বাবার সঙ্গে যেমন আচরণ করতে বলেছেন মহানবী (সা.)

বাবার সঙ্গে যেমন আচরণ করতে বলেছেন মহানবী (সা.)
প্রতীকী ছবি

সন্তানের জন্য বাবার হৃদয়ে আছে অফুরন্ত শুভকামনা। আছে সঞ্চিত দয়ার ভাণ্ডার। বাবা নির্ভয় ও নির্ভরতার আশ্রয়স্থল। বাবার ছায়ার মতো এত পবিত্র, বিশ্বাসী ছায়া পৃথিবীতে নেই। এ ছায়ায় কোনো কলুষতা নেই। স্বার্থ নেই। ভয় নেই। দ্বান্দ্বিকতা নেই। এ ছায়া ভালোবাসার। মায়ার। ভরসার। সৌভাগ্যের। কল্যাণ ও প্রার্থনার।

Advertisement

সন্তানের জীবনজুড়ে আছে মা-বাবার আত্মত্যাগ। মা-বাবার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বদৌলতে সন্তান বেড়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা ইমানি দায়িত্ব। মা-বাবার ত্যাগ ও কষ্টের মূল্যায়ন করে আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো। মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত করো এবং বলো—‘হে আমার প্রতিপালক, তাদের প্রতি রহম করো যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩-২৪)

বাবা জান্নাতের দরজা

প্রতিটি ঘরেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হয়। জান্নাতেও প্রবেশ করতে হবে দরজা দিয়ে। আর জান্নাতের দরজা হলো বাবা। এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হলে বাবার সন্তুষ্টি কার্ড লাগবে। বাবা সন্তুষ্টি ছাড়া জান্নাতে যাওয়া যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বাবা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা। এখন তোমার ইচ্ছা, এর হেফাজত করো অথবা একে নষ্ট করে দাও।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২১৭৬৫)

বাবার খুশিতে আল্লাহ খুশি

মুসলমানের জীবনে সবচে বড় অর্জন হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহর সন্তুষ্টি পেলে মুমিনজীবনে আর কি লাগে! আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে হলে বাবার সন্তুষ্টি লাগবে। বাবাকে কষ্ট দিয়ে আল্লাহকে খুশি করা যায় না। আল্লাহকে পাওয়া যায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বাবার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি এবং বাবার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টি রয়েছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৯৯)

বাবার সেবায় মেলে আল্লাহর প্রতিদান

আমাদের ভেবে দেখা উচিত, আমি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যে কাজ বা চাকরি করছি, এতে বাবা খুশি কি না? একবার মহানবী (সা.) ও সাহাবিরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এক সাহাবি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য নবীর কাছে ছুটে এলেন। অনুমতি প্রার্থনা করলেন। মহানবী তাকে অনুমিত দেননি। তখন নবীর চোখে তার জন্য জিহাদের চেয়ে বড় আমল কি ছিল? সাহাবি আমর ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনুল আস (রা.) বলছেন সেই বড় আমলের কথা, ‘একবার এক ব্যক্তি এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলল, আমি আপনার হাতে হিজরত ও জিহাদের শপথ গ্রহণ করতে চাই। আর এর প্রতিদান চাই শুধুই আল্লাহর কাছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমার মা-বাবার মধ্যে কেউ কি বেঁচে আছেন? লোকটি বলল, হ্যাঁ, তারা উভয়েই বেঁচে আছেন। মহানবী বলেন, তুমি কি আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান পেতে চাও? সে বলল, হ্যাঁ। নবী বলেন, মা-বাবার কাছে ফিরে যাও এবং তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৪৯)

বাবার দিকে তাকালে মেলে হজের সওয়াব

আরেক হাদিসে আছে, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (স.) বলেন, ‘যে সন্তান তার পিতামাতার দিকে সশ্রদ্ধ ও ভালোবাসার নজরে তাকায়, সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তার আমলনামায় একটি কবুল হজের সওয়াব লিখে দেন। এ কথা শুনে উপস্থিত সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), সে যদি ওইভাবে দৈনিক ১০০ বার তাকায় তাহলে কি সে ১০০ কবুল হজের সওয়াব পাবে? নবী বললেন, হ্যাঁ, যদি দৈনিক ১০০ বারও তাকায়, তাহলে সেই সন্তান ১০০ কবুল হজের সওয়াব পাবে।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস: ৭৪৭২)

সন্তান বাবার জন্য

সন্তানের আয় থেকে বাবা চাইলে খরচ করতে পারেন। সামর্থ্যবান সন্তানের উচিত সাধ্যানুযায়ী বাবার জন্য খরচ করা। হাদিসে আছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, ‘আমার সম্পদ আছে, সন্তান আছে। আমার বাবাও আছেন। আমার বাবা আমার সম্পদের মুখাপেক্ষী। এখন আমার করণীয় কী? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমি ও তোমার সম্পদ তোমার বাবার।’ আরও বললেন, ‘তোমাদের সন্তানাদি তোমাদের সর্বোত্তম উপার্জন। সুতরাং তোমরা সন্তানদের সম্পদ ভোগ করতে পারো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮৭০)

বাবার অবাধ্য হওয়া কবিরা গুনাহ

মা-বাবার অবাধ্য হওয়া কবিরা গুনাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করব না?’ আমরা বললাম, ‘অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল।’ তিনি বলেন—‘আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে অংশীদার করা, মা-বাবার অবাধ্যতা করা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭৬)