logo
Advertisement

‘সরকার ভুল সিদ্ধান্ত নিলে সমালোচনা করব’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘সরকার ভুল সিদ্ধান্ত নিলে সমালোচনা করব’
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির স্বনির্ভরবিষয়ক সহসম্পাদক ড. নিলোফার চৌধুরী মনি। সংরক্ষিত নারী আসনে দুই দফায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি—২০০৯ সালে প্রথমবার এবং সাম্প্রতিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামালপুর থেকে দ্বিতীয়বার।

Advertisement

সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। কথা বলেছেন নিজের রাজনৈতিক পথচলার গল্প, বিএনপি সরকারের ছয় মাস, দলীয় রাজনীতি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর।

এশিয়া পোস্ট: রাজনীতি, সংসদ ও টকশো সামলে আপনার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততা কেমন কাটছে?

নিলোফার চৌধুরী মনি: আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে ব্যস্ততা তো থাকবেই। রাজনৈতিক দল, এলাকার সাধারণ মানুষ, নিজের পরিবার, সংসদ এবং নিয়মিত টকশো, সব মিলিয়ে আসলে প্রতিটি দিনই অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কেটে যায়।

এশিয়া পোস্ট: আপনার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? শৈশব থেকে রাজনীতিতে আসার গল্পটা শুনতে চাই।

নিলোফার চৌধুরী মনি: সত্যি বলতে, আমি ঠিক কখন রাজনীতিতে প্রবেশ করেছি তা আমার নিজেরই জানা নেই। আমার বেড়ে ওঠা ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের শাসনামলে। আমি যখন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তখন ছিল এরশাদের স্বৈরশাসন। সে সময় স্বৈরাচারের অত্যাচার ও নিপীড়ন দেখে মনে হতো, এর প্রতিবাদ করা উচিত।

তাছাড়া আমার পরিবারে রাজনৈতিক আবহ ছিল। আমার বাবা ছিলেন জাতীয়তাবাদী আদর্শের মানুষ। জামালপুর জেলায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যে কয়েকজন মানুষ প্রথম বিএনপির রাজনীতি শুরু করেছিলেন, আমার বাবা তাদের মধ্যে অন্যতম। ফলে ঘর থেকেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শের দীক্ষা পেয়েছি। পরবর্তীতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় যখন এরশাদের আমলের টর্চার বা নির্যাতন দেখতাম, তখন মনের অজান্তেই প্রতিবাদী হয়ে উঠি। কলেজে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা ওঠার পর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কখন যে সবার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে গেলাম, বুঝতেই পারিনি।

এশিয়া পোস্ট: আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন, এরপর আইন নিয়ে পড়েছেন। এরপর পিএইচডিও করেছেন। এরমধ্যে কোনো বিষয়টা আপনার জীবনের সঙ্গে বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে?

নিলোফার চৌধুরী মনি: তাত্ত্বিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাজনীতির সুন্দর সংজ্ঞা থাকলেও, বাংলাদেশের বাস্তব রাজনীতির সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া ভার। আমাদের দেশের রাজনীতির আকাশ সবসময় এক ধরনের দুর্যোগের ঘনঘটায় আচ্ছন্ন থাকে। আমাদের শৈশব-কৈশোর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমরা এমনই দেখে আসছি। সেদিক থেকে বিচার করলে, বাংলাদেশের বাস্তব রাজনীতি আর থিওরিটিক্যাল রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুটি বিষয়।

আর পড়াশোনার বিষয়ে যদি বলি, আমি কোনো নেমপ্লেট বা পদবি ব্যবহারের জন্য পড়াশোনা করিনি। আমি নামের পাশে ‘অ্যাডভোকেট’ বা অন্যান্য ডিগ্রি ওভাবে ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। পড়াশোনাটা করেছি সম্পূর্ণ আমার ভেতরের জানার ক্ষুধা থেকে। যখনই কোনো বিষয়ে জানার প্রয়োজন মনে করেছি, তখনই পড়াশোনা করেছি। এর বাইরেও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াও আমি প্রচুর পড়াশোনা করি। জীবনের সব জায়গা থেকেই আমি অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করেছি, যদিও আমি নিজেকে খুব একটা বড় পড়ুয়া ছাত্র মনে করি না।

এশিয়া পোস্ট: সক্রিয় রাজনীতি, সংসদ ও পরিবার, বিশেষ করে দুই সন্তানকে বড় করার দায়িত্ব, সবকিছু একসঙ্গে সামলেছেন কীভাবে, চ্যালেঞ্জ কেমন ছিল?

নিলোফার চৌধুরী মনি: এটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম বড় একটা যুদ্ধ। আমি রাজনীতি বা ব্যক্তিজীবনে সবসময় সত্য, নিয়ম এবং মানবতার মধ্যে থাকতে চেয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই তিনটির মেলবন্ধন ঘটিয়ে চলা খুবই কঠিন এবং এটি বজায় রাখতে আমাকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়েছে।

আমার বড় সন্তানের বয়স যখন ছয়-সাত বছর এবং ছোটটির বয়স এক-দুই বছর, তখন আমি সংসদ সদস্য ছিলাম। এক দিন হঠাৎ আবিষ্কার করলাম যে আমার সন্তানেরা আমার চেয়ে অন্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আমি কখনও কাজের লোকের ওপর ভরসা করিনি, আমার আত্মীয়রাই বাচ্চাদের দেখত। কিন্তু একপর্যায়ে দেখলাম বাচ্চারা আমার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্ক করত এবং তাদের অবচেতন মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছিল যে তাদের মা অনেক ব্যস্ত মানুষ, তাদের সময় দিতে পারবেন না। এই উপলব্ধি থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার জীবনে আর যা-ই ঘটুক না কেন, এই মুহূর্তে আমার সন্তানদের সময় দেওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি।

বাচ্চাদের সময় দেওয়ার জন্য আমি আমার সমস্ত ব্যস্ততাকে একখানে করার পরিকল্পনা করলাম। তখন আমি কেবল টেলিভিশন টকশোতে নিয়মিত অংশ নিতাম। কিন্তু টকশো করার জন্য আমাকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হতো। আমি বিছানায় শুয়ে-বসে পড়তে বেশি পছন্দ করতাম। তখন আমাদের শোবার ঘরের বিছানাটাকেই আমাদের পৃথিবী বানিয়ে ফেললাম। সন্তানদের ডেকে বললাম, এখানেই আমরা খেলব, পড়ব এবং সময় কাটাব। বড় সন্তান ও ছোট সন্তানের আগ্রহ অনুযায়ী খেলনা ও ড্রইং খাতা দিয়ে ওদের ব্যস্ত রাখতাম আর নিজে পড়তাম। ওদের ঘরে অভ্যস্ত করাটা প্রথম দিকে বেশ কষ্টের ছিল। কারণ, আগে ওদের বাইরে নিয়ে গিয়ে ফাস্টফুড খাওয়ানো হতো এবং ওরা বাইরে যেতেই বেশি পছন্দ করত।

পরবর্তীতে আমি ওদের এমনভাবে সময় দেওয়া শুরু করলাম যাতে ওরা আমার অনুপস্থিতি বুঝতেই না পারে। এমনকি কোনো টকশোতে যাওয়ার সময়ও ওদের গাড়িতে সঙ্গে নিয়ে যেতাম। আমি যখন ভেতরে টকশো করতাম, ওরা গাড়িতে খেলনা নিয়ে খেলত। ট্রাফিকের কারণে গাড়িতে যে এক-দেড় ঘণ্টা সময় পেতাম, সেই সময়টাতে ওদের নিজের মতো করে নানা বিষয় শেখাতাম। আমি কখনও মুখে ওদের বলিনি যে মিথ্যা বলা মহাপাপ, বরং নিজের আচরণ দিয়ে ওদের সত্য বলায় অভ্যস্ত করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন পর্যন্ত আমি সফল।

এশিয়া পোস্ট: এখন সন্তানরা বড় হয়ে গেছে। তারপরও রাজনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে কতটা সময় দিতে পারেন? নিজের জন্যই বা কতটা সময় থাকে?

নিলোফার চৌধুরী মনি: এখন আসলে সন্তানদের ওভাবে সময় দিতে হয় না। কারণ, ওরা বড় হয়ে গেছে। আমার মেয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ বর্ষে পড়ে আর ছেলে এ লেভেল পরীক্ষা দেবে। তবে আত্মীয়তা রক্ষা করার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক জীবন কিছুটা বিঘ্নিত হয়। আত্মীয়রাও এখন বিষয়টি বোঝেন যে চাইলেই আমাকে সহজে পাওয়া যাবে না। কোনো দাওয়াতে যেতে না পারলেও তারা এখন আর কিছু মনে করেন না এবং আমার সীমাবদ্ধতা বুঝে নেন।

আর নিজের জন্য সময় পাওয়ার কথা যদি বলেন, ওভাবে নিজের জন্য সময় এখন আর পাই না। খুব জরুরি কোনো কাজ থাকলে আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা সময় নিয়ে বের হই, কিন্তু ঢাকার জ্যামের যে অবস্থা, গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সময় শেষ হয়ে যায়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে ফিরে আসি। নিজের পোশাক তৈরি বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত প্রয়োজন হলে আমি আমার বোনকে দায়িত্ব দিই। অনেক সময় ঢাকা থেকে কাপড় নিয়ে আমি আমার গ্রামের বাড়ি জামালপুরে পাঠিয়ে দিই। সেখানে আমার বোন আমার পছন্দমতো ডিজাইন দিয়ে দর্জিকে বুঝিয়ে কাজ করিয়ে রাখে। এভাবেই নিজের প্রয়োজনগুলো মেটাতে হয়।

এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলে বিরোধী রাজনীতি করতে গিয়ে আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

নিলোফার চৌধুরী মনি: ১৭ বছরের সেই সময়টা দেশের কারও জন্যই ভালো ছিল না, আর আমার জন্য তো তা ছিল আরও বেশি কষ্টের। দুটি কারণে আমি প্রতি দুই-তিনটি টকশোতে অংশ নেওয়ার পর বলতাম যে, জানি না আজ নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারব কি না। প্রথম কারণ ছিল, আমি যদি গুম বা নিখোঁজ হয়ে যাই, তবে মানুষ অন্তত জানবে যে আমি এই সত্য কথাগুলো বলে গিয়েছিলাম। দ্বিতীয় কারণ ছিল, এই কথাটি শুনলে হয়তো স্বৈরাচারী সরকার কিছুটা ভয় পাবে এবং ভাববে যে ও তো সবকিছু বলেই দিচ্ছে, আজ ওকে না ধরি। এভাবেই আশঙ্কার মধ্য দিয়ে চলতে হতো।

সংসদ সদস্য থাকা সত্ত্বেও বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছি। সারাদিন থানায় আটকে রাখত, পরবর্তীতে স্পিকারের হস্তক্ষেপ বা রাতে ছেড়ে দেওয়া হতো। অনেকবার পুলিশ ও নারী পুলিশ সদস্যদের হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি, মার খেতে হয়েছে। জেলে গিয়ে ওভাবে দীর্ঘ সময় থাকতে না হলেও গ্রেপ্তার হতে হয়েছে বারবার। আর সেই গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়াগুলো ছিল অত্যন্ত বর্বর ও অমানবিক। একবার পুলিশ আমার হাত মুচকে দিয়েছিল, আরেকবার পায়ে আঘাত করে পা মুচকে দিয়েছিল। পুলিশের নারী সদস্যদের নখের খামচির অসংখ্য দাগ আমার হাতে বা অন্য কোথাও এখনও রয়ে গেছে।

একবার একটি টকশোতে তৎকালীন র‍্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদকে নিয়ে কথা বলায় বিরতির পর তাকে সরাসরি ফোনে যুক্ত করা হয়। তিনি আমাকে ফোনে এমনভাবে হুমকি দিয়েছিলেন যে, রাতে এক-দেড়টার সময় টকশো শেষ করে সাড়ে ১০-১২ কিলোমিটার দূরের বাসায় ফেরা আমার এবং আমার পরিবারের জন্য অত্যন্ত আতঙ্কের ছিল। এরপর আমার পরিবার থেকে এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা চলে আসে। আমার স্বামী তখন আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি হয়তো ভালো বাবা নই, কারণ আমি বাচ্চাদের ওভাবে যত্ন নিতে পারি না। কিন্তু তুমি আমার চেয়ে অনেক ভালো মা। আমি চাই কোনো বিপদ হলে যেন আমি মারা যাই, তুমি বেঁচে থাকো। কারণ আমি মারা গেলে তুমি বাচ্চাদের মানুষ করতে পারবে, কিন্তু তুমি না থাকলে আমি তা পারব না।’ ১৭ বছরের সেই দিনগুলো ছিল সত্যিই বিভীষিকাময়।

এশিয়া পোস্ট: সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ে কোন ঘটনা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?

নিলোফার চৌধুরী মনি: অনেক স্মৃতি আছে। তবে সবচেয়ে ভীতিকর ছিল আমার স্বামীর কাছে চাঁদা দাবির ঘটনাটি। তৎকালীন ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর একজন আমাদের কাছে প্রায় দেড় কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে, যা দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের তখন ছিল না। আমি লক্ষ্য করলাম, হঠাৎ করেই আমার স্বামী টানা তিন দিন বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি যখন বাইরে যেতাম তখনও তাকে বাসায় দেখতাম, ফিরে এসেও দেখতাম তিনি নিশ্চুপ বসে আছেন। তিনি আমাকে কিছুই বলছিলেন না। ফোনে রিং বাজলেও তিনি ধরতেন না, আমাকেও ধরতে নিষেধ করতেন। এক দিন ফোন বাজার পর আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি একদম শক্ত হয়ে থমকে গেছেন।

তখন আমি ফোনটি কেড়ে নিয়ে ধরলাম এবং অপর প্রান্তের লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে কে এবং কেন বারবার ফোন দিচ্ছে। লোকটি আমার স্বামীকে চাইলে আমি বললাম, ‘সংসারের সমস্ত ভালো-মন্দ আমিই দেখি, আপনি যা বলার আমাকেই বলুন।’ তখন সে দেড় কোটি টাকার চাঁদা দাবি করে এবং বলে এই টাকা নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে। আমি তখন সাহসের সঙ্গে তাকে বললাম, ‘আমি টাকা দেব, তবে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে গিয়ে এই টাকা দিতে চাই, আপনি তাকে ডাকুন।’ এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং হুমকি দিয়ে বলে, ‘নিজের জন্য সাদা শাড়ি কিনে রাখুন।’

ঘটনাটি আমাকে ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত আতঙ্কিত করে তুলেছিল। আমি তখন আমাদের নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে গিয়ে পুরো বিষয়টি খুলে বলি। ম্যাডাম অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমার কথা শোনেন এবং আমাকে বলেন, পরবর্তী সময়ে ফোন আসলে যেন সেটি রেকর্ড করে উনাকে দিই। কিন্তু তখনকার ফোনে রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা এখনকার মতো সহজ ছিল না এবং আমি তা ভালো বুঝতামও না। আমি যখন বাসায় ফিরে আমার স্বামী ও বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করলাম, তারা ম্যাডামকে জড়াতে নিষেধ করলেন। কারণ, আন্ডারগ্রাউন্ডের এই সন্ত্রাসীরা অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল।

পরবর্তীতে আমরা আমাদের জুনিয়র ছাত্রনেতাদের ১০-১৫টি মোটরসাইকেল দিয়ে কয়েক দিন পাহারা দিয়ে আমার স্বামীকে অফিসে আনা-নেওয়া করাতাম। কিন্তু তেলের খরচ ও খাবারের পেছনে অনেক টাকা ব্যয় হতো। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫০-৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে সজ্জিত আমাদের পুরানা পল্টনের ছিমছাম অফিসটি মাত্র ৫ লাখ টাকা লোকসান দিয়ে ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হই। এভাবে রাতারাতি অফিস ছাড়ার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য সব ধ্বংস হয়ে যায়।

এশিয়া পোস্ট: এত মানসিক চাপ, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও ব্যক্তিগত ঝুঁকির মধ্যেও কখনও কি রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথা মনে হয়েছে?

নিলোফার চৌধুরী মনি: অনেকবার মনে হয়েছে। রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবে টানা ৮-১০ দিন ঘরে বসে থেকেছি, কোথাও যাইনি। কিন্তু যখনই দেশের কোনো বড় সংকট তৈরি হতো বা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে ডাক আসত, তখন আর নিজের প্রতিজ্ঞা ধরে রাখতে পারতাম না। সব ভুলে আবার আন্দোলনে নেমে পড়তাম।

এখনও অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। বর্তমানে বিএনপি যেখানে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে আছে, সেখানে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং বট বাহিনী আমাকে ও বিএনপিকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ করছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, যাদের জন্য এত সংগ্রাম করলাম, তারাই আজ আমাদের ভুল বুঝছে। তবে অনেকেই যখন এসে বলেন, ‘আপনাকে কত মানুষ ভালোবাসে, তা কি আপনি বোঝেন?’ তখন আবার সান্ত্বনা পাই। আসলে আমাদের ভালোবাসে বলেই বিরোধী পক্ষ এসব বট বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে আমাদের হেয় করার জন্য।

সম্প্রতি এলাকায় গিয়ে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে মাত্র দু-এক লাইন কথা বলার কারণে আমার বিরুদ্ধে রীতিমতো সুনামি বয়ে যাচ্ছে। অথচ আমি শুধু সত্যটাই বলেছি। তাই এখন মাঝে মাঝে রাগ করে বলি, আমি এখন আর রাজনীতি করি না, রাজনীতিই এখন আমাকে করে।

এশিয়া পোস্ট: আপনি ২০০৯ সালে এবং বর্তমানে ২০২৬ সালেও সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দুই মেয়াদের অভিজ্ঞতায় আপনার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি? বিশেষ করে সরকারি দলের সদস্য হিসেবে এখন কি কোনো সীমাবদ্ধতা অনুভব করেন?

নিলোফার চৌধুরী মনি: আমার আদর্শগত বা মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন আসেনি। দেশের মঙ্গল করা এবং স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন ছিল, তা একই রয়ে গেছে। তবে সংসদের পরিবেশের দিক থেকে আমি ২০০৯ সালের সময়টা বেশি উপভোগ করেছি। কারণ, তখন আমরা বিরোধী দলে ছিলাম। বিরোধী দলে থাকলে মন খুলে সরকারের ভুলত্রুটি নিয়ে কথা বলা যায়, প্রতিবাদ করা যায়। সংসদে বিরোধী দলই মূলত প্রাণ। আর এখন আমরা সরকারে আছি। আমাদের দলের সদস্য সংখ্যা অনেক বেশি। সংসদে কথা বলার জন্য সিরিয়াল বজায় রাখতে হয়।

তবে সরকারি দলে আছি বলে আমি যে সরকারের অন্যায় বা ভুলের সঙ্গে আপস করে ব্যালেন্স করে কথা বলব, তা নয়। আমি কখনোই আপস করে কথা বলি না। যদি দেখি সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত দেশের স্বার্থের পরিপন্থি হচ্ছে বা অত্যন্ত গুরুতর কোনো ভুল হচ্ছে, আমি অবশ্যই তার সমালোচনা করব। কিন্তু ছোটখাটো আঞ্চলিক বিষয়, যেমন কোথাও পাঁচটি কলেজ বরাদ্দ দেওয়া হলো আর ৬০টি জায়গায় দেওয়া গেল না, এসব বিষয় নিয়ে সরকারি দলে থেকে ওভাবে বলা যায় না। কারণ, আমরা আমাদের সীমাবদ্ধ বাজেট সম্পর্কে জানি। বিরোধী দলে থাকলে হয়তো এগুলো নিয়েও কথা বলা যেত।

এশিয়া পোস্ট: সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের কাজের পরিধি নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন আছে। নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক এলাকা না থাকায় মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়?

নিলোফার চৌধুরী মনি: এখানে সাধারণ আসনের এবং সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের মধ্যে কিছুটা মানসিকতার তফাত লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ আসনের সংসদ সদস্যরা মনে করেন যে এলাকার উন্নয়ন বা বরাদ্দের একক মালিক কেবল তারাই। সাধারণ জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে তাদের নির্বাচিত করে বলে তারা অনেক কিছু জোর করে বা দাবি করে আদায় করে নেন, যা স্বাভাবিক। কিন্তু একজন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যের নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক এলাকা থাকে না। তবে আমরা যেখানে থাকি বা যে এলাকায় কাজ করতে চাই, সেখানে উন্নয়নমূলক কাজ করতে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।

সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন প্রক্রিয়াটি কিন্তু উচ্চকক্ষের মতো। সাধারণ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটে আমরা নির্বাচিত হই। একজন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য গড়ে প্রায় ৬ লাখ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন, যা কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক কিছু জটিলতা থাকে। আমলারাও হিসাব করে চলেন কার কথায় কাজ দ্রুত হবে। তবে একজন সচেতন, শিক্ষিত এবং জনগণের আস্থাভাজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলার সময় আমলারা সবসময় বাড়তি সতর্কতা ও হিসাব-নিকাশ করেই কথা বলেন।

এশিয়া পোস্ট: দীর্ঘ ১৭ বছর দলের জন্য কারাবরণ, রাজপথে মার খাওয়া ও নানা ত্যাগের পর এবারের নির্বাচনে সরাসরি মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা নিশ্চয়ই ছিল। দল যখন আপনাকে সরাসরি মনোনয়ন না দিয়ে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত করল, তখন বিষয়টি কীভাবে নিয়েছিলেন?

নিলোফার চৌধুরী মনি: আমি তো অনেকের মতো দল পরিবর্তন করে বা বিট করে অন্য কোথাও চলে যেতে পারি না। অনেকেই দল ছেড়ে গিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে পাস করেছেন এবং এখন বড় বড় কথা বলছেন। কিন্তু আমার জন্ম এই দলেই, আমি এই দলের আদর্শেই কাজ করি এবং দলের বাইরে অন্য কিছু চিন্তা করতে পারি না। বাবা-মা যেমন সব সন্তানকে সমান চোখে দেখলেও কারও প্রতি একটু বাড়তি টান থাকে, দলের ক্ষেত্রেও হয়তো তেমনটি হয়েছে। তারা হয়তো হিসাব-নিকাশ করে মনে করেছেন যে আমাকে দিয়ে সরাসরি আসনে ওভাবে কাজ হবে না। জনগণ কী মনে করে, তা জনগণই ভালো জানে। তবে আমি যখন মাঠে নেমেছি, জনগণের যে স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা ও উচ্ছ্বাস দেখেছি, তাতেই আমি কৃতজ্ঞ।

মনোনয়ন না পেয়ে প্রথম কয়েক দিন আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম এবং নিজেকে গুটিয়ে ঘরে বসেছিলাম। কিন্তু পরে ভাবলাম, আমি যদি নিজ এলাকায় না যাই, তবে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী যিনি মনোনয়ন পেয়েছেন, তিনি হয়তো রটিয়ে দেবেন যে আমি দলের বিপক্ষে কাজ করছি। তাই আমি নিজের ক্ষোভ ভুলে আমাদের দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এলাকায় গিয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেছি। আমার এলাকার নেতাকর্মীদেরও স্পষ্ট বলে দিয়েছি যে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে হলে এবং ধানের শীষের সরকারকে ক্ষমতায় আনতে হলে নৌকার বা অন্য কোনো প্রতীকের বিপরীতে ধানের শীষকে জয়ী করার বিকল্প নেই। এভাবেই দলের বৃহত্তর স্বার্থে নিজের চাওয়াকে কোরবানি দিয়েছি।

এশিয়া পোস্ট: অতীতে আপনারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তর অভিযোগ তুলেছেন। এখন বিএনপি সরকারের আমলেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসছে। একজন রাজনৈতিক কর্মী ও সংসদ সদস্য হিসেবে বিষয়গুলো আপনাকে কতটা বিব্রত করে?

নিলোফার চৌধুরী মনি: অবশ্যই এসব অভিযোগ আমাদের ভীষণভাবে বিব্রত করে। তবে গণমাধ্যমে বা জনমুখে যা শোনা যায়, তার সবকিছুই শতভাগ সত্য নয়। আমাদের দেশের মানুষ বা মিডিয়া অনেক সময় তিলকে তাল বানিয়ে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে। আমরা তো মানুষ, আমরা কেউ ফেরেশতা বা শয়তান নই; আমাদের মন ভালো থাকলে ভালো কাজ করি, মন্দ থাকলে হয়তো ভুল হয়ে যায়। তবে আমি ঢালাওভাবে সব সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমকে দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু এ কথা সত্য যে, একজন রাজনৈতিক নেতা পচে গেলে একটি জাতি পচে যায়, আর একজন সাংবাদিক যদি হলুদ সাংবাদিকতা করেন বা পচে যান, তবে একটি পুরো দেশ ধ্বংস হয়ে যায়। আমি বলছি না যে চাঁদাবাজি বা অপকর্ম একদমই ঘটছে না, তবে যতটুকু প্রচার হচ্ছে তার মাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে বলা হচ্ছে।

এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের সময় দলীয়করণের বিরুদ্ধে আপনাদের তীব্র সমালোচনা ছিল। এখন ব্যাংক খাত ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বিএনপি-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বসানোর অভিযোগ উঠছে। এই অভিযোগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সময়কার দলীয়করণের পার্থক্য কোথায় দেখেন?

নিলোফার চৌধুরী মনি: বাংলাদেশ ব্যাংকের যে কর্মকর্তার কথা বলা হচ্ছে, তার কিন্তু বিএনপিতে কোনো সাংগঠনিক পদ-পদবি নেই। তিনি বিএনপি মনা বা আমাদের আদর্শের সমর্থক হতেই পারেন, কিন্তু সরাসরি দলীয় রাজনীতি করার সঙ্গে এর তফাত রয়েছে। তাছাড়া বিএনপি একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। দেশের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল বলা যায় না। এই ক্রান্তিকালে যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন মতাদর্শের বা অবিশ্বস্ত কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়, তবে রাষ্ট্রের ভালো হওয়ার চেয়ে মন্দের আশঙ্কাই বেশি থাকে।

তবে আওয়ামী লীগ যেভাবে নগ্নভাবে দলীয়করণ করেছিল, বিএনপি কিন্তু তা করছে না। আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যমন্ত্রী একদা পবিত্র কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ করিয়ে বলেছিলেন যে, টাকা খেয়ে হোক আর যেভাবে হোক, কেবল নিজেদের দলের লোককেই চাকরি দিতে হবে। বিএনপি এমনটি কখনো বলেনি। বিএনপি বলছে, তোমরা লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগ্যতা প্রমাণ করে আসো। যোগ্যতা থাকলে তবেই মূল্যায়ন করা হবে। যেমন সম্প্রতি এসএসসির ফলাফল দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে, অতীতের মতো পাশের হার জোর করে ৯৮ শতাংশ দেখানোর কোনো চেষ্টা করা হয়নি। একটি স্থবির রাষ্ট্রকে টেনে তুলতে যে সময়টুকু লাগে, বিএনপি এখন সেটিই করার চেষ্টা করছে।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্র-জনতার জুলাই আন্দোলনকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? এটা গণ-অভ্যুত্থান, বিপ্লব নাকি শুধুই সরকার পরিবর্তন? আর আন্দোলন চলাকালীন স্নাইপার ব্যবহার নিয়ে আপনার যে প্রশ্নটি ছিল, সেটির মূল বিষয়টি কী?

নিলোফার চৌধুরী মনি: আমার চোখে জুলাইয়ের ঘটনাটি ছিল একটি সফল গণ-অভ্যুত্থান। কারণ এখানে দেশের আপামর সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে এসেছিল। ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই সংগ্রাম পরবর্তীতে এক দফায় রূপ নেয়, যা আমাদের দলেরও দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। সবার দাবি যখন এক বিন্দুতে মিলে গেল, তখনই এই স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে। তবে এর জন্য অনেক তাজা প্রাণ ঝরে গেছে, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। আমি তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

আর স্নাইপারের বিষয়টি নিয়ে আমি মূলত টকশোতে আমার প্রতিপক্ষের কাছে একটি কৌতূহলবশত প্রশ্ন রেখেছিলাম, যা পরবর্তীতে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমি জানতে চেয়েছিলাম যে, ছাদ থেকে বা জানালা দিয়ে যেভাবে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শিশুদের হত্যা করা হয়েছে, তার নেপথ্যে কারা ছিল। এগুলো যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ছিল তা স্পষ্ট, কিন্তু এই সন্ত্রাসীদের তো একটি সুনির্দিষ্ট পরিচয় থাকে। তারা কি কেবলই আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী, নাকি পুলিশ-র‍্যাব, নাকি এর আড়ালে কোনো ঐশী বা বিদেশি চক্র জড়িত ছিল? এই সূক্ষ্ম পরিকল্পনাটির রহস্য উন্মোচন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

যে কোনো বড় যুদ্ধ বা বিপ্লবের পেছনে অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন থেকে যায় এবং সত্য অনুসন্ধানের স্বার্থেই আমাদের এই প্রশ্নগুলো করা উচিত। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা যে পাড়া-মহল্লায় তাণ্ডব চালিয়েছে এবং খুন করেছে, তা তো ওপেন সিক্রেট। কিন্তু এর পেছনে অন্য কোনো শক্তির ইন্ধন ছিল কি না, তা জানাটাই ছিল আমার কৌতূহলের মূল বিষয়।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা আপনার সহযোদ্ধা ছিলেন, আজ তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। এই পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছেন? নতুন দল এনসিপির রাজনীতিকে আপনার কেমন লাগছে?

নিলোফার চৌধুরী মনি: এটাই তো রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। একটি পরিবারে সন্তানরা যখন একসঙ্গে জরাজড়ি করে বড় হয়, তখন একরকম সম্পর্ক থাকে। কিন্তু বাবা-মার মৃত্যুর পর যখন জমিজমার ভাগবাটোয়ারা হয়, তখন তাদের সম্পর্ক বদলে যায়, অনেকে একে অপরের মুখ দেখাও বন্ধ করে দেয়। রাজনীতিতেও এখন তারা বিরোধী পক্ষ আর আমরা সরকারি দল; তারা আমাদের কাজের চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে, প্রশ্ন তুলবে বা চাপ প্রয়োগ করবে, এটাই স্বাভাবিক এবং এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

তরুণদের দল এনসিপি নিয়ে ২০২৪ সালে আমাদের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। আমরা ভেবেছিলাম, আমাদের প্রজন্ম যা করতে পারেনি, এই তরুণরা তা করে দেখাবে। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, আমাদের সেই প্রত্যাশা যেন কিছুটা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তবে তারা তো আমাদেরই সন্তান। আমরা যদি নিজেরা ভালো উদাহরণ তৈরি করতে না পারি, তবে তারা কীভাবে এত ভালো কাজ করবে? তাছাড়া আমাদের মতো তাদের কোনো পারিবারিক বা জীবিকার পিছুটান ছিল না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা তাদের নৈতিকতার স্খলন ঘটিয়েছে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন শাহাদাত বরণ করেন, তখন তার সম্পত্তি হিসেবে কেবল একটি ভাঙা সুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি পাওয়া গিয়েছিল। এই সততাই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা এই তরুণদের কাছেও তেমন সততা আশা করেছিলাম। তবে আমি সবসময় চাই দেশে তিন-চারটি শক্তিশালী দল থাকুক, যাতে ফ্যাসিবাদের শূন্যস্থানে একটি কার্যকর বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং সাধারণ মানুষ তাদের ইচ্ছেমতো যোগ্য প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়। এনসিপির ইতিবাচক দিক হলো তারা রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে এবং কিছু সংস্কারের কথা বলছে, যা ভালো লেগেছে। কিন্তু যখনই দেখি তারা আবার অনৈতিকভাবে বা অন্য কোনো স্বার্থে আপস করছে বা জামায়াতের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের দ্বিমুখী নীতি প্রকাশ পাচ্ছে, তখন সত্যিই মন খারাপ হয়।

এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে জামায়াত ও এনসিপির সমালোচনা যতটা করছেন, আওয়ামী লীগের সমালোচনা তুলনামূলক কম। রাজনৈতিকভাবে আপনাদের প্রধান প্রতিপক্ষ এখন আসলে কারা?

নিলোফার চৌধুরী মনি: আওয়ামী লীগ যখন মাঠে ছিল, তখন আমরা এবং তারা একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করেছি। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ মাঠে নেই, তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। যারা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়, তাদের কাপুরুষতা নিয়ে অকারণে কথা বলা আমি পছন্দ করি না। আওয়ামী লীগ সাড়ে ১৫ বছর ধরে সংসদে আমাদের অনুপস্থিতিতে কেবল আমাদের গালিগালাজ করে গেছে, যা অত্যন্ত সস্তা রাজনীতি ছিল। আমি সেই নোংরা পথ অনুসরণ করতে চাই না।

আওয়ামী লীগকে আমরা ছেড়ে দিইনি। তাদের রাজনীতি এখন বিচারাধীন এবং স্থগিত রয়েছে। তারা মাঠে ফিরলে এবং আইনগতভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেলে আমরা আবারও তাদের রাজপথে মোকাবেলা করব। কিন্তু বর্তমানে যারা মাঠে সক্রিয় আছে, যেমন জামায়াত ও এনসিপি, রাজনৈতিক আলোচনা বা সমালোচনা তো তাদের নিয়েই হবে। অনুপস্থিত কোনো শক্তিকে নিয়ে অকারণে রাজনীতি গরম করার চেয়ে যারা রাজপথে সক্রিয়, তাদের নিয়ে কথা বলাটাই যুক্তিযুক্ত।

এশিয়া পোস্ট: দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। আওয়ামী লীগের পতনের পর বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের অবসান হয়েছে বলে মনে করেন কি? আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

নিলোফার চৌধুরী মনি: ফ্যাসিবাদের মেন্টালিটি বা মানসিকতা মানুষের মন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা অত্যন্ত কঠিন। মানুষ সুযোগ পেলেই অন্যের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। অনেকেই এখন রং বদলেছে, কিন্তু তাদের ভেতরের ফ্যাসিবাদী মনোভাব একই রয়ে গেছে। তাই সুযোগ পাওয়ার পরও যদি কেউ সেই ক্ষমতার অপব্যবহার না করে, তবেই বলা যাবে ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটেছে।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার প্রশ্নে বলব, আমি আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। বিচার বিভাগই সিদ্ধান্ত নেবে তারা রাজনীতি করতে পারবে কি না। বিচার বিভাগ যদি তথ্য-প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে, তবে সেটি তাদের এখতিয়ার। আবার যদি শর্তসাপেক্ষে বা শর্তহীনভাবে তাদের কাজের সুযোগ দেয়, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, ‘পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়’। আওয়ামী লীগের যে সমস্ত ব্যক্তিবর্গ অপরাধ করেছেন, অত্যাচার করেছেন, আমি তাদের অপছন্দ করি; কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তো একটি নাম মাত্র। তাদের ভালো কর্মকাণ্ড থাকলে এবং বিচার বিভাগ অনুমতি দিলে আমাদের কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।

এশিয়া পোস্ট: বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন? বিশেষ করে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ কতটা কার্যকর বলে মনে করছেন?

নিলোফার চৌধুরী মনি: আলহামদুলিল্লাহ, সামগ্রিকভাবে মূল্যায়নে আমি বলব যে, অতীতের সরকারগুলোর রেখে যাওয়া পর্বতসম সমস্যার পাহাড় এবং বৈশ্বিক নানা দুর্যোগের মধ্যেও বিএনপি দেশের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। যেমন, হামের টিকার তীব্র সংকটের যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটির জন্য কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার দায়ী নয়। বিগত কয়েক বছর ধরে এই টিকা কেনা হয়নি, যার ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সময়ে এই টিকা কেনেনি। ফলে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর যখন এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটছে, তখন পূর্ববর্তী অব্যবস্থাপনার ফল এ দেশের মানুষ ভোগ করছে। তবুও বর্তমান সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে।

আর বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের যে সমস্যা, সেটি সম্পূর্ণ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস সরবরাহের মূল কেন্দ্র কাতারের ওপর হামলার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। কাতারের একটি বড় গ্যাস প্ল্যান্ট অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বিশ্বের ১৭ থেকে ২০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করত। এছাড়া আমাদের দেশেও দুটি প্রধান গ্যাস কারখানার একটি আগুনে পুড়ে গেছে। এগুলো সবই প্রাকৃতিক বা বৈশ্বিক বিপর্যয়, যেখানে সরকারের হাত থাকে না।

আমরা বিরোধী দলে থাকাকালীন এক ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের জন্যও আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করতাম, সেটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার কুইক রেন্টালের নামে এবং আদানির সাথে এমন অসম চুক্তি করেছিল যে, তারা বিদ্যুৎ না দিলেও আমাদের কোটি কোটি টাকা জরিমানা গুনতে হতো। তারা বলেছিল ২৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করে তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ, অথচ বাস্তব চিত্র আজ সবার সামনে উন্মোচন হয়েছে। বিএনপি চাইলে জনগণের টাকা অপচয় করে ভারত থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ এনে কালকেই লোডশেডিং দূর করতে পারত। কিন্তু আমরা চাই এ দেশের টাকা এ দেশেই থাকুক।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দেশের সোলার বা সৌরবিদ্যুৎ খাতের ওপর ব্যাপক জোর দিয়েছেন। আশা করা যায় আগামী এক-দেড় বছরের মধ্যে সোলার প্ল্যান্টগুলো চালু হলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে। তাছাড়া সরকারের সস্তায় বা কম খরচে বেশি ভালো কাজ করার চিন্তা রয়েছে এবং প্রয়োজনে টিআর-কাবিখার অর্থ দরিদ্র মানুষের বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে টেনে তুলতে সময় তো একটু দিতেই হবে। বৈশ্বিক ও প্রাকৃতিক নানা বিপত্তি না থাকলে বিএনপির গত ছয় মাসের কাজের গতি আরও মসৃণ ও দৃশ্যমান হতো।

এশিয়া পোস্ট: একজন নারী রাজনীতিবিদ হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান ও তাদের প্রতি মূল্যায়নকে কীভাবে দেখেন?

নিলোফার চৌধুরী মনি: নারীরা হলো জন্মগতভাবেই একেকজন যোদ্ধা। সন্তান জন্ম দেওয়া থেকে শুরু করে সংসার পরিচালনা এবং সন্তানদের উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিটি ধাপেই নারীদের প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়। ইসলাম ধর্ম নারীদের সবচেয়ে বেশি মর্যাদা ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করেছে। আমাদের সমাজ ও সরকারের উচিত সব ক্ষেত্রে নারীদের প্রকৃত সম্মান দেওয়া, কারণ যে জাতি নারীকে সম্মান দিতে জানে না, তারা কখনো বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।

কিন্তু আমাদের দেশের একটি নোংরা সংস্কৃতি হলো, কোনো নারী যোগ্যতার জোরে ভালো কোনো পদে অধিষ্ঠিত হলে, তাঁর মেধা বা যোগ্যতার চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে কুৎসিত আক্রমণ করা শুরু হয়। সম্প্রতি একজন নারী গণমাধ্যমকর্মী একটি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর পর যেভাবে তাঁর চরিত্র হরণ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও ন্যাক্কারজনক। যারা চান না নারীরা রাজনীতি বা সমাজে এগিয়ে যাক, তারাই এই চরিত্র হরণের নোংরা খেলায় মেতে ওঠে, যাতে সাধারণ মানুষ ও সমাজ তাঁর মূল কাজ বা যোগ্যতা ভুলে এই অপপ্রচারে লিপ্ত থাকে। প্রত্যেকটি মানুষের একটি ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং রাজনৈতিক জীবন থাকে। অথচ কোনো সত্যতা বা প্রমাণ ছাড়াই অমীমাংসিত কিছু বিষয় নিয়ে যেভাবে নারীর ওপর কালিমা লেপন করা হয়, তা তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রথম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

আমাকে আজ পরিণত বয়সে এসে যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুৎসিত গালিগালাজ শুনতে হয়, এই গালি যদি আমাকে আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে শুনতে হতো, তবে হয়তো আমার রাজনীতি করা আর হতো না। একজন পরিণত মানুষের মনে গালি যেভাবে লাগে, কম বয়সী একটি মেয়ের মনে তার চেয়ে শতগুণ বেশি আঘাত করে। তাই সমালোচনা যদি করতেই হয়, তবে যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে সমালোচনা করুন, অযৌক্তিক ও কুৎসিত চরিত্র হরণ বন্ধ হওয়া উচিত।

এশিয়া পোস্ট: বিএনপিতে নারীরা সক্রিয় রাজনীতির সুযোগ পেলেও সাংগঠনিক পদ ও নির্বাচনী মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীদের কতটা মূল্যায়ন করা হয়?

নিলোফার চৌধুরী মনি: বিএনপিতে নারীদের সক্রিয় রাজনীতি করার সুযোগ অবারিত এবং দলে নারীরা অত্যন্ত সম্মানিত। তবে সাংগঠনিক পদবী বণ্টন এবং নির্বাচনের সময় দলীয় মনোনয়নের (নমিনেশন) ক্ষেত্রে এখনো নারীদের অবহেলার একটি অদৃশ্য দেয়াল রয়ে গেছে। বিএনপি যদি এই বৈষম্যটি দূর করতে পারে, তবে বিশ্বের আধুনিক রাজনৈতিক দলগুলোর কাতারে বিএনপি অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।

এই প্রতিবন্ধকতা আসলে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ফল। দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের প্রত্যেক নেতাই দিনশেষে একেকজন পুরুষ এবং এই মানসিকতা পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যের অবর্তমানে তাঁর ঘরে পুত্রসন্তান না থাকলে তবেই কেবল বাড়ির নারী সদস্যটিকে সামনে এনে বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের মতো যারা বড় কোনো মন্ত্রী বা এমপির সন্তান নন, তারা শত মেধা ও ত্যাগ স্বীকার করেও সেই শীর্ষস্থানগুলোতে পৌঁছাতে পারেন না।

এশিয়া পোস্ট: রাজনীতির বাইরে নিজেকে কোন পরিচয়ে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

নিলোফার চৌধুরী মনি: আমি রাজনীতির বাইরে একজন গর্বিত মা এবং আমার বাবা-মার একজন বাধ্যগত সন্তান হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এলাকায় বা পরিবারে যখন মানুষ আমাকে ভালো মনের মানুষ হিসেবে প্রশংসা করে, তা শুনতেই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। আমার সহকর্মীদের অনেকেই আমাকে ‘পলিটিক্যালি ফুলিশ’ বা রাজনৈতিকভাবে বোকা মনে করেন, যা আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ উপভোগ করি। কারণ আমি সবসময় মূল বা বেসিক বিষয় নিয়ে সৎভাবে কাজ করতে চাই। যদিও বর্তমান সময়ে সৎ ও সাধারণ কর্মীদের চেয়ে চাটুকার বা বাঁকা পথে চলা ব্যক্তিরাই তরতর করে উপরে উঠে যায়, যা আমি নীরবে পর্যবেক্ষণ করি এবং নিয়তির ওপর ছেড়ে দিই।

এশিয়া পোস্ট: রাজনীতির এত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আগামী দিনের নিলোফার চৌধুরী মনিকে আপনি কোথায় দেখতে চান?

নিলোফার চৌধুরী মনি: আমার একটাই পরিকল্পনা, আমি এ দেশের সাধারণ মানুষের জন্য, বিশেষ করে বঞ্চিত নারীদের অধিকারের জন্য কাজ করতে চাই। আমরা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত জীবনে যে সমস্ত বাধা ও কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের নারীরা যেন এমন সংকটে আর না পড়ে, সেই নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই। একই সাথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সবসময় জারি রাখতে চাই, যেখানে নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ থাকবে না।

এশিয়া পোস্ট: এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।

নিলোফার চৌধুরী মনি: আপনাকে এবং আপনার দর্শকদেরও অনেক ধন্যবাদ।