logo
Advertisement
কোরআনের গল্প

নবীর ছেলে হয়েও জাহান্নামি

নবীর ছেলে হয়েও জাহান্নামি
পবিত্র কোরআনের প্রচ্ছদ। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী আদম (আ.)-এর মৃত্যুর পর মানুষ আল্লাহকে ভুলে মূর্তিপূজার উপাসনা শুরু করে। এভাবে কেটে যায় বহু বছর। আল্লাহ নুহ (আ.)-কে হেদায়াতের আলোকবর্তিকা দিয়ে পাঠালেন। তিনি মানুষকে একাত্ববাদের দাওয়াত দিলেন। অধিকাংশ মানুষই তাঁর কথা শুনল না। তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দিল। তিনি আজাবের ভয় দেখালেন। তারা আজাবের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। আল্লাহ আজাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নুহ (আ.)-কে নৌকা বানাতে আদেশ করলেন। তিনি নৌকা বানালেন। একদিন রান্নার চুলাগুলো থেকে পানি উথলিয়ে উঠতে শুরু করল। নুহ নবী পরিবার-পরিজন ও বিশ্বাসীদের নিয়ে নৌকায় চড়লেন। পানি বাড়তে লাগল। আকাশ বেয়ে মুষলধারে বর্ষণ পানি হলো। জমিন উথলে দিলো পানি। আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে নৌকা চলল।

Advertisement

নৌকায় আছে নবী পরিবার ও বিশ্বাসীরা। কিন্তু তাঁর এক ছেলে নৌকায় নেই। সে নবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সরে থাকল। এদিকে ভয়ংকরভাবে পানি বাড়ছে। পাহাড়সম ঢেউ উঠছে। জনপদ ডুবে গেছে। এক ভয়ানক সংকটময় মুহূর্ত গিলে ফেলছে পৃথিবীকে। ছেলের জন্য টান পড়ে নবীর মনে। বিভ্রান্ত ছেলের নাম ধরে আওয়াজ করে ডাক দিতে লাগলেন তিনি। (ফি জিলালিল কোরআন, সাইয়িদ কুতুব, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১৮৭৮)

নুহ নবীর এই ছেলের নাম কিনয়ান। সে তার বাবার ওপর ইমান আনেনি। একাত্ববাদের সাক্ষ্য দেয়নি। নবীর সন্তান—নবীর কোলে লালিত-পালিত হয়েছে, নবীর আলোছায়ায় বড় হয়েছে—একসঙ্গে ঘরে বসবাস করত, একসঙ্গে খেত, মিলেমিশ কাজ করত, তবুও তার ভাগ্যে ইমানের মহাদৌলত জুটেনি। নবীর মধ্যে এত পবিত্র গুণ আর উত্তম আদর্শের সমাহার দেখেও সে ইমান আনেনি। বিশ্বাসী হওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারেনি। আকিদা-বিশ্বাসে সে ছিল তার সম্প্রদায়ের লোকদের ধর্মে বিশ্বাসী। কুফুরি মতবাদ লুকিয়ে রেখেছিল সে। পিতৃত্বের সম্পর্কের কারণে তা প্রকাশ করেনি। তার বিচ্ছিন্নতা নিবৃত্ত থাকার উদ্দেশ্যে ছিল। সে তার বাবার বিরুদ্ধে সম্প্রদায়কে সাহায্য করতে চায়নি এবং সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে বাবার অনুসরণ ও তাঁকে সাহায্য করতে চায়নি। (নুহ আ. ওয়া কওমুহু ফিল কোরআনিল মাজিদ, আল-মাইদানি, পৃষ্ঠা: ১২১; নুহ আ. ও মহাপ্লাবন, ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, পৃষ্ঠা: ৩৮৪)

ওদিকে প্রচণ্ড গতিতে পানি বেড়ে চলছে। তখনো পাহাড়ের শীর্ষ চূড়ায় পানি পৌঁছেনি। মহাপ্লাবন শুরু হওয়ার পূর্বমুহূর্ত। কিনয়ান দাঁড়িয়ে আছে এক উঁচু জায়গায়। বিশ্বাসীদের নিয়ে নুহ (আ.)-এর নৌকা চলছে। নবী তাকে বললেন, ‘হে আমার ছেলে, আল্লাহর ওপর ইমান আনো, আমার সঙ্গে নৌকায় আরোহণ করো। অবিশ্বাসীদের সঙ্গে থেকো না। ইমান আনলে ডুবে ধ্বংস হওয়ার কবল থেকে রক্ষা পাবে। মুক্তিপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং তাদের সাথি হও।’ (তাফসিরু সুরাতি হুদ, আহমদ নাওফিল, পৃষ্ঠা: ১৬২)

ছেলে বলল, ‘আমার ওসবে প্রয়োজন নেই। খুব দ্রুতই কোনো পাহাড়ে আশ্রয় নেব।’ কোরআনে আছে, ‘তখন নুহ তার ছেলেকে—যে তাদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল—ডাক দিয়ে বলল, ‘হে আমার ছেলে, আমাদের সঙ্গে আরোহণ করো, কাফেরদের সঙ্গে থেক না। সে (অর্থাৎ নুহের ছেলে) বলল, ‘আমি এক্ষুণি পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি থেকে রক্ষা করবে।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৪২-৪৩)

নুহ (আ.) ছেলেকে নানাভাবে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। আল্লাহর আজাবের কথা বললেন। সর্বগ্রাসী প্লাবনের দৃশ্যের প্রতি অন্তরদৃষ্টি দিতে বললেন। তীব্রগতির প্লাবনেও নৌকার পূর্ণ শান্তি ও স্থির বয়ে চলার দৃশ্য অবলোকনে উপলব্ধি করাতে চাইলেন। কিন্তু সে আগের অবস্থান থেকে সরল না।

বাবা-ছেলের কথোপকথন চলছে। ওদিকে তীব্রগতিতে পানি বেড়ে চলছে। একপর্যায়ে ঢেউ এসে বাবা-ছেলের মাঝখানে আড়াল হয়ে গেল। তাদের কথোপকথনের মাঝে চিরস্থায়ী ছেদ নেমে এলো। সে অন্য সব ডুবে মরা অবিশ্বাসীদের মতো ডুবে ধ্বংস হলো। কাফেরদের সঙ্গে তারও করুণ পরিণতি হলো। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন, মাওলানা মুহাম্মাদ ইদরিস কান্ধলভি, অনুবাদ: আব্দুল্লাহ আল ফারুক, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩২৮)

কিনয়ান বিশ্বাস করেছিল উঁচু পাহাড় তাকে রক্ষা করবে। উঁচু পাহাড়ে আশ্রয় নিলে পানি তাকে ছুঁতে পারবে না। বাবা নুহ (আ.) তাকে বলেছিলেন, এ খেয়াল মন থেকে ঝেড়ে ফেলো। এটি সাধারণ প্লাবন নয়। এটি আল্লাহর গজব। আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস আর নৌকায় আরোহণ ছাড়া কেউ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না। কিনয়ানের চোখের ওপর পড়া গাফলতির বিপুল পুরু আবরণ সত্য ও বিশ্বাসের সৌন্দর্য দেখতে ব্যর্থ হলো। বাবার পবিত্র হাত ধরে জান্নাতের মহানেয়ামত উপভোগ করার গৌরব থেকে বঞ্চিত হলো। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তিনি (নুহ) বললেন, আজকের দিনে আল্লাহ তাআলার হুকুম থেকে কোনো রক্ষাকারী নেই। একমাত্র তিনি যাকে দয়া করেন, সে ছাড়া। এ সময় উভয়ের মাঝে ঢেউ আড়াল হয়ে দাঁড়াল, ফলে সে নিমজ্জিত হলো।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৪৩)

কিনয়ান কাফের হওয়া সত্ত্বেও নুহ (আ.) কেন তাকে নৌকায় আরোহণ করতে বলেছিলেন, এ নিয়ে নানাধর্মী আলাপ পাওয়া যায়। ইমাম রাজি বলেন, ‘নুহ (আ.)-এর সন্তানের ব্যাপারে আলেমদের কাছ থেকে তিনটি অভিমত পাওয়া যায়। যথা—এক. সে মুনাফিক ছিল। নুহ (আ.) তার মুনাফিকির বিষয়ে জানতেন না। বাহ্যিক আচরণ দেখে তাকে মুমিন মনে করে আহ্বান করেছিলেন যে, কাফেরদের সঙ্গ ছেড়ে আমাদের সঙ্গে নৌকায় চড়ে বসো। দুই. নুহ (আ.) জানতেন, কিনয়ান কাফের ছিল। কিন্তু প্লাবনে নিমজ্জিত হওয়ার আগে তাকে এ উদ্দেশ্যে আহ্বান করেছিলেন, সম্ভবত ভয়ানক পরিস্থিতি নিজ চোখে দেখার পর ইমান আনবে। তিন. পিতাসুলভ স্নেহের বশবর্তী হয়ে নুহ (আ.) সেই আবেদন-অনুরোধ পেশ করেছিলেন।’ (তাফসিরে কাবির, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৬২)

নুহ (আ.)-এর ছিল চার ছেলে—ইয়াফিস, সাম, হাম ও কিনয়ান। কিনয়ান মহাপ্লাবনে ডুবে মারা যায়। বাকি তিনজন সম্পর্কে হাফেজ ইবনে কাসির বলেছেন, ‘এই পৃথিবীতে বর্তমানে যত আদম সন্তান আছে তারা সবাই নুহ (আ.)-এর এই তিন ছেলের বংশধর।’ (কাসাসুল কোরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: মাওলানা আব্দুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪০)

ইয়াফিস, সাম, হাম—নুহ (আ.)-এর এই তিন সন্তান তাঁর সঙ্গে নৌকায় আরোহণ করেছিলেন। পরবর্তী পৃথিবীর সব মানুষ এই তিনজনের সন্তান। সাম থেকে আরবদের জন্ম। হাম থেকে হাবশিদের জন্ম। ইয়াফিস থেকে রোমান জাতির জন্ম। (নুহ আ. ও মহাপ্লাবন, ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, পৃষ্ঠা: ১৩১)

সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সাম আরবজাতির পিতা, হাম হাবশিদের পিতা, ইয়াফিস রোমানদের পিতা।’ ( মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২০১২৬; শাওকানি, ফাতহুল কাদির, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২১২)

ইবনু ওহাব বলেন, ‘সাম ইবনু নুহ আরব, পারস্য ও রোমান জাতির পিতা। হাম ইবনু নুহ হাবশি জাতির পিতা এবং ইয়াফিস তুর্কি ও ইয়াজুজ-মাজুজ জাতির পিতা। ইয়াজুজ-মাজুজ ও তুর্কিরা পরস্পর চাচাতো ভাই।’ (তাফসিরে তাবারি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৭৪)