‘ক্রেডিট নিতে চাইলে জুলাইয়ের অনেক ইমাম বানাতে পারতাম’

ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুনতাছির আহমাদ। জন্মস্থান দিনাজপুর থেকেই ছাত্রজীবনে শুরু হয় তার সাংগঠনিক পথচলা। জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দুই বছর করে দায়িত্ব পালনের পর ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর কেন্দ্রীয় কমিটিতে টানা ছয় বছর বিভিন্ন দায়িত্বে থেকে ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক আয়োজন আলাপন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন অতিথি হয়ে। কথা বলেছেন সংগঠনের আদর্শ, রাষ্ট্রচিন্তা, ছাত্ররাজনীতি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংগঠনের অবস্থান নিয়ে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।
এশিয়া পোস্ট: আপনার রাজনীতিতে আসার গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই। কীভাবে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা তৈরি হলো এবং নেতৃত্বে আসার পথ কেমন ছিল?
মুনতাছির আহমাদ: আমি ২০১০ সালে সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। আমাদের এই সংগঠনটি ১৯৯১ সালের ২৩ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এর পথচলার ৩৪ বছর পূর্ণ হয়েছে। আমি আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনের অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে যুক্ত হই ২০১৩ সালে। ২০১৩ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ সময় আমি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছি। আমার বাড়ি দিনাজপুর। সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া এবং সক্রিয়ভাবে কাজ করার শুরুটা সেখানেই ছিল। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় উঠে আসার সুযোগ হয়েছে। দিনাজপুরে আমি দুই বছর সাধারণ সম্পাদক এবং দুই বছর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এরপর যখন উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসি, তখন সরকারি তিতুমীর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্সে ভর্তি হই। ঢাকায় আসার পর সংগঠনের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তরের দায়িত্ব পালন করি। সেখানে প্রথমে সহসভাপতি এবং পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করি। এরপর গত ছয় বছর কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিভিন্ন পদে—যেমন কার্যনির্বাহী সদস্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক, আন্তর্জাতিক সম্পাদক, প্রশিক্ষণ সম্পাদক, সেক্রেটারি জেনারেল ও সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এ বছর আমি সপ্তম বছরের মতো কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
এশিয়া পোস্ট: সাধারণত দেখি ইসলামী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে কওমি মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রাধান্য থাকে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে দেখছি আপনি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। আপনার মতো জেনারেল ব্যাকগ্রাউন্ডের নেতৃত্বের উদাহরণ কি সংগঠনে আরও আছে?
মুনতাছির আহমাদ: আমাদের সংগঠনে আমিই জেনারেল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা প্রথম নেতৃত্ব—বিষয়টি মোটেও এমন নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের অনেক নেতৃত্ব উঠে এসেছেন। যেমন আমাদের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি শরিফুল ইসলাম রিয়াদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন। শেখ ফজলুল করিম মারুফ, যিনি এখন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব, তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে এসেছেন। এমন অনেক উদাহরণ আমাদের আছে। আবার কওমি মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকেও অনেক নেতৃত্ব এসেছেন। আমার পূর্ববর্তী সভাপতি ইউসুফ আহমদ মানসুর মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের ছিলেন, তবে তার জেনারেল পড়াশোনাও ছিল এবং তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছিলেন। অর্থাৎ আমাদের এখানে কওমি, আলিয়া ও জেনারেল—এই তিন ধারার শিক্ষার্থীদের একটি চমৎকার সমন্বয় রয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: দেশে তো ছাত্রদল, ছাত্রলীগ বা ছাত্রশিবিরের মতো আরও অনেক ছাত্র সংগঠন আছে। আপনি সব ছেড়ে কেন এই নির্দিষ্ট সংগঠনটিতেই যোগ দিলেন?
মুনতাছির আহমাদ: হিফজ শেষ করে এই ধারায় আসি। পারিবারিকভাবেই ইসলামের শিক্ষাটা আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি এবং বাবা আমাদের সেই চিন্তাধারাতেই বড় করেছেন। ফলে ইসলামের প্রতি একটা আলাদা ঝোঁক আগে থেকেই ছিল। অন্যান্য ইসলামি সংগঠনের ক্ষেত্রে আমি দেখেছি, তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা বা রাষ্ট্র পরিচালনার কথা খুব জোরালোভাবে বলে, কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইসলাম পালন—যেমন আমল-আখলাক (কাজ ও চরিত্র), মোয়ামেলাত (লেনদেন) ও মোয়াশারাতের (আচার-আচরণ) বিষয়গুলো সেখানে অনেকটা অনুপস্থিত ছিল। আমার কাছে মনে হয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনার মতো বড় পরিসরে ইসলাম কায়েমের আগে নিজের জীবনে তা চর্চা করা জরুরি। কথায় এবং কাজে মিল থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্র আন্দোলনের এই দিকটিই আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে। তারা যেটা বলে, নিজেরা সেটা ধারণ করার চেষ্টা করে। তাদের দেখলেই মনে হয় তারা ইসলামকে অনুসরণ করছে। এই চারিত্রিক মাধুর্য ও আদর্শিক অবস্থান দেখেই আমি এই সংগঠনে যোগ দিই।
এশিয়া পোস্ট: এই সংগঠনে আসার প্রক্রিয়াটি কেমন ছিল? কেউ কি আপনাকে আমন্ত্রণ করেছিল নাকি আপনি নিজেই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন?
মুনতাছির আহমাদ: আমাদের সংগঠনেও দাওয়াতের প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে আমার আসার গল্পটা একটু ভিন্ন। আমি যখন রংপুরের জুম্মাপাড়ায় একটি মাদ্রাসায় হিফজ পড়তাম, তখন এক দিন শুক্রবার মাদ্রাসা পরিষ্কার করার সময় ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের একটি পরিচিতি পড়ে থাকতে দেখি। সেটা পড়ে আমার মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়। এরপর রংপুরে দলের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীমের একটি সমাবেশ ছিল। আমি নিজ উদ্যোগেই একা একা সেখানে চলে যাই। ওই সমাবেশ দেখার পর আমার মনে হয়েছে এটিই আমার জন্য সেরা প্ল্যাটফর্ম। যদিও তখন রংপুরে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ হয়নি, তবে পরবর্তীতে দিনাজপুরে গিয়ে আমি সরাসরি কাজ শুরু করি।
এশিয়া পোস্ট: রাজনৈতিক ময়দানে না গিয়ে আপনি তো তাবলিগ জামাত বা অরাজনৈতিক কোনো ইসলামি সংগঠনের মাধ্যমেও দ্বীনের কাজ করতে পারতেন। কেন রাজনীতিকেই বেছে নিলেন?
মুনতাছির আহমাদ: অল্প বয়স হলেও তখন আমি একটি বিষয় বুঝতে পেরেছিলাম যে, অরাজনৈতিক পরিসরের চেয়ে রাজনৈতিক পরিসরে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। ব্যক্তি পর্যায়ের পরিবর্তনের মেহনত তো অবশ্যই লাগবে, কিন্তু সামগ্রিক পরিবর্তন ছাড়া ন্যায়ের পক্ষে থাকা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ—এই দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে হলে রাজনৈতিক চিন্তা অপরিহার্য।
এশিয়া পোস্ট: আপনাদের সংগঠনের নাম আগে ছিল ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন’। কয়েক বছর আগে আপনারা ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ’ করেছেন। এই পরিবর্তনের কারণ কী? আপনাদের লক্ষ্য বা আদর্শ কি বদলে গেছে?
মুনতাছির আহমাদ: নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। আমাদের আদর্শ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যা আগে ছিল, এখনও তা-ই আছে। সংগঠনের মজলিসে শুরা এবং ইসলামী আন্দোলনের পরামর্শ ও পীর সাহেব চরমোনাইয়ের নির্দেশনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তৎকালীন পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দটি অনেক সময় সাংবিধানিক পরিভাষাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো মনে হতো। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতিতে ইসলামি মূল্যবোধকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো সাহস কেউ দেখায়নি। ফলে এই মূলনীতির বাইরে গিয়ে ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দটি একটি রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণ হতে পারত। এ ছাড়া ২০০৮ সালে মূল দল ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’ নিবন্ধনের সময়ও ‘শাসনতন্ত্র’ শব্দটি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। সেই লিগেসি বজায় রাখা এবং সংগঠনের নামের সঙ্গে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটিকে জোরালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা থেকে আমরা এই পরিবর্তন এনেছি।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে আপনাদের ইসলামি বিপ্লব বা ধর্মীয় শিক্ষার চিন্তা কি সাংঘর্ষিক নয়?
মুনতাছির আহমাদ: বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার অনেক বিষয়ের সঙ্গেই ইসলামের মৌলিক বিধানগুলো সাংঘর্ষিক। আমাদের শিক্ষা ও বিচার কাঠামোর দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যায়। ৯২ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত এই রাষ্ট্রে একজন শিক্ষার্থী প্রাইমারি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়েও সঠিকভাবে দুই রাকাত নামাজ পড়া বা সুরা ফাতেহা শিখতে পারে না। আমাদের জাতীয় কারিকুলামে মুসলিমদের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতিফলন নেই। আবার বিচার ব্যবস্থার কথা যদি বলি, আমরা আজও সেই ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া বিচার ব্যবস্থা অনুসরণ করছি। ফলে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সংস্কৃতির সঙ্গে এই ব্যবস্থার কোনো মিল নেই। যার কারণে আদালতে ৩০ লক্ষাধিক মামলা ঝুলে আছে। মানুষ বিচার না পেয়েই মারা যাচ্ছে। আমরা এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি যা ইসলামের আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে এবং যা বাংলাদেশের হাজার বছরের বাঙালি সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
এশিয়া পোস্ট: আপনারা ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের কথা বলেন। সেক্ষেত্রে হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টানদের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কী হবে?
মুনতাছির আহমাদ: ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা যা অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার সংরক্ষণের পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং খোলাফায়ে রাশেদার ৩০ বছরের শাসনামল এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইসলামি রাষ্ট্রে অন্যদের অধিকার সংকুচিত হবে—এমন ভাবার কোনো অবকাশ নেই। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালন, প্রচার এবং অনুষ্ঠান করার ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে। ইসলাম কখনও কারও ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেয় না।
এশিয়া পোস্ট: ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী? বিশেষ করে পোশাকের স্বাধীনতা বা মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে কি আপনারা কঠোরতা অবলম্বন করবেন?
মুনতাছির আহমাদ: ইসলাম মতপ্রকাশের অবাধ সুযোগ দেয়। খলিফা হজরত ওমর (রা.)-কে একজন সাধারণ মানুষ মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে পোশাকের হিসাব চেয়ে আটকে দিয়েছিলেন এবং খলিফা তার জবাব দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। স্বাধীনতার মানে হলো—আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার স্বাধীনতা ভোগ করবেন যতক্ষণ তা অন্যের সীমানা বা অধিকার নষ্ট না করে। পোশাকের ক্ষেত্রে ইসলাম মানুষকে উৎসাহিত করে, তবে কারও ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে না।
এশিয়া পোস্ট: বিগত ১৭ বছরের আওয়ামী শাসনামলে বিএনপি-জামায়াতসহ অনেক দলই চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আপনারা নির্যানের শিকার হয়েছেন, এমনটা তেমন শোনা যায় না। আপনারা কি সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করে চলেছেন?
মুনতাছির আহমাদ: এ ধারণা সঠিক নয়। আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে আমরাও অনেক জেল-জুলুমের শিকার হয়েছি। আমাদের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আরিফুল ইসলামসহ কেন্দ্রীয় কমিটির ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে নখ তুলে ফেলাসহ অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়েছে। আমাদের অনেক সভাপতির নামে আইসিটি মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে ছাত্রলীগ আমাদের ইফতার মাহফিল করতে দেয়নি, রক্তাক্ত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজাব দিবসের পোস্টার লাগাতে গিয়েও হামলার শিকার হয়েছি। আমরা আসলে আমাদের কর্মসূচিগুলো খুব শান্তিপূর্ণভাবে পালন করার চেষ্টা করি এবং প্রশাসনিক যে কমিটমেন্ট থাকে তা রক্ষা করি। ৩৪ বছরের ইতিহাসে আমরা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা বা ক্লাস বন্ধের মতো ঘটনা ঘটাইনি। এই গঠনমূলক রাজনীতির কারণেই হয়তো আমরা রাজপথে কর্মসূচি পালনের সুযোগ পেয়েছি, যা কোনো সমঝোতা নয় বরং আমাদের রাজনৈতিক আচরণেরই প্রতিফলন।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই অভ্যুত্থানে আপনাদের ভূমিকা কী ছিল? আপনাদের কতজন শহীদ হয়েছেন?
মুনতাছির আহমাদ: জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই আমরা মাঠে ছিলাম। ৫ জুন যখন হাইকোর্টের রায়ে কোটা বহাল করা হলো, তার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যানের যে কর্মসূচি শুরু হয়, সেখানে আমাদের প্রতিনিধিরা যুক্ত ছিলেন। আমাদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি খায়রুল হাসান মারজান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফ মোহাম্মদ আলাউদ্দিন সরাসরি পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ৫ আগস্ট পর্যন্ত আমাদের রাজপথের অবস্থান ছিল দৃঢ়। এই আন্দোলনে আমাদের সংগঠনের ২১ জন সদস্য শহীদ হয়েছেন এবং সুনির্দিষ্টভাবে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের দায়িত্বশীল ও কর্মী মিলিয়ে সংখ্যাটি আরও বড়। আমরা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে নিজেদের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে প্রচার করিনি, তবে রাজপথে জনশক্তি দিয়ে এবং সব ধারার শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করতে আমাদের নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ক্রেডিট নিতে চাইলে জুলাইয়ের অনেক ইমাম বানাতে পারতাম।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই-পরবর্তী ক্যাম্পাস রাজনীতিতে আপনারা কী পরিবর্তন দেখছেন?
মুনতাছির আহমাদ: জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ এবং সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এখনও ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখছি। বড় দলগুলো হলে সিট দখল বা প্রভাব বিস্তার নিয়ে একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এমনকি আমাদের কর্মীদেরও ভিন্ন মতের কারণে নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছে। আমরা এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই না যেখানে কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদল বা ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আপনাদের পার্থক্য কোথায়? অনেকে বলে আপনারা আপনাদের মূল দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের লেজুড়বৃত্তি করেন।
মুনতাছির আহমাদ: আমরা কোনো লেজুড়বৃত্তি করি না। আমরা ইসলামী আন্দোলন থেকে শুধু অভিভাবকসুলভ পরামর্শ নিই। মূল দলের ক্ষমতার স্বার্থে শিক্ষার্থীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা—এমন কোনো কাজ আমরা কখনও করি না। ছাত্রদল বা ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা তাদের অভিভাবক দলের ক্ষমতার জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বা তাদের স্বার্থ রক্ষা করে। আমাদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো ইতিহাস নেই। আমরা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করি। আমাদের রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হলো আদর্শিক পরিবর্তন, ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নয়।
এশিয়া পোস্ট: প্রায় ৩৫ বছরের পথচলায় আপনাদের সেরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য কী?
মুনতাছির আহমাদ: আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো দীর্ঘ ৩৪-৩৫ বছরের পথচলায় আমাদের কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে একটি খুনের মামলা নেই, কোনো ধর্ষণের কলঙ্ক নেই এবং আমাদের কারণে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক ঘণ্টার জন্যও বন্ধ হয়নি। এ ছাড়া আমরা বিতর্কিত শিক্ষা সিলেবাস পরিবর্তনের আন্দোলনে সফল হয়েছি এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সব সময় পাশে থেকেছি।
এশিয়া পোস্ট: ইসলামী ছাত্র আন্দোলন নেতৃত্ব নির্বাচন করে কীভাবে?
মুনতাছির আহমাদ: আমাদের এখানে নেতৃত্ব তৈরির চারটি ধাপ আছে—সদস্য, কর্মী, মুবাল্লিগ প্রত্যাশী এবং মুবাল্লিগ। একজন শিক্ষার্থীকে অবশ্যই মুবাল্লিগ হতে হয় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আসতে হলে। আমরা নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে সম্মেলন করে নতুন কমিটি গঠন করি। নেতৃত্বে গতিশীলতা রাখতে আমরা এক বছরের সেশন পদ্ধতি কঠোরভাবে অনুসরণ করি। আমাদের এখানে লবিং বা গ্রুপিংয়ের কোনো সুযোগ নেই; যোগ্যতার ভিত্তিতেই নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়।
এশিয়া পোস্ট: নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবন—বিশেষ করে বৈবাহিক অবস্থা কোনো প্রভাব ফেলে, নাকি এটি পুরোপুরি ব্যক্তির নিজস্ব বিষয়?
মুনতাছির আহমাদ: না, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। ছাত্ররাজনীতি করলে বিয়ে করা যাবে না—এমন ধারণা অনৈতিক। পারিবারিক দায়িত্বের কারণে হয়তো অনেকে সময় দিতে পারবেন না ভেবে নিরুৎসাহিত করা হয়, কিন্তু এটি কোনো বাধা নয়। আমি নিজে কেন্দ্রীয় সভাপতি হওয়ার ২০ দিনের মাথায় বিয়ে করেছি এবং আমার দায়িত্ব পালনে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমাদের অনেক নেতা বিবাহিত অবস্থায়ও দায়িত্ব পালন করছেন।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্ররাজনীতিতে বয়স নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। আপনাদের ক্ষেত্রে বয়সের সীমারেখা কী?
মুনতাছির আহমাদ: আমরা মনে করি নিয়মিত শিক্ষার্থীদেরই ছাত্ররাজনীতি করা উচিত। আমাদের নীতিমালায় আছে, একজন শিক্ষার্থীর নিয়মিত শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত তিনি ছাত্র সংগঠনে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। আমাদের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের প্রায় সব নেতাই বর্তমানে রানিং স্টুডেন্ট। ছাত্রত্ব ধরে রাখার জন্য অনৈতিক কোনো কোর্সে ভর্তি হওয়ার সংস্কৃতি আমাদের নেই।
এশিয়া পোস্ট: আগামী ১০ বছরে ছাত্র আন্দোলনকে কোথায় দেখতে চান?
মুনতাছির আহমাদ: আগামী ১০ বছরে আমি আমার সংগঠনকে বাংলাদেশের সেরা এবং সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ছাত্র সংগঠন হিসেবে দেখতে চাই। আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আদর্শ প্ল্যাটফর্ম হতে চাই, যেখানে তারা আদর্শিক শিক্ষার পাশাপাশি নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে পারবে। শিক্ষার্থীবান্ধব এবং সুন্দর একটি ছাত্ররাজনীতির পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
এশিয়া পোস্ট: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মুনতাছির আহমাদ: আপনাদের এবং এশিয়া পোস্টের পাঠকদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ।
.png)






