logo

অন্যকে দেখে নিজেকে ছোট লাগে, কোরআনে আছে এর চিকিৎসা

অন্যকে দেখে নিজেকে ছোট লাগে, কোরআনে আছে এর চিকিৎসা
দুনিয়ার বিষয়ে নিচের দিকে তাকাতে হবে, দ্বীনের বিষয়ে ওপরের দিকে। ছবি: অ্যাবাউট ইসলাম

বর্তমান সময়ে অনেক মানুষের জীবনের নানা ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে জানা যায়। বিশেষ করে ফেসবুকে অনেক মানুষ তার জীবনের ঘটে যাওয়া হরেক রকম কাহিনি, ভালো-মন্দ, উন্নতি-অবনতি সবই শেয়ার করেন। ফেসবুকে শেয়ার করা মানুষের উন্নত লাইফস্টাইল দেখে হয়তো অনেকের কষ্ট বাড়ে। সে-ও আকাঙ্ক্ষা করে তার মতো জীবনযাপনের।

ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ে কারও নতুন গাড়ি, কারও দামি ফোন, কারও বিদেশ ভ্রমণ বা কারও প্রমোশনের খবর। কারও সন্তানের সফলতার গল্পও শেয়ার করতে ভুলেন না অনেকে। এগুলো দেখে আমাদের অনেকের মনখারাপ হয়। ওই সব পেতে হৃদয়ে আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠে। নতুন গাড়ি, দামি ফোন বা চাকরিতে প্রমোশন না পাওয়ার হতাশায় ভোগেন কেউ কেউ।

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে কিছু নারী আকাঙ্ক্ষা জানিয়েছিল, তারা যদি পুরুষ হতেন, তাহলে তারাও জিহাদে যেতে পারতেন। অর্জন করতে পারতেন অধিক সওয়াব। হজরত উম্মে সালমা (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.), পুরুষ লোকেরা জিহাদে অংশগ্রহণ করে, আর আমরা এ পুণ্য থেকে বঞ্চিত থাকি। এমনভাবে মিরাসেও আমরা পুরুষদের তুলনায় অর্ধেক পেয়ে থাকি।’ (জামিউত তিরমিজি)। তাদের মধ্যে এ আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হলে আল্লাহ নাজিল করেন কোরআনের আয়াত। এরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের কাউকে কারও ওপর যা দিয়ে মর্যাদা দিয়েছেন, তার আকাঙ্ক্ষা করো না।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩২)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশ্বখ্যাত মুফতি তাকি উসমানি বলেন, এ আয়াত মূলনীতি জানিয়ে দিয়েছে, যেসব বিষয়ে মানুষের কোনো এখতিয়ার নেই, তাতে আল্লাহ তাআলা কারও ওপর কাউকে এক হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, আবার অপরকে অন্য হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। যেমন কেউ পুরুষ, কেউ নারী; কেউ শক্তিমান, কেউ দুর্বল; আবার কেউ অন্যের তুলনায় বেশি সুন্দর। এসব জিনিস যেহেতু মানুষের এখতিয়ারে নয়, তাই এর আকাঙ্ক্ষা করে অহেতুক দুঃখবোধ ছাড়া কোনো উপকারিতা নেই। (তাছাড়া এতে পরস্পরে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়)। সুতরাং এসব জিনিসে তাকদিরের (ভাগ্য) ওপর সন্তুষ্ট থাকা চাই। তবে যেসব ভালো জিনিসে মানুষের এখতিয়ার আছে, তা অর্জনে সচেষ্ট থাকা অবশ্য কর্তব্য। তাতে আল্লাহ তাআলার রীতি হলো, যে ব্যক্তি যেমন কাজ করবে, তার ক্ষেত্রে তেমনই ফল। তাতে নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য নেই।

তাফসিরে মাআরেফুল কোরআনে আছে, ‘এ আয়াতে অন্যের এমনসব বৈশিষ্ট্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে নিষেধ করা হয়েছে, যা মানুষের সাধ্যায়ত্ত নয়। কারণ, মানুষ যখন নিজেকে অন্যের চেয়ে ধন-দৌলত, আরাম-আয়েশ, বিদ্যা-বুদ্ধি বা শারীরিক সৌন্দর্য-সৌষ্ঠবে হীন মনে করে, তখন স্বভাবগতভাবেই তার অন্তরে হিংসার বীজ বপন হতে শুরু করে। এতে কম করে হলেও তার মনে সেসব বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত লোকের সমপর্যায়ে উন্নীত হওয়া কিংবা তার চেয়ে কিছুটা ওপরে ওঠার একটা বাসনা সৃষ্টি হতে থাকে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার সে আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার মতো নয়। কেননা, তা অর্জন করা মানুষের সাধ্যায়ত্ত নয়। যেমন কোনো নারীর পক্ষে পুরুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করার আকাঙ্ক্ষা বা কোনো সাধারণ ঘরের সন্তানের পক্ষে দেশের সেরা কোনো পরিবারের সন্তান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কিংবা কারও পক্ষে অত্যন্ত সুশ্রী হওয়ার বাসনা ইত্যাদি। যদি কেউ আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে জন্মগতভাবে এসব বৈশিষ্ট্য লাভ করতে না পারে, তবে সারা জীবন সাধ্যসাধনা করেও তার পক্ষে সেটা লাভ করা সম্ভব হবে না।’

কারও দামি ফোন, গাড়ি, বাড়ি বা সুন্দর চেহারা দেখে হিংসা করা যাবে না। অন্যের জীবন দেখে নিজেকে তুচ্ছ ভাবা বা ছোট মনে করা যাবে না। নিজের ওপর সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

আমাদের অনেকেরই এমন হয় যে, আমরা অন্যের জীবনযাপন দেখে হতাশায় ভুগি। আমার জীবন বা সম্পদ কেন তার মতো নয়, তা নিয়ে হাহাকারে ডুবে মরি। হয়তো বলি, আমার জীবন যদি তার মতো হতো। এমন মানুষের জন্য সমাধান দিয়েছেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাদের কী করা উচিত, তা জানিয়েছেন তিনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের চেয়ে নিচের অবস্থার মানুষের দিকে তাকাও, ওপরের দিকে তাকিও না। এতে আল্লাহর নেয়ামতকে তুচ্ছ মনে হবে না।’ সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৬৩)

দুনিয়ার বিষয়ে নিচের দিকে তাকান, দ্বীনের বিষয়ে ওপরের দিকে। এই এক সূত্রে হিংসা কমে, কৃতজ্ঞতা বাড়ে।

পৃথিবীতে সবকিছুই সীমাবদ্ধ। এখানে সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তবুও মানুষের চাহিদার শেষ নেই। এ চাহিদা শেষ হবে একমাত্র মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো আদম সন্তানের মালিকানায় যদি দুই উপত্যকা ভর্তি স্বর্ণ থাকে, তবু সে তৃতীয় আরেকটি স্বর্ণভর্তি উপত্যকা অর্জনের ইচ্ছা করবে। একমাত্র কবরের মাটি ছাড়া অন্য কিছুই তার মুখ ভর্তি করতে পারবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৩৭)

রায়হান রাশেদ

সম্পাদনা

রায়হান রাশেদ

সহ-সম্পাদক | এশিয়া পোস্ট