‘ভারতীয় এজেন্ডার অংশ হিসেবে ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতা’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘ভারতীয় এজেন্ডার অংশ হিসেবে ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতা’
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছে বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর কর্মী হিসেবে, পরে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য এবং বাংলাদেশ ছাত্রশক্তির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালে বাংলাদেশ লেবার পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। বর্তমানে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় জোটের অন্যতম শরীক দল এটি। দীর্ঘ দুই দশক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে সম্পৃক্ত থেকে রাজপথে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করেছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন পাঁচবার। এশিয়া পোস্টের সঙ্গে ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান আলোচনা করেছেন দেশের রাজনীতি, গণতান্ত্রিক উত্তরণে সরকারি দলের ভূমিকা ও বিরোধী দলের ফাংশন এবং সদ্য ঘোষিত বাজেট নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবিদ আজম।

Advertisement

এশিয়া পোস্ট: আপনার রাজনীতির হাতেখড়ি এবং দীর্ঘ এই রাজনৈতিক পথচলার গল্পটি জানতে চাই।

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: আমি মূলত ছাত্ররাজনীতি থেকেই এই অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত। যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তাম, তখন থেকেই পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে রাজনীতিতে আমার পদার্পণ। প্রথমে বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তবে পরবর্তীতে ডানধারার রাজনীতিতে আসার সুযোগ হয়। আমার রাজনীতির মূল লক্ষ্যই ছিল নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের পরিবারে একদিকে ইসলামী ধারার রাজনীতি ছিল, অন্যদিকে আমরা বাম রাজনীতি করতাম। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দেখতে পেলাম যে, বাম রাজনীতির কথা এবং কাজের সঙ্গে বিস্তর অমিল। বিশেষ করে রাজনীতির জাতীয় ধারা, মুক্তিযুদ্ধ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের বিষয়ে তাদের উপস্থাপনায় অনেক ফাঁক রয়েছে। এই আদর্শিক অমিলের কারণেই আমি জাতীয়তাবাদী ধারার গণমুখী রাজনীতিতে থিতু হই।

আমার পরিবার ছিল অত্যন্ত সচেতন একটি রাজনৈতিক পরিবার। আমার বাবা শিক্ষক হওয়ার কারণে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না, তবে আমার মামাসহ আত্মীয়-স্বজনের অনেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। শৈশবে তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রোগ্রাম ও কর্মসূচিতে যাওয়ার মাধ্যমেই আমার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা, দেশপ্রেম এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশ লেবার পার্টি দীর্ঘ ২০ বছর বিএনপির ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে রাজপথে আন্দোলন করেছে। কিন্তু গত বছরের শেষের দিকে কেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কের ইতি ঘটল?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: বেগম খালেদা জিয়ার আমন্ত্রণে ২০০৬ সালে আমার নেতৃত্বে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয় বাংলাদেশ লেবার পার্টি। তৎকালীন রাজনৈতিক সংকট, আওয়ামী লীগের চক্রান্ত এবং নির্বাচনের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় তিনি আমাদের মতো ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোকে নিয়ে দেশ ও মানুষ বাঁচানোর ডাক দিয়েছিলেন। সেই থেকে ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী সময় এবং এরপর দীর্ঘ ২০ বছর আমরা রাজপথে একসঙ্গে লড়াই করেছি। শত শত কর্মসূচিতে বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতি ও দিকনির্দেশনায় আমরা কাজ করেছি। আমাদের ইফতার মাহফিলগুলোতেও তিনি নিয়মিত আসতেন।

এই দীর্ঘ সময়ে আমি যুবলীগের হামলার শিকার হয়েছি, পাঁচবার গ্রেপ্তার হয়েছি। আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মী মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদমুক্ত একটি দুর্নীতি ও প্রতিহিংসামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার। কিন্তু ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দৃশ্যপট বদলে গেল। যে দলটির নেতাকর্মীরা ১৭ বছর নির্যাতিত ছিল, তারা এলাকায় ফিরেই খুন, দখলবাজি, চাঁদাবাজি এবং টেন্ডারবাজির মতো অপকর্মে লিপ্ত হলো।

বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের এই কর্মকাণ্ড আমাদের ব্যথিত করেছে। আমরা মানুষের মুক্তির জন্য এবং গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছিলাম, জবরদখল রাজনীতির জন্য নয়। আমরা দেখলাম, ১৭ বছর নির্যাতিত একটি দল মাত্র ১৭ মাসে মানুষের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। এই জায়গা থেকেই মনে হয়েছে, এই বিএনপিকে দিয়ে জনগণের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই আমরা জোট থেকে সরে দাঁড়িয়েছি।

এশিয়া পোস্ট: দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী হয়েও আপনারা বিএনপির কাছে কি হঠাৎ অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছেন?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: বিএনপি যখনই কোনো বিশেষ শক্তির ওপর ভর করে, তখনই তারা পুরোনো মিত্রদের অবজ্ঞা করতে শুরু করে। দীর্ঘ ২৬ বছর জামায়াতে ইসলামী তাদের জোটসঙ্গী ছিল। জামায়াতের সমর্থনেই ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করেছিল। জামায়াত নেতাদের শুধুমাত্র বিএনপির সঙ্গে থাকার কারণে বিচারের নামে অবিচার বা ‘জুডিশিয়াল কিলিং’-এর শিকার হতে হয়েছে। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, জামায়াত যদি বিএনপির সঙ্গে না থাকত, তবে আওয়ামী লীগ তাদের ওপর এই বিচারিক হত্যাকাণ্ড ঘটাতো না। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে কোনো দেশি-বিদেশি শক্তির ইশারায় বিএনপি সেই জামায়াতকে জোট থেকে সরিয়ে দিল। একইভাবে ২০ দলীয় জোটকেও তারা অকার্যকর করেছে। তারা মূলত জামায়াতকে সরানোর বাহানায় ২০ দলীয় জোট ভেঙে দিয়েছে এবং আমাদের মতো বিশ্বস্ত মিত্রদের অপ্রয়োজনীয় ভেবেছে।

এশিয়া পোস্ট: বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে যুগপৎ কাজ করার সময় আপনারা কোনো সমস্যা অনুভব করেছেন কি না?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: ২০২২ সালের পর থেকে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের নামে যে প্রক্রিয়া শুরু করল, তাতে আমাদের ঐক্য দুর্বল হয়েছে। যারা দীর্ঘকাল গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়ে রাজপথে ছিল, তাদের গুরুত্ব না দিয়ে বিএনপি এমন কিছু দল ও ব্যক্তিকে কাছে টেনে নিল যারা সুযোগসন্ধানী। যারা সকালে এক কথা বলে আর বিকেলে অন্য কথা। যাদের অনেকের সঙ্গে ভারতীয় দূতাবাস বা বিদেশি শক্তির গোপন আঁতাত রয়েছে। তাদের নিয়ে বিএনপি নতুন সমীকরণ সাজিয়েছে। আমরা যারা দীর্ঘকাল বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আন্দোলন করেছি, তারা বিএনপির পাতানো ফাঁদে কাঁটা হিসেবে চিহ্নিত হলাম। তারা মূলত জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তিকে আলাদা করে দেওয়ার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এমনকি সালাহউদ্দিন আহমদ কীভাবে ভারতে থেকে বাংলাদেশে আসার সুযোগ পেলেন, তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন আছে। বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে, আর বিএনপি এই ব্যর্থতার দায় না নিয়ে উল্টো জনগণের সঙ্গে তামাশায় মেতেছে।

এশিয়া পোস্ট: সংবিধান সংস্কার কমিশনের বৈঠকে আপনার দল যে মতামত দিয়েছে, তা কতটা গুরুত্ব পেয়েছে?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: আমরা সংবিধান সংশোধন নয়, বরং আমূল সংস্কার চাই। বর্তমান ৭২-এর সংবিধানটি মূলত ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার তৈরি করার উপযোগী। আমাদের এমন একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান দরকার, যা জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করবে এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করবে। বিএনপি সংস্কারের কথা বললেও তারা আসলে ততটুকুই সংস্কার চায় যতটুকু তাদের স্বার্থে লাগে। আমরা ঐক্যমত কমিশনের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাজ করে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে যে প্রস্তাব তৈরি করেছিলাম, তাতে ৭০ ভাগ মানুষ সমর্থন দিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি সেই ম্যান্ডেটকে অবজ্ঞা করেছে। গণভোটের রাজনীতি বিএনপিই শুরু করেছিল, আবার তারাই তা কবর দিচ্ছে। এর দায়ভার তাদেরই নিতে হবে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্মম একটা ঘটনা হচ্ছে যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। বিএনপিও শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যদি এ দেশের রাজনীতিবিদরা ওয়ান ইলেভেন থেকে শিক্ষা নিত তাহলে আর ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দরকার ছিল না। যদি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নিত বিএনপি, তাহলে আজকে আমাদেরকেই রাজপথে আন্দোলন করার দরকার ছিল না। আজকে আমাদের বিভাগীয় সম্মেলনগুলো করার দরকার ছিল না। এখন আমাদের গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার দরকার ছিল না।

এশিয়া পোস্ট: ধানের শীষ প্রতীকে আপনি অতীতে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপির সঙ্গ ত্যাগ করে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যোগ দেওয়া আদর্শিক বৈপরীত্য ঘটল কি না?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: বাংলাদেশ লেবার পার্টি একটি ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ও সাম্যবাদ আদর্শের দল। আমরা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করি। লেবার পার্টি বিএনপির আগে ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নিষিদ্ধ থাকার পরবর্তী সময়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে ১৯৭৭ সালে এটি পুনরায় কাজ করার সুযোগ পায়। জিয়াউর রহমান যে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট করেছিলেন সেই ফ্রন্টের ছয়টা রাজনৈতিক দলের একটা বাংলাদেশ লেবার পার্টি। সুতরাং বিএনপির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।

জিয়াউর রহমানের সঙ্গে মাওলানা আব্দুল মতিন কাজ করেছেন। আমি ১৬ বছর বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজ করেছি। আর ছয় বছর তারেক রহমানের সঙ্গে কাজ করেছি। তবে লন্ডনের তারেক রহমান আর বর্তমানের তারেক রহমানের মধ্যে আমি অনেক পার্থক্য দেখি। সংসদে জুলাই অভ্যুত্থানের নায়কদের নিয়ে যখন বিরূপ মন্তব্য করা হলো, তখন তারেক রহমানের অবস্থান আমাদের ব্যথিত করেছে। আমরা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল হওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে কাজ করতে কোনো সমস্যা দেখছি না। কারণ, আমাদের আদর্শিক জায়গাগুলো কাছাকাছি।

এশিয়া পোস্ট: নির্বাচনে আপনাদের দল ১৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং সেই দলের প্রধান হিসেবে আপনি এবার নিজে নির্বাচন করেননি। মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কেন?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: আমার নির্বাচনি এলাকায় বড় দলের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতির কারণে এবং জামায়াত জোটের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে আমি নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে বিরত ছিলাম। ওই সময় নির্বাচনের পরিবেশ অত্যন্ত ভীতিপ্রদ ছিল। বড় দলের প্রার্থীরা আমাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছিল। আমরা এজন্য আইনের আশ্রয় নিয়েছি।

সর্বোপরি, আমরা যখন দেখলাম যে আমাদের মূল লক্ষ্য শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং একটি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে, সে আন্দোলনে আমি শরিক হয়েছি। ফলে বৃহত্তর স্বার্থে আমি নির্বাচন থেকে দূরে সরে যাই।

এশিয়া পোস্ট: সদ্য ঘোষিত বাজেট নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? এটি কতটা জনবান্ধব?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: এ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে বাজেট মানেই একটি আতঙ্কের নাম। বাজেট ঘোষণার পর কখনো দ্রব্যমূল্য কমেছে এমন নজির নেই। এবারের বাজেটেও এর ব্যতিক্রম কিছু দেখছি না। বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ অনেক বেশি, প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। রাজস্ব আহরণের নামে সাধারণ মানুষকে ভ্যাট ও করের জালে বন্দি করা হচ্ছে। অথচ বড় বড় শিল্পপতিরা কর ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে।

গত ১৭ বছরে যে অর্থ পাচার হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনার কোনো কার্যকর উদ্যোগ সরকার নেয়নি। উল্টো ঋণের বোঝা বাড়ানো হচ্ছে। এমনিতেই আওয়ামী লীগের সময়ের বড় একটা ঋণের খড়্গ আমাদের ওপরে রয়েছে এবং প্রতিবছর আমাদেরকে অনেক টাকা ঋণের কিস্তি দিতে হয়। এই কিস্তি দেওয়া একদিকে নতুন কিস্তি আবার আরেকদিকে নতুন ঋণের ভিতরে আমরা জর্জরিত হচ্ছি।

আজ প্রতিটি শিশু মাথায় বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। মেগা প্রজেক্ট না নেওয়ার অঙ্গীকার থাকলেও সরকার তা থেকে সরেনি। এসব কারণে আমাদের অর্থনীতিতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ড এবং প্রতিদিন ভারত থেকে নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া বা ‘পুশ-ইন’ করার ঘটনা উদ্বেগজনক। সরকার বলছে তারা চিঠি দিয়েছে, কিন্তু চিঠি দিয়ে কাজ না হলে ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করতে হবে। জাতীয় স্বার্থে আমাদের নতজানু নীতি পরিহার করতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে। আমরা ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এসবের প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছি। আমরা কোনো ফ্যাসিবাদী বা কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর চারণভূমি হতে দেব না এই দেশকে।

এশিয়া পোস্ট: ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: ইসলামী ব্যাংকে একটি পরিকল্পিত লুটপাটের ছক বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটি ধ্বংস করেছে, তাদের প্রতিনিধিদের আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। হাজার হাজার অযোগ্য লোককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে তাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলছেন, তাতে মনে হচ্ছে তিনি কারও দ্বারা পরিচালিত। এই ব্যাংকিং খাতের অরাজকতা সহজে কাটবে না।

ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি ব্যাংক নয়, এটি বিশাল একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। একে ধ্বংস করার অর্থ হলো এ দেশের ইসলামী ভাবধারা ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে পঙ্গু করে দেওয়া। এটি মূলত ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটি অংশ বলে আমি মনে করি। আমাদের দাবি, ব্যাংকটিকে এর আদি প্রতিষ্ঠাতা ও উদ্যোক্তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

এশিয়া পোস্ট: ক্ষমতায় আসার পর থেকে বর্তমান সরকারের কার্যক্রমকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ণ করেন?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: সরকারের ১০০ দিনে অর্জন যেমন আছে, বিসর্জনও কম নয়। তারা জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। পত্রিকায় এসেছে এই ১০০ দিনে ১০৮৪ জন মানুষ খুন হয়েছেন, ধর্ষণের সংখ্যাও উদ্বেগজনক। জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে। সরকার বলেছিল দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়াবে না, কিন্তু তারা কথা রাখেনি। আইনশৃঙ্খলার এই নাজুক পরিস্থিতি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করে তুলছে।

এশিয়া পোস্ট: সরকারি দলের নানা বিষয়ে বিরোধী দল আপস করছে বলে একটি অভিযোগ আছে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: আসলে বাংলাদেশের বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে ওয়াক আউট করে চলে যেত। সেই জায়গা থেকে এই ১১ দলীয় জোট বিরোধী দলের জায়গায় আছে। তারা এই কালচারটা করেনি। ভালো কাজের জন্য, দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে দেশের কল্যাণের জন্য তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে চায়। এটাকে যদি কেউ দুর্বলতা মনে করে আমি মনে করি সঠিক নয়।

আমরা সরকারের ভালো কাজের ধন্যবাদ জানাব ও মন্দ কাজের সমালোচনা করব। এখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী হেঁটে সচিবালয় থেকে ওসমানী উদ্যানে গেলেন। এটার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে যে আমাদের যানজট নিরশন আমরা কতটুকু করতে পেরেছি। আমরা শুধুমাত্র বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করতে চাই না। আমরা মনে করি যে বিরোধী দল তার সঠিক জায়গায় সঠিক কাজ করছে। গণভোটের বিষয়ে সরকার তাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেনি। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি। তারা জনগণের যেই ম্যান্ডেট নিয়ে জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করেছে। তারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

আমরা তো এই কথাগুলো বলছি এবং আমরা জনগণের কাছে যাচ্ছি। যেদিন সরকার শপথ নিয়েছে সেদিন আমাদের প্রতিবাদ সমাবেশ ছিল। গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে আমরা ভূমিকা রাখতে চাই। তথাকথিত পুরোনো আমলে যেভাবে সংসদ বর্জন করা হতো, আমরা সেদিকে যেতে চাই না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের ওই পথে যাওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি না হবে।

এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা এবং শেখ হাসিনার দেশে আসার ঘোষণা কতটা বাস্তবসম্মত?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: আওয়ামী লীগ ১৭ বছরে এ দেশকে আয়নাঘর ও লাশের ঘরে পরিণত করেছিল। জুলাই অভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষকে হত্যার পরও তাদের মধ্যে কোনো অপরাধবোধ নেই। তারা জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি। এমন একটি ফ্যাসিবাদী দলের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। অথচ আমরা উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি যে, বিএনপির কোনো কোনো নেতা আওয়ামী লীগের অফিস খুলে দিচ্ছেন। এটি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে, তাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার কোনো উদ্যোগ জনগণ মেনে নেবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়াও একটি ভুল সিদ্ধান্ত হবে এবং এটি বিএনপির জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এশিয়া পোস্ট: শহীদ শরিফ উসমান হাদি হত্যাকে ইঙ্গিত করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া বক্তব্যকে আমলে না নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তর। বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে কতটা গুরুত্ব বহন করে?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: এটা তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তিনি তো রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে অনেক কিছুই জানতেন। আমরা বারবার বলেছি যে ওসমান হাদির হত্যার সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ জড়িত। তাদেরকে আবার সেভ করার জন্য দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মমতার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সেই কথা প্রমাণিত হয়েছে। আজ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের বিচারের কোনোকিছু দেখছি না। বরং পরস্পর দোষারোপের রাজনীতি দেখছি। ওসমান হাদি হত্যার বিচার আমরা চাই। আর তদন্তের আগেই যদি বলে দেন অমুক করেছে তমুক করেছে, তাহলে আর তদন্তের কি দরকার?

আজকে শরিফ ওসমান হাদি আলাদা একটা প্ল্যাটফর্ম যাদের কারণে করেছিল, তাদের অনেকেই দেখছি তার উত্তরসূরি হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। আমি মনে করি, এগুলো হছে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। শরিফ ওসমান হাদিকে রাজনৈতিকভাবে অনেকেই স্পেস দেননি। এ কারণে আলাদা ইনকিলাব মঞ্চ করে তারপর কাজ করতে হয়েছে। তাকে নিজেকে তৈরি করতে হয়েছে। আমার সঙ্গে সর্বশেষ শহীদ ওসমান হাদির দেখা হয়েছিল শাহবাগের একটা প্রোগ্রামে। ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা লেবার পার্টির পক্ষ থেকে গিয়েছিলাম শহীদ বরকতের কবরে ফুল দেওয়ার জন্য। গিয়ে দেখি ভেতরে ওসমান হাদি হাজির। তার সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল।

তিনি যা বলতেন, তা করতেন। আমরা ইনসাফের কথা বলব। সেইসঙ্গে আমি নিজেকে ইনসাফের উপযোগী করে তুলব। আমি ইনসাফভিত্তিক সমাজ করতে চাইব। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড় থাকবে। আমি যে কোনো মূল্যে টাকা ইনকামের রাস্তায় দৌড়ালে হবে না। আজকে আমাদের জুলাই আন্দোলনকে কার্যকর করতে হলে বিশ্বাস করতে হবে, জুলাইয়ের চেতনা হচ্ছে বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ। প্রতিহিংসা এবং হানাহানি বিভাজনমুক্ত একটা বাংলাদেশ আমরা চাই।

১৯৭১ এবং ২০২৪ এর সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই, বরং একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত, পরিপূরক। ২০২৪ হয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ১৯৭১ হয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে। এই বৈষম্যহীন একটা বাংলাদেশ যদি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কার্যকরি হবে। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাও ছিল তেমনই।

এশিয়া পোস্ট: আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল এবং স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক, তবে এর জন্য হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা কোনো সমাধান নয়। মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আদ্-দ্বীন হাসপাতাল সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসার একটি বড় আস্থার জায়গা। বড় বড় হাসপাতালগুলো যেখানে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষছে, সেখানে আদ্-দ্বীন নামমাত্র মূল্যে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এটি মূলত ‘ইসলামোফোবিয়া’র শিকার হয়েছে বলে আমার ধারণা। যে কোনো ভুল বা অবহেলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া হোক, জরিমানা করা হোক। কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ করে লাখ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করা ঠিক হবে না।

এশিয়া পোস্ট: দেশে প্রচলিত বড় দলের পাশাপাশি রাজনীতি করা নতুন ধারার দলগুলো কি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: বাংলাদেশে আদর্শহীন এবং শুধুমাত্র ইস্যুকেন্দ্রিক রাজনীতির কোনো ভবিষ্যৎ নেই। অতীতে ফ্রিডম পার্টি বা মুসলিম লীগের মতো বড় দলগুলো হারিয়ে গেছে। যারা প্রতিশ্রুতি এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে পারবে না, তারা রাজনীতিতে টিকতে পারবে না। নতুন দলগুলোকে অবশ্যই জনসম্পৃক্ততা এবং শক্তিশালী আদর্শের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়াতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: আপনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটকাল কোনটি?

ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান: আমি মনে করি বর্তমান সময়টাই সবচেয়ে সংকটময়। দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন করে ফ্যাসিবাদমুক্ত হলাম, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মুক্তি এলো না। আমরা যে নতুন সূর্যের অপেক্ষায় ছিলাম, তা আজও উদিত হয়নি। এখনও আমাদের আতঙ্কে থাকতে হয়। ২০১২ সালে যখন আমার ওপর নৃশংস হামলা হলো, তখন ভেবেছিলাম এটাই শেষ; কিন্তু আজও যখন দেখি ফ্যাসিবাদী শক্তি অন্য রূপে ফিরে আসতে চাইছে, তখন খুব কষ্ট হয়। আমরা একটি বৈষম্যহীন, প্রতিহিংসামুক্ত এবং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাদীপ্ত বাংলাদেশ চাই। ইনশাআল্লাহ, জনগণের অধিকার আদায়ের এই লড়াই আমরা চালিয়ে যাব।