাকরি করে, তারা চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধা পায়। কিন্তু ছোট কোম্পানি বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে কাজ করলে অনেকেই চিকিৎসাসেবা পায় না। তাদের জন্য অনলাইনে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বিষয়ে আমরা ভাবছি। দেশের মধ্যেও আমাদের দপ্তরগুলোকে সেবামুখী করা জরুরি। আমরা জনগণের সেবক। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও সেই দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বিদেশের দূতাবাসগুলো প্রবাসীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও বন্ধুসুলভ সেবাকেন্দ্র হয়ে উঠবে, সেটি নিশ্চিত করতে চাই। যেসব দেশে আমাদের শ্রম কল্যাণ উইং নেই, সেখানে তা স্থাপন এবং সৌদি আরব বা ওমানের মতো দেশে জনবল বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

অনেক প্রবাসী দুই বা তিন বছরের জন্য বিদেশে গেলেও ছয় মাস বা এক বছর পর বেকার হয়ে পড়ে। তাদের একটি ডেটাবেস তৈরি করতে চাই। শ্রম কল্যাণ উইং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। যদি দূতাবাসের কাছে তথ্য থাকে যে নির্দিষ্ট খাতে ৫০ শ্রমিক বেকার আছেন, তাহলে তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হবে। এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে আমরা এগোচ্ছি।

এশিয়া পোস্ট: তরুণদের অংশগ্রহণে এবারের সংসদ কতটা ভিন্ন হবে বলে আশা করছেন?

নুরুল হক নুর: আমার মতে, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি প্রাণবন্ত ও গঠনমূলক সংসদ হবে। যেখানে যুক্তি ও মেধার ভিত্তিতে বিতর্ক হবে। দেশের পুনর্গঠন ও মানুষের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা হবে। কারণ নির্বাচনের মাধ্যমে যারা এসেছেন, তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে একটি সাধারণ বোঝাপড়া রয়েছে। 

গণতন্ত্রের ঘাটতির কারণেই আমরা গত ১৬ বছর ভুগেছি। আমি ডাকসুর ভিপি ছিলাম, এখন এই অবস্থানে আছি। কয়েক দিন আগেও নির্মম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। বহুবার হামলার শিকার হয়েছি, সহকর্মীরা আহত হয়েছেন। ভিন্নমতের রাজনীতি করতে গিয়ে অনেকে গুম ও খুনের শিকার হয়েছেন। ভবিষ্যতে এমন অন্ধকার যেন আর না নামে, সে জন্য আমরা একসঙ্গে কাজ করব। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন সংসদের প্রতিশ্রুতি হলো— বাংলাদেশ আর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। এখানে কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসন থাকবে না। মানুষের কল্যাণ, নাগরিক মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা হবে। প্রয়োজনে সংবিধান ও আইন সংশোধন নিয়ে আলোচনা হবে। বিভিন্ন মত ও তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব থাকায় সংসদটি কার্যকর হবে।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে আপনার অবস্থান কী?

নুরুল হক নুর: জুলাই সনদ নিয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে। এখন সংসদ গঠিত হওয়ায় সংসদে আলোচনা হয়ে অধ্যাদেশগুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে আইন আকারে রূপ দেওয়া হবে।

এশিয়া পোস্ট: সংসদে গণঅধিকার পরিষদের অবস্থান কোন পক্ষে থাকবে?

নুরুল হক নুর: গণঅধিকার পরিষদ সবসময় জনমুখী রাজনীতি করেছে। বর্তমানে সরকারে থাকায় সরকারি দলের নীতিমালার ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালিত হবে। আমি যেহেতু সরকারে আছি, সেক্ষেত্রে একটা পলিসি থাকবে। তবে দল হিসেবে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান থাকবে এবং মাঠের রাজনীতি দলীয় নেতারা পরিচালনা করবেন।

এশিয়া পোস্ট: তারুণ্যনির্ভর রাজনীতি বাস্তবে কতটা সম্ভব?

নুরুল হক নুর: তরুণদের জন্য বড় বার্তা হলো, দেশ নিয়ে কাজের ইচ্ছা ও কমিটমেন্ট থাকলে মূল্যায়ন পাওয়া সম্ভব। ছাত্র আন্দোলন থেকে ধারাবাহিকভাবে সংগ্রাম করে আমরা নির্বাচন করেছি এবং জনগণের ভোটে সংসদে এসেছি। আমাদের অনেক সহযোদ্ধাও এমপি বা গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। রাজনীতি যে কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকারের বিষয় নয়, সাধারণ পরিবার থেকেও নেতৃত্ব দেওয়া যায়, আমরা সেটির উদাহরণ। তরুণদের ইতিবাচক রাজনীতিতে এগিয়ে আসা উচিত। এখন রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ অনেক বেশি।

এশিয়া পোস্ট: দেশের পটপরিবর্তনে নিজের ভূমিকা নিয়ে আপনি কতটা সন্তুষ্ট?

নুরুল হক নুর: আমার জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিমুখী করতে পেরেছি। সবাই বলে তরুণদেরকে রাজনীতিতে আসতে হবে। কিন্তু তরুণদেরকে কেউ জায়গা ছাড় দিতে চায় না। আমরা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তরুণদের জন্য নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করে দিতে পেরেছি। আগামীতে রাজনীতি করতে চাইলে তাদের জন্য যথেষ্ট সুযোগ আছে। এই পরিবর্তনের সূচনালগ্ন থেকে আমরা ছিলাম, আমাদের অনেক ত্যাগ আছে। 

এশিয়া পোস্ট: এবারের নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে মনে করেন?

নুরুল হক নুর: বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে শতভাগ স্বচ্ছ নির্বাচন হয়নি। ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানদণ্ড পূরণ করলে সেটিকে গ্রহণযোগ্য ধরা যায়। আমার এলাকায় নির্বাচন মোটামুটি অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল, তবে সামগ্রিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। প্রশাসনের ভূমিকা আরও ভালো হতে পারত, তবে তারা চেষ্টা করেছে। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সে বিবেচনায় নির্বাচনকে সফল বলা যায়।

এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি নিয়ে আপনার অবস্থান কী?

নুরুল হক নুর: রাজনৈতিক ও আইনগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তারা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম করতে পারবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি দেখবে। জাতীয় পার্টিসহ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে বিচার প্রক্রিয়া চলমান। নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা ক্যাবিনেটের মাধ্যমে জানানো হবে।

এশিয়া পোস্ট: প্রবাসে মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া সহজ হবে কি?

নুরুল হক নুর: সম্প্রতি আমরা ঘোষণা দিয়েছি, প্রবাসীদের মরদেহ বিনা খরচে দেশে আনা হবে। শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনেক সেবা রয়েছে, কিন্তু এগুলোর প্রচার কম। তাই পেশাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব সেবা প্রচারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিএমইটির মাধ্যমে যারা বিদেশে যান, তাদের বিপদে মন্ত্রণালয় দায়িত্ব নেয়। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিদেশে কাজের জন্য গেলে সমস্যা হয়। তাই সবাইকে বিএমইটির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে মরদেহ আনা বা অন্য সেবা দেওয়া সহজ হবে। অনেক সময় বিদেশে হাসপাতালের বিল ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা আসে, যা পরিশোধ না করলে মরদেহ আনা যায় না। বিএমইটির অন্তর্ভুক্ত থাকলে বিষয়টি সহজ হয়, অন্যথায় আইনগত জটিলতা তৈরি হয়। এ বিষয়ে নীতিগত সমাধান নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের আশা করা হচ্ছে।