ফ্রিজে থাকা মরদেহের কবরের হিসাব কীভাবে নেওয়া হবে

প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী অনেককে দেশে আনতে বেশ সময় লাগে। দেশে আনা এবং কবরস্থ করার মাঝের সময়টাতে ব্যক্তিকে ফ্রিজিং করে রাখা হয়। এ ছাড়া আরও অনেক কারণে মৃত্যুর পর কারও কারও মরদেহ ফ্রিজিং করার প্রয়োজন পড়ে। প্রশ্ন হলো—ফ্রিজে থাকা মরদেহের কবরের হিসাব কীভাবে নেওয়া হবে?
প্রত্যেক প্রাণীকে মরতে হবে। মৃত্যুর কবল থেকে জগতের কোনো তাবৎ পরাশক্তি, কোনো প্রযুক্তি কাউকে বাঁচাতে পারবে না। মৃত্যুর কাছে সবাই অক্ষম। মৃত্যুর নির্ধারিত সময় থেকে এক সেকেন্ডও বেশি বেঁচে থাকার ক্ষমতা কারও নেই। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা আনয়াম, আয়াত: ১৮৫)
মৃত্যু কাউকে জানান দিয়ে আসে না। কোনো সময় বা নির্ধারিত স্থান ধরে উপস্থিত হয় না। মানুষ জানে না, কার মৃত্যু কোথায় কোন জায়গায় হবে। আল্লাহ বলেন, ‘কোনো প্রাণী এটাও জানে না যে, কোন ভূমিতে তার মৃত্যু হবে।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ৩৪)
মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা জীবিতদের দায়িত্ব। কাফন-দাফনে বিলম্ব করা যাবে না। বিভিন্ন হাদিসে মৃত্যুর পর দাফন পর্যন্ত কাজগুলো বিলম্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে। হাদিসে আছে, ‘তালহা ইবনে বারা (রা.) অসুস্থ হলে হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাকে দেখতে গেলেন। এরপর বললেন, আমি তালহার মধ্যে মৃত্যুর আলামত দেখতে পাচ্ছি। সে মারা গেলে আমাকে জানাবে। তোমরা দ্রুত কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে। কেননা কোনো মুসলমানের মরদেহকে পরিবারের লোকদের মাঝে আটকে রাখা উচিত নয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩১৫৯)
ইসলাম ধর্মমতে, মৃত ব্যক্তিকে দাফন করে সঙ্গীরা ফিরে যাওয়ার পর পরই কবরে মুনকার-নাকির নামে দুজন ফেরেশতা আসেন। তারা তাকে প্রশ্ন শুরু করেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘মৃত ব্যক্তি কবরে আগত মানুষের জুতার শব্দ শুনতে পায়, যখন তারা ফিরে যেতে থাকে। আর তখনই তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, হে অমুক, তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী এবং তোমার নবী কে?’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৫৩)। আরেক হাদিসে আছে, ‘মৃত্যুর পর রুহকে তার শরীরে ফিরিয়ে আনা হয় এবং দুজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে প্রশ্ন শুরু করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮৫৫৭)
ইসলামি বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষের মৃত্যুর পর কেয়ামত পর্যন্ত সময় হলো আলমে বারজাখ। মানুষ যেভাবে, যেখানেই মৃত্যুবরণ করুক না কেন, তার দাফন হোক বা না হোক, তার মৃত্যু পরবর্তী জীবন শুরু হয়ে যায়। মৃত ব্যক্তির মরদেহ যদি ফ্রিজিং করেও রাখা হয়, সেখানেই সে জান্নাতি হলে নেয়ামত পাবে। জাহান্নামি হলে শাস্তি পাবে। কারণ, এখানে রুহ হলো প্রধান বিষয়। ফ্রিজিং অবস্থায় রেখে যেহেতু পরে কবরে দাফন করা হয়, তাই তার প্রশ্নোত্তর পর্ব কবরে রাখার পরই শুরু হবে। কেননা হাদিসে আছে, ‘মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখার পরই প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়।’
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ ইউটিউবে ‘কবরে দাফন না করলে তার কবরের হিসাব কীভাবে নেওয়া হয়’ প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘মৃত্যুর পরই মানুষ আলমে বারজাখে প্রবেশ করে। চাই সে মৃত্যুর পর ফ্রিজে থাকুক, নদীতে মাছের পেটে খাবার হোক বা বাঘের পেটে থাকুক, ব্যক্তির ধ্বংসাবশেষ যেখানেই থাকুক না কেন, তার মৃত্যু পরবর্তী জীবন সেখানেই শুরু হবে। ব্যক্তি নেককার হলে নেয়ামত পাবে, বদকার হলে শাস্তি পাবে। কারণ, মৃত্যুর পরই মানুষের মধ্যে রুহ দিয়ে দেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘মানুষের মৃত্যুর পর তার লাশ যদি ফ্রিজে রেখে দেওয়া হয়, তার মরদেহ যদি কোনো কিছু খেয়ে ফেলে, সেখানেও আল্লাহ তার সওয়াল-জবাবের ব্যবস্থা করবেন। এটা কীভাবে করা হবে, আল্লাহ ভালো জানেন।’
হাদিস বিশেষজ্ঞ ও ইসলামি স্কলার ড. সাইফুল্লাহ বলেন, ‘মানুষকে কবরস্থ করা হলেই দুজন ফেরেশতা আসেন। তারা তাকে প্রশ্ন করেন। মৃত্যুর পর মানুষকে যেখানে সমাধি হিসেবে রাখা হয়, সেটি কবর। সেটি পানিতে হতে পারে, ফ্রিজে হতে পারে, কবরে হতে পারে বা সিন্দুকে হতে পারে। মৃত্যুর পর তাকে যেখানে রাখা হবে, সেখানেই তার প্রশ্নোত্তর শুরু হবে।’
অদৃশ্য জগত সম্পর্কে আল্লাহ ভালো জানেন জানিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ‘ফ্রিজিং অবস্থায় মৃত ব্যক্তির প্রশ্নোত্তর শুরু হবে নাকি কবর দেওয়ার পর শুরু হবে, এটা আল্লাহ ভালো জানেন। এ বিষয়ে কোরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট কিছু নেই।’




