‘জোট মানেই আদর্শ বিসর্জন নয়, স্বতন্ত্র অবস্থানেই কাজ করছি’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত মুখ হিসেবে রাজপথ থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসা সারজিস আলম এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সক্রিয়। সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। কথা বলেছেন জুলাইয়ের অর্জন ও অপূর্ণতা, এনসিপির রাজনীতি, নির্বাচন, বর্তমান সরকার এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।
এশিয়া পোস্ট: স্বাগত আপনাকে। কেমন আছেন, সাংগঠনিক ব্যস্ততা কেমন যাচ্ছে?
সারজিস আলম: আলহামদুলিল্লাহ, ব্যস্ততা এখন অনেক বেশি। আমার প্রাতিষ্ঠানিক বা সাংগঠনিক দায়িত্ব হচ্ছে দেশের উত্তরাঞ্চল নিয়ে, যেখানে জেলা ও মহানগর মিলিয়ে মোট ৩৬টি ইউনিট রয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি হাসনাত আবদুল্লাহকে দলের পক্ষ থেকে কিছু বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাংগঠনিক কাজগুলোতেও আমাকে কিছুটা সময় দিতে হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ৪৪টি জেলা ও মহানগর ইউনিট রয়েছে। সব মিলিয়ে সারা দেশে আমাদের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মোট ৮০টি জেলা ও মহানগর সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হলো আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি ওয়ার্ডে এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করানো এবং এনসিপি ও তার সহযোগী বা অঙ্গ সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি নিশ্চিত করা। এটি করতে পারলে অনেক বড় অর্জন হবে, কারণ আমাদের দেশে সাধারণ নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রগুলো মূলত ওয়ার্ডভিত্তিক হয়ে থাকে। সেই তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্যেই আমি কাজ করছি।
এশিয়া পোস্ট: পঞ্চগড়ের আটোয়ারী থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শৈশব থেকে বেড়ে ওঠার গল্প সংক্ষেপে জানতে চাই।
সারজিস আলম: আমার পড়াশোনার শুরুটা হয়েছিল মাদ্রাসায়, প্রথম শ্রেণি সেখানেই। এরপর আব্বু-আম্মু আমাকে মাদ্রাসা থেকে একটি কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করিয়ে দেন। তারপর আমি সরকারি প্রাথমিক স্কুলেও পড়াশোনা করেছি যাতে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়া যায়। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হই। কিন্তু সেখানে শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট না পড়ার কারণে স্কুলভিত্তিক মূল্যায়নে (এসবিএ) পক্ষপাতিত্বের শিকার হই, যার ফলে ভালো পরীক্ষা দেওয়া সত্ত্বেও আমার রোল সাত হয়ে যায়। এই অবিচারের পর আব্বু আমাকে সেখান থেকে নিয়ে এসে নিজের ইউনিয়নের আলোক তপশিল উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করান। সেখানে কঠোর পরিশ্রমের পর অষ্টম শ্রেণিতে আমার রোল নম্বর এক হয় এবং নবম ও দশম শ্রেণিতেও তা ধরে রাখি। পরবর্তীতে সেই স্কুল থেকেই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ-প্লাস (জিপিএ-৫) পাই। এরপর এইচএসসিতে ভর্তির জন্য ঢাকায় আসি এবং বিএএফ শাহীন কলেজ থেকেও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন এ-প্লাস পাই। এইচএসসির পর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় আমার নাম রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজে শেষের দিকে এসেছিল। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তির সুযোগ পাই। তখন কয়েকজন শিক্ষকের সসঙ্গে পরামর্শ করলে তারা জানান, আমি যদি ভবিষ্যতে প্রশাসন ক্যাডারে (বিসিএস অ্যাডমিন) যেতে চাই—যা আমাদের গ্রামীণ মনস্তত্ত্ব এবং আমার আব্বুরও চাওয়া ছিল—তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই সেরা অপশন হবে। সেই অনুযায়ী আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হই। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষার ঠিক এক মাস আগে প্রথম অ্যান্ড্রয়েড ফোন কেনা এবং সেটি ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে মনোযোগ নষ্ট হওয়া আমার জন্য একটি বড় শিক্ষা ছিল। তবে আজকেও যদি আমাকে পুনরায় সুযোগ দেওয়া হয়, আমি চোখ বন্ধ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই বেছে নেব।
এশিয়া পোস্ট: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
সারজিস আলম: ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি অমর একুশে হলের গণরুমে উঠি। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ৪ জনের জন্য নির্ধারিত রুমে প্রথম দিনই ৪০ জন শিক্ষার্থীকে তোলা হয়, যা পরবর্তীতে ৫৫ থেকে ৬০ জন পর্যন্ত পৌঁছায়। পুরো কক্ষের মেঝেতে মাত্র ১০টি সিঙ্গেল তোশক বিছিয়ে আমাদের গাদাগাদি করে ঘুমাতে হতো। ক্লাসে যাওয়ার সময় আমাদের পুরো শরীর ব্যথায় টনটন করত। এর পাশাপাশি প্রতি রাতে নিয়মিত ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের গেস্টরুম করা এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। এই অমানবিক ব্যবস্থাটি ছাত্রলীগকে সাময়িকভাবে কিছু জনবল সরবরাহ করলেও এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মনে চরম ক্ষোভের জন্ম দিত। হলে সিট ডিস্ট্রিবিউশনের ক্ষেত্রে হল প্রশাসনের কোনো ভূমিকা ছিল না, পুরো হল নিয়ন্ত্রণ করত ছাত্রলীগ।
এশিয়া পোস্ট: ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে অমর একুশে হলের সদস্য পদে রেকর্ড ভোটে বিজয়ী হওয়ার পর আপনি কীভাবে ছাত্রলীগের কালচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন?
সারজিস আলম: ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ তাদের প্যানেলটির নাম দিয়েছিল ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী পরিষদ’। এটিকে গ্রহণযোগ্য করতে বিতর্ক ক্লাব বা সামাজিক সংগঠনের আমার মতো কিছু অরাজনৈতিক ছেলেকে প্যানেলে যুক্ত করা হয়েছিল। আমি হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিপুল সমর্থন নিয়ে ৯০০ ভোটের মধ্যে ৬২৪ ভোট পেয়ে রেকর্ড ব্যবধানে সদস্য পদে বিজয়ী হই। বিজয়ী হওয়ার পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। আমি ডাকসুর প্রতিনিধি হিসেবে প্রকাশ্যে হলের গণরুম, গেস্টরুম এবং বৈরী রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হই এবং ফেসবুকে লেখালেখি শুরু করি। এর ফলে হল ছাত্রলীগের নেতৃত্ব আমাকে একাধিকবার রুমে ডেকে একাকী গেস্টরুম করানো এবং হুমকি দেওয়ার মতো নানা চাপ সৃষ্টি করে, কিন্তু আমি আমার অবস্থান থেকে সরে আসিনি।
এশিয়া পোস্ট: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে আপনার যুক্ত হওয়ার ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল?
সারজিস আলম: ২০২৪ সালের ৫ জুন আসরের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে ফেসবুকে স্ক্রল করতে গিয়ে জানতে পারি যে, ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্রটি বাতিল করে পুনরায় ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল করা হয়েছে। এটি সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য চরম অবিচার ছিল। ওই দিন রাতে হলের আবু বাকের মজুমদার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিবাদের প্রস্তাব দেয়। ডাকসুতে বিজয়ী হওয়ার কারণে এবং সায়েন্স লাইব্রেরির সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ থাকায় আমি তাদের স্পোক পারসন হিসেবে যুক্ত হই। পরবর্তীতে ৬ই জুন শহীদ মিনারে প্রথম বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সবাইকে সংগঠিত করে নিয়ে যাওয়ার কাজটি আমি করি। ওই সমাবেশে সায়েন্স লাইব্রেরির প্রতিনিধি হিসেবে আমি বক্তব্য রাখি এবং এভাবেই আন্দোলনের সঙ্গে আমার সরাসরি সম্পৃক্ততা তৈরি হয়।
এশিয়া পোস্ট: আন্দোলনের শুরুতেই সমন্বয়ক ও সহসমন্বয়ক নির্ধারণ করা হয়েছিল কীসের ভিত্তিতে?
সারজিস আলম: জুলাই মাসের শুরুতে যখন হাইকোর্টের আদেশের পর আমরা বুঝতে পারলাম যে আমাদের ফাইট দীর্ঘস্থায়ী হবে, তখন আমরা ১০-১২ জন একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিই যে একটি নেতৃত্ব কাঠামো তৈরি করতে হবে। তবে এখানে কোনো সভাপতি-সেক্রেটারি বা একক প্রধান সমন্বয়কারী রাখা যাবে না। কারণ, একক নেতৃত্ব থাকলে প্রশাসন সহজেই তাকে টার্গেট বা নজরবন্দি করে আন্দোলনকে ধ্বংস করে দিতে পারত। তাই সবাইকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এবং আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে সমন্বয়ক ও সহসমন্বয়ক—এমন দুই স্তরের নেতৃত্ব গঠন করা হয়, যা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল।
এশিয়া পোস্ট: কোটা সংস্কারের কীভাবে এক দফার সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিল?
সারজিস আলম: প্রকৃতপক্ষে ৫ আগস্ট সকাল পর্যন্তও কেউ নিশ্চিতভাবে জানত না যে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাবে। তবে সরকারের প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্ত এবং দমন-পীড়নই তার পতনের পথ তৈরি করেছে। ১৪ জুলাই রাতে শেখ হাসিনার বিতর্কিত মন্তব্য এবং ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ-যুবলীগের রক্তাক্ত হামলার পর ক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে নৃশংসভাবে হত্যা, ১৭ জুলাই গায়েবানা জানাজায় হামলা এবং ১৮ জুলাই সারা দেশে স্কুল, কলেজ ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে হত্যার পর এটি সাধারণ মানুষের গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। মানুষ যখন বুঝতে পেরেছে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তখনই তারা রাজপথে নেমে এসেছে।
এশিয়া পোস্ট: আন্দোলন চলাকালীন ডিবি কার্যালয়ে আপনাদের আটক করে মুচলেকা নেওয়া হয়েছিল। আসলে কী ঘটেছিল?
সারজিস আলম: সায়েন্সল্যাবের একটি বাসা থেকে আমাকে ও হাসনাতকে ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। ডিবি কার্যালয়ে আমাদের একেকজনকে আলাদা আলাদা রুমে রেখে চরম মেন্টাল টর্চার করা হতো। বাথরুমের দরজার সামনে চেয়ারে বসিয়ে ২৪ ঘণ্টা ঘুমাতে না দেওয়া এবং পরিবারের ক্ষতি করার ভয় দেখানো হতো। এক দিন ডিবিপ্রধান হারুন আমাদের ডেকে একটি স্ক্রিপ্ট দিয়ে তা পড়তে বলেন। নাহিদ প্রথমে রাজি হয়ে বলে যে এখান থেকে আগে বের হওয়া প্রয়োজন। এরপর জোরপূর্বক ভিডিও ধারণ করা হয়। তারা এতটাই বোকা ছিল যে তিন-চার লাইনের লিখিত কাগজ পড়ে আমাদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের নাটক সাজিয়েছে, যা দেখে দেশের মানুষ সহজেই বুঝতে পেরেছিল যে এটি জোরপূর্বকভাবে আদায় করা হয়েছে।
এশিয়া পোস্ট: ডিবি কার্যালয় থেকে মুক্ত হওয়ার পর আপনাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কেমন ছিল?
সারজিস আলম: দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র চাপ এবং বিশ্ব গণমাধ্যমের ভূমিকার কারণে সরকার ১ আগস্ট আমাদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ডিবি অফিস থেকে বের হয়ে গাড়িতে বসে বাসায় যাওয়ার পথেই আমি ফেসবুকে একটি বড় স্ট্যাটাস দিই, যার শেষ লাইনে স্পষ্টভাবে লিখেছিলাম—‘আমাদের এ লড়াই চলবে’। ডিবি অফিসের জোরপূর্বক বিবৃতি যে আন্দোলনের মূল শক্তিকে স্পর্শ করতে পারেনি, তা আমরা মুক্তির প্রথম ঘণ্টায়ই স্পষ্ট করে দিয়েছিলাম।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
সারজিস আলম: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং বর্তমান সময় দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অধ্যায়। তখন আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটানো। আর এখনকার সময়টি হচ্ছে দেশ গড়ার সময়, আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণের সময়। সে সময় দেশজুড়ে একটি চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। আর এখন আমাদের মূল প্রত্যাশা হলো একটি স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা। তখনকার সময়টি ছিল স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসান ঘটানোর সংগ্রাম, আর এখনকার সময়টি হলো একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ তৈরি করা। ৫ আগস্ট যখন এ দেশের মানুষ শুনল যে শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে, তখন প্রতিটি নাগরিকের মনে যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশার জন্ম হয়েছিল, আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো সেই আশা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা। আমরা এখন সেই স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম করছি।
এশিয়া পোস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ গ্রহণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে তরুণদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে কোনো ঘাটতি ছিল বলে মনে করেন?
সারজিস আলম: ৫ আগস্ট যখন শেখ হাসিনা পালিয়ে যায়, তখন আমাদের তরুণদের রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু দেশ যাতে অস্থিতিশীলতা বা গৃহযুদ্ধের দিকে না যায় এবং মার্শাল ল জারি না হয়, সেজন্য একটি রানিং সরকার অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। আমরা শহীদ মিনার থেকে বিপ্লবী সরকার বা জাতীয় সরকার গঠন করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো সেটিতে একমত হয়নি। ফলে সব পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। তবে আজ যদি আমাদের সেই সময়ে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকত, আমরা ফ্যাসিস্ট প্রেসিডেন্টের অধীনে শপথ না নিয়ে শহীদ মিনার থেকে কোনো শহীদের বাবা বা মায়ের হাত দিয়ে বিপ্লবী সরকারের শপথ গ্রহণ করাতাম এবং ৭২-এর সংবিধানের বদলে নতুন রূপরেখায় এগোতাম।
এশিয়া পোস্ট: জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভিন্ন ধারার রাজনীতির কথা বললেও প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো মনে হয়। এর কারণ কী?
সারজিস আলম: এনসিপি সম্পূর্ণ নতুন ধারার একটি রাজনৈতিক দল। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে সংগঠনকে একদম তৃণমূলের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সুসংগঠিত করা। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মতো এনসিপিতে কোনো পরিবারতন্ত্রের স্থান নেই—এখানে কোনো এমপির ছেলে এমপি বা মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে না, সবাই রাজপথের লড়াই সংগ্রাম করে উঠে আসা প্রতিনিধি। দ্বিতীয়ত, আমরা কোনো সরকারি অফিস দখল, চাঁদাবাজি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের রাজনীতি করি না। আমরা ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জবাবদিহিতামূলক একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য লড়াই করছি।
এশিয়া পোস্ট: এনসিপির সিদ্ধান্তগুলো কর ওপর নির্ভরশীল এবং আগামী কাউন্সিলে আপনি কোন পদপ্রত্যাশী?
সারজিস আলম: এনসিপিতে সিদ্ধান্ত কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছায় হয় না। আমাদের মূল নীতিনির্ধারণী ফোরাম হচ্ছে পিসি (পলিটিক্যাল কাউন্সিল), যার সদস্য সংখ্যা বর্তমানে ১৬ জন। এ ছাড়া ৫০ সদস্যের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল (ইসি) এবং ২০০ সদস্যের সাধারণ কমিটি রয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো সেখানে আলোচনার মাধ্যমেই নেওয়া হয়। দলের পরবর্তী কাউন্সিল ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমি নিজে সংগঠন গোছানোর কাজ পছন্দ করি এবং ভবিষ্যতেও দলের সাংগঠনিক দায়িত্বেই কাজ করতে আগ্রহী।
এশিয়া পোস্ট: বিগত নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসনে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ফলাফল-পরবর্তী অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
সারজিস আলম: পঞ্চগড়-১ আসনে আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। অত্যন্ত সাধারণ একটি দল হিসেবে প্রথমবার আমাদের লড়াই করা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। নির্বাচনের দিন সকালে আমাদের যুব সংগঠনের প্রধানকে ভিত্তিহীন অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়, যা ভোটারদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া ভোট গণনার ক্ষেত্রেও ব্যাপক কারচুপি ও বিলম্ব করা হয়েছিল। ৮৫টি কেন্দ্র পর্যন্ত আমি ৮ হাজার ভোটে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও ফলাফল আটকে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে সমন্বিতভাবে ফলাফল ঘোষণা করে আমাদের সামান্য ব্যবধানে পরাজিত দেখানো হয়। তবে পঞ্চগড়ের সাধারণ মানুষ ও ভোটাররা ভালো করেই জানেন যে রাজপথের লড়াইয়ে কে তাদের প্রকৃত প্রতিনিধি ছিল।
এশিয়া পোস্ট: জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের কারণ কী ছিল?
সারজিস আলম: প্রথমবার এককভাবে সারা দেশের ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্বাচন করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। তাই আমরা সংস্কার এবং জুলাই সনদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দলগুলোর সঙ্গে একটি নির্বাচনি জোট গঠন করেছিলাম। জোট করা মানেই নিজস্ব আদর্শ বিসর্জন দেওয়া নয়। আমরা আমাদের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রেখেই কাজ করছি এবং সামনে যে স্থানীয় নির্বাচন আসছে, সেখানে আমরা এককভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।
এশিয়া পোস্ট: রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করছেন? একই সঙ্গে আপনার আয়ের মূল উৎসগুলো কী?
সারজিস আলম: সত্যি বলতে, ব্যস্ততার কারণে পরিবারকে একেবারেই সময় দিতে পারি না। আমার বিয়ের দেড় বছর হয়েছে, কিন্তু সাংগঠনিক সফরের কারণে স্ত্রীকে খুব একটা সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। আয়ের উৎসের ক্ষেত্রে, রাজনীতির বাইরে আমরা বন্ধুরা মিলে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড কোম্পানি এবং একটি অনলাইন ক্লদিং ব্র্যান্ড গড়ে তুলেছি, যেখান থেকে আমার নিয়মিত আয় আসে। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া মনিটাইজেশন থেকেও আমার ভালো আয় আসে, যা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক খরচের জন্য যথেষ্ট।
এশিয়া পোস্ট: দেশের তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষের প্রতি আপনার কী আহ্বান থাকবে?
সারজিস আলম: বাংলাদেশে রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন শুরু হয়েছে এবং এই পরিবর্তন আসতে সময় লাগবে। তবে সাধারণ মানুষকে ক্ষমতার সমালোচনা করার এবং প্রশ্ন তোলার প্রবণতা বজায় রাখতে হবে। যারা ক্ষমতায় থাকবে, তাদেরও সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা থাকতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ব্যাপক প্রপাগান্ডা ও গুজব ছড়ানো হয়, সাধারণ মানুষের উচিত কোনো তথ্য বিশ্বাস করার আগে সঠিক উপায়ে তা ফ্যাক্ট-চেক করে নেওয়া। আমরা যদি আমাদের বিবেক বোধকে জাগ্রত রাখতে পারি, তবে দীর্ঘমেয়াদে হলেও একটি সুন্দর ও কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।






