‘পারস্পরিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ফ্যাসিবাদ ফেরার পথ উন্মুক্ত হবে’

ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি রিদওয়ান মাযহারী। সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা, সমসাময়িক রাজনৈতিক সংকট এবং আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।
এশিয়া পোস্ট: স্বাগত আপনাকে। আপনার ছাত্ররাজনীতি শুরুর গল্প দিয়ে আলোচনা শুরু করতে চাই। শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
রিদওয়ান মাযহারী: আমি মূলত ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির প্রতি কিছুটা আগ্রহী ছিলাম। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগেই সামগ্রিক রাজনীতির প্রতি আমার এক ধরনের আগ্রহ কাজ করত। আমি রাজনীতি জানার এবং বোঝার চেষ্টা করতাম।
যখন আমি স্কুল ছেড়ে মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করি, বিশেষ করে হিফজ সম্পন্ন করার পর থেকেই রাজনীতি নিয়ে আমার মধ্যে এক ধরনের কৌতূহল কাজ করত। তখন থেকেই আমি নিয়মিত পত্রিকা কিনতাম। মাদ্রাসায় সকালে নাশতার ছুটি হলে বাইরে গিয়ে পত্রিকা কিনে পড়তাম। আবার অনেক জায়গায় পত্রিকা রাখা হতো, সেখানে দাঁড়িয়ে দেশ-বিদেশের রাজনীতি ও বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যু সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতাম।
এভাবে চলতে চলতে একপর্যায়ে ইসলামী রাজনীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি এবং ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক কার্যক্রম নিজের চোখে দেখি। তখন থেকেই ইসলামী ছাত্ররাজনীতির প্রতি আমার গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হয়। আমি যাচাই-বাছাই করা শুরু করি, কোন ছাত্র সংগঠনে যুক্ত হতে পারি। পাশাপাশি বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও রাজনৈতিক সমাবেশের ভিডিও দেখতাম। রাজনীতির প্রতি আমার এই আগ্রহ দেখে বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যরাও বলত, বড় হয়ে আমি রাজনীতি করব কি না।
পরবর্তীতে দেশের সক্রিয় ইসলামী সংগঠনগুলোকে মূল্যায়ন করে দেখতে পেলাম, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে, যা অন্য অনেক সংগঠন থেকে ভিন্ন এবং একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা দেয়। তাছাড়া জমিয়তের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতৃবৃন্দ ও ওলামায়ে কেরাম দেশের শীর্ষস্থানীয় ও নেতৃত্বশীল আলেম। এসব বিষয় আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ ছাড়াও আরও বেশ কিছু ইসলামী ছাত্র সংগঠন রয়েছে। আপনি কওমি বা হিফজ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করার কারণে কি জমিয়তের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল?
রিদওয়ান মাযহারী: বিষয়টি কেবল মাদ্রাসাকেন্দ্রিকতার কারণে নয়। কওমি মাদ্রাসাগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্বশীলরা কাজ করেন। কওমি অঙ্গনে বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীদের আনাগোনা ও বিচরণ থাকে। তবে কওমি অঙ্গনে বড় হওয়ার পাশাপাশি জমিয়তের নীতি ও আদর্শের প্রতি আমার ভেতর অন্যরকম ভালো লাগা ও আগ্রহ কাজ করেছে। তাছাড়া আমার চলাফেরা ও ওঠাবসা যাদের সঙ্গে ছিল, তাদের মধ্যে জমিয়তের সঙ্গে সম্পৃক্তদের সংখ্যাই বেশি ছিল। যার কারণে আদর্শিকভাবে প্রভাবিত হয়েই আমি ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশে কর্মী হিসেবে যোগদান করি।
এশিয়া পোস্ট: একজন সাধারণ কর্মী থেকে আজ আপনি সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি। এই দীর্ঘ পথযাত্রা বা অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
রিদওয়ান মাযহারী: আমি প্রথম যখন ছাত্র জমিয়তে অংশগ্রহণ করি, তখন ক্যাম্পাস পর্যায় থেকে আমার সাংগঠনিক দায়িত্ব শুরু হয়। প্রথমে ক্যাম্পাসের দায়িত্বশীল ছিলাম। এরপর ক্যাম্পাস পর্যায় শেষ করে ঢাকার মিরপুর জোনের দায়িত্ব পাই। জোনের দায়িত্ব পালনের পর ঢাকা মহানগরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মহানগর কমিটি থেকে ধাপে ধাপে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যপদ লাভ করি। কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসার পর প্রথমে কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সহসাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এরপর ধারাবাহিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাকে কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়।
এশিয়া পোস্ট: যখন আপনি একজন সাধারণ কর্মী বা সমর্থক হিসেবে সংগঠনকে দেখতেন, আর আজ সভাপতি হিসেবে যখন দেখছেন—এই দুই অবস্থানের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পার্থক্য দেখেন কি না।
রিদওয়ান মাযহারী: অবশ্যই এই দুই অবস্থানের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। আমি যখন দলের সাধারণ কর্মী বা সমর্থক ছিলাম, তখন যে কোনো দলীয় বা ব্যক্তিগত কার্যক্রম করার সময় আমাকে অনেক বিষয় নিয়ে অতটা গভীরভাবে ভাবতে হতো না। কিন্তু আজ শীর্ষ দায়িত্বশীল হওয়ার পর প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। স্বাভাবিকভাবেই বড় দায়িত্বে এলে মনের ভেতর এক ধরনের গুরুদায়িত্ব ও চিন্তার গভীরতা তৈরি হয়। এখন সচেতনতা ও দায়বদ্ধতা অনেক বেশি কাজ করে। তাই সাধারণ কর্মী এবং কেন্দ্রীয় সভাপতির অবস্থানের মধ্যে আমি অবশ্যই বড় ধরনের পার্থক্য অনুভব করি।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য প্রচলিত ছাত্র সংগঠনগুলোর (যেমন ছাত্রলীগ, ছাত্রদল বা ছাত্রশিবির) আদর্শিক বা কাঠামোগত কোনো মৌলিক পার্থক্য আছে?
রিদওয়ান মাযহারী: ইসলামী ছাত্র সংগঠন হিসেবে অন্যান্য সাধারণ সংগঠনের সঙ্গে আমাদের অবশ্যই মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আমাদের পুরো সংগঠনটি পরিচালিত হয় ইসলামী ভাবধারা, নীতি ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে। আদর্শের এই পার্থক্যের কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও পার্থক্য থাকে। যাদের আদর্শ ভিন্ন, তাদের নীতি ও কর্মসূচিও ভিন্ন হবে—এটাই স্বাভাবিক। সেই দিক থেকে ওই সংগঠনগুলোর সঙ্গে আমাদের আদর্শ ও কাজের ধরনে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: আপনাদের সংগঠন মূলত বাংলাদেশের কোন কোন অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়?
রিদওয়ান মাযহারী: সাংগঠনিক বিস্তৃতির কথা বললে, আমাদের সংগঠন ঢাকা, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ও বিস্তৃত।
এশিয়া পোস্ট: কওমি ঘরানা ছাড়া অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আপনাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম কেন? সাধারণ শিক্ষার্থীদের আরও কাছাকাছি যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা আছে?
রিদওয়ান মাযহারী: আমাদের এই সংগঠনের বেড়ে ওঠা ও প্রতিষ্ঠা যেহেতু কওমি মাদ্রাসা অঙ্গনকে কেন্দ্র করে, তাই সেখানে আমাদের সংগঠনের বিচরণ ও প্রভাব বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। যে কোনো সংগঠন যে প্রেক্ষাপট ও ক্ষেত্র থেকে শুরু হয়, সেখানে তার প্রভাব বেশি থাকে।
তবে আমাদের শিক্ষাসিলেবাস, কারিকুলাম ও সাংগঠনিক নীতিমালা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন সব ধরনের শিক্ষার্থী এখানে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। আমাদের দলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমও সমানভাবে চলমান রয়েছে।
এমনকি আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতেও এমন দায়িত্বশীলরা আছেন, যারা কখনো কওমি মাদ্রাসায় পড়েননি; বরং স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে ধারাবাহিক যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে আজ কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান করে নিয়েছেন। যেহেতু আমাদের গোড়াপত্তন মাদ্রাসা অঙ্গন থেকে, তাই অন্যান্য সাধারণ অঙ্গনে আমাদের সংখ্যা এখনও তুলনামূলকভাবে কম।
এশিয়া পোস্ট: কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের চাহিদা আর সাধারণ স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাহিদার মধ্যে ভিন্নতা থাকে। এই দুই ধারার শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষাকে আপনারা কীভাবে সমন্বয় করেন?
রিদওয়ান মাযহারী: আমাদের যে সাংগঠনিক সিলেবাস ও কারিকুলাম রয়েছে, তা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে উভয় ধারার শিক্ষার্থীদের চাওয়া ও চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়। মূলত আমাদের লক্ষ্য হলো, যারা ইসলামকে মনেপ্রাণে ধারণ করে, সম্মান করে এবং ইসলামী ভাবধারায় নিজের জীবন পরিচালনা করতে চায়, তারা যেন আমাদের সংগঠনে আসার সুযোগ পায়।
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা কওমি মাদ্রাসা—শিক্ষার্থী যেখানকারই হোক না কেন, সবাই যেন ইসলামকে সামনে রেখে সমাজে কীভাবে নিজেকে পরিচালনা করবে এবং কল্যাণমূলক কাজ করবে, সেই উপযোগী প্রশিক্ষণই আমাদের সিলেবাস ও কর্মসূচি থেকে দেওয়া হয়। ফলে যারা এখানে যুক্ত হয়, মৌলিক চাওয়া বা আদর্শের দিক থেকে তারা সবাই এক জায়গায় চলে আসে—আমরা ইসলামকে ভালোবাসি এবং ধারণ করতে চাই।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ কি কেবল ধর্মকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ, নাকি সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও ভূমিকা রাখে?
রিদওয়ান মাযহারী: আমরা শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার এবং তাদের কল্যাণমুখী যে কোনো প্রয়োজনকে সবসময় সমর্থন করি এবং সেসব দাবিকে সামনে আনার চেষ্টা করি। যেহেতু আমরা একটি ইসলামী আদর্শিক সংগঠন, তাই যে কোনো যৌক্তিক আন্দোলন বা কর্মসূচিকে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতি ও বিধিনিষেধের আলোকেই পরিচালনা করার চেষ্টা করি।
এশিয়া পোস্ট: কোনো শিক্ষার্থী যদি ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম পালন করতে চায়, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী না হয়, তিনি কি আপনাদের সংগঠন করতে পারবেন?
রিদওয়ান মাযহারী: আমাদের পক্ষ থেকে এ ধরনের শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বাধা নেই। সে যদি নিজের কল্যাণের পাশাপাশি দেশ, সমাজ ও জাতির মঙ্গলের জন্য কাজ করতে চায়, তবে অনায়াসে আমাদের সংগঠনে আসতে পারে এবং আমাদের সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে শরিক হতে পারে। আমরা আশা করব এবং চেষ্টা করব যে, আমাদের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি ইসলামের মহান আদর্শ ও চিন্তাচেতনা যেন তার ব্যক্তিগত জীবনকেও সুন্দরভাবে প্রভাবিত করে।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে তো ইসলামী ছাত্রশিবির বা ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের মতো আরও ইসলামী ছাত্রসংগঠন রয়েছে। তাদের সঙ্গে আপনাদের কোনো মৌলিক পার্থক্য আছে? বিশেষ করে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্কের দূরত্বটা কোথায়?
রিদওয়ান মাযহারী: বাংলাদেশে কওমি ঘরানার যেসব ইসলামী ছাত্র সংগঠন আছে, তাদের সঙ্গে মৌলিক আদর্শিক দিক থেকে আমাদের তেমন কোনো বড় পার্থক্য নেই। যার যার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা দলীয় কৌশল ভিন্ন হতে পারে, দল আলাদা হতে পারে, কিন্তু ইসলামের মৌলিক আকিদার দিক থেকে আমরা এক। তবে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আমাদের আদর্শিক জায়গায় কিছুটা দূরত্ব রয়েছে। ইসলামী রাজনীতি করতে গেলে যেসব মৌলিক আকিদা ও বিশ্বাস ধারণ করতে হয়, সেই ক্ষেত্রগুলোতে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আমাদের মৌলিক ও আদর্শিক ব্যবধান রয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আপনাদের এই মৌলিক বা আদর্শিক দূরত্বের দু-একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দেওয়া যাবে?
রিদওয়ান মাযহারী: প্রধান যে বিষয়টি নিয়ে আমাদের তীব্র আপত্তি রয়েছে, তা হলো ‘সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি’—এই আকিদা। আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি এবং কোরআন-হাদিসের দলিল অনুযায়ী এই আকিদা পোষণ করি যে, সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি। কিন্তু ছাত্রশিবির বা তাদের মূল দল এই বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করতে চায় না। তারা সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসা করে, তাদের কোরবানি ও ত্যাগের কথা বলে, কিন্তু তাদের ‘সত্যের মাপকাঠি’ হিসেবে মেনে নেওয়ার জায়গায় আমাদের সঙ্গে একমত হতে পারে না। এ ছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং অন্যান্য কিছু মৌলিক ধর্মীয় বিষয়ে তাদের দেওয়া ব্যাখ্যাগুলো আমরা মনে করি, ইসলামের মূল ধারার আকিদার সঙ্গে খাপ খায় না।
এশিয়া পোস্ট: দেশের মূলধারার রাজনীতিতে বা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ অন্যান্য বড় সংগঠনের মতো ততটা আলোচিত নয় কেন? আপনাদের সংগঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং দুর্বলতা কোনগুলো?
রিদওয়ান মাযহারী: আলোচিত হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি মূলত ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশে ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের মূল দলগুলো দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, যার কারণে তারা সবসময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকে।
তবে আমরা কাজের ক্ষেত্রে নিজেদের শতভাগ নিখুঁত বা সফল দাবি করি না। আমাদের অবশ্যই কিছু সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে এবং কাজের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা আসে। আমরা সেই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সম্ভাবনা ও কাজের পরিধি অন্যান্য সংগঠনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় এবং আমরা তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়েই মাঠে সক্রিয় আছি।
এশিয়া পোস্ট: তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আপনাদের পথচলা। এই দীর্ঘ সময়ে সাংগঠনিকভাবে আপনাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য কী?
রিদওয়ান মাযহারী: আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, আমরা যেসব কর্মী ও দায়িত্বশীল গড়ে তুলেছি, তাদের আমাদের সংগঠনের মূল নীতি ও আদর্শের ওপর অবিচল রাখতে পেরেছি। আমাদের কর্মীরা নিজেদের ব্যক্তিজীবনে, পরিবারে এবং সমাজে একটি সুন্দর আদর্শিক রূপ ধারণ করতে পেরেছে।
আরেকটি বড় সাফল্য হলো, বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা খুন, ধর্ষণ, টেন্ডারবাজি বা নানা অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে মিডিয়ায় তুমুল সমালোচনা হয়। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, দীর্ঘ তিন দশকে ছাত্র জমিয়তের কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে এমন কোনো দুর্নাম, বদনাম বা কালো দাগ নেই, যা আমাদের বা সমাজকে কলঙ্কিত করেছে। এটি আমাদের একটি বড় নৈতিক সাফল্য।
এশিয়া পোস্ট: সচরাচর দেখা যায়, বড় দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, যা অনেক সময় সংঘাতের রূপ নেয়। ভবিষ্যতে আপনাদের সংগঠন যদি বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তখন কি আপনারাও আধিপত্য বিস্তারের এই ধারায় জড়িয়ে পড়বেন?
রিদওয়ান মাযহারী: আমরা আমাদের কর্মীদের এমন আদর্শিক ও নৈতিক ভিত্তির ওপর গড়ে তুলি, যেখানে অন্যায় আধিপত্য বা পেশীশক্তি প্রদর্শনের কোনো সুযোগ নেই। আমাদের কর্মীদের মানসিকতা কখনোই আধিপত্যবাদী নয়। এরপরও যদি কেউ এমন অনৈতিক কাজে জড়াতে চায়, আমরা তৎক্ষণাৎ তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। ক্যাম্পাসে আধিপত্যবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার যেসব চোরাপথ রয়েছে, আমরা সাংগঠনিকভাবে শুরুতেই তা বন্ধ করে দিই।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল?
রিদওয়ান মাযহারী: জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই, বিশেষ করে যখন এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়েছিল, আমরা এর গতিবিধি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। একপর্যায়ে যখন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, মামলা, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড শুরু হলো, তখন আমরা বুঝলাম, এটি আর কেবল কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি একটি গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
ছাত্র সংগঠন হিসেবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং এই জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই অবস্থান থেকে জুলাই মাস থেকেই আমরা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হই এবং সারা দেশের দায়িত্বশীলদের নির্দেশনা দিই, যেন তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে রাজপথে নেমে আসে। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকেও দলীয় ব্যানার পরিহার করার আহ্বান ছিল। তাই আমাদের কর্মীরা দেশের সব প্রান্তে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনে যোগ দেয়। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বড় আন্দোলনের জায়গাগুলোতে আমাদের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় দায়িত্বশীলরা প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলনে আপনাদের কোনো সুনির্দিষ্ট অবদানের কী ছিল?
রিদওয়ান মাযহারী: এই ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে আমাদের সংগঠনের দুজন কর্মী শাহাদাতবরণ করেছেন। আমাদের বেশ কয়েকজন কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং অনেকেই গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া আমাদের একজন কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল সরাসরি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে যুক্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকার কথা ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অবদান নিয়ে তেমন আলোচনা দেখা যায় না। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
রিদওয়ান মাযহারী: বাংলাদেশে সবসময়ই ইসলামপন্থি বা কওমি অঙ্গনের মানুষের অবদানকে কিছুটা কোণঠাসা ও খাটো করে দেখার একটি প্রবণতা কাজ করে। মিডিয়া বা বিভিন্ন মহলে তাদের বীরত্বপূর্ণ অবদানকে সেভাবে ফোকাস বা হাইলাইট করা হয় না। যদিও এই আন্দোলনটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে সংঘটিত হয়েছিল, দুঃখজনকভাবে কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের অবদান মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এক ধরনের বৈষম্য আমরা লক্ষ্য করেছি।
তবে মাদ্রাসা ছাত্রদের অংশগ্রহণ মোটেও অস্পষ্ট ছিল না। আন্দোলনের কঠিন সময়ে ঢাকার হাটহাজারী মাদ্রাসা, যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসা, বারিধারা মাদ্রাসা এবং আরজাবাদ মাদ্রাসার মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজপথে সাহসী ভূমিকা পালন করেছে। তখন মাদ্রাসাগুলোতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা সন্নিকটে ছিল। এমনকি ৫ আগস্টের মাত্র তিন-চার দিন পরই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা যায়নি। তারা দেশের ক্রান্তিলগ্নে জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমে আসে। যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বারিধারাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা শহীদ হয়েছেন এবং অনেকে গুরুতর অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই আন্দোলনের সময় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্দোলনের এই বিপ্লবী মনোভাব কখন এবং কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে তীব্র হয়ে উঠেছিল?
রিদওয়ান মাযহারী: যখন জুলাই আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বর্বরোচিত হামলা ও নির্যাতন শুরু হলো, তখন আমাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। আমরা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম যে, এই ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে আর ঘরে বসে থাকার সময় নেই। ফ্যাসিবাদ বিদায়ের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেখানে তরুণ প্রজন্ম হিসেবে আমাদের অংশ নিতেই হবে।
শিক্ষার্থীরা আমাদের ভাই, তারা আমাদের নাগরিক। তাদের ওপর যখন অমানবিক অত্যাচার চলছিল, তখন আমরা কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা বসে থাকতে পারিনি। বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে প্রতিটি আপডেট সবার হাতে পৌঁছে গিয়েছিল, যা শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামতে চূড়ান্তভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
এশিয়া পোস্ট: কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা দীর্ঘকাল ধরে সনদের সরকারি স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়ে আসছে। বর্তমান সরকারের কাছে এ বিষয়ে আপনাদের কী ধরনের প্রত্যাশা রয়েছে?
রিদওয়ান মাযহারী: আমাদের শিক্ষা বোর্ড এবং ওলামায়ে কেরামের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ইতিপূর্বে সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন এবং এখনও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। স্বীকৃতির বিষয়টি আমরা এমনভাবে চাই, যেন কওমি মাদ্রাসার নিজস্ব স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। আমরা আমাদের ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা বজায় রেখে চাই।
এশিয়া পোস্ট: এই দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতা বা সাফল্যের সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?
রিদওয়ান মাযহারী: সরকার যদি আমাদের যৌক্তিক দাবির প্রতি আন্তরিক থাকে এবং কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা বজায় রাখার শর্তগুলো মেনে নেয়, তবে অবশ্যই এ বিষয়ে একটি ইতিবাচক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে এ বিষয়ে স্পষ্ট মন্তব্য করা কঠিন।
এশিয়া পোস্ট: বিগত সরকারের সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। এরপরও কেন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের এই দাবিগুলো পুরোপুরি পূরণ হয়নি?
রিদওয়ান মাযহারী: প্রথমত, ‘কওমি জননী’ উপাধিটি কওমি মাদ্রাসা বা ওলামায়ে কেরামের সামষ্টিক কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ব্যক্তিগতভাবে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলেছিলেন। এই উপাধি দেওয়ার পর কওমি অঙ্গন থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনা হয়েছিল এবং ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। আর স্বীকৃতির বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—সরকারে আওয়ামী লীগ থাকুক আর বিএনপি থাকুক, আমরা আমাদের নিজস্ব স্বকীয়তা ও গৌরব ধরে রেখেই আমাদের সনদের যথাযথ মূল্যায়ন চাই।
এশিয়া পোস্ট: তৎকালীন সময়ে শেখ হাসিনাকে এই উপাধি দেওয়ার বিষয়টি কি আপনাদের জন্য বিব্রতকর ছিল?
রিদওয়ান মাযহারী: হ্যাঁ, অবশ্যই আমরা অত্যন্ত বিব্রত বোধ করেছিলাম। আমরা কখনোই এই উপাধি সমর্থন করিনি এবং আমাদের ওলামায়ে কেরাম ও ছাত্রসমাজ এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। আমরা তখন ছাত্র ছিলাম, তবে আমাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এ বিষয়ে তাদের দ্বিমত ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ সময় পার হয়েছে। আপনারা যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন, সেই বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষাগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বলে মনে করেন?
রিদওয়ান মাযহারী: আমরা মনে করি, জুলাই আন্দোলনের যে মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা এখনও দৃশ্যমানভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফ্যাসিবাদকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা, পুনরায় যেন কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনরুত্থান না ঘটে এবং সমাজ থেকে সর্বপ্রকার বৈষম্য দূর করার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, সেই জায়গাগুলোতে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। আমরা এখনও অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ লক্ষ্য করছি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
এশিয়া পোস্ট: আপনি সম্প্রতি ‘মব জাস্টিস’ বা মব বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। আপনার দৃষ্টিতে এই ‘মব’ বিষয়টি আসলে কী এবং কেন এটি ঘটছে?
রিদওয়ান মাযহারী: আমরা উগ্রতা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনাগুলোকেই ‘মব’ বলে অভিহিত করি। ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে এই শব্দটি আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে। অতীতে আমরা একে উগ্রতা বা বিশৃঙ্খলা বলতাম, এখন একে মব বলা হচ্ছে। এই ধরনের আইনহীনতা ও হামলা-ভাঙচুর দেশের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ছাত্রদল বা ছাত্রশিবিরের মতো বড় সংগঠনগুলোর কিছু কর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ আসছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এখানে কারও গা বাঁচিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের দলীয় পরিচয় যাই হোক না কেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির কিছুটা সহাবস্থানে থাকলেও মাঝে মাঝে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এই সংঘাত এড়াতে আপনার পরামর্শ কী?
রিদওয়ান মাযহারী: বিগত আওয়ামী শাসনের সময় ছাত্রলীগ যেভাবে একক আধিপত্য কায়েম করেছিল এবং ভিন্নমতের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল, সেই তুলনায় এখন কিছুটা সহাবস্থান আছে বলা যায়। তবে সংঘাত এড়াতে আমাদের পরামর্শ হলো—সকল ছাত্র সংগঠনকে অত্যন্ত বিনয়ী, আন্তরিক ও সংযমী হতে হবে। এক পক্ষের উসকানিতে অন্য পক্ষ যেন পাল্টা মারমুখী না হয়। উসকানি পেলেও নিজের কর্মীদের শান্ত রাখা এবং সংঘাত থেকে বিরত রাখাটাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়।
নিজেরা আঘাত পেয়েও যদি বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো যায়, তাহলে সেই সংযমটুকু প্রদর্শন করা উচিত, যাতে ক্যাম্পাসের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট না হয় এবং কোনো ছাত্রের প্রাণহানি না ঘটে।
এশিয়া পোস্ট: দেশের ছাত্ররাজনীতির এই সংঘাতময় রূপ দেখে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কি রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন?
রিদওয়ান মাযহারী: অবশ্যই। ছাত্র সংগঠনগুলো যদি নিজেদের মধ্যে মারামারি এবং শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি করে, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে ছাত্ররাজনীতির প্রতি অনীহা ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের রাজনীতিতে যুক্ত হতে বাধা দিচ্ছেন বা সরিয়ে নিচ্ছেন।
ছাত্ররাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় এবং দেশ গঠন। আমরা যদি সেই মূল আদর্শে ফিরে এসে কাজ করতে পারি, তবেই ছাত্ররাজনীতি পুনরায় মর্যাদা ফিরে পাবে এবং দেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে।
এশিয়া পোস্ট: বামপন্থি বা প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অভিযোগ রয়েছে যে, ধর্মভিত্তিক ছাত্র সংগঠনগুলো ভিন্নমতের স্বাধীনতা বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতায়, যেমন পোশাকের স্বাধীনতায়, বিশ্বাস করে না। এ বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী?
রিদওয়ান মাযহারী: ইসলাম একটি সার্বজনীন ও শান্তির ধর্ম। ইসলামের মহান আদর্শ বা আইন অনুসরণ করে কারও ওপর জুলুম বা অবিচার করা হয়েছে—এমন কোনো উদাহরণ কেউ দেখাতে পারবে না। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এখন কেউ যদি নিজেকে মুসলিম দাবি করে, তবে ইসলামের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান ও নৈতিকতা মেনে চলা তার দায়িত্ব। সে যদি মুখে ইসলাম মানার কথা বলে, অথচ প্রাত্যহিক জীবনে তার বিপরীত কাজ করে, তবে তা অন্যান্য সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে পারে।
এশিয়া পোস্ট: কেউ যদি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও ব্যক্তিগতভাবে ইসলাম পুরোপুরি না মানে বা নিজের ইচ্ছামতো পোশাক পরতে চায়, সেক্ষেত্রে কি আপনারা তাকে বাধ্য করবেন?
রিদওয়ান মাযহারী: আমরা কাউকে জোর বা বাধ্য করব না। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে কোনটি সঠিক আর কোনটি অন্যায় বা অনুচিত, তা তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব। আমরা শুধু এতটুকু খেয়াল রাখব, যেন কারও ব্যক্তিগত আচরণের কারণে অন্য কোনো সাধারণ মুসলমান বিভ্রান্ত না হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আমরা সমাজে সুস্থ ধর্মীয় পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করব, তবে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো পোশাক বা জীবনাচরণে বাধ্য করার দায়িত্ব আমাদের নয়।
এশিয়া পোস্ট: ইদানীং ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে বিভিন্ন স্থানে নাটক, কনসার্ট বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়া এবং মঞ্চ ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটছে। এই ‘তৌহিদী জনতা’ কারা এবং কেন তারা এমন করছে?
রিদওয়ান মাযহারী: প্রথমত, ইসলাম শান্তি ও নিয়মতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী। গান-বাজনা বা এমন কোনো বিষয় যদি ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থি হয়, তবে তা প্রতিহত করার সঠিক উপায় হলো প্রশাসন ও স্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা। কিন্তু ‘তৌহিদী জনতা’র নামে অতিউৎসাহী হয়ে যারা ভাঙচুর বা মারামারি করছে, তা ইসলাম সমর্থন করে না।
এর পেছনে ইসলামকে বিতর্কিত করার কোনো ষড়যন্ত্রকারী চক্রও থাকতে পারে। ইসলাম সবসময় শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজ সংস্কারের কথা বলে। তবে কোনো অনুষ্ঠানে চরম অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে সমাজ ধ্বংসের আশঙ্কা থাকলে, তা স্থানীয় প্রশাসন ও মুরব্বিদের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বন্ধ করা আবশ্যক।
এশিয়া পোস্ট: কিন্তু অনেকে কনসার্ট বা গান-বাজনাকে সুস্থ সংস্কৃতি বা প্রগতিশীলতা হিসেবে দেখেন। আপনাদের কাছে কি কনসার্ট অশ্লীল মনে হয়?
রিদওয়ান মাযহারী: গান-বাজনার ক্ষেত্রে ইসলামে সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা আমরা জানি। তবে কেউ যদি অন্যের ক্ষতি না করে বা মাদ্রাসা-মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট না করে নিজস্ব আঙিনায় তা করতে চায়, তাহলে আমরা গিয়ে সরাসরি তাদের বাধা দিই না। আর ‘তৌহিদী জনতা’র নামে যারা এসব সহিংসতা ঘটাচ্ছে, আমরা তাদের চিনি না বা তাদের বিষয়ে অবগত নই। আমাদের জানা মতে, কোনো মূলধারার ইসলামী সংগঠন বা নেতৃবৃন্দের নির্দেশনায় এ ধরনের ভাঙচুর বা হামলা চালানো হচ্ছে না।
এশিয়া পোস্ট: এমন কি হতে পারে যে, জুলাই আন্দোলনের মতো এখানেও ইসলামপন্থিরা বা কওমীপন্থিরা সরাসরি দলীয় পরিচয় না এনে ‘তৌহিদী জনতা’র নামে এসব করছে?
রিদওয়ান মাযহারী: না, এটি পুরোপুরি সত্য নয়। আপনারা যদি গভীরভাবে অনুসন্ধান বা বিশ্লেষণ করেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে, এ ধরনের উগ্র কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দেশের মূলধারার কোনো ইসলামী শক্তি বা ব্যক্তিবর্গ জড়িত নন। আমরাও তৌহিদ ও ঈমানের ভিত্তিতে তৌহিদী জনতা, কিন্তু আমরা কখনোই এ ধরনের হামলা-মামলা বা সহিংসতাকে সমর্থন করি না। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢালাওভাবে পুরো ইসলামপন্থি সমাজকে দায়ী করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
এশিয়া পোস্ট: কোনো অমুসলিম কি আপনাদের ছাত্র সংগঠনে যোগ দিতে পারবে?
রিদওয়ান মাযহারী: আমাদের সংগঠনের মূল ভিত্তি ও নীতি তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ ইসলামী আদর্শের ওপর। এখন কোনো অমুসলিম যদি আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায়, তবে তাকে সংগঠনের আদর্শ ও নীতিমালা মেনেই আসতে হবে। তবে সরাসরি সাংগঠনিক সদস্য না হয়েও আমাদের বিভিন্ন সামাজিক, সেবামূলক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তারা সহযোগী হিসেবে কাজ করতে পারে, এতে কোনো বাধা নেই।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে আপনারা বিএনপি জোটের সঙ্গে কাজ করছেন। ভবিষ্যতে তারা কোনো ভুল বা অন্যায় করলে তার দায় কি আপনারা নেবেন?
রিদওয়ান মাযহারী: আমরা শুরু থেকেই স্পষ্ট করে বলেছি যে, বিএনপির সঙ্গে আমাদের জোটটি ছিল মূলত নির্বাচনকেন্দ্রিক একটি সাময়িক রাজনৈতিক কোয়ালিশন। নির্বাচনের পর আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক গতিপথ সম্পূর্ণ স্বাধীন। বর্তমান সময়ে তাদের দলীয় মিটিং বা কর্মকাণ্ডে আমাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। আমরা তাদের ভালো কাজকে যেমন সাধুবাদ জানাই, তেমনি তাদের যে কোনো ভুল বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ভাষায় সমালোচনা করি। অতএব, তাদের কোনো ভুলের দায় আমাদের ওপর চাপানোর কোনো সুযোগ নেই।
এশিয়া পোস্ট: সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার নিয়ে আপনাদের ছাত্র সংগঠনের অবস্থান কী?
রিদওয়ান মাযহারী: সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে আমাদের মূল দল জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও আপত্তিগুলো তুলে ধরেছে। বিশেষ করে জুলাই সনদের কিছু ধারা, যা আমাদের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেগুলোর সংশোধনের দাবি জানানো হয়েছে। আমরা মনে করি, দেশের কল্যাণ এবং জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান জানিয়ে সব দলের ঐকমত্য ও আলোচনার ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার করা উচিত।
এশিয়া পোস্ট: সংবিধানে ‘গণভোট’ বিধান রাখার বিষয়ে আপনার ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক অভিমত কী?
রিদওয়ান মাযহারী: আমরা মনে করি, জনগণের চূড়ান্ত মতামত নেওয়ার জন্য গণভোটের বিধান সংবিধানে থাকা অত্যন্ত জরুরি। এটি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে আরও শক্তিশালী করে। যদি কোনো বিষয়ে বিতর্ক থাকে, তাহলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে গণভোটের বিষয়টিকে অবশ্যই প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
এশিয়া পোস্ট: সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আপনি ছাত্র জমিয়তে বিশেষ কী ধরনের গুণগত পরিবর্তন আনতে চান?
রিদওয়ান মাযহারী: আমাদের সংগঠনের একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা ও পরিকল্পনা আগে থেকেই নির্ধারিত রয়েছে। আমার পূর্বসূরিরা অত্যন্ত যোগ্য ও দূরদর্শী ছিলেন। তারা যে সুন্দর রূপরেখা দিয়ে গেছেন, সভাপতি হিসেবে আমার প্রধান লক্ষ্য হলো সেই পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তব রূপ দেওয়া এবং সংগঠনকে আরও গতিশীল ও সুশৃঙ্খল করা। আমি যদি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করে যেতে পারি, তবেই নিজেকে সফল মনে করব।
এশিয়া পোস্ট: আমাদের পাঠকদের উদ্দেশে সবশেষে আপনার বার্তা কী?
রিদওয়ান মাযহারী: আমরা সবাই এ দেশের নাগরিক এবং আমরা সকলেই দেশের সার্বিক কল্যাণ ও শান্তি কামনা করি। আমরা চাই, সমাজে আর কোনো বিশৃঙ্খলা বা ফ্যাসিবাদী আচরণের পুনরাবৃত্তি না ঘটুক। বাংলাদেশ একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে পরিণত হোক। আসুন, আমরা সকলে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্তরিকতার সঙ্গে দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করি।
এশিয়া পোস্ট: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
রিদওয়ান মাযহারী: আপনাকেও ধন্যবাদ।







