logo
Advertisement

ইসলামের নির্দিষ্ট কোনো পতাকা আছে?

ইসলামের নির্দিষ্ট কোনো পতাকা আছে?
রাজধানীর হাতিরঝিলে ব্রিজে টাঙানো কালেমাখচিত পতাকা। শনিবার তোলা, ছবি: এশিয়া পোস্ট

সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কালেমাখচিত পতাকা প্রদর্শন এবং তা নিয়ে শোডাউনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনমনে এক ধরনের কৌতূহল ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে একদল যুবককে এই পতাকা টাঙাতে দেখা যায়। পরবর্তীতে তা সরিয়ে ফেলা হলেও দেশের বিভিন্ন মহাসড়কের পাশে, চত্বরে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পতাকার ব্যবহার ও প্রচার বাড়ছে। যারা এই কার্যক্রম চালাচ্ছেন, তারা এটিকে ‘ইসলামের পতাকা’ হিসেবে দাবি করছেন।

Advertisement

প্রশ্ন হলো, ইসলামের সুনির্দিষ্ট কোনো পতাকা আছে কি না?

মহানবী (সা.) পতাকা ব্যবহার করেছেন?

হাদিস ও ইতিহাসের বর্ণনায় পাওয়া যায় হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পতাকা ব্যবহার করেছেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় বুরাইদা (রা.) (যিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি) মহানবী (সা.)-কে পরামর্শ দেন, মদিনায় প্রবেশের সময় শান্তির প্রতীক হিসেবে যেন বর্শা বা লাঠির মাথায় পাগড়ি ঝুলিয়ে রাখা হয়। মহানবী (সা.) তা করেছিলেন। মদিনায় যাওয়ার ছয় মাস পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর চাচা হামজা (রা.)-কে পতাকা ব্যবহারের অনুমতি দেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) যেসব পতাকা ব্যবহার করেছেন, ইসলাম বিশেষজ্ঞরা সেগুলোকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। এক. আর-রায়াতু রায়িতুন বা রায়া। রায়ার রং ছিল কালো। হাদিস বিশারদ ইমাম বুখারি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রায়ার রঙ ছিল কালো, চারকোণা বিশিষ্ট এবং সাদা ডোরাকাটা দাগ ছিল।’ যেমন নেকড়ে বাঘে ডোরাকাটা দাগ দেখা যায়। এটি যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহার করা হতো। এই পতাকার নিচে যুদ্ধারা জড়ো হয়ে যুদ্ধ করতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৫)

দুই. লিওয়া। লিওয়া ছিল সাদা রঙের। এটি প্রধান সেনাপতি বা রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে থাকত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ধরনের একটি পতাকা ব্যবহার করতেন। এর মধ্যে লেখা ছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। (আর-রাহিকুল মাখতুম, বদরের যুদ্ধ অধ্যায়)। তবে কালেমা লেখার বর্ণনাকে দুর্বল বলেছেন কোনো কোনো আলেম। তারা বলেন, মহানবী (সা.) সাদা পতাকা ব্যবহার করতেন। তবে সেখানে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ লেখা ছিল না।

‘ইসলামের পতাকা’ বলতে কিছু আছে?

ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট ডিজাইন, প্রতীক বা রঙের পতাকাকে আবশ্যকীয় ইসলামের পতাকা হিসেবে নির্ধারণ করে দেয়নি। মহানবী (সা.)-এর সময়ে একই যুদ্ধে একাধিক রঙের পতাকা ব্যবহারের দৃষ্টান্ত যেমন রয়েছে, তেমনি পরবর্তী সময়ে সাহাবি এবং মুসলিম শাসকরাও যুগে ‍যুগে নিজেদের সুবিধামতো বিভিন্ন রঙের পতাকা ব্যবহার করেছেন। সবার পতাকা একই রকম ছিল, এমন কোনো পতাকা পাওয়া যায় না।

নরসিংদী জেলা তানযীম ফাতওয়া বোর্ডের সদস্য মুফতি নুরুল হুদা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবিরা জিহাদ কিংবা বিশেষ অভিযানের সময় বিভিন্ন ধরন বা রঙের পতাকা ব্যবহার করেছেন বলে হাদিসে প্রমাণ আছে। ইসলাম সুনির্ধারিত ডিজাইন, কোনো বিশেষ ছবি বা প্রতীকের পতাকা ব্যবহার আবশ্যক করেনি। ইসলামে পতাকা আছে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো পতাকা নেই। ইসলাম পতাকার ডিজাইন নির্দিষ্ট করে দেয়নি। কোনো একক পতাকাকে ইসলামের পতাকা বলে নির্দিষ্ট করে দেওয়ার সুযোগ নেই।’

ইসলাম বা মুসলিম উম্মাহর সুর্নিধারিত কোনো পতাকা নেই উল্লেখ করে মুফতি নুরুল হুদা বলেন, ‘বর্তমানে দেশে কারও কারও মধ্যে কালেমাখচিত পতাকা উড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটাকে উৎসাহিতও করা যাবে না, আবার মন্দও বলা যাবে না। তাদের উদ্দেশ্য জেনে মন্তব্য করা বা ব্যবস্থা নিতে হবে।’

ইসলামি চিন্তাবিদ ও লেখক প্রফেসর ড. মুখতার আহমেদ বলেন, ‘ইসলামের পতাকা এরকম বা তাতে কী লেখা থাকবে, এমন কোনো নির্দেশনা হাদিসে নেই। বর্তমানে কারা কালেমাখচিত পতাকা ব্যবহার করছে, কেন করছে, এটা প্রথমে যাচাই করতে হবে। তাদের উদ্দেশ্য কি, সেটাও জানতে হবে। এর পেছনে ভিনদেশি বা ইসলামের শত্রুদের চক্রান্ত আছে কি না, সেটাও যাচাই করতে হবে। ইসলামি খেলাফত বা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার জন্য এই পতাকার ব্যবহার কি খুব গুরুত্বপূর্ণ? এই পতাকা ছাড়া কি দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হবে না?’