‘বিক্রয়ের জন্য নহে’ লেখা পণ্য কেনাবেচা করা কি জায়েজ

সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন মালামাল এবং অনেক প্রতিষ্ঠানের স্যাম্পলের গায়ে লেখা থাকে ‘নট ফর সেল অর এক্সচেঞ্জ’ বা বিক্রয়ের জন্য নহে। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত বিস্কুট, পাউরুটি বা ডিমও বিক্রয়ের জন্য নয়। সরকারি ওষুধের গায়েও এ বাক্যটি যত্ন করে লেখা থাকে। এরপরও অনেককে এসব পণ্য বেচাকেনা করতে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, বিক্রেতা শরিয়তসম্মতভাবে সেটি বিক্রি করার অধিকার রাখেন কি না? আর ক্রেতার জন্যও কি তা কেনা বৈধ?
সরকারি সম্পদের মালিক কে
সরকারি সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অধীন। এগুলো জনস্বার্থমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত। প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সেগুলোর মালিক নন। তারা শুধু দেখভাল এবং বিতরণের দায়িত্ব পান। তারা মূলত দায়িত্বশীল ও আমানতদার।
ইসলামে আমানত রক্ষা করা ইমানি দায়িত্ব। আমানতের খেয়াতন করা মারাত্মক গুনাহ। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)। হাদিসে আছে, ‘যার আমানত নেই, তার ইমান নেই।’
রাষ্ট্রের সম্পদ বা অন্যের পণ্য নিজের কাছে আমানত থাকলে সেটা ইচ্ছামতো বিক্রি, দান বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যাবে না। মূল মালিক পণ্যটি যে কাজে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন, শুধু সেই কাজে ব্যবহার করা যাবে। তার অনুমতি ছাড়া অন্য খাতে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। ইসলামি আইন শাস্ত্রে প্রতিনিধিত্বের একটি মূলনীতি হলো, যে পরিমাণ ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে, প্রতিনিধি তার সীমার মধ্যেই তা প্রয়োগ করতে পারেন। কর্তৃত্ব যতটুকু, বৈধ অধিকার ততটুকুই। (আলাউদ্দিন কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে ফি তারতিব আশ-শরায়ে, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৪২৪, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০৫)
সরকারি পণ্য কেনাবেচা করা যাবে
সম্পদ বা পণ্যের ওপর যার বৈধ ও পূর্ণ মালিকানা রয়েছে, তিনিই শুধু পণ্যটি বিক্রি করতে পারবেন—এটা শরিয়তসম্মত বেচাকেনার মৌলিক শর্ত। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যা তোমার কাছে (মালিকানায়) নেই, তা বিক্রি করো না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫০৩)
এই হাদিস ও শর্তের আলোকেই সরকারি মাল কেনাবেচার বিধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষ বা মূল মালিকের অনুমতি ছাড়া সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগতভাবে বিক্রির অধিকার সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নেই। বস্তুটি পুরোনো, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত বা নতুন মাল আসায় অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেলেও একই বিধান প্রযোজ্য।
শুধু কেনাবেচা নয়, অনুমতি ছাড়া অফিসের সম্পদ বাড়িতে নেওয়া, ব্যক্তিগত কাজে লাগানো বা কাউকে দিয়ে দেওয়াও একই ধরনের আমানতের লঙ্ঘন। (ইবনে নুজাইম মিসরি, আল-বাহরুর রায়েক শরহু কানজ আদ-দাকায়েক, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ১১৯, দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, বৈরুত, ১৯৯৭)
বৈধ নিলাম আর গোপন বিক্রি এক নয়
তবে সব সরকারি মালই চিরকাল অবিক্রেয়, বিষয়টি এমন নয়। কোনো সম্পদ পুরোনো, অকেজো বা উদ্বৃত্ত হয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ বিধিসম্মত পদ্ধতিতে নিলাম, টেন্ডার বা অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় তা বিক্রি করতে পারেন। তখন যথাযথ অনুমোদন ও কর্তৃত্ব প্রয়োগ থাকায় বিষয়টি ভিন্ন। অতএব, নিষেধের কারণ শুধু সম্পদটি সরকারি হওয়া নয়, বরং যার হাতে সম্পদটি রয়েছে, তার বিক্রির বৈধ কর্তৃত্ব আছে কি না, মূল প্রশ্নটি সেখানে। (আলাউদ্দিন কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে ফি তারতিব আশ-শরায়ে, ৭/৪২৪, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০৫)
ক্রেতারও কি দায় থাকে
সম্পদ বা পণ্য অননুমোদিতভাবে বিক্রি হচ্ছে—এটা জেনেও যদি সস্তার লোভে ক্রেতা সম্পদ বা পণ্য কিনে নেন, তাহলে তিনি নিছক ক্রেতা হিসেবে দায়মুক্ত থাকতে পারবেন না। তার অর্থপ্রদান বিক্রেতাকে অবৈধভাবে সম্পদ হাতছাড়া করতে সহায়তা করেছে। সুতরাং জেনেশুনে এমন কেনাবেচায় অংশ নেওয়া পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত হবে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)
পরে জানতে পারলে করণীয়
পণ্য কেনার পর যদি জানা যায়, সেটি বিক্রয়ের জন্য ছিল না এবং বিক্রেতার তা বিক্রি করার বৈধ অনমুতি ছিল না, তাহলে তা নিজের কাছে রাখা বৈধ হবে না। তাকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পদটি ফেরত দিতে হবে এবং বিক্রেতার কাছ থেকে নিজের প্রদত্ত মূল্য ফেরত দিতে হবে। কারণ, জনসাধারণের সম্পদের অধিকার জনসাধারণের জন্যই প্রতিষ্ঠিত, কোনো কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষ নিজের ইচ্ছায় সে অধিকার বাতিল করে অন্য কাউকে তার মালিক বানিয়ে দিতে পারেন না। (শামসুদ্দিন সারাখসি, আল-মাবসুত, খণ্ড: ২৩, পৃষ্ঠা: ২০৩, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৮৯)
নষ্ট, ব্যবহার বা অন্য কোনো কারণে যদি মূল পণ্যটি আর ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয় বা সুযোগ না থাকে, তাহলে তার সমজাতীয় বস্তু ফেরত দিতে হবে। সেটিও সম্ভব না হলে তার মূল্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা বৈধ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।



