logo

‘যে কোনো সময় বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ’

‘যে কোনো সময় বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ’
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম। বিপিইআরবি (BPERB) এর ভাইস চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল তিনি। জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকম্প, মাটি এবং ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা করছেন। সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে এসেছিলেন অতিথি হয়ে। বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি, ভবনগুলো কতটা নিরাপদ, বড় ভূমিকম্প হলে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং এই ঝুঁকি কমাতে সরকার ও জনগনের করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন।

সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।

এশিয়া পোস্ট: ভূমিকম্প কেন হয় এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় বাংলাদেশ এই মুহূর্তে ঠিক কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: ভূমিকম্পের বিষয়টা বুঝতে হলে পৃথিবীর টেকটনিক কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে। আমাদের পুরো পৃথিবীটাই কতগুলো টেকটনিক প্লেটে বিভক্ত। একটি দেশের ভেতরে যেমন জেলা থাকে, তেমনি ভূগঠনে আন্তর্জাতিক বড় প্লেট বাউন্ডারির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও ছোট ছোট ফল্ট লাইন বা চ্যুতি থাকে। টেকটনিক প্লেট ও অভ্যন্তরীণ ফল্ট লাইনগুলোর ক্রমাগত নড়াচড়ার ফলে ভূগর্ভে শক্তি সঞ্চিত হতে থাকে। সেই সঞ্চিত শক্তি যখন একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, তখন শিলাস্তর ভেঙে ভূকম্পনের মাধ্যমে সেই শক্তি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে বা নির্গত হয়।

আমরা এই মুহূর্তে দ্বিমুখী ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি। প্রথমত, বাংলাদেশ একটি সক্রিয় আন্তর্জাতিক প্লেট বাউন্ডারির একেবারেই কাছে অবস্থিত। এই প্লেট সীমানাটি সরাসরি বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে না গেলেও আমাদের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থান করছে। এর ফলে সেখানে আট থেকে নয় মাত্রার মতো অতি শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে, সেই বড় ঝুঁকির বলয়ে আমরা পড়ে গেছি। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক প্লেট বাউন্ডারির পাশাপাশি আমাদের দেশের সীমানার ভেতরেও অনেকগুলো অভ্যন্তরীণ ফল্ট লাইন রয়েছে; যেমন নরসিংদী কিংবা খুলনার দিকে। অভ্যন্তরীণ ফল্ট লাইনগুলোতে হয়তো আন্তর্জাতিক সীমানার মতো আট-নয় মাত্রার ভূমিকম্প হবে না, তবে সেখানে যদি ৬.৫ বা ৭ মাত্রার ভূমিকম্পও আঘাত হানে, সেটাও আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য কোনো অংশেই কম আশঙ্কাজনক নয়। সুতরাং সার্বিকভাবে আমরা নিশ্চিতভাবেই বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি।

এশিয়া পোস্ট: সাম্প্রতিক দেশে বেশ কয়েকবার মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ঘনঘন এসব কম্পনগুলো কি ভবিষ্যতে কোনো বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: এসব স্পষ্ট ইঙ্গিত যে, আমাদের দেশের ভূগর্ভে ভূমিকম্পের সক্রিয় উৎপত্তিস্থল রয়েছে। আমি যখন জাপানে পড়াশোনা ও গবেষণা করেছি, তখন দেখেছি সেখানে প্রায়ই ছোট ছোট ভূমিকম্প হতো। তাতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হতো না; হালকা ঝাঁকুনি হতো, মানুষ বুঝত যে একটি কম্পন হয়েছে। ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যই হলো, ছোট মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা অনেক বেশি হয়, আর বড় মাত্রার ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি অনেক কম হয়।

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। রিখটার স্কেলে সাত মাত্রার একটি বড় ভূমিকম্প হয়তো ১০০ বা ২০০ বছর পর পর একবার আঘাত হানে; কিন্তু তিন মাত্রার ছোট ভূমিকম্প বছরে বহুবার হতে পারে। আমাদের দেশে বিগত ১০০ বছরের মধ্যে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প সংঘটিত হয়নি। ভূপ্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী সেই বড় ভূমিকম্পটি যে কোনো সময় ঘটতে পারে। ছোট ছোট কম্পনগুলো প্রমাণ করছে ভূগর্ভের সেই শক্তি নির্গমন প্রক্রিয়া সক্রিয় রয়েছে এবং যে কোনো মুহূর্তে বড় বিপর্যয় ঘটার প্রবল আশঙ্কা ও ঝুঁকির মধ্যে আমরা আছি।

এশিয়া পোস্ট: ২০২৫ সালে নরসিংদী ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর সেখানে আরও কয়েকবার কম্পন হয়েছে। ভৌগোলিক বিবেচনায় নরসিংদী কি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: এভাবে সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে না যে নরসিংদীই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। নরসিংদীতে ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার অর্থ হলো, সেখানকার মাটির নিচে একটি সক্রিয় সোর্স বা চ্যুতি রয়েছে, এটা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে মাটির গঠন ও ফল্ট লাইন নিয়ে গবেষণার পরিধি খুবই সীমিত। গবেষণার স্বল্পতার কারণে আমাদের দেশের ভূগর্ভস্থ ফল্ট লাইনগুলো এখনও শতভাগ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। নরসিংদীতে যখন ঘটনাটি ঘটল, তখন হয়তো মনে হতে পারে যে এখানেই মূল কেন্দ্র। কিন্তু কিছুদিন পর অন্য কোনো অঞ্চলে ভূমিকম্প হলে দেখা যাবে সেখানেও চ্যুতি আছে। মূল বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের মাটির নিচে একাধিক সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে এবং যে কোনো সময় যে কোনো এলাকা থেকেই এ ধরনের কম্পন সৃষ্টি হতে পারে।

এশিয়া পোস্ট: দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকায় যদি ৬.৭ বা ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কতটা ভয়াবহ হতে পারে? এটা মূলত কোন কোন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: ঢাকায় ক্ষয়ক্ষতি কেমন হতে পারে, তা কেবল ভূমিকম্পের মাত্রার ওপর নির্ভর করে না। মাত্রা অবশ্যই বড় একটি উপাদান, মাত্রা যত বাড়বে, ক্ষতির তীব্রতা তত বাড়বে। তবে এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি মৌলিক বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ভবনগুলোর কাঠামোগত নকশা যথাযথ হয়েছে কি না, নির্মাণকাজের মান ঠিক ছিল কি না এবং এলাকার মাটির গুণাগুণ সঠিকভাবে যাচাই করে সে অনুযায়ী ফাউন্ডেশন বা ভবনের নকশা করা হয়েছে কি না।

নরসিংদীর ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটির কথাই যদি ধরি, সেই কম্পনে ঢাকা ও এর আশপাশের বেশ কিছু ভবন হেলে পড়েছিল এবং নরসিংদীতেও লক্ষণীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। অথচ আমাদের জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় (বিএনবিসি) যে ফোর্সের ওপর ভিত্তি করে ভবন নকশা করার কথা বলা হয়েছে, নরসিংদীর ভূমিকম্পে ঢাকায় যে ফোর্স বা শক্তি এসেছিল তা ছিল নির্ধারিত ফোর্সের আনুমানিক বিশ ভাগের এক ভাগ, সর্বোচ্চ দশ ভাগের এক ভাগ (অর্থাৎ মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ)। বিধিমালার মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ শক্তিতেই যদি আমাদের ভবনগুলোতে এমন ফাটল ও হেলে পড়ার দৃশ্য দেখা যায়, তবে নকশায় নির্ধারিত পূর্ণমাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে, তা সহজেই অনুমেয়। সে ক্ষেত্রে যে মাত্রার মহাবিপর্যয় ও ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে, তা সাধারণ কল্পনারও বাইরে।

এশিয়া পোস্ট: আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে ভূমিকম্পের নির্দিষ্ট সময় ও সঠিক মাত্রা কি আগে থেকেই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: ভূমিকম্পজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, কোন নির্দিষ্ট দিন, ক্ষণ বা সময়ে এটা আঘাত হানবে, তা আজ পর্যন্ত বিশ্বের কোনো বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলী সুনির্দিষ্টভাবে পূর্বাভাস দিতে পারেননি।

তবে সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণের (Probabilistic Analysis) মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কত বছরের মধ্যে কী মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, তা গবেষণার মাধ্যমে নিরূপণ করা যায়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বলা হয়। অর্থাৎ কত বছর পর পর ওই মাত্রার ভূকম্পন ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। উন্নত দেশগুলোতে নিয়মিত গবেষণার মাধ্যমে এই রিটার্ন পিরিয়ড ও সম্ভাব্য তীব্রতা হালনাগাদ করা হয়। এই বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করেই সরকারি দুর্যোগ প্রস্তুতি, নীতি এবং ভবনের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বা বিল্ডিং কোড প্রণয়ন করা হয়। সেই অনুযায়ী যদি কাজ বাস্তবায়ন করা যায়, তবে দুর্যোগের ঝুঁকি বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশ কি বহুতল ভবন নির্মাণের উপযোগী? দেশের সব জায়গায় কি একই ধরনের বহুতল ভবন করা যায়?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: এটা অত্যন্ত মৌলিক একটি কারিগরি প্রশ্ন। ভৌগোলিকভাবে আমাদের দেশ মূলত পলল বা পলিমাটি দ্বারা গঠিত। ফলে ভূতাত্ত্বিকভাবে মাটির ভারবহন ক্ষমতা স্বভাবতই কিছুটা দুর্বল এবং এখানে ভূকম্পন তরঙ্গ মাটির ওপরের স্তরে এসে অ্যামপ্লিফাইড হয়ে শক্তি বাড়িয়ে দেয়।

তবে আধুনিক প্রকৌশলবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাটির এই দুর্বল অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে সঠিক প্রকৌশল নকশা করলে বাংলাদেশের যে কোনো জায়গাতেই বহুতল ভবন নির্মাণ করা সম্ভব। নকশা করার সময় মাটির চরিত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও শক্তি যুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া গবেষণার মাধ্যমে এটাও নির্ধারণ করা যায় যে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ঠিক কত তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করলে তা অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ হবে। সুতরাং যথাযথ প্রকৌশলগত পদক্ষেপ নিশ্চিত করলে ভবনের উচ্চতা কোনো বাধা নয়।

এশিয়া পোস্ট: ঢাকাসহ সারা দেশেই এখন পুরোনো বাড়ি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের ব্যাপক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব ভবন কি ভূমিকম্প সহনশীল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে এটা সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। যদিও জাতীয় পর্যায়ে আমাদের কাছে শতভাগ ভবনের পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ নেই, তবুও সার্বিক পর্যবেক্ষণ থেকে নিশ্চিত করেই বলা যায়, আমাদের বিদ্যমান বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে নকশা ও নির্মাণ উভয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে, এমন ভবনের অনুপাত অত্যন্ত নগণ্য। নকশায় কোড মানলেও নির্মাণে গাফিলতি থাকে, আবার অনেক ক্ষেত্রে নকশাতেই ত্রুটি থেকে যায়। এই সমন্বিত পদ্ধতির প্রয়োগ না থাকায় নির্মিত ভবনগুলোর সিংহভাগই দুর্যোগ প্রতিরোধে যথেষ্ট সক্ষম নয়।

এশিয়া পোস্ট: বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয় ঢাকার বহু ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। একটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ কি না, তা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়? ঝুঁকিতে থাকা মানেই কি ভবনটি ধসে পড়বে?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: কোনো বিদ্যমান ভবনকে যখন প্রকৌশলগতভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তখন কয়েকটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। প্রথম ধাপটি হলো স্বল্প ব্যয়ের প্রাথমিক স্ক্রিনিং, যার মাধ্যমে ভবনটিতে কাঠামোগত দুর্বলতা আছে কি না তা পরখ করা হয়। প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ে ঝুঁকি শনাক্ত হলে পরবর্তী ধাপে বিস্তারিত ও গভীর প্রকৌশল বিশ্লেষণ করা হয়। আমাদের জাতীয় বিল্ডিং কোড ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কোডে এই মূল্যায়নের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি স্পষ্টভাবে বিধিবদ্ধ আছে।

এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল নিশ্চিত করে বলা যায় যে নকশায় নির্ধারিত সম্ভাব্য ভূমিকম্পের তীব্রতায় ভবনটি কেমন আচরণ করবে এবং এটা ব্যবহার উপযোগী থাকবে নাকি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া মানেই তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়া নয়; বরং এর অর্থ হলো নির্দিষ্ট মাত্রার কম্পনে ভবনটি নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না।

এশিয়া পোস্ট: ভবন নির্মাণে এই যে অনিয়ম ও জাতীয় বিল্ডিং কোড না মানার সংস্কৃতি, এর পেছনে মূলত কারা দায়ী?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: এখানে আসলে একক কাউকে দোষারোপ করা অত্যন্ত কঠিন; যেন ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’ অবস্থা। এই দায় সামগ্রিকভাবে আমাদের সবার, সরকার থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক এবং প্রকৌশল সমাজ, কেউই এর দায় এড়াতে পারি না। কারণ একটি নিরাপদ নগরায়ণ কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এটা বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি সংস্থার সমন্বিত কাজের ওপর নির্ভরশীল।

আমাদের বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড বা বিএনবিসি কেবল সাধারণ কোনো উপদেশমূলক বিধিমালা নয়, এটা দেশের আইনগত বাধ্যবাধকতা সম্বলিত পূর্ণাঙ্গ বিল্ডিং কোড। এই কোড কার্যকর করতে হলে প্রথম দায়িত্বটি সরকারের ওপর বর্তায়। সরকারকে এমন একটি কঠোর নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ (Controlling Authority) প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে নিশ্চিত করা যায় যে উপযুক্ত ও সার্টিফাইড প্রকৌশলীর অনুমোদন ও স্বাক্ষর ছাড়া কোনো ভবনের নকশা হতে পারবে না এবং নির্মাণকাজও শুরু করা যাবে না।

এশিয়া পোস্ট: সারা দেশে এসব নিয়ন্ত্রণ করা কি সরকারের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: অনেকের মনে হতে পারে, সারা দেশে এমন একটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অনেক টাকা খরচ হবে। কিন্তু আমার মতে, এটি খুব ব্যয়বহুল কোনো প্রকল্প নয়। প্রাথমিকভাবে সরকারকে সারা দেশে অবকাঠামো ও মনিটরিং নেটওয়ার্ক প্রস্তুত করতে কিছু মূলধনি ব্যয় (ক্যাপেক্স) করতে হবে। তবে একবার চালু হয়ে গেলে এই খাত থেকে সরকারের খরচের চেয়ে রাজস্ব আয় বেশি হবে। কারণ বহুতল ভবন নির্মাণ তো কোনো প্রান্তিক মানুষের কাজ নয়; সমাজের সামর্থ্যবান ও বিত্তশালী ব্যক্তিরাই মূলত ভবন নির্মাণ করেন। তারা সরকারের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ফি দিয়েই অনুমোদন নেবেন। ফলে সেই ফি থেকেই এই পুরো প্রশাসনিক ও তদারকি ব্যবস্থা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।

সরকারকে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে যাতে অনুমোদিত সার্টিফাইড পেশাদার প্রকৌশলীর স্বাক্ষর ছাড়া সারা দেশের কোথাও একটি ইটও না গাঁথা যায়। প্রকৌশলীদের এই যোগ্যতার সনদ প্রদানের জন্য ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি)-এর অধীনে ‘বিপিআরবি’ নামে একটি বডি ইতিমধ্যে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কাজ করছে। সরকারের দায়িত্ব হলো এই ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে সারা দেশে বাধ্যতামূলক করা। আজ যদি সঠিক পরিকল্পনায় কাজটি শুরু করা হয়, তবে একটি পরিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাতে হয়তো পাঁচ থেকে দশ বছর সময় লাগবে। কিন্তু এখনই শুরু না করলে এবং যেভাবে বিগত ৫০ বছর ধরে চলছে সেভাবেই যদি চলতে থাকে, তবে আগামী ১০০ বছরেও আমাদের ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।

এশিয়া পোস্ট: একটি নিরাপদ ভবনের জন্য মাটি পরীক্ষা, কাঠামোগত নকশা ও নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণ কতটা জরুরি? এগুলোর ব্যালেন্স না হলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব। সরকারের কাজ নিজে নকশা করা বা ভবন নির্মাণ করা নয়; সরকারের কাজ হলো সঠিক মান বজায় রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রটোকল ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা এবং তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা। বিষয়টি পুরোপুরি জনসাধারণের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না; মানুষকে শুধু নীতিবাক্য শুনিয়ে আপনি পাঁচজনকেও নিয়ম মানাতে পারবেন না। এখানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকতেই হবে।

যেমন ধরুন মাটি পরীক্ষা বা সাব-সয়েল ইনভেস্টিগেশন। বর্তমানে যে কেউ একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে মাটি পরীক্ষার কাজ করছে, যার কোনো গুণগত মান নেই। এর প্রতিকার হলো, যেই কোম্পানি সয়েল টেস্ট করবে, তার যথাযথ সক্ষমতা তদন্ত করে সরকারের মনোনীত সংস্থার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্স দিতে হবে। লাইসেন্সবিহীন কাউকে এই কাজে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। এটা শুরু করলে হয়তো এক দিনে সব ঠিক হবে না; কিন্তু শূন্য থেকে শুরু করে তিন বছরে ৭০ শতাংশ বা পাঁচ বছরে ৮০ শতাংশ প্রগ্রেস তো হবে।

মান নিয়ন্ত্রণ না হলে ভবন শতভাগ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। আমার অভিজ্ঞতার একটি বাস্তব উদাহরণ দিই। একটি তৈরি পোশাক কারখানার ভবন নির্মাণের মাত্র পাঁচ বছর পর দেখা গেল ভবনটি একদিকে সামান্য হেলে পড়েছে এবং ফাটল দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপে যখন এর কারিগরি তদন্ত করা হলো, তখন দেখা গেল ওপরে যে প্রকৌশলী ভবনের কাঠামোগত নকশা করেছিলেন, তার নকশা সম্পূর্ণ সঠিক ছিল। কিন্তু যে সয়েল টেস্ট রিপোর্টের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি ফাউন্ডেশনের নকশা করেছিলেন, সেই সয়েল টেস্ট রিপোর্টটিই ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া ও ভুল। ফলে মাটির ভুল তথ্যের ওপর সঠিক নকশা তৈরি করেও আলটিমেটলি ভবনটি রক্ষা পায়নি। এই ধরনের ভয়াবহ ঘটনা আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত ঘটছে।

এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে নিচু জমি বা জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন গড়ে তোলা হচ্ছে। ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এই ধরনের ভবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: জলাভূমি বা নিচু এলাকা ভরাট করে আবাসন গড়ে তুললে একসাথে দুটি মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়। প্রথমত, জলাভূমির নিচের আদি মাটি প্রাকৃতিকভাবেই দুর্বল এবং সেখানে অত্যন্ত নরম কাদা মাটি থাকার আশঙ্কা ৯৯ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, এর ওপরে যখন ড্রেজিং করে বালু ফেলে বিশাল এলাকা ভরাট করা হয়, তখন বাস্তবে সেখানে কোনো লেয়ার-বাই-লেয়ার কম্প্যাকশন (নির্দিষ্ট স্তরে স্তরে বালু চেপে শক্ত করা) করা হয় না বা করার সুযোগও থাকে না।

এর ফলে নরম কাদার ওপরে তৈরি হয় আলগা বালুর একটি স্তর। ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি শুরু হলে এই ভরাট করা বালু তরলের মতো আচরণ শুরু করে, যাকে পুরকৌশলের ভাষায় ‘লিকুইফ্যাকশন’ বলা হয়। যে মাটির ওপর গাড়ি চলছিল বা ভবন দাঁড়িয়ে ছিল, কম্পনের মুহূর্তে সেই মাটি তরল পানির মতো হয়ে নিজের সমস্ত শক্তি ও ভারবহন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একদিকে নরম মাটির কারণে ভূকম্পনের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে ওপরের মাটি তরল হয়ে যায়। এমন জমিতে যদি সাধারণ মানের চিকন ও লম্বা পাইল ফাউন্ডেশন দিয়েও ভবন নির্মাণ করা হয়, তবুও লিকুইফ্যাকশনের হাত থেকে সেই ভবনের রক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এই ধরনের স্থাপনা সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ।

এশিয়া পোস্ট: যেসব ভবন ইতিমধ্যে পুরনো হয়ে গেছে কিংবা নিয়ম না মেনে ঝুঁকিপূর্ণভাবে তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোকে কি সংস্কার করে ভূমিকম্প সহনশীল করা সম্ভব?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: হ্যাঁ, কারিগরিভাবে তা নিশ্চিতভাবেই সম্ভব। যেসব ভবনে নকশাগত বা নির্মাণগত ত্রুটি রয়েছে, যথাযথ কাঠামোগত অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে প্রথমে সেই ত্রুটিগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং সলিউশন ব্যবহার করে ‘রেট্রোফিটিং ডিজাইন’ করা হয়। রেট্রোফিটিংয়ের মূল উদ্দেশ্যই হলো পুরোনো বা দুর্বল কাঠামোকে বাড়তি শক্তি দিয়ে ভূমিকম্প সহনশীল মানে উন্নীত করা।

তবে এখানে একটি অর্থনৈতিক বিবেচনা রয়েছে। রেট্রোফিটিংয়ের কাজটিতে ভালো অঙ্কের খরচ জড়িত। হিসাব করে যদি দেখা যায় যে রেট্রোফিটিংয়ের খরচ মাত্রাতিরিক্ত হচ্ছে, তখন হয়তো ভবনটি ভেঙে ফেলে নতুন করে ভূমিকম্প সহনশীল হিসেবে নির্মাণ করাই বেশি লাভজনক হতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যুক্তিসঙ্গত খরচে রেট্রোফিটিং সম্পন্ন করে ভবনটিকে দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ করা সম্ভব হচ্ছে। সুতরাং ভবনের অবস্থা ও ব্যয় বিশ্লেষণ করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এশিয়া পোস্ট: রাজউক থেকে অনুমোদিত নকশার না মেনে ভবন নির্মাণ করার যে প্রবণতা রয়েছে, সেটা তদারকিতে ঘাটতি কোথায়?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: নিয়ম না মানার বিভিন্ন ধরন রয়েছে। অনেকে হয়তো অনুমোদন পেয়েছেন প্রতি ফ্লোরে ৩০০০ বর্গফুট করার, কিন্তু তিনি করে বসলেন ৪০০০ বর্গফুট। এই অতিরিক্ত অংশটুকুও যদি ভালো প্রকৌশলী দিয়ে সঠিক মানে তৈরি করা হয়, তবে হয়তো তা ভূমিকম্প সহনশীল হতে পারে। কিন্তু এই যে নিয়ম লঙ্ঘন হচ্ছে, তা নজরদারি করার জন্য আমাদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের যে সক্ষমতা দরকার, তা নেই।

সারা বাংলাদেশের কথা বাদই দিলাম, শুধু ঢাকা শহরের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেরও (রাজউক) পুরো মহানগরীর প্রতিটি নির্মাণকাজ তদারকি করার মতো পর্যাপ্ত জনবল, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা প্রটোকল সক্ষমতা এই মুহূর্তে রয়েছে বলে আমার মনে হয় না। এই সক্ষমতার ঘাটতি দূর করা অত্যন্ত জরুরি।

এশিয়া পোস্ট: যেহেতু নির্দিষ্ট সময় জানার সুযোগ নেই এবং যে কোনো মুহূর্তে ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে, সেহেতু সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকারের কোন কোন দিকে দ্রুত গুরুত্ব দেওয়া উচিত?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি সরকারের অবিলম্বে স্বল্পমেয়াদি কিছু সুনির্দিষ্ট অ্যাকশনে যাওয়া প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের আওতায় প্রথমত, ভূমিকম্প পরবর্তী জরুরি উদ্ধারকাজে যুক্ত সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই এবং জনসেবামূলক স্থাপনা, যেমন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ, পাওয়ার প্ল্যান্ট, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবনগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে অ্যাসেসমেন্টের আওতায় আনতে হবে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এই স্থাপনাগুলোর ঝুঁকি নিরূপণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোনটি ভেঙে নতুন করে করতে হবে আর কোনটি রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে।

কারণ বড় দুর্যোগের সময় যদি আমাদের পাওয়ার প্ল্যান্ট ধসে বিদ্যুৎ চলে যায়, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা ও টেলিযোগাযোগ অচল হয়ে পড়ে এবং হাসপাতালগুলো নিজেই বিধ্বস্ত হয়ে যায়, তবে আহত মানুষদের চিকিৎসাও দেওয়া যাবে না। তাই হাসপাতাল, পাওয়ার, ফায়ার সার্ভিস ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় রেখে স্বল্পমেয়াদে কাজ শেষ করতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করতে হবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেন কোনো স্থাপনা সরকারের সঠিক অনুমোদন ও বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি হতে না পারে।

এশিয়া পোস্ট: হঠাৎ যদি বড় মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে দেশে বর্তমান উদ্ধারকারী দল, হাসপাতাল ও জরুরি সরঞ্জাম দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে কি?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: খোলামেলাভাবে বলতে গেলে, এই মুহূর্তে আমাদের যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি রয়েছে তা অত্যন্ত অপ্রতুল। যেটুকু সক্ষমতা আছে, সেগুলোতেও ড্রিল বা নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে যে ধরনের নিখুঁত প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন, তাতে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। বড় ভূমিকম্প হলে শহরের বহু রাস্তাঘাট ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হতে পারে, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়তে পারে।

ঢাকা শহরের যে বিপুল জনসংখ্যা ও ভবনের ঘনত্ব, তার তুলনায় আমাদের বিদ্যমান উদ্ধারকারী দল ও সরঞ্জামের পরিমাণকে ‘নাই বললেই চলে’ বা অত্যন্ত নগণ্য বলা যায়। এই বাস্তবতায় দুর্যোগপরবর্তী উদ্ধার নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে অবিলম্বে বিপুল বিনিয়োগ করতে হবে, সুপ্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী বাহিনী গড়ে তুলতে হবে এবং সমাজের সর্বস্তরে ব্যাপকভাবে দক্ষ ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবী দল প্রস্তুত করতে হবে। এটা কোনো ছোটখাটো কাজ নয়, এখানে বিশাল পরিসরে কাজের প্রয়োজন রয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিটি পরিবারে একটি আপৎকালীন জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা উচিত। সেই ব্যাগে এমন কিছু শুকনা খাবার থাকবে যা সহজে নষ্ট হয় না, বিশুদ্ধ পানি, একটি ভালো টর্চলাইট এবং ধ্বংসস্তূপের মাঝে পথ তৈরি করে বের হয়ে আসার উপযোগী কিছু প্রাথমিক ধারালো বা সহায়ক সরঞ্জাম রাখা যেতে পারে। ব্যাগটি ঘরের এমন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে হবে যা পরিবারের সবাই জানে, যাতে কম্পন শুরু হলে বা থামার সাথে সাথে সেটি নিয়ে নিরাপদে সরে যাওয়া যায়। আর নাগরিক হিসেবে যখনই আমরা কোনো ভবন নির্মাণ করব, তখন অবশ্যই নিয়ম মেনে করব; কারণ ভবন টিকে থাকলে মানুষের জীবনের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়।

এশিয়া পোস্ট: ঘরে থাকা অবস্থায় হঠাৎ তীব্র ভূমিকম্প শুরু হলে একজন মানুষের তাৎক্ষণিক করণীয় কী?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর সময় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত থাকে। সেই মুহূর্তে কোনো অবস্থাতেই নড়াচড়া বা ছোটাছুটি করা যাবে না। আমি একজন মুসলিম হিসেবে বলব, প্রথমত শান্ত হোন, দোয়া পড়ুন এবং আল্লাহর সাহায্য চান। এরপর ঘরের মধ্যে শক্ত কোনো টেবিল থাকলে তার নিচে অবস্থান নিন, অথবা সবচেয়ে ভালো হয় কোনো শক্ত কলামের পাশে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা।

অনেকে কম্পন শুরু হলেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার জন্য দৌড়াদৌড়ি করেন। এটা চরম অনিরাপদ এবং সবচেয়ে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কারণ ঝাঁকুনির সময় সিঁড়ি ধসে পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ ছাড়া লিফট ব্যবহার করার তো প্রশ্নই আসে না।

অনেকে বারান্দায় চলে যান, এটাও একেবারেই করা যাবে না। কারণ আপনার ভবনটি অক্ষত থাকলেও পাশের ভবনের কোনো অংশ বা বারান্দা ভেঙে আপনার ওপর পড়তে পারে; অতীতে পুরান ঢাকায় বারান্দা ভেঙে পড়ার ঘটনা আমরা দেখেছি। এমনকি হুড়মুড় করে রাস্তায় বের হওয়াও নিরাপদ নয়, কারণ ওপর থেকে ভবনের কাচ, ইট বা সাইনবোর্ড মাথায় পড়ে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। তাই যেখানে আছেন, সেখানেই মাথা ঠান্ডা রেখে শক্ত টেবিলের নিচে বা শক্ত কলামের কোণে অবস্থান নেওয়াই জীবন রক্ষার সর্বোত্তম উপায়। ঘরে টেবিল না থাকলে দেওয়াল বা কলামের কর্নারে দাঁড়ানোই সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ একটি ভবনের কাঠামোগত নকশা যদি ন্যূনতম সঠিকও থাকে, তবে কলাম ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম থাকে। ছাদ ধসে পড়লেও কলামের গোড়ায় বা কলামের পাশের অংশে শূন্যস্থান বা টিকে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। ফলে কলামের পাশে অবস্থান নিলে ওপর থেকে সরাসরি ছাদ পড়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।

এশিয়া পোস্ট: ভূমিকম্প শেষ হওয়ার পর যদি দেখা যায় ভবনের কোথাও ফাটল ধরেছে, তখন কী করা উচিত?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: এ ক্ষেত্রে নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া একেবারেই উচিত নয়। অবিলম্বে একজন অভিজ্ঞ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের শরণাপন্ন হতে হবে। কারণ সাধারণ মানুষ খালি চোখে ফাটলের ভয়াবহতা বুঝতে পারে না। অনেক সময় পার্টিশন দেওয়ালে বড় ফাটল দেখা গেলেও তা ভবনের কাঠামোর জন্য ততটা বিপজ্জনক নাও হতে পারে। কিন্তু কলাম, বিম কিংবা শেয়ার ওয়ালে যদি ক্ষুদ্র ফাটলও তৈরি হয়, তা ভবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে দেখিয়ে নিশ্চিত হতে হবে যে এটা বিপজ্জনক কোনো ক্ষতি কি না।

এশিয়া পোস্ট: স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা কিংবা অফিসগুলোতে ভূমিকম্প মহড়া পরিচালনা করা কতটা জরুরি?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: মহড়া পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। বর্তমানে আমাদের গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে বিদেশি ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্সের বাধ্যবাধকতা থাকায় তারা কিছুটা সচেতন এবং নিয়মিত বিভিন্ন মহড়া করে থাকে। কিন্তু আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই সচেতনতামূলক প্রোগ্রামগুলো একেবারেই অনুপস্থিত।

জাপানে থাকাকালীন আমরা দেখেছি, সেখানে স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব প্রতিষ্ঠানে বছরে অন্তত দুবার বাধ্যতামূলকভাবে ভূমিকম্প ও অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত মহড়া অনুষ্ঠিত হতো। এই মহড়ার মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই জানতে পারে বিপদের মুহূর্তে কার কী ভূমিকা, ফায়ার এক্সটিংশারটি কোথায় রাখা আছে কিংবা জরুরি নির্গমন পথ কোনটি। কোনো ভবনে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকলেও বিপদের সময় মানুষ যদি তা ব্যবহার করতে না জানে, তবে তা কোনো কাজে আসে না। তাই মানুষকে অভ্যস্ত ও সচেতন করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে অন্তত দুবার মহড়া চালু করা আবশ্যক।

এশিয়া পোস্ট: প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভূমিকম্পের গুজব বা আগাম বার্তা ছড়াতে দেখা যায়। সাধারণ মানুষ কীভাবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারে?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর যুগে ভুয়া তথ্য ও ভিডিও এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে দেখে সাধারণ মানুষের কাছে সত্য বলেই মনে হয়। এই পরিস্থিতিতে সামাজিকমাধ্যমের গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নজর দেওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক এমন অনেক ওয়েবসাইট রয়েছে, যেখানে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মৃদু থেকে যে কোনো মাত্রার ভূমিকম্প ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সঠিক ডেটা হালনাগাদ করা হয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস-এর (USGS) ওয়েবসাইট। ইন্টারনেটে সার্চ করে এসব স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক প্ল্যাটফর্ম থেকে যে কেউ সহজেই সঠিক মাত্রা ও কেন্দ্রের তথ্য যাচাই করে নিতে পারেন।

এশিয়া পোস্ট: জাপান ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে তারা ঝুঁকিকে সফলভাবে জয় করেছে। তাদের ব্যবস্থাপনা ও অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের কী শেখার আছে?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: জাপানে যে তীব্রতায় ও নিয়মিত বিরতিতে ভূমিকম্প হয়, তার তুলনায় আমাদের দেশে ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি অনেক কম। কিন্তু জাপান তাদের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে একটি বড় সুযোগে রূপান্তর করেছে। তারা ভূকম্পন নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছে, নিজস্ব বিল্ডিং কোড বিশ্বমানের করেছে, উন্নত সেন্সর ও নির্মাণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। আজ তারা সারা বিশ্বে এই প্রযুক্তি সরবরাহ করে বড় ধরনের অর্থনৈতিক খাত তৈরি করেছে।

একটি বৈশ্বিক উদাহরণ দিলে বিষয়টি বোঝা যাবে। রিখটার স্কেলে একই মাত্রার একটি ভূমিকম্প যদি হাইতিতে আঘাত হানে, জাপানে আঘাত হানে এবং নিউজিল্যান্ডে আঘাত হানে, দেখা যায় হাইতিতে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ও চরম ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে, অথচ জাপান বা নিউজিল্যান্ডে প্রায় কোনো ক্ষয়ক্ষতিই হয় না। কারণ তারা বিল্ডিং কোড শতভাগ বাস্তবায়ন করে তাদের পরিকাঠামোকে আগেই নিরাপদ করে প্রস্তুত রেখেছে। নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার যে ভূমিকম্প হলো, এই মাত্রার কম্পন জাপানে অহরহ ঘটছে এবং তাতে তাদের কিছুই হয় না। আর আমাদের দেশে ভবন হেলে পড়ার ঘটনা ঘটে। আমাদের গবেষক, প্রকৌশলী ও সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় সঠিক নীতি বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশও এই দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

এশিয়া পোস্ট: টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার উচ্চতর গবেষণার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে গিয়ে বিশেষ কোনো নতুন বাস্তবতা কি আপনি লক্ষ্য করেছেন?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: জাপানে আমার পিএইচডির মূল গবেষণার বিষয় ছিল জিওটেকনিক্যাল আর্থকোয়েক ইঞ্জিনিয়ারিং ও মাটির লিকুইফ্যাকশন। উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে যখন বাংলাদেশের মাটি নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলাম, তখন আমার সামনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় পরিষ্কার হলো।

সাধারণত মানুষ ধারণা করে কেবল বালুমাটিতেই বুঝি লিকুইফ্যাকশন ঘটে। কিন্তু গবেষণায় আমরা দেখলাম, বাংলাদেশে এমন কিছু মাটি রয়েছে যা দৃশ্যত সাধারণ বালু নয়, কিন্তু ভূমিকম্পের কম্পন পেলে তার আচরণ সম্পূর্ণ বালির মতোই হয়ে যায় এবং মারাত্মকভাবে লিকুইফাইড হয়। আমাদের দেশের ভূতাত্ত্বিক গঠনে এই ধরনের মাটির উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি কারিগরি দিক, যা ভবন ও মাটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

এশিয়া পোস্ট: সাধারণ নাগরিকদের উদ্দেশে আপনার তিনটি পরামর্শ কী থাকবে?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: সাধারণ মানুষ যারা নতুন বাড়ি বা ভবন নির্মাণ করতে যাচ্ছেন, তাদের জন্য আমার সুস্পষ্ট তিনটি পরামর্শ: ১. কোনো নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান নয়; সরকার অনুমোদিত ও মানসম্পন্ন অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান দিয়ে যথাযথভাবে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা সম্পন্ন করুন। ২. বিপিআরবি বা আইইবি স্বীকৃত বৈধ লাইসেন্সধারী দক্ষ ও অভিজ্ঞ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে ভবনের বিস্তারিত কাঠামোগত নকশা করান। ৩. নির্মাণের সময় অভিজ্ঞ ঠিকাদার নিয়োগ দিন এবং সার্বক্ষণিক কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে যোগ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের তত্ত্বাবধানে (সুপারভিশন) ভবন নির্মাণ করুন।

অনেকে সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য নিম্নমানের কাজ বা হাতুড়ে লোক দিয়ে কাজ করান। মোট নির্মাণ বাজেটের তুলনায় এই খরচ অত্যন্ত নগণ্য। এই সামান্য সাশ্রয় করতে গিয়ে আপনি আপনার সারা জীবনের স্বপ্ন এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবেন না।

এশিয়া পোস্ট: সরকারের কাছে যদি আপনার একটা দাবি তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে ভূমিকম্পের সামগ্রিক ঝুঁকি কমাতে কোন দাবি জানাবেন?

ড. জাহাঙ্গীর আলম: সরকারের কাছে আমার একমাত্র মৌলিক দাবি থাকবে, সারা দেশে এমন একটি সমন্বিত প্রশাসনিক ও কারিগরি ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, যার নিয়ন্ত্রণে বিধিবদ্ধ বিল্ডিং কোড এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তেও যেন একটি ইট বা কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা না যায়। এই সিস্টেম বা প্রোটোকল বাস্তবায়ন করাই হতে হবে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার।