logo
Advertisement
ঢাকা জেলা পরিষদ প্রশাসক ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ

দুর্নীতিমুক্ত, টেকসই উন্নয়ন ও সম্পত্তি উদ্ধারই মূল লক্ষ্য

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
দুর্নীতিমুক্ত, টেকসই উন্নয়ন ও সম্পত্তি উদ্ধারই মূল লক্ষ্য
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

ঢাকা জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত প্রশাসক ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সহসভাপতি ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের গ্রাস থেকে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি উদ্ধার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং ঢাকার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আতিক হাসান

Advertisement

এশিয়া পোস্ট: জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী কী বলে চিহ্নিত করেছেন?

ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ: প্রথম ও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি প্রতিরোধ করা। বিগত সরকার দেশের প্রায় প্রতিটি ইনস্টিটিউটকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক কাজের বড় জায়গা জেলা পরিষদ। অতীতে বণ্টনের মাধ্যমে উন্নয়ন হয়নি, হয়েছে কিছু ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থে। কাজের নামে অর্থের হরিলুট হয়েছে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী (তারেক রহমান) সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে আমাদের উজ্জীবিত করছেন। আগে ভিআইপি প্রটোকলের নামে রাস্তা বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা হতো। কিন্তু তিনি শপথ নেওয়ার পর থেকে নিজে প্রতিটি সিগন্যাল মেনে চলছেন। এটি দেখে প্রায় সবাই এখন নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে চলে এসেছে, এতে ঢাকার যানজটও অনেক হ্রাস পেয়েছে।

একজন ব্যক্তিই পারেন একটি রাষ্ট্রকে পরিবর্তন করতে। প্রধানমন্ত্রী আমাকে সততার সঙ্গে কাজ করতে বলেছেন। মানুষের কল্যাণে সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন একসঙ্গে পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দিরের উন্নয়নসহ ঢাকার লেকগুলোর সৌন্দর্যবর্ধন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি।

আমরা উন্নয়ন বলতে ‘রডের পরিবর্তে বাঁশ’ দেওয়ার প্রথায় নেই। টেকসই ও মানসম্মত কাজের জন্য যা যা প্রয়োজন, এর শতভাগ নিশ্চিত করাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ ও লক্ষ্য।

এশিয়া পোস্ট: জেলা পরিষদের অনেক স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বেদখল হয়ে আছে। এগুলো উদ্ধার ও সঠিক ব্যবহারে আপনার পরিকল্পনা কী?

ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ: জেলা পরিষদের মূল উৎস রাজস্ব, যা আমাদের লিজকৃত সহায়-সম্পত্তি থেকে আসে। বিগত পতিত স্বৈরাচার সরকারের সময় এগুলো নিয়ে হরিলুট হয়েছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় একটি অত্যাধুনিক কমিউনিটি সেন্টার পুনরুদ্ধার করেছি, যা তৎকালীন উপজেলার চেয়ারম্যান ও সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু দলীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছিলেন। ৫ আগস্টের পর বিক্ষুব্ধ জনতা সেটির লিফট, রেলিং, গ্লাসসহ সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে সেটি সংস্কার করেছি। জনগণের ব্যবহারের উপযোগী করছি।

গাবতলী দেশের সবচেয়ে বড় পশুর হাট, এখানে প্রায় প্রায় ৫০ একরের মতো জমি আছে। ২০০২ সালের পর থেকে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হাটের রাজস্বের ৫০ শতাংশ জেলা পরিষদ এবং ৫০ শতাংশ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা তা পাইনি। সেখানে ‘রোজিনা এন্টারপ্রাইজ’ নামে এক আওয়ামী লীগ নেতার প্রতিষ্ঠান এক বছরের লিজ নিয়ে অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে রাজস্ব দিচ্ছিল না। আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছি।

এ ছাড়া চলচ্চিত্র অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজল অবৈধভাবে জমি দখল করে মিথ্যা রিট করেছিলেন। আমরা হাইকোর্টে আইনি লড়াইয়ে জিতেছি এবং ডিপজলকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যুবলীগ ক্যাডার ইসমাইলের করা মিথ্যা মামলা থেকেও জমি উদ্ধার করেছি। মোহাম্মদপুরে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও স্থানীয় কাউন্সিলরের দখলে থাকা চারটি কমিউনিটি সেন্টার এবং কাঁটাবনে ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র তাপসের অবৈধভাবে দখল করা সম্পত্তি উদ্ধার করেছি। কাঁটাবনের জমির ডিজাইন ও ড্রইং বুঝে পেতে আমাদের দক্ষিণ সিটিকে ৬৫ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। এখন সেখানে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। সাভার ও কেরানীগঞ্জ থেকেও প্রায় ২ কোটি টাকার মতো বকেয়া রাজস্ব উদ্ধার করা হয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: ঢাকা জেলার অন্তর্গত উপজেলা ও ইউনিয়নগুলোর সুষম উন্নয়নের জন্য আপনার বিশেষ কোনো পদক্ষেপ আছে?

ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ: অবশ্যই। প্রধান লক্ষ্য হলো ‘নিড বেসিস’ বা চাহিদার ভিত্তিতে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। আমার আগের জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কাজ করেছেন। লুটপাট করেছেন বিপুল অর্থ। যেসব এলাকায় আগে কাজ কম হয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যালেন্সের মধ্যে নিয়ে আসব। ঢাকা জেলার অন্তর্গত ২০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটি জায়গায় সুষম উন্নয়ন হবে। কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, কাজ হবে সাধারণ মানুষের কল্যাণে।

এশিয়া পোস্ট: সাধারণত জেলা পরিষদের কাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের অস্পষ্টতা থাকে। জনগণের দোরগোড়ায় নাগরিক সেবা পৌঁছে দিতে আপনি কী কর্মসূচি নিচ্ছেন?

ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ: অনেকেই জেলা পরিষদের কার্যক্রম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখেন না। এই প্রতিষ্ঠানটিকে জনগণের কাছে দৃশ্যমান করতে চাই। আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমানের রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফার আলোকে, রেইনবো নেশনের আওতায় সব ধর্ম ও মতের মানুষকে এক ছাতার নিচে এনে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করছি। শুধু অবকাঠামো নয়, মানুষের জীবনমান উন্নয়নই আমাদের লক্ষ্য।

এশিয়া পোস্ট: স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রায়ই দুর্নীতি ও অপচয়ের অভিযোগ উঠে। ঢাকা জেলা পরিষদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কোন ধরনের কৌশল অবলম্বন করছেন?

ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ: আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর শতভাগ সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ই-টেন্ডারের মাধ্যমে সব কার্যক্রম পরিচালনা করছি। নিজেকে প্রশাসক নয়, জনগণের সেবক মনে করি।

ঠিকাদারদের স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে, কাজে ফাঁকি, রডের বদলে বাঁশ বা মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহার চলবে না। আমাদের দেশের ওয়ার্ক অর্ডারগুলো ইংরেজিতে দেওয়া হতো, যা সাধারণ মানুষ বুঝত না। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে প্রতিটি ওয়ার্ক অর্ডার বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই দেওয়া হবে। এর ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষও পড়ে বুঝতে পারবেন, রাস্তায় কত মিলি রড ব্যবহার করা হচ্ছে, ঢালাইয়ের থিকনেস কত এবং কাজের মেয়াদ কত দিন। এতে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

এশিয়া পোস্ট: একজন প্রশাসক হিসেবে ঢাকা জেলা পরিষদের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী?

ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ: শিক্ষার্থীদের আবার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়মুখী করা আমার ভবিষ্যৎ রূপরেখা। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যুগোপযোগী ও কারিগরি শিক্ষার উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। সম্প্রতি বেকারত্ব দূরীকরণে ধামরাইতে এইচডিআইয়ের কল্যাণে একটি ‘জব ফেয়ার’ করে একশ’র বেশি তরুণ-তরুণীর তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি।

দ্বিতীয়ত, প্রাণঘাতী মাদক যুবসমাজকে ধ্বংস করছে। মাদককে ‘না’ বলে আমরা খেলাধুলার মাঠগুলোকে উপযোগী করে তুলছি, যাতে তরুণরা মাঠে ফিরে আসে।

তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঢাকা এখন ঝুঁকিপূর্ণ জোনে রয়েছে। ঢাকাকে একটি ‘সবুজ ঢাকা’ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। যেখানেই খালি জায়গা পাওয়া যাবে, সেখানেই বৃক্ষরোপণ ও তা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

এশিয়া পোস্ট: দায়িত্ব শেষে ঢাকা জেলাকে কেমন দেখতে চান?

ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ: একটি সুন্দর, সাবলীল এবং সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ঢাকা জেলা পরিষদ দেখতে চাই। সফল আমি তখনই হব, যখন জেলার প্রতিটি মানুষ বুক ফুলিয়ে বলবে, ‘ঢাকা জেলা পরিষদ আমার নিজের পরিষদ’। এটাই জনগণের প্রতি আমার অঙ্গীকার।

এশিয়া পোস্ট: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ: এশিয়া পোস্ট ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ।