logo

যে কারণে ধ্বংস হয়েছিল কারুন

যে কারণে ধ্বংস হয়েছিল কারুন
তারাবি নামাজ পড়ছেন মুসল্লিরা। সংগৃহীত ছবি

আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ২০তম পারা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা নামলের ৬০ থেকে সুরা কাসাস ও সুরা আনকাবুতের ১ থেকে ৪৪ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। এই অংশে মিঠা পানি ও লবণাক্ত পানির দরিয়া, সবুজ-শ্যামল বাগান সৃষ্টি, আল্লাহর কুদরত, আসমান-জমিন সৃষ্টি, মৃত্যু-পরবর্তী জীবন, হেদায়ত আল্লাহর হাতে, রিজিক, মুসা (আ.) ও ফেরাউনের কাহিনি, কারুনের ঘটনা, মুসলমানদের দুঃখ-কষ্ট, আল্লাহর ক্ষমতা, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য, ঈমানদারের পরীক্ষা ও কোরআন আঁকড়ে ধরাসহ নানা বিষয় আলোচিত হয়েছে। 

বান্দার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ
সুরা নামলের ৬১ থেকে ৬৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা মানুষের প্রতি তাঁর অনুগ্রহের বিবরণ পেশ করেছেন। তিনি মানুষের জন্য জমিনকে আবাসযোগ্য করে তার মাঝে প্রবাহিত করেছেন নদী-নালা। তিনি নিরুপায়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিপদ দূর করেন। তিনি তোমাদের স্থলে ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ দেখান এবং তিনি স্বীয় রহমতের প্রাক্কালে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন। তিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। সবাইকে রিজিক দেন। তিনি অদৃশ্য ও আখেরাতের খবর জানেন। এগুলো তিনি ছাড়া আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এগুলো বলে তিনি তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করার নির্দেশ দিচ্ছেন। 

সুরা কাসাসে আছে ঘটনা
সুরা কাসাস মক্কায় অবতীর্ণ, এটি কোরআনের ২৮ তম সুরা। এর আয়াত সংখ্যা ৮৮। কাসাস অর্থ ধারাবাহিকভাবে ঘটনার বর্ণনা। এ সুরায় বিস্তারিতভাবে মুসা (আ.)-এর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, তাই একে সুরা কাসাস বলা হয়। 

মুসা (আ.)-এর বেড়ে ওঠা 
স্বপ্নের ব্যাখ্যায় ফেরাউন জানলেন, বনি ইসরায়েলের এক ছেলে তাকে হত্যা করবে। ফেরাউন বনি ইসরায়েলের সব ছেলেসন্তানকে হত্যার নির্দেশ দেন। এদিকে একদিন মুসা (আ.)-এর মা তাঁকে প্রসব করলেন। মুসা নবীর বংশের লোকেরা ছিলেন বনি ইসরায়েল। মুসার মা চিন্তায় পড়ে গেলেন। আল্লাহ মায়ের অন্তরে ছেলেকে রক্ষার যাবতীয় কৌশল ঢেলে দিলেন। সিন্দুক বানালেন মা। একদিন শিশু মুসাকে সিন্দুকে বসিয়ে দরিয়ায় ভাসিয়ে দিলেন। 

সিন্দুকের গতির পথ ধরে চললেন মুসার বোন। সেই সিন্দুক ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে গেল ফেরাউনের ঘাটে। শিশু মুসা গেল ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার কোলে। ফেরাউন দেখে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলো। আসিয়া দাঁড়ালেন বাধা হয়ে। আসিয়ার ব্যক্তিত্বের কাছে ফেরাউন হেরে গেলেন।  

এবার তবে ক্ষুধার্ত শিশু মুসাকে দুধ খাওয়াতে হয়। দুগ্ধবতী কয়েকজন নারী চেষ্টা করলেন। কাজ হলো না। মুসার বোন অপরিচিতি হয়ে সব ঘটনা কাছ থেকে দেখছিলেন। তিনি আসিয়াকে বনি ইসরায়েলের এক নারীর খবর দেন, যার দুধ এই বাচ্চা পান করতে পারে। ডাকা হয় সেই নারীকে। সেই নারী মুসার মা। মায়ের স্তনে মুখ লাগতেই মুসা দুধ খেতে শুরু করে। শত্রুর ঘরে মায়ের আদরে মুসা বড় হতে থাকেন। যৌবনে পদার্পণ করেন। ঘটনাচক্রে মুসার হাতে এক কিবতির হত্যা হয়। ফেরাউন মুসাকে হত্যার নির্দেশ দিলে এক ব্যক্তির পরামর্শে শহর ছেড়ে মাদায়েনে চলে যান তিনি। সুরা কাসাসের ৩ থেকে ৫০ নম্বর আয়াতে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। 

কারুন ধ্বংসের গল্প 
মুসা (আ.)-এর সময়ে আরেক অহংকারী ও দুষ্ট লোক ছিল কারুন। অঢেল সম্পদ ছিল তার। বাইবেল ও তালমুদে কারুনের নাম পাওয়া যায় কোরহ। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসের (রা.) মতে, ‘মুসা (আ.)-এর চাচাতো ভাই ছিল কারুন। মুসা (আ.) বনি ইসরায়েলের এক অঞ্চলের নেতৃত্ব দিতেন এবং কারুন নেতৃত্ব দিত অন্য অঞ্চলের।’

একদল শক্তিশালী বাহিনী কারুনের ধনভান্ডারের চাবিগুলো বহন করত। তাদের পক্ষে ব্যাপারটি ছিল কষ্টসাধ্য। সম্পদের প্রাচুর্য তাকে ধোঁকায় ফেলে দিয়েছিল। সে অহংকার করত। কাউকে দান করত না। আল্লাহকে ভয় করত না। মুসা (আ.) তাকে বোঝালেন। আল্লাহর ভয় দেখালেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘(মুসা তাকে বলল) আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তা দিয়ে পরকালের ঘর অনুসন্ধান করো এবং ইহকাল থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয় না।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৭)  

কারুন মুসা (আ.)-এর কথা শুনল না। সে অহংকার দেখিয়ে চলল। অবশেষে আল্লাহ তাআলা কারুনকে তার বাড়িঘরসহ জমিনে ধসিয়ে দেন। মিসরের ফায়ুম শহরে ‘কারুন হ্রদ’ নামে একটি জায়গা রয়েছে। রাজধানী কায়রো থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখন লোকে চেনে ‘বিরকেত কারুন’ নামে। সুরা কাসাসের ৭৬ থেকে ৮২ নম্বর আয়াতে সম্পদশালী কারুনের দম্ভ, অবাধ্যতা ও ধ্বংসের কাহিনির বর্ণনা রয়েছে।

মাকড়সার জালের সুরা আনকাবুত 
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা আনকাবুত কোরআনের ২৯তম সুরা। এ সুরার আয়াত সংখ্যা ৬৯। সুরার অনেকাংশে পূর্ববর্তী জাতিদের অবিশ্বাস, অবাধ্যতা ও ধ্বংসের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। শেষে দেওয়া হয়েছে মুসলমানদের সান্ত্বনা। মুসলমানেরা তখন মক্কায়। প্রতিনিয়ত তারা কাফেরদের হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তারা ঘাবড়ে যান। ভয় পেয়ে বসেন। ‘মুমিনদের পরীক্ষা করা আল্লাহর প্রাচীন রীতির কথা’ আল্লাহ এ সুরায় জানিয়ে দেন। পূর্ববর্তী বিশ্বাসী মুসলমানদের কষ্ট ও ত্যাগের কথা বলতে গিয়ে নুহ (আ.), ইবরাহিম (আ.), লুত (আ.), শুয়াইব (আ.)-এর উদাহরণ দেন। কারুন, ফেরাউন ও হামান,আদ ও সামুদ জাতির ধ্বংসের কাহিনি তুলে ধরেন।