Advertisement

‘তারেক রহমান যা বলছেন, তা করে দেখাচ্ছেন’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘তারেক রহমান যা বলছেন, তা করে দেখাচ্ছেন’
ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন। ছিলেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সহসাংগঠনিক সম্পাদক এবং বর্তমানে ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য। সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসেছিলেন এশিয়া পোস্টের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান আলাপনে। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নেত্রীর রাজনীতির দীর্ঘ পথচলা, সংসদে তার ভূমিকা এবং আগামী দিনের রাজনীতি নিয়ে তার ভাবনা জানিয়েছেন। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর

Advertisement

এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আগে আপনি রাজনীতি করেছেন, এখনও করছেন। এই দুই সময়ের পার্থক্য কেমন দেখছেন?

নাদিয়া পাঠান পাপন: আসলে দুটো ফিল্টার দুই রকম এবং অভিজ্ঞতাও দুই রকম। একটির অভিজ্ঞতা নেওয়া হয়েছে দীর্ঘ বছর ধরে, আর অন্যটির যাত্রা কেবলমাত্র শুরু। তো ভিন্নতা তো থাকবেই এবং তার মধ্য দিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, তার মধ্য দিয়েই চলতে হবে।

এশিয়া পোস্ট: আপনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে উঠে এসেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীদের জন্য রাজনীতি সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। আপনার রাজনৈতিক যাত্রার শুরুর সেই সংগ্রামটা কেমন ছিল?

নাদিয়া পাঠান পাপন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি আসলে সংস্কৃতির মাটি। আপনারা জানেন, ওখান থেকে অনেক বরেণ্য ব্যক্তিরা উঠে এসেছেন। বিখ্যাত মানুষদের ভিড়ে অসংখ্য নারীরাও ছিলেন। সংসদ সদস্যের কথা যদি বলেন, সেখান থেকেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে অনেক নারী নেতৃত্ব উঠে এসেছে। তো ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে উঠে আসায় আমার তেমন কোনো ভিন্নতা নেই। তবে হ্যাঁ, নারীরা যে কোনো পরিবেশে খুব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। সেই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে একটা লক্ষ্যে পৌঁছানো খুব ডিফিকাল্ট থাকে। এই যাত্রাটা খুব একটা মসৃণ হয় না। এটি একটি কঠিন পথ, সেই পথ পাড়ি দিয়েই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়। তো সেই জায়গা থেকে আসলে অন্যান্য নারীর মতো আমারও একটা স্ট্রাগল ছিল। আমার একটি দীর্ঘ এবং কঠিন যাত্রা ছিল। সেই যাত্রার পরিসমাপ্তি একটা জায়গা পর্যন্ত হয়েছে, যেখান থেকে এখন আবার নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: একদম শুরুর গল্পটা জানতে চাই। আপনি রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা পেলেন কীভাবে?

নাদিয়া পাঠান পাপন: রাজনীতিতে আসার ক্ষেত্রে প্রথমত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আমার খুব পছন্দ ছিল। উনার ড্রেসআপ, স্টাইল সবকিছু আমার খুব ভালো লাগতো। এটা আমি একদম অনেস্টলি বলছি। মানুষ কথায় বলে না—প্রথমে দর্শনধারী তারপরে গুণবিচারী। তো ম্যাডামকে ছোটবেলা থেকে আমার খুব ভালো লাগতো, উনার মধ্যে একটা মা-মা অবয়ব পেতাম। আমার মা ছোটবেলায় খুব বড় সানগ্লাস পরতেন, তো ম্যাডামকেও আমি সবসময় এভাবেই দেখতাম। ওনাকে আমার খুব ভালো লাগতো। কিন্তু যখন উনার সম্পর্কে জানা শুরু করলাম এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শকে জানা শুরু করলাম, তখন ভেতর থেকে এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ কাজ করতে লাগল এবং ভালোবাসতে বাসতে জড়িয়ে গেলাম। ইউনিয়ন পর্যায়ে যখন প্রোগ্রাম হতো, বড় ভাইরা তখন বিভিন্ন প্রোগ্রামে ইনভাইট করতেন এবং আমি যেতাম। এরপর ২০০৩ সালে যখন আমি ঢাকায় আসি এবং বদরুন্নেসা কলেজে অর্থনীতিতে ভর্তি হই, তখন আমি কালচারাল অঙ্গনের মেয়ে হিসেবে খুব ভালো নাচতে পারতাম, গাইতে পারতাম এবং অভিনয় করতে পারতাম। অল্পদিনেই ক্যাম্পাসে আমার একটা পরিচিতি হয়ে গেল। তখন আমাদের বিএনপি সরকার ছিল এবং দল থেকে বিভিন্ন প্রস্তাব আসতে লাগল রাজনীতি করার জন্য।

এশিয়া পোস্ট: অন্য কোনো দল থেকেও কি প্রস্তাব ছিল? ছাত্রদলকেই কেন বেছে নিলেন?

নাদিয়া পাঠান পাপন: দল থেকেও প্রস্তাব আসছিল, লীগ থেকেও আসছিল। কিন্তু কেন যেন আমি ছোটবেলা থেকেই ম্যাডামকে পছন্দ করতাম। এর আগেও আমি এলাকায় ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। তো বরাবরই দলের প্রতি আমার একটা টান ছিল। ওই সময়টায় দেখা গেল যে আমাদের বিভিন্ন কর্মসূচি হতো। ছাত্রলীগের যারা আপু ছিলেন, তখন তো আর এগুলো বুঝতাম না যে বিক্ষোভ মিছিল করে তারা আসছে। প্রায় সময়ই দেখতাম তারা খুব উগ্র মেজাজে হলে বা ক্যাম্পাসে আসতেন। তখন ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ছিল, উনারাও ছিলেন আমরাও ছিলাম। আমার আসলে উনাদের চলাফেরা বা আচরণ কিছুই ভালো লাগত না। অন্যদিকে বিএনপির যারা আপুরা ছিলেন, তারা আমাকে খুব ভালোবাসতেন ও আদর করতেন। বেগম জিয়াকে আমার ভালো লাগত এবং জিয়াউর রহমানকে ভালো লাগত। তো আমার অন্য কোনো জায়গায় যাওয়ার সুযোগ বা ইচ্ছা কোনোটিই ছিল না। আর সত্যি বলতে রাজনীতি করব এটা কখনো ভাবিনি। কিন্তু যখন আপুরা আমাকে বললেন যে, এই সময়ে তুমি দায়িত্ব নিলে ভালো করবে এবং তোমার ক্যাম্পাসে যে পরিচিতি আছে তাতে আমাদের নতুন ছাত্রনেত্রীদের আনার একটা সুযোগ তৈরি হবে, তখন আমি রাজি হলাম। ওখান থেকে আসলে অল্পদিনের মধ্যে পলিটিক্যাল জায়গাটাতে আমি খুব তাড়াতাড়ি মিশে গেলাম।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলে আপনার শুরুর গল্প জানতে চাই।

নাদিয়া পাঠান পাপন: আমাকে যে কোনো দায়িত্ব দিলে আমি পালন করতাম। আমাদের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফাতেহা পারভিন লোপা এখন লন্ডনে আছেন। উনাকে দেখতাম পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। রুমে একটা রুলস ছিল যে ফজরের সময় সবাইকে উঠতে হবে। এটা আসলে কোনো প্রেশার ছিল না, তবে নামাজ পড়ার জন্য সবাইকে উঠতে হতো। প্রথম প্রথম খুব বিরক্ত লাগত যে, প্রতিদিন এভাবে কেন ডাকে। মুসলিম পরিবার হলেও সবাই যে খুব নামাজি হবে বিষয়টি তা না। অনেক সময় মনে হতো আজ ভালো লাগছে না, উঠব না। কিন্তু একটা সময় এমন হলো যে, যখন দেখা যেত রুমের আটজনই এক সারিতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে, তখন ভেতর থেকেই চলে আসতো যে আমি কেন পড়ব না। আস্তে আস্তে উনার সবকিছুই ভালো লাগা শুরু করল। সেই ভালো লাগা থেকেই আমার মনে হলো যে পলিটিক্যাল মানুষজন মনে হয় এমনই হয়। তখন থেকেই আমি প্রোগ্রামগুলোতে যোগ দিতাম, মধুর ক্যান্টিনে যেতাম এবং রাজপথের মিছিল-মিটিংয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতাম।

এশিয়া পোস্ট: রাজনীতি করতে এসে পরিবার থেকে কোনো বাধা পেয়েছেন? ২০০৬ সালের সেই মামলার ঘটনাটি জানতে চাই।

নাদিয়া পাঠান পাপন: ২০০৬ সালে যখন আমার নামে মামলা হয়, তখন প্রায় ১১টি পত্রিকায় সেটি লিড নিউজ হয়েছিল। ক্যাম্পাসে যা ঘটেছিল তা অনেক বাড়িয়ে লেখা হয়েছিল। আমার মা ফোন করলেন। মা নিজেও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং পরিবারের আরও অনেকে রাজনীতি করেন। মা বললেন, ‘তোমাকে তো পড়ালেখা করতে পাঠিয়েছি। পত্রিকার হেডলাইন হওয়া ভালো, কিন্তু সেটা যেন গৌরবের হয়। তুমি পরিবারের মানসম্মান নষ্ট করছো।’ মা আমাকে দল করতে কখনো বাধা দেননি, আমার আব্বা মারা গেছেন ৯৮ সালে, তাই পরিবারের সব দায়িত্ব ছিল মায়ের কাঁধে। মা যদি চাইতেন যে রাজনীতি করতে দেবেন না, তবে আমার করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু মা কষ্ট পেয়েছিলেন পত্রিকার ওই লেখালেখিতে। ২০০৬ সালের মামলা, তা-ও গ্রামে আমার দাদাকে মানুষ অনেক সম্মান করেন, বাবা ও পরিবার যথেষ্ট পরিচিত। এটা আমার মা ভালোভাবে নিতে পারছিলেন না। সে বছর মামলার কারণে আমি বাড়িতে ঈদ করতেও যেতে পারিনি।

এশিয়া পোস্ট: সেই কঠিন সময়ে কি মনে হয়েছিল যে রাজনীতিতে আসা ভুল ছিল? মানসিক চাপ সামলেছেন কীভাবে?

নাদিয়া পাঠান পাপন: আমার কখনো মনে হয়নি যে আমি ভুল করেছি। লাইফে সব ডিসিশন আমি খুব ভেবেচিন্তে নিয়েছি। তবে ওই সময়টা এক মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম। হোস্টেলে যখন ছিলাম, দেখা যেত কোনো কারণ ছাড়াই গায়ে পড়ে কিছু মেয়ে ঝামেলা করার চেষ্টা করত। রুমে ঘুমাচ্ছি, হঠাৎ রুমের সামনে এসে স্লোগান দেওয়া শুরু করত। এটা ছিল একটা মেন্টাল স্ট্রেস। আবার পরিবার থেকে দেখা যাচ্ছে যে, আমার নাম্বার নিয়ে মায়ের কাছে যাচ্ছেতাই গল্প বানিয়ে বলা শুরু করে দিল যে আপনার মেয়ে এই করছে, সেই করছে। আমি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছিলাম, বিপর্যস্ত ছিলাম। ওই সময়ে মানুষ স্ট্রেস নিতে না পেরে সুইসাইডও করে ফেলে। কিন্তু আমি তখন শুধু নামাজ পড়তাম আর আল্লাহর কাছে দোয়া চাইতাম যেন তিনি আমাকে পথ দেখান। ২০০৬-০৭ সালের মামলার চাপ ২০০৮ সালে সরকার পরিবর্তনের পর পুরোদমে শুরু হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সাহারা খাতুন ছিলেন, মা আমাকে বারবার হাজিরা দিতে দেখে বললেন যে, তোমাকে নিয়ে যাব, তুমি শুধু উনাকে গিয়ে সরি বলবা, তাহলে নাম কেটে দেবে। কিন্তু আমার খুব ইগোতে লাগল। আমি বললাম, ‘আমি তো ভুল করিনি, সরি বলব কেন?’ আমি ২০১৩ সাল পর্যন্ত ওই মামলার হাজিরা দিয়েছি, কিন্তু সরি বলিনি। কারণ, আমি জানতাম আমি ভুল করিনি।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলের জন্য আপনার যে দীর্ঘ ত্যাগ, তার মূল্যায়ন আপনি যথাযথ পেয়েছেন?

নাদিয়া পাঠান পাপন: ছাত্রদল আমার কাছে আবেগের জায়গা। আমি সবসময় বলি যে ছাত্রদল আমার কাছে দেবদাস আর আমি তার পার্বতী। আমাকে যদি দলের কোনো বড় পদেও নেওয়া হয়, ছাত্রদলের প্রতি আমার আবেগ ও ভালোবাসা কোনোভাবেই কমবে না। ২০০৬ সালের পর সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছিল, কিন্তু আমাদের ১১ জনের নামে মামলা চলমান ছিল। পুরোটা সময় আমি জুনিয়র ছাত্রীদের নিয়ে পথ চলেছি। বড় বোনদের সাপোর্ট বা আশীর্বাদের হাত আমি পাচ্ছিলাম না, আমি একা একাই এই যাত্রা করেছি। তখন সবাই বলল যে তুমি সেক্রেটারি ছিলে, এবার প্রেসিডেন্টের জন্য ট্রাই করো। তখন থেকে আমি প্রার্থী হলাম। কিন্তু প্যানেল করার সময় আমাকে বলা হতো যে আমার তো সেক্রেটারি ক্যান্ডিডেট নেই। আমি বলতাম সবই তো আমাদের এখান থেকেই আসবে। আসলে আমার শক্তি ছিল ঐক্য। হল থেকে যাদের বের করে দেওয়া হয়েছিল, আমি দুটা ফ্ল্যাট মর্গেজ নিয়ে তাদের থাকার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিলাম যাতে তারা রাজনীতি করতে পারে। আমি কখনো চাইনি আমার অনুসারীরা কোনো ঝড়ের মধ্যে পড়ুক, সবসময় তাদের আগলে রেখেছি।

এশিয়া পোস্ট: আপনি সভাপতি প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন পদটি পেলেন না?

নাদিয়া পাঠান পাপন: আমি সভাপতি প্রার্থী ছিলাম, আমাকে বদরুন্নেসার সম্রাজ্ঞী বলা হতো। আমি বলেছিলাম আমাকে এক দিনের জন্য সভাপতি হতে দেন, অগ্রিম পদত্যাগপত্র জমা রাখেন, তা-ও পদটি দেন। কিন্তু কেন দেওয়া হয়নি তার উত্তর আমার কাছে নেই। আমাকে অজুহাত দেখানো হলো যে আমি বিবাহিত। অথচ আমি যখন স্টুডেন্ট ছিলাম এবং ক্যান্ডিডেট ছিলাম, তখনও দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত যখন কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচন হলো, আমি প্রার্থী হলাম এবং ব্যাপক সাড়া পড়ল। তখন হঠাৎ বলা হলো মেয়েরা ক্যান্ডিডেট হতে পারবে না, স্পেশালি যারা বিবাহিত। অথচ মনোনয়ন ফর্ম কেনার সময় এই কথা বলা হয়নি। পরে সিদ্ধান্ত হলো বিবাহিতরা সুপার টুতে থাকবে না, সুপার ফাইভে থাকবে। কিন্তু ৬০ জনের কমিটির কোথাও আমার নাম ছিল না। অথচ সেই কমিটিতে ১৬-১৭ জন বিবাহিত ছেলে ছিল। এটা সাংঘর্ষিক ছিল। তখন আমি মধুর ক্যান্টিনে এভিডেন্সসহ সংবাদ সম্মেলন করলাম এবং এরপর আমাকে বহিষ্কার করা হলো।

এশিয়া পোস্ট: নিজ দলের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে বহিষ্কার হওয়াটা কি প্রত্যাশিত ছিল? এরপর কী ঘটেছিল?

নাদিয়া পাঠান পাপন: আমি জানতাম যে বহিষ্কার হবো না। কারণ, দলের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল এবং আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে তারেক রহমানের সঙ্গে বসিয়ে দেওয়া হবে। এক রোববার দুপুরে আমাকে ফোন দিয়ে জানানো হলো আমি বহিষ্কার। বলা হলো ক্যাম্পাসে কোনো এক অপ্রীতিকর ঘটনার নেতৃত্বে আমি ছিলাম, অথচ আমি তখন বাসায় রান্না করছিলাম। আসলে অন্য একটি গ্রুপ আমাদের ফাঁসানোর প্ল্যান করেছিল। পরে যখন আমি যৌক্তিকভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরলাম, তখন পার্টি থেকে বলা হলো যে মেয়েদের ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল হবে। আমার ওই আন্দোলনের পরেই কিন্তু বিবাহিত মেয়েদের রাজনীতিতে আসার পথ সুগম হলো এবং সব বিবাহিত মেয়েরা কমিটিতে ঢুকল। কিন্তু আমি আটকে গেলাম। কারণ, যে কমিটির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলাম তারা আমাকে আর নেয়নি।

এশিয়া পোস্ট: ছাত্রদলে আপনার সবচেয়ে বড় তৃপ্তির জায়গা এবং আক্ষেপের জায়গা কোনটি?

নাদিয়া পাঠান পাপন: তৃপ্তির জায়গা হচ্ছে সবচেয়ে দুঃসময়ে এবং কঠিন চ্যালেঞ্জিং সময়ে দলের পাশে থেকে জনগণের দাবি আদায়ের আন্দোলনে নিজেকে সক্রিয় রাখতে পেরেছি। বিরোধী দলে থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার যে সাহস ও নেতৃত্ব দেওয়ার মানসিকতা দেখাতে পেরেছি, সেটা আমার বড় অর্জন। আর আক্ষেপ বা কষ্টের জায়গা হলো—যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আমাকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ওই সময় যদি আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হতো, তবে ছাত্রদলের নারী নেতৃত্বে একটা আমূল পরিবর্তন আনতে পারতাম। কর্মী তৈরি করা এবং ক্রাইসিস মোমেন্টে পাশে থাকা আমি আলহাজ রফিকুল আলম মজু ভাই এবং হাবিবুর রশিদ হাবিব ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছি। ওই সময় দায়িত্ব পেলে নারী নেতৃত্বের সংকট থাকত না।

এশিয়া পোস্ট: দলের শীর্ষ নেতৃত্বে নারীদের কম দেখা যাওয়ার কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

নাদিয়া পাঠান পাপন: আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এখনও নারীর পেছনে রাজনীতি করার মানসিকতা তৈরি হয়নি। নারীদের একটা জায়গায় ফিক্সড করে দেওয়া হয়—যেমন মহিলা দল। আমি যদি কলেজে লিড দিয়ে আসি, তবে আমি কেন যুবদল বা স্বেচ্ছাসেবক দলে থাকতে পারব না? প্রধান পদে আসতে বাধা হলো সেই পুরোনো মানসিকতা এবং কাঁধের ওপর বড় কোনো নেতার হাতের অভাব। সমাজ এখনও একজন নারীর নেতৃত্ব সহজভাবে নেয় না। এমনকি হিলারি ক্লিন্টনের মতো জনপ্রিয় নেত্রীও আমেরিকায় কেন প্রেসিডেন্ট হতে পারছেন না, সেই প্রশ্নও থেকে যায়। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।

এশিয়া পোস্ট: আপনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ কোনো স্মৃতি শুনতে চাই, যা আপনাকে এখনও নাড়া দেয়?

নাদিয়া পাঠান পাপন: অনেক খারাপ সময় গেছে। ২০১৩-১৪ সাল খুব ভয়াবহ ছিল। ২০১৮ সালে ম্যাডামের গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের লাঠিচার্জের শিকার হয়েছি। বাসায় ছোট ছোট দুই বাচ্চাকে কাজের মেয়ের কাছে রেখে রাজপথে যেতাম। এক দিন এক ভাবি ফোন করে জানালেন আমার বাসার দরজা খোলা এবং বাচ্চারা সিঁড়িতে কান্নাকাটি করছে। কাজের মেয়েটি জিনিসপত্র চুরি করে ওদের একা ফেলে চলে গিয়েছিল। আমার মেয়ে আমার ছেলের পা ধরে গ্রিলের ফাঁকা দিয়ে বসে ছিল, পড়ে গেলে ভয়াবহ অবস্থা হতো। আমি তখন ম্যাডামের হাজিরায় ব্যারিকেড ভাঙছিলাম। খবর শুনেও ম্যাডামকে বিদায় দিয়ে তারপর বাসায় গিয়েছি। এ ছাড়া ২৮ অক্টোবর এবং ৭ ডিসেম্বরের ঘটনাগুলো ছিল বিভীষিকাময়। ২৮ অক্টোবর পল্টনে টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল সবকিছু, স্যান্ডেল ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছিল না। পা ধরে ছোট ভাইয়েরা নামতে বলছিল, কিন্তু আমি স্টেজ ছাড়িনি। মনে হয়েছিল আজকে মারা যাব।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আপনার ভূমিকা এবং অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কিছু বলুন।

নাদিয়া পাঠান পাপন: জুলাই আন্দোলন ১৭ বছরের জমানো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ১৭ জুলাই বদরুন্নেসা কলেজের মেয়েদের তালা মেরে আটকে রাখা হয়েছিল, আমি ভাইদের নিয়ে সেই তালা ভেঙে মেয়েদের মুক্ত করি। ১৯ জুলাই রিজভী ভাই গ্রেপ্তার হলেন, আমরা কাকরাইল মোড়ে গোলাগুলির মধ্যে ছিলাম। আমি নিজেও রাবার বুলেটে আহত হয়েছিলাম। ঢাকা মেডিকেলের চিত্র ছিল সবচেয়ে মর্মান্তিক। মর্গে জায়গা না পেয়ে লাশের সারি ইমারজেন্সি গেটের সামনে রাখা ছিল। সেই ছবি তুলতে গিয়ে আমি হেনস্তার শিকার হয়েছি। ফ্যাসিজম তখনও চারপাশে ছড়িয়ে ছিল। সেই রক্তাক্ত দৃশ্যগুলো ভুলতে পারছি না।

এশিয়া পোস্ট: এই আন্দোলনে সাধারণ নারীদের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

নাদিয়া পাঠান পাপন: নারীদের ভূমিকা ছোট করে দেখার কিছু নেই। শামসুন্নাহার বা রোকেয়া হলের সেই বিদ্রোহী স্লোগান পুরো বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সম্মুখসারিতে আমরাও ছিলাম। সাধারণ নারীরা আমাদের খাবার খাইয়েছে, পানি দিয়েছে। তিনতলা-চারতলা থেকে তারা আমাদের জন্য পুরোনো খাতা-কাগজ ফেলেছে যেন আমরা টিয়ার গ্যাস থেকে বাঁচতে আগুন জ্বালাতে পারি। তৃণমূলের নারীরাও নিজেদের ভোট দেওয়ার অধিকার রক্ষায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে এসেছে। এটি ছিল এক ধরনের নৈতিক যুদ্ধ।

এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের পরবর্তী অবস্থা এবং বর্তমান সরকার নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

নাদিয়া পাঠান পাপন: আলহামদুলিল্লাহ, আমি আশাবাদী। ১৭ বছরের যে জট, তা দুই-চার মাসে খোলা সম্ভব নয়। তবে আড়াই মাসের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য উদ্যোগ বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন যা দেখছি, তা ইতিবাচক। তারেক রহমান যা বলছেন, তা তিনি করে দেখাচ্ছেন। আমরা চাই একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে এবং সেখানে বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা আমরা প্রত্যাশা করি। রাজনীতির জন্য শুধুমাত্র সমালোচনা না করে সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবার ভূমিকা থাকা উচিত।

এশিয়া পোস্ট: রাজনৈতিক তিক্ততা বা কাদা-ছোড়াছুড়ি বন্ধ হওয়া নিয়ে আপনার মতামত কী?

নাদিয়া পাঠান পাপন: শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছে এবং আমরা লাল-সবুজ পতাকা পেয়েছি। একটি দলকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা যারা করছে, তাদের অতীত মানুষ জানে। আমরা কাদা-ছোড়াছুড়ি করছি না, কিন্তু কেউ করলে সত্য ইতিহাসটা আয়নার সামনে তুলে ধরব। আমি মনে করি যত তাড়াতাড়ি ভুল সংশোধন হবে, ততই মঙ্গল। আমরা গঠনমূলক রাজনীতি চাই, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনুসরণ করবে।

এশিয়া পোস্ট: সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে আপনার পরিকল্পনা ও লক্ষ্য কী?

নাদিয়া পাঠান পাপন: সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের কাজ আইন প্রণয়ন এবং এলাকার সমস্যাগুলো তুলে ধরা। কাজের লোকের কাজের অভাব হয় না। অতীতে নারী এমপিরা যা সুযোগ পেয়েছেন, আমি বিশ্বাস করি এবার তার চেয়ে বেশি কাজ করার সুযোগ পাব। আমি চাই রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কাজে প্রশাসনিক ও সব সেক্টর থেকে আমাদের সমান সুযোগ দেওয়া হোক যাতে আমরা চমৎকারভাবে ভূমিকা রাখতে পারি।

এশিয়া পোস্ট: ব্যক্তিগতভাবে আপনি কেমন বাংলাদেশ দেখার স্বপ্ন দেখেন?

নাদিয়া পাঠান পাপন: তরুণ প্রজন্ম যে চোখ দিয়ে বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছে এবং যে স্বপ্ন নিয়ে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, সেই স্বপ্নের সঙ্গে আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে একটি সুন্দর বাংলাদেশ দেখতে চাই। যে বাংলাদেশে কথা বলার জন্য জেলে যেতে হবে না, প্রতিবাদ করার প্রয়োজন পড়বে না এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে। সরকারি ও বিরোধী দল দেশের স্বার্থে সবসময় এক প্ল্যাটফর্মে থাকবে—এমনটিই আমার প্রত্যাশা।

এশিয়া পোস্ট: আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।