logo

জাকাত যেভাবে বদলাতে পারে গরিবের অর্থনীতি 

জাকাত যেভাবে বদলাতে পারে গরিবের অর্থনীতি 

জাকাত মুসলমানদের ওপর অর্পিত আর্থিক ইবাদত এবং ইসলামি রাষ্ট্রের রাজস্বের অন্যতম উৎস। জাকাত আদায়ের মাধ্যমে ব্যক্তির সম্পদ পবিত্র হয়। তার আমলনামায় যুক্ত হয় অফুরন্ত সওয়াব। সমাজ ও দেশ থেকে দূর হয় দারিদ্র্য। 

সামর্থবানদের ওপর জাকাত আদায় করা ফরজ। যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা কিংবা সমপরিমাণ ব্যবসায়ী পণ্য বা নগদ অর্থ আছে, তাকে জাকাত দিতে হবে। জাকাত দিতে হয় অভাবী ও মিসকিনকে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নামাজ আদায় করো, জাকাত দাও এবং রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৩)

আল্লাহ কোরআনে ৮২ বার জাকাতের কথা বলেছেন। আল্লাহ জাকাতকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন এ জন্য যে, জাকাত ব্যক্তির সম্পদকে পবিত্র করে। দারিদ্র্য দূরীকরণে সঠিক ভূমিকা রাখে। 

দারিদ্র্য আমাদের দেশের প্রধান শত্রু। সমাজের জন্য এটা অভিশাপও বটে। দারিদ্র্যের ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি। এই দারিদ্র্যের হাত থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য আটটি খাতে জাকাত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যথা—এক. গরিব—যার নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই। দুই. মিসকিন—যার মালিকানায় সম্পদ নেই। তিন. ইসলামি সরকারের পক্ষ থেকে জাকাত সংগ্রহে নিয়োজিত ব্যক্তি। চার. ইসলামের দিকে চিত্ত আকর্ষণের জন্য কাউকে জাকাত দেওয়া। পাঁচ. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি। ছয়. নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের বিনিময়ে স্বাধীন হওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ দাস-দাসী। সাত. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী। আট. মুসাফির—সফর অবস্থায় অভাবগ্রস্ত মানুষ।

উল্লিখিত আটটি খাত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর মধ্যে ছয়টি খাতই দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভূমিকা রাখে। এতে প্রতীয়মান হয়, দারিদ্র্য দূরীকরণে জাকাত প্রদান হাতিয়ার। কিন্তু এরপরও দেশে দারিদ্র্য দিন দিন বাড়ছে। কারণ, সঠিক নিয়মে জাকাত দেওয়া হচ্ছে না। 

অন্তত্য দুঃখের বিষয়, বর্তমানে জাকাত প্রদানের যে প্রথা চালু হয়েছে; বলতে গেলে তা লোক দেখানো ছাড়া অন্য কিছু নয়। জাকাত দেওয়ার আগে প্রচারণা চালিয়ে, সারাদিন রোজাদার গরিবদের খাঁখাঁ রোদে দাঁড় করিয়ে রেখে ৫০ টাকা, ১০০ টাকা দিতে দেখা যায়। বাজার থেকে ‘জাকাত’ নামের নিম্ন মানের শাড়ি-লুঙ্গি এনে বিলি করেন অনেকে। জাকাত নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে এ দেশে।  

আমাদের দেশে যে নিয়মে জাকাত আদায় করা হয়, এতে কোনো পরিবার বা লোক সচ্ছল হতে পারছে না। জাকাতের মূল উদ্দেশ্যই সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করা। জাকাত এমনভাবে দেওয়া উচিত, পরবর্তী বছর যাতে জাকাত গ্রহীতা জাকাত আদায় করতে পারে। এ বিষয়ে ওমর ফারুক (রা.) বলেন, ‘যখন তোমরা ফকির-মিসকিনদের কোনো কিছু দেবে, তখন তাকে ধনী বানিয়ে দাও।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৫১৮)

ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ফকির বা মিসকিনদের এতটুকু পরিমাণ সম্পদ দিতে হবে, যাতে তারা অভাবের গ্লানি থেকে মুক্তি পায় এবং ধনী ব্যক্তির পর্যায়ে এসে উপনীত হয়। এই মতের ওপর সব ইমাম ঐকমত্য হয়েছেন। 

ছোট্ট একটি উদাহরণ দিতে চাই, ধরা যাক কোনো ইউনিয়নে ১০০ জন জাকাতদাতার মোট জাকাতের পরিমাণ ৫০ লাখ টাকা। তারা যদি সবার টাকা একটি ফান্ডে রেখে ইউনিয়নের সবচেয়ে গরিব ৫০টি পরিবার বাছাই করে প্রতিটি পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে দেন, তাহলে এই পরিবারগুলো দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে। এক লাখ টাকা দিয়ে অবশ্যই কোনো আয়ের পথ বের করে সচ্ছল হওয়া যায়। 

এভাবে প্রতিবছর একটি ইউনিয়নের ৫০টি পরিবার দারিদ্র্য থেকে মুক্ত পেলে খুব অল্প সময়ে দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হবে। এ জন্য দরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং সঠিক নিয়মে জাকাত দেওয়া। 

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে জাকাত উত্তোলন ও বণ্টনের দায়িত্ব সরকারের। আল-কোরআনে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আমি তাদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে; আর প্রত্যেক কাজের পরিণাম আল্লাহরই।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৪১)  

 

বাংলাদেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় জাকাত উত্তোলন ও বণ্টনের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেই। তাই এ দেশের মুসলিমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে জাকাত দেন। তারা মাদ্রাসা, লিল্লাহ বোর্ডিং কিংবা ফকির-মিসকিনকে বিচ্ছিন্নভাবে জাকাতের অর্থ বা সম্পদ দেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে শাড়ি-লুঙ্গি বা স্বল্প পরিমাণ নগদ অর্থ বিতরণের ফলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য-বিমোচন হচ্ছে না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা-বিপর্যয়ও লক্ষ করা যায়। 

অন্যদিকে যদিও কোনো কোনো সংগঠন বা সংস্থা জাকাত আদায় ও বণ্টন করে, তবে তাদের মাঝে পারস্পরিক সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যায়। ফলে জাকাত যে দারিদ্র্য-বিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি, এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। 

জাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো, জাকাত গ্রহীতাকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার মাধ্যমে গ্রহীতার পর্যায় থেকে দাতার পর্যায়ে উন্নীত করা। কিন্তু বর্তমানে দেশে প্রচলিত জাকাত পদ্ধতির ফলে দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কোনো পরির্বতন তো হচ্ছেই না, বরং তাদের দারিদ্র্যকে লালন করা হচ্ছে।

কোনো কোনো জাকাতদাতা ও গ্রহীতার মাঝে অসুস্থ মানসিকতা লক্ষ করা যায়। দাতা অনুগ্রহ করে দেন এবং গ্রহীতা অসম্মানজনকভাবে দয়া হিসেবে গ্রহণ করেন। অথচ ইসলামের সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, জাকাত একটি ফরজ ইবাদত। এটি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। ধনীদের সম্পদে তা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নির্ধারিত অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ১৯) 

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘সেসব লোক মনের সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্ত, যাদের ধন-সম্পদে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতদের একটা নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে।’ (সুরা মাআরিজ, আয়াত: ২৪-২৫) 

জাকাত দেওয়া দরিদ্র্যের প্রতি অনুগ্রহ নয়; বরং তাদের নির্ধারিত অধিকার তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কিছু কিছু বিত্তবানদের মাঝে জাকাত ফাঁকি দেওয়ার অসুস্থ মানসিকতা লক্ষ করা যায়। তারা বিভিন্ন কূট-কৗশল অবলম্বন করে নিজেদের ঋণগ্রস্ত কিংবা জাকাত দেওয়ার উপযুক্ত নয়, তা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকের বাস্তব অবস্থা ও মনের অবস্থা ভালোভাবে জানেন। এ ধরনের অসুস্থ চিন্তা কোরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ।