logo

মেরাজের ঘটনা ও সাত যুবকের ৩০৯ বছরের বিস্ময়কর ঘুম

মেরাজের ঘটনা ও সাত যুবকের ৩০৯ বছরের বিস্ময়কর ঘুম

আজকের তারাবিতে কোরআনের ১৫তম পারা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা ইসরা ও সুরা কাহাফের ১ থেকে ৭৪ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। এই অংশে সামাজিক জীবনে শিষ্টাচার, বিপর্যয় সৃষ্টির কারণে শাস্তি, নবী (সা.)-এর মেরাজ, আল্লাহ ও বান্দার হক, মা-বাবার প্রতি সদাচার, আসহাবে কাহফের ঘটনা, মহানবীর প্রতি তাহাজ্জুদের নির্দেশ, আল্লাহর সুন্দর নাম, বান্দার ডাকে আল্লাহর সাড়া, ব্যভিচারের শাস্তি, নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়, প্রাণ হত্যা হারাম ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। 

সুরা ইসরায় আছে ঊর্ধ্বজগত ভ্রমণের কথা
সুরা ইসরা মক্কায় অবতীর্ণ, এর আয়াত সংখ্যা ১১১। এটি কোরআনের ১৭তম সুরা। ইসরা অর্থ রাতের ভ্রমণ। মহানবীর (সা.) ভ্রমণ বা মেরাজ রাতে হয়েছিল, তাই এটিকে ইসরা বলা হয়। বিশেষত বায়তুল্লাহ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণকে ইসরা বলা হয়। এ সুরায় বনি ইসরাইয়েলের নানা বিষয়ের আলোচনা থাকায় এটিকে সুরা বনি ইসরাইলও বলা হয়।  

মেরাজের ঘটনা 
সুরা বনি ইসরাইল শুরু হয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঊর্ধ্বজগৎ ভ্রমণের আলোচনা দিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সে সময় মক্কায়। রাতের আঁধারে মোড়ানো পৃথিবী। তিনি শুয়ে আছেন। জিবরাইল ও মিকাইল (আ.) তাঁর কাছে এলেন। তাঁর বুক চিড়লেন। জমজমের পানি দিয়ে পবিত্র করলেন বুক। জিবরাইল-মিকাইল বুরাকে করে তাঁকে নিয়ে চললেন মেরাজের পথে। তিনি মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় যান। সেখানে সব নবী-রাসুলদের নিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়েন। তিনিই ইমামতি করেন। 

নামাজ পড়ে বের হওয়ার সময় জিবরাইল তাঁর সামনে দুধ ও শরাবের পাত্র রাখেন। তিনি দুধের পাত্র নিলেন। এরপর তিনি প্রথম আসমান হয়ে ধারাবাহিকভাবে সাত আসমান অতিক্রম করেন। সেখানে আসমানের ফেরেশতারা তাঁকে স্বাগতম জানান। সাত আসমানে সাতজন নবীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। পরে তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় যান। সেখান থেকে একাকী রফরফ বাহনে আরশে আজিম যান। এরপর মহান রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করেন। পরিদর্শন করেন জান্নাত-জাহান্নামও। এরপর ফিরে আসেন পৃথিবীতে। উম্মতের জন্য নিয়ে আসনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। 

বাবা-মার সঙ্গে সদাচরণ ইবাদত 
বাবা-মার সঙ্গে সদাচার করা ইবাদত। তাদের মুখে হাসি ফোটানো সওয়াবের কাজ। তাদের কষ্ট দেওয়া গুনাহ। আল্লাহ বলেন, ‘বাবা-মার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন বা তাদের উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের বিরক্তি বা অবজ্ঞাসূচক কথা বলো না, আর তাদের ভৎর্সনা করো না। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো। তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও এবং বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক, তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমনভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৩) 

অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই
জীবনে সচ্ছলতা পাওয়া আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। অর্থসম্পদ আল্লাহর নেয়ামত। এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা মুমিনের গুণ। অর্থের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ করতে হবে। অপচয় ও কৃপণতা করা যাবে না। অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান তার রবের (প্রভু) প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭) 

সুরা কাহাফে প্রসিদ্ধ চার ঘটনা 
সুরা কাহাফ কোরআনের ১৮তম সুরা। এর আয়াত সংখ্যা ১১০। এটি মক্কায় অবতীর্ণ। কাহাফ মানে গুহা। সুরা গুহাবাসীর ঘটনা আছে, তাই এর নাম কাহাফ। এ সুরায় বেশ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। যথা—

  • সাত তরুণের গুহাবাসী হওয়া।
  • বাগান মালিকের বিশ্বাস। 
  • মুসা ও খিজির (আ.)-এর গল্প।
  • বাদশাহ জুলকারনাইনের কাহিনি। 

সাত যুবকের গুহায় আশ্রয়
তখন ওই দেশের কারও মধ্যে একত্ববাদের বিশ্বাস ছিল না। দেশের বাদশাহ মূর্তিপূজক। সেসময় আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছিলেন সাত যুবক। গোপনে ইবাদত করতেন তারা। বাদশাহ একদিন তাদের ইমানের বিষয়টি জেনে যান। তিনি তাদের ডেকে পাঠান। তার ধর্মে বিশ্বাসী হতে বলেন। তারা নাকচ করে দেন। রাজা তাদের হত্যার ঘোষণা দেন। ইমান রক্ষায় তারা শহর থেকে বেরিয়ে পড়েন। একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন। তাদের সঙ্গে ছিল একটি কুকুরও। এর নাম ছিল কিতমির। কিতমির গুহামুখে বসে পাহারা দিল তাদের। 

বাদশাহর বাহিনী তাদের খুঁজে পেল না। গুহায় আল্লাহ তাদের ঘুম পাড়িয়ে দেন। সেই ঘুম দীর্ঘ হয় ৩০৯ বছর পর্যন্ত। ঘুম ভাঙার পর তাদের একজন খাবার নিতে শহরে আসে। দেখেন, শহরের সবকিছু বদলে গেছে। আগের মতো কিছুই নেই। তিনি এক দোকানে খাবার কিনে মুদ্রা দিলে দোকানি অবাক হন। তার পরিচয় জানতে চান। দোকানি বলেন, এটা তো ৩০০ বছর আগের মুদ্রা। শহরের লোকজন তাকে চিনে ফেলে। তিনি জানতে পারেন, সেই অবিশ্বাসী বাদশাহ মারা গেছেন। বর্তমান বাদশাহ আসমানি ধর্মে বিশ্বাসী। তাদের ওপর দিয়ে অতিবাহিত হয়ে গেছে তিন শতক। 

লোকেরা তাকে দেখে বিস্মিত হয়ে নানা কথা বলছিলেন। তিনি গুহায় থাকা সাথিদের কথা বলে দ্রুত কেটে পড়েন। গুহায় ফিরে সাথিদের বিস্তারিত ঘটনা শোনান। এদিকে বর্তমান রাজা খবর পেয়ে দলবল নিয়ে সেখানে যান। গুহার কাছে গিয়ে দেখন, সবাই মারা গেছেন। রাজা সেই গুহামুখে তাদের স্মরণে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। কোরআনে তাদের কাহিনিকে ‘আসহাবে কাহাফ’-এর ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনার বিবরণ আছে সুরা কাহাফের ৯ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতে।