অন্তর্বর্তী সরকার গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণ করতে পারেনি: সাইফুল ইসলাম

বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্র সমাজের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, ছাত্ররাজনীতি, ব্যক্তিগত জীবনসহ নানা বিষয় নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রাহাত রূপান্তর
এশিয়া পোস্ট: ছাত্ররাজনীতিতে আপনার পথচলা কীভাবে শুরু হয়েছিল?
সাইফুল ইসলাম: আমি একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। আমার বাবা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং আমার অনেক চাচা ও কাজিন সরাসরি ছাত্ররাজনীতি করছেন। ছোটবেলা থেকেই মিছিল-মিটিং দেখে বড় হয়েছি। ক্লাস ফাইভ-সিক্সে পড়ার সময় আমাদের বাড়িতে কাদা বা রাস্তার উন্নয়নের জন্য প্রতিনিধি বাছাই করা হতো প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে। সেখানে আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতাম। ভোটারদের কনভিন্স করা বা জনসেবা করার সেই আগ্রহ থেকেই মূলত হাতেখড়ি। পরে ঢাকায় এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হই। আমার মনে হয়েছে, ব্যক্তিগতভাবে আন্দোলন করলে টিকে থাকা কঠিন, তাই একটি রাজনৈতিক ছত্রছায়া বা শেল্টার দরকার। সেখান থেকেই ছাত্ররাজনীতিতে নিয়মিত হওয়া।
এশিয়া পোস্ট: পরিবার থেকে রাজনীতিতে কতটা সমর্থন পেয়েছেন?
সাইফুল ইসলাম: আমার বাবা সবসময় পজিটিভ ছিলেন। ছোটবেলায় ভোটের সময় তিনি আমাকে চকলেটের বক্স কিনে দিতেন ভোটারদের কনভিন্স করার জন্য। জুলাই আন্দোলনের সময় যখন পরিস্থিতি ভয়াবহ ছিল, তখন বাবা আমাকে বলেছিলেন, ‘আন্দোলন করো, কিন্তু সাবধানে থেকো।’ ৫ আগস্ট সকালে যখন আমি বাসা থেকে বের হই, তখন ভেবেছিলাম এটিই হয়তো শেষ দিন। দুই রাকাত নামাজ পড়ে বের হয়েছিলাম। আমার স্ত্রী নববিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও আমাকে বাধা দেয়নি বরং উৎসাহ দিয়েছে। এমনকি আমার শাশুড়ি ও শ্যালকও উত্তরায় আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
এশিয়া পোস্ট: স্কুল জীবনে ডিবেটিংয়ের অভিজ্ঞতা আপনার রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন?
সাইফুল ইসলাম: ডিবেট করলে অনেক পড়াশোনা ও অনুসন্ধান করতে হয়। প্রতিপক্ষকে কীভাবে যুক্তি দিয়ে পরাস্ত করতে হয়, সেই অভিজ্ঞতা রাজনীতিতে খুব কাজে লেগেছে। এ ছাড়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাজের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে মেশা এবং তাদের কনভিন্স করার যে দক্ষতা তৈরি হয়, তা আমাকে শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বে আসতে অনেক সাহায্য করেছে।
এশিয়া পোস্ট: প্রায় সাত-আট বছর ধরে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। কখনো কি মনে হয়েছে, এই পথ ছেড়ে অন্য কিছু করলে ভালো হতো?
সাইফুল ইসলাম: সেই সময়টা যদি পড়ার টেবিলে দিতাম, হয়তো আমি বিসিএস ক্যাডার বা একটি সিকিউর লাইফ পেতাম। কিন্তু রাজনীতি যে পরিচিতি ও মানুষের ভালোবাসা দিয়েছে, তা অন্য কোথাও সম্ভব ছিল না। আমাদের মতো যারা রাজপথে লড়াই করে বড় হয়েছে, তাদের রাজপথেই বেশি মানায়। পুলিশের দৌড়ানি বা মামলা-হামলার ভয় এখন আর কাজ করে না, বরং এটি একটি অ্যাডভেঞ্চারাস লাইফ।
এশিয়া পোস্ট: সংগঠনের দায়িত্ব নেওয়ার পর ছাত্র সমাজকে কীভাবে নতুনভাবে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন?
সাইফুল ইসলাম: আমি চেষ্টা করেছি সংগঠনটিকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয় থেকে বের করে রাজপথমুখী করতে। ছোট দলগুলোর বড় সমস্যা হলো তাদের নেতাদের অনেকে চেনে না। আমি একা নয় বরং একটি টিমকে লাইমলাইটে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা আমাদের লক্ষ্য, কারণ ঢাকার রাজপথের কর্মসূচির মিডিয়া কাভারেজ ও প্রভাব অনেক বেশি।
এশিয়া পোস্ট: আপনাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা রয়েছে—সারা দেশে শক্ত সংগঠন না থাকা বা বড় দলের ছায়া হিসেবে কাজ করার অভিযোগ, এগুলো আপনি কীভাবে দেখেন?
সাইফুল ইসলাম: এটি ঠিক নয়। আমাদের ৩০টিরও বেশি জেলায় কমিটি আছে। ঢাকা মহানগরকে চারটি ভাগে ভাগ করে থানা কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার কাজ চলছে। তবে বাংলাদেশে ছোট দলগুলোর জন্য রাজনীতি করা অনেক চ্যালেঞ্জিং। বড় গাছের ছায়ায় যেমন ছোট গাছ বড় হতে পারে না, তেমনি এখানেও মানুষের মাইন্ডসেট বা মার্কার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বের করে আনা কঠিন। এ ছাড়া ছোট দলগুলোর ফান্ডিং সমস্যাও থাকে। রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হতে একটি ঐতিহাসিক ব্যাকগ্রাউন্ড লাগে, যেমনটি বিএনপি বা আওয়ামী লীগের আছে।
এশিয়া পোস্ট: আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা থাকলেও সাংগঠনিক জায়গায় পিছিয়ে থাকার কারণ কী বলে মনে করেন?
সাইফুল ইসলাম: সাংগঠনিক শক্তির জন্য প্রচুর জনবল ও অর্থ লাগে, যা আমাদের সীমিত। এ ছাড়া একটি বড় সমস্যা হলো— যে কোনো আন্দোলনের কৃতিত্ব শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাদের কাছে চলে যায়। ঢাবির বাইরে আপনি যতই প্রতিভাবান হোন না কেন, ফার্স্ট লেয়ারে নেতৃত্ব পাওয়া প্রায় অসম্ভব। জুলাই আন্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য কলেজের শিক্ষার্থীদের যে বিশাল অবদান ছিল, তা ঢাবির নেতৃত্বের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। এই বৈষম্যের কারণেই অনেকে পরবর্তীতে আড়ালে চলে যায়।
এশিয়া পোস্ট: ২০১৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্দোলনের পরও দেশের কাঠামোগত পরিবর্তন কতটা হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
সাইফুল ইসলাম: সত্যি বলতে, আমি কিছুটা হতাশ। ভেবেছিলাম ৫ আগস্টের পর একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ দেখব। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, আমরা ডিমোটিভেট হচ্ছি। একজন মুরুব্বি, যিনি ’৪৭ থেকে ’২৪ দেখেছেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন, মানসিকভাবে হয়তো আমরা পরিবর্তনের কথা ভাবি, কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না। আমাদের আবেগ বা দেশপ্রেমকে অনেক সময় নির্দিষ্ট গ্রুপ তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করে।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্র রাজনীতির প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের কতটা আস্থা আছে?
সাইফুল ইসলাম: ৫ আগস্টের আগে শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতিকে ঘৃণা করত পেশিশক্তির দাপটের কারণে। ৫ আগস্টের পরে ছাত্র সংগঠনগুলো সেই আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, কারণ আমরা নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে পারিনি। আমরা একে অপরকে দমিয়ে রাখার কূটকৌশলে লিপ্ত হয়েছি। ক্যাম্পাসগুলোতে হলগুলোর গুণগত পরিবর্তন আসেনি। ছাত্রদল বা অন্যান্য দল ছাত্র সংসদ, ডাকসু, নির্বাচনের ব্যাপারে এখন আর সেভাবে তৎপর নয়। শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে অনেক সময় শিবিরকে বেছে নিচ্ছে, কারণ তারা গতানুগতিক ধারার পরিবর্তন চায়।
এশিয়া পোস্ট: ছাত্রলীগের সহিংসতার প্রসঙ্গ যেমন উঠে আসে, তেমনি বর্তমানে অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের অভিযোগ দেখা যাচ্ছে?
সাইফুল ইসলাম: ছাত্রলীগের প্যাটার্ন ছিল ভিন্ন। সেখানে হাজার কোটি টাকার টেন্ডারবাজির গল্প আমরা শুনেছি। ছাত্রদল এখন পর্যন্ত বিরোধী মতো দমনে বা শিক্ষার্থীদের ওপর সেভাবে চড়াও হয়নি। তবে তাদের উচিত আরও শিক্ষার্থীবান্ধব কাজ করা।
এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
সাইফুল ইসলাম: এই সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছে। তারা একটি গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণ না করে অনেকটা নতজানু অবস্থানে চলে গেছে। তারুণ্যের চাহিদা পূরণে তারা ব্যর্থ হয়েছে এবং দেশে একটি নতুন ধরনের মতো কালচার প্রতিষ্ঠা করেছে।
এশিয়া পোস্ট: সামনে ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কি বলে মনে করেন?
সাইফুল ইসলাম: ছাত্ররাজনীতিতে বিয়ে সংক্রান্ত যে নিষেধাজ্ঞা আছে তা অত্যন্ত অযৌক্তিক। সংবিধান যেখানে ২১ বছরে বিয়ের অধিকার দেয়, সেখানে ছাত্র রাজনীতিতে এটি কেন বাধা হবে? এ ছাড়া বড় সংগঠনগুলোকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ছাত্র সংগঠনকে ব্যবহার করার মানসিকতা ছাড়তে হবে। মূল সংগঠনের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ছাত্র সংগঠনগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলেই কেবল ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।