logo
Advertisement

‘৭১-এ জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় শিবিরের সভাপতি পদ ছাড়তে হয়েছে’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘৭১-এ জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় শিবিরের সভাপতি পদ ছাড়তে হয়েছে’
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের। ১৯৮২ সালে ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন। পরে যুবশিবির গঠন করেন। রাজনীতিতে প্রায় প্রতিটি ইসলামি দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রশিবির ত্যাগ, খেলাফত মজলিস গঠন, ইসলামি দল ও জামায়াতের রাজনীতি, বিগত নির্বাচন, ইসলামি দলগুলোর ভাঙন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতিসহ ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেছেন এশিয়া পোস্টের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ

Advertisement

এশিয়া পোস্ট: আপনি একজন লেখক ও রাজনীতিক। কর্মব্যস্ততার মাঝে কোন কাজে সময় কাটাতে ভালো লাগে?

আহমদ আবদুল কাদের: সাধারণত বই পড়তে আমার ভালো লাগে। ছেলেবেলা থেকেই আমার বই পড়ার অভ্যাস। বিভিন্ন ধরনের বই পড়ি। এখনও অব্যাহত আছে। নিয়মিত লেখালেখির চেষ্টা করি। প্রতিদিনই কিছু লিখি। রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অংশ হিসেবে লেখালেখি করি। সমাজ, রাজনীতি, মুসলিম জাতি, ইসলামি আন্দোলন, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে লিখি।

এশিয়া পোস্ট: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করে কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেছেন। সাধারণ রাজনৈতিক ধারার বাইরে এসে ইসলামি রাজনীতি বেছে নেওয়ার নেপথ্যের কারণ কী ছিল?

আহমদ আবদুল কাদের: মাধ্যমিকে পড়ার সময় সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম। প্র্যাক্টিসে নয়, তত্ত্বগতভাবে ঝুঁকে পড়েছিলাম। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় এক শিক্ষকের প্রভাবেই এটা হয়েছিল। নাইনে পড়ার সময় যে বাসায় ছিলাম, ওই বাসায় আমার কাকা ছিলেন। তিনি বললেন, ‘সমাজতন্ত্রে হবে না, তোমাকে পড়তে হবে।’ তার দেওয়া বইপত্র আমি পড়তে শুরু করলাম। ইসলাম যে শ্রেষ্ঠ ধর্ম, আমি সেটা ক্লাস এইটে এসে খুব ভালোভাবে বুঝেছি। তখনই দেখেছি, একমাত্র ইসলাম ধর্মেই সবকিছু আল্লাহর জন্য নিবেদিত। তবে আমি ধর্মকর্ম করি প্রাইমারি স্কুল থেকেই। খেলাধুলার মাঝখানেও আমি নামাজ ছাড়তাম না।

এর মধ্যে ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান শুরু হয়। আমি জড়িয়ে পড়ি। মিছিল-মিটিং করি। তবে কোনো দলের ব্যানারে নয়। আইয়ুব খানের পতনের পর আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর গ্রামে চলে যায়। সেখানেও আন্দোলন নিয়ে মিটিং-মিছিল হয়। আমি বক্তব্য রাখি।

আমার কাকা সুভাষচন্দ্র বসুর খুব ভক্ত ছিলেন। তিনি আমাকে সুভাষ বসুর অনেক ভাষণ পড়তে দিলেন। পড়ে আমার ভালো লাগল। কিছুটা তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়লাম। আমার এক শিক্ষকও তার সমর্থক ছিলেন। কালিকচ্চ এলাকায় আমি ছিলাম তখন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যার সম্পৃক্ত ছিল, তাদের অনেক সেখানে থাকত। কাকা আমাকে তাদের কাছে নিয়ে গেলেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে আমি কিছুটা অনুপ্রাণিত হলাম। আন্দোলনের জন্য কিছু পয়সাকড়ি সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে শুনলাম, এক কলেজ পড়ুয়া নেতা সে টাকার অধিকাং মেরে স্যুট-কোট বানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন থেমে গেল।

ক্লাস টেনে এসে ইসলামের প্রতি আমি একদম দুর্বল হয়ে পড়ি। তখনও কোনো রাজনীতি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নই আমি। ওই সময় আমি কেনেথ ডব্লিউ মর্গানের একটা বই পড়ি, সেখানে পাকিস্তানের সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদির বিষয়ে আমি জানি। মওদুদির বিষয়ে তিনি লিখলেন, তিনি হচ্ছেন বেস্ট চ্যাম্পিয়ন অব অর্থোডক্স ইসলাম। ক্লাস টেনের শেষে দিকে মওদুদির লেখা আল্লাহর পথে জিহাদ পড়ি—ছোট বই। দাঁড়িয়ে বইটি পড়ে ফেললাম। বইটি পড়ে মনে হলো যে, এই যদি ইসলামের আদর্শ হয়, তাহলে তার ভিত্তিতে রাজনীতি করা যেতে পারে।

সিলেট এমসি কলেজে পড়ার সময় একাত্তর শুরু হলো। ২৬ মার্চের পর বাড়িতে রটে গেল পাকিস্তানি বাহিনী আমাকে মেরে ফেলেছে। যুদ্ধের মধ্যেই বাড়ি ফিরি। এপ্রিলে ট্রেনিং নিতে এক বন্ধুসহ ভারত যাই। সেখানে গিয়ে পরিবেশ ভালো লাগেনি, তাই ফিরে আসি। একসময় পাকিস্তান বাহিনী আমাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। বাড়ি ছেড়ে নানাবাড়ি চলে যেতে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দেখি এখানে জাসদের খুব তোড়জোড়। বেশ তৎপরতা। ওই সময় ডাকসুর দ্বিতীয় নির্বাচন হয়। জাসদের ভিপি প্রার্থী আ ফ ম মাহবুবুল হক। ছাত্র ইউনিয়ন ও মুজিববাদী ছাত্রলীগ মিলে যৌথ প্যানেল দেয়। নির্বাচনের দিন সন্ধ্যায় বোমাবাজি শুরু হয়। জানতে পারে, মাহবুব জিতে যাচ্ছিল, তাই ভোট নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের আর ফলাফল হয়নি।

১৯৭৪ সালে দাউদ হায়দার চার ধর্মের বিরুদ্ধে কবিতা লিখে। আমরা এর বিরুদ্ধে ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগানে হলে হলে মিছিল করি। মিছিলের পর সিদ্ধান্ত হয় পরদিন ধর্মঘট ডাকা হয়। ধর্মঘট সফল হয়নি। পরদিন বটতলায় প্রোগ্রাম করি। সেখানে বক্তৃতা রাখি। এসব কাজ এবং ধর্মঘট ব্যর্থ হওয়ায় আমার মনে হলো, এভাবে করলে হবে না, সংঘবদ্ধ হয়ে করতে হবে। এর মধ্যে ইসলামি মিশন নামে এক সংগঠনের যাত্রা শুরু হলো। আমি তাদের সাপোর্টার ছিলাম। ইসলামি আন্দোলন বিষয়ে দেশ-বিদেশের কিছু বই পড়লাম। সেসময় প্রতিদিনই খুনাখুনি হতো। বোমাবাজি হতো। তখন মনে হলো, এ ধরনের রাজনীতি করলে হবে না। আমাকে ইসলামি রাজনীতি হবে।

এশিয়া পোস্ট: ১৯৭৭ সালে ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আপনি যুক্ত ছিলেন। ১৯৮২ সালে ছাত্রশিবিরের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। ছাত্রশিবির থেকে পদত্যাগ করে যুবশিবির গঠনের পথ বেছে নিতে হলো কেন?

আহমদ আবদুল কাদের: ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হয়। আমি তখনও ছাত্রশিবিরের সভাপতি হয়নি। শিবিরের লোকেরা ইরানি বিপ্লবের সমর্থক। পরে ইরানে সাদ্দাম এসে আক্রমণ করল। সৌদি আরব সাপোর্ট দিল সাদ্দামকে। জামায়াত থেকে আমাদের বলা হলো, সৌদি আরবের পক্ষে মিছিল করতে, শিবিরের নেতারা না করে দিল এবং জামায়াতের এ প্রস্তাব শিবিরের পছন্দ হয়নি। জামায়াত তখন ইরানের বিপক্ষে বইও লিখল। আমাদেরকে বলল, ইরানের পক্ষ না নিতে। আমরা জামায়াতের এ আচরণ ভালোভাবে নিইনি।

আমি সেসময় শিবিরের পরিষদ সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি। ৮১ সালে রমনা গ্রীনে শিবিরের এক বিশাল কর্মী সম্মেলন হয়। আমি ছিলাম সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক। আলোচনা করে ঠিক করা হলো, জামায়াতের কাউকে বক্তা হিসেবে দাওয়াত দেওয়া হবে না। কেউ আসলেও স্টেজে উঠানো হবে না। জামায়াত এটা খুব সিরিয়াসলি নিল। এদিকে আবার গোলাম আযম সাহেবের নাগরিকত্ব আন্দোলন শুরু হয়। জামায়াত মিটিং করে, আমাদের শরিক হতে বলে। আমরা বললাম, আমাদের পক্ষে সরাসরি সহযোগিতা করা সম্ভব নয়, তবে পোস্টার লাগানো ইত্যাদি কাজে পরিচয় গোপন রেখে সহযোগিতা করা যেতে পারে। কারণ, শিবিরের জন্মই হয়েছে এ কথার ওপর যে, এটা দলের লেঁজুড়বৃত্তি করবে না। তারা এটা ভালোভাবে নেয়নি।

১৯৮০ ও ১৯৮১ সালে মাওলানা আবু তাহের ছিলেন শিবিরের সভাপতি। তিনি প্রস্তাব দিলেন, ৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে রিভিও বা পর্যালোচনা করা হোক। শিবিরের জানা প্রয়োজন, ৯১-এ জামায়াতের ভূমিকা কী ছিল? তারা কেন পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করেছিল? ৭১-এ জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে একটি কমিটি করা হয়। আমি তার একজন সদস্য ছিলাম। আমরা প্রশ্নমালা প্রস্তুত করলাম। জামায়াতের সঙ্গে বসার ব্যবস্থা করতে তাহের ভাইকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। তার সময়ে আর এর অগ্রগতি হলো না। এরপর এনামুল হক মঞ্জু নামে একজন সভাপতি হলেন। তিনি বেশিদিন ছিলেন না।

১৯৮২ সালে আমার ওপর দায়িত্ব আসল। আমি তখন মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের কাছে গিয়ে ৭১-এর ভূমিকা নিয়ে জানতে চাই। আমার কথাবার্তায় তাকে ভার মনে হলো। তিনি বললেন, তোমরা কী করতে চাও। বললাম, তথ্য জানতে চাই। পাকিস্তান আর্মিকে সাপোর্ট দেওয়ার বিষয়ে কোথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এটা কি জামায়াতের শুরা মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। আলবদরকে কি জামায়াত স্বীকৃতি দিয়েছে? তিনি কিছু বললেন না। একপর্যায়ে দেখি আমার বিরুদ্ধে সারা দেশে অনাস্থা প্রস্তাব আনল। শিবিরের সদস্যদের আমার প্রতি সভাপতি হিসেবে আস্থা নেই। ভেতরগত সমস্যা তৈরি হলো। শুরার বৈঠক ডাকা হলো। গোলাম আজম সাহেব বৈঠকে এলেন। তিনি এর সুরাহার জন্য দায়িত্ব নিলেন। তিনি একটা লিখিত প্রস্তাব আনলেন। বৈঠক ডাকা হলো। শিবিরের প্রাক্তন নেতারাও আসলেন। তিনি পড়ে শোনালেন, আব্দুল কাদের বাচ্চু (আহমদ আবদুল কাদের) শিবির জীবন শেষ করবে আর শাহজাহান চৌধুরী—যিনি ছিলেন অনাস্থা প্রস্তাব আনার প্রধান উদ্যোগী, তিনি শপথ ভঙ্গের কাফফারা হিসেবে তিনটি রোজা রাখবে। সবাই চুপ। মুজাহিদ নামের এক ভাই বললেন, আমি এই রায় মানি না। তখন থেকেই ছাত্রশিবির শেষ আমার। আমি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেনি।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রশিবির থেকে বেরিয়ে আপনি কি কোনো দলে যোগ দিয়েছিলেন?

আহমদ আবদুল কাদের: আমাদের সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে যুবশিবির গঠন করি। শিবিরে থাকাবস্থায়ও আমরা যুব সংগঠন করার কথা ভাবছিলাম। কারণ, শিবির থেকে বের হয়ে সরাসরি জামায়াতে যোগ দিতে হতো।

এশিয়া পোস্ট: ৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং রিভিউ করার তাগিদ দিয়েছিলেন। আপনার ওই অবস্থানের পর জামায়াতের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

আহমদ আবদুল কাদের: তারা আমার বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে প্রপাগান্ডা ছড়িয়েছে। তারা আমাকে মোসাদ, সিআইএ’র এজেন্টসহ যা বলা যায়, তা বলেছে। পরে অনেকে আমাকে জানিয়েছেনও আমার বিরুদ্ধে তারা কত ধরনের আপত্তিকর কথা ছড়িয়েছে। দেশ-বিদেশের যেখানে শিবিরের বলয় আছে, সেখানেই আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়েছে। শারীরিকভাবে আমাকে হিট করেছে। যুবশিবির ঠেকাতে জামায়াতের ছেলেরা চট্টগ্রামে গিয়ে আমাকে গুরুতরভাবে আহত করেছে। কারণ, তখন শিবিরের সদস্যরা যুবশিবিরে ব্যাপকহারে যোগ দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর চট্টগ্রামে গেলে ওই সময় হত্যাচেষ্টায় জড়িত একজন আমার কাছে এসে ক্ষমা চেয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: যুবশিবির থেকে একসময় আপনি মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জীর (হাফেজ্জী হুজুর রহ.) সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ এবং খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেন। এর পেছনের প্রেক্ষাপটটা কী ছিল?

আহমদ আবদুল কাদের: যুবশিবির থেকে নয়, যুবশিবির নিয়েই আমরা হাফেজ্জী হুজুরের খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়েছি। খেলাফত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জোট করেছিলাম—সম্মিলিত ইসলামি সংগ্রাম পরিষদ। এ জোটে ১১ বা ১৩ দল ছিল। হাফেজ্জী হুজুর খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করলে ধর্মীয় অঙ্গনে এটি বেশ জাগরণ তুলল। তখন সবাই মনে করল, একটি আন্দোলন করা প্রয়োজন। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সেসময় রাষ্ট্রপতি। তখন সবাই উপজেলা বিরোধী আন্দোলন করছে। ইসলাম প্রতিষ্ঠা, এরশাদ ও উপজেলা বিরোধী ইস্যু নিয়ে তখন আন্দোলন করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মূলত সম্মিলিত ইসলামি সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।

এশিয়া পোস্ট: একসময় চরমোনাই পীর প্রয়াত মাওলানা ফজলুল করীমকে নিয়ে শাসনতন্ত্র আন্দোলন করলেন। পরে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের সঙ্গে মিলে খেলাফত মজলিস করলেন। সেখানও ভাঙন দেখা দেয়। শায়খুল হাদিসের দল পরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নামে কার্যক্রম শুরু করে। আপনি খেলাফত মজলিস নিয়ে রাজনীতি শুরু করলেন। বারবার এই ভাঙনের কারণ কী?

আহমদ আবদুল কাদের: হাফেজ্জী হুজুরের সঙ্গে আমাদের ভাঙন হয়নি। জোট করেছিলাম, পরে জোট কার্যকর হয়নি। বছর দুয়েক পর খেলাফত আন্দোলন নিজেই জোট ভেঙে দেয়। পরবর্তীতে চরমোনাইয়ের তৎকালীন পীরকে নিয়ে জোটবদ্ধ হতে চাচ্ছিলাম। এর আগে ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে আল্লামা দেলোয়ার হুসেন সাঈদীকে নিয়ে ঐক্য করতে চেয়েছিলাম। মিটিংও হয়েছিল। সাঈদী সাহেব জামায়াত ছেড়ে আসার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। ১৩ মার্চ মিটিং ডাকা হলো। সাঈদী সাহেবের নামে পোস্টারও ছাপা হলো। একজনের মারফত জানতে পারলাম, সাঈদী সাহেব আমাদের সঙ্গে থাকবেন না। তার বাসায় গেলাম। তিনি আমাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে জানালেন, থাকতে পারছেন না। পরে বাংলামোটরের সুন্দরবন হোটেলে মিটিং করে চরমোনাই পীরকে সমন্বয়কারী করা হলো। চরমোনাই পীরের নামে পোস্টার করা হলো। কিন্তু পুলিশের বাধায় ১৩ মার্চের প্রোগ্রাম করতে পারেনি।

পরে ইসলামী শাসনতন্ত্র নামেই আমাদের কার্যক্রম চলল। এটা আর তেমন এগোয়নি। এ বিষয়ে চরমোনাই পীরের সঙ্গে এক দিন দেখাও করি। রাজনৈতিক দল করার কথাও জানাই। তিনি জানালেন, তিনি অরাজনৈতিক দল করেন। তার মুজাহিদ কমিটিও অরাজনৈতিক সংগঠন। তিনি আমাদেরকে দল করতে বললেন। হতাশ হয়ে ফিরে আসলাম। পরে খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে দল করি। সেখানে গঠনতন্ত্র মেনে চলার অঙ্গীকার করি। ২০০৫ সালে আমাদের রিপোর্টারস ইউনিটিতে মিটিং করার কথা ছিল। সেখানে তৎকালীন এমপি মাওলানা শহিদুল ইসলামের কারণে করতে পারেনি। পরে এক হোটেলে করি। সেখানে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক সাহেব আসেননি। তারা রাহমানিয়া মাদ্রাসায় অবস্থান করছেন। সেখানে লোক পাঠানো হলো। তারা আসেননি। তখন আমরা খেলাফত মজলিস নামে দল ঘোষণা করে কমিটি দিলাম।

এশিয়া পোস্ট: এত ভাঙনের কারণ কী?

আহমদ আবদুল কাদের: খেলাফত মজলিসই ভেঙেছে। অন্যগুলো তো ভেঙেনি। তারা জোটবদ্ধ ছিল, জোট ছেড়ে দিয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: ধর্মভিত্তিক দলগুলো ঐক্যের কথা বলে, কিন্তু এসব দলে ঐক্যের চেয়ে ভাঙন বেশি। এর মূল সংকটটা কোথায় বলে মনে করেন?

আহমদ আবদুল কাদের: সব দলই ভাঙে। বড় দল কম ভাঙে। তাদের এখানে কর্মীদের প্রেশার থাকে। সহজে ভাঙলে আলাদা হয়ে যেতে পারে। আওয়ামী লীগ ভেঙেছে একসময়। জামায়াতও ভেঙেছে, তবে টিকতে পারেনি। ভাঙার প্রবণতা সব দলেই কমবেশি আছে। তবে যে দলে শৃঙ্খলা ও কর্মীদের মধ্যে আনুগত্য বেশি থাকে, ওইসব দল ভাঙে কম।

ধর্মীয় দলে সংকটের মূল কারণ হলো, গঠনতন্ত্রে আনুগত্য নেই। আনুগত্য আছে ব্যক্তির। দলের পরিচয়ের চেয়ে এখানে ব্যক্তির পরিচয় বেশি।

এশিয়া পোস্ট: দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আপনি খেলাফত মজলিসের মহাসচিবের দায়িত্বে আছেন। আপনার দলের এই অবস্থানে কি আপনি সন্তুষ্ট?

আহমদ আবদুল কাদের: সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি নির্ভর করে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের ওপর। ২০০৫ সালে খেলাফত মজলিস প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা চেষ্টা করেছি, এটাকে একটা ফর্মে আনতে। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা পরিহার করে সিস্টেমে আনতে। এ জায়গায় আমরা সফল হয়েছি। আমাদের দলে ব্যক্তির প্রাধান্য নেই। রাজনীতির ময়দানে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই আমরা।

এশিয়া পোস্ট: জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খেলাফত মজলিসের কাঙ্ক্ষিত আসন না পাওয়ার প্রধান কারণ কী বলে মনে করেন?

আহমদ আবদুল কাদের: নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যে ছিলাম। কয়জন প্রার্থী বেশ ভালো ভোট পেয়েছে। একজনের নামও ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু দুই ঘণ্টা পর ইঞ্জিনিয়ারিং করে এটাকে প্রত্যাহার করা হয়। আমরা কিছুটা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিকার। আমাদের আর্থিক দৈন্যদশা একটা কারণ। জামায়াতও অনেক জায়গায় আমাদের সহযোগিতা করেনি। তারা করতেও দেয়নি।

এশিয়া পোস্ট: জামায়াতের আদর্শের বিষয়ে খেলাফত মজলিসের অবস্থান কী?

আহমদ আবদুল কাদের: জামায়াতের আদর্শ একটা রাজনৈতিক, আরেকটা ধর্মীয়। ধর্মীয় ইস্যুতে আমাদের বক্তব্য নেই। তাদের ৭১ এর অবস্থান নিয়ে আমাদের বক্তব্য আছে। আমি তাদেরকে এটা থেকে বের হয়ে আসতে বলেছি। ৭১ এর লেগ্যাসি তাদের বাদ দেওয়া প্রয়োজন। আদর্শগত কোনো বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের ঐক্য হয়নি। আমরা দেশ ও ইসলামের জন্য এক হয়েছিলাম। কিন্তু সবাই সমানভাবে কাজ করেনি।

এশিয়া পোস্ট: কিছুদিন আগে আপনারা ১১ দলীয় নির্বাচনি সমঝোতা থেকে সরে এসেছেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে মূল কারণ কী?

আহমদ আবদুল কাদের: নির্বাচনে জামায়াত আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সহযোগিতা করেনি। আমাদের একজন প্রার্থীকে জোর করে পদত্যাগ করিয়েছেন। আরেক জায়গায় আমাদের প্রার্থী দেওয়ার পরও তারা প্রার্থী দিয়েছে এবং সেটা প্রত্যাহার করেনি। দশটা আসনের মধ্যে দুটিতেই এমন করেছে। আমরা অভিযোগও দিলাম। বুঝলাম, তাদের সঙ্গে কাজ করা বিপজ্জনক। তারা আমাদের কর্মীদের দল থেকে ভাগানোর চেষ্টা করে। তারা আমাদের উপেক্ষাও করেছে। এজন্য বলেছি, তাদের কোনো প্রোগ্রামে যাব না।

এশিয়া পোস্ট: ভবিষ্যতে জামায়াতের সঙ্গে জোট করার প্রস্তাবনা পেলে আপনাদের অবস্থান কী হবে?

আহমদ আবদুল কাদের: ভবিষ্যতে ঐক্যের প্রয়োজন দেখা দিলে জাতির স্বার্থে ইসলামের স্বার্থে জোট করব।

এশিয়া পোস্ট: কওমি ঘরানার বিভিন্ন দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে সম্প্রতি হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী উদ্যোগ নিয়েছেন। এ বিষয়ে খেলাফত মজলিসের ভাবনা কী?

আহমদ আবদুল কাদের: এই সাত দল আগেও এক ছিল—সমমনা ইসলামি দল নামে। একসঙ্গে থেকে কাজ ও আন্দোলন করেছি। নির্বাচনের আগে ভাঙন তৈরি হয়। কেউ বিএনপিতে যায়, কেউ ১১ দলীয় ঐক্যে, কেউ আলাদা। আমরা সাত দলের পূর্ব অবস্থায় ফিরতে আপত্তি নেই। তবে রাজনৈতিক ঐক্য করতে হলে জুলাই সনদ ও গণরায়কে মেনে নিয়েই ঐক্য সম্ভব।

এশিয়া পোস্ট: ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বিরুদ্ধে একটি সাধারণ অভিযোগ হলো, ধর্মীয় ইস্যু ছাড়া জাতীয় ইস্যুতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর কর্মসূচি কম। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

আহমদ আবদুল কাদের: ধর্মীয় দলগুলো ধর্ম ইস্যুতে জোড় দেন—এ কথা সত্য। তাই অনেক সময় জাতীয় ইস্যু মার খেয়ে যায়। আমি মনে করি, মেইনস্ট্রিম রাজনীতি করতে হলে ধর্মীয় দলগুলোকে দেশের সাধারণ মানুষের ইস্যুগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং এ অনুযায়ী প্রোগ্রাম নিতে হবে। জনআকাঙ্ক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

আহমদ আবদুল কাদের: এশিয়া পোস্ট ও আপনাকে ধন্যবাদ।