সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ করলে হবে?

বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের মানুষ সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা রাখেন ও ভাঙেন। ঈদের নামাজও আদায় করেন সৌদির সঙ্গে মিল রেখে। তবে দেশের বেশিরভাগ মানুষ ঈদ উদযাপন করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে চাঁদ দেখার ঘোষণা অনুযায়ী বা ৩০ রোজা পূর্ণ হওয়ার পর দিন। অনেকের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করা যাবে?
বাংলাদেশ কখন ঈদ উদযাপন করা হয়
মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুই ঈদ—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এ উৎসব দুটি পালন করা হয় দেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। ২৯ রোজার দিন চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক বসে। দেশের আকাশে কোথাও শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে পরদিন ঈদুল ফিতর পালন করা হয়। অন্যথায় ৩০ রোজা পূর্ণ হওয়ার পর দিন পালন করা হয়।
এদিকে দেশের কয়েকটি জেলার বেশ কিছু গ্রামে ঈদ পালন করা হয় সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে। এটির শুরু হয়েছে চাঁদপুরে, ১৯২৮ সালে। এর প্রচলন করেন জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা দরবার শরিফের পীর মাওলানা ইসহাক (রহ.)।
ঈদের দিন নিয়ে হাদিসে কী আছে
ইসলামি শরিয়তের যেসব বিধান বছরে একবার আদায় করতে হয়, সেগুলো সাধারণত চাঁদকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। চাঁদ দেখে সেসব বিধান পালন করতে হয়। যেমন—হজ, জাকাত, রোজা, ঈদ ও কোরবানি ইত্যাদি। আর যেসব বিধান প্রতিদিন আদায় করতে হয়, সেগুলো সূর্যের বিভিন্ন অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে করতে হয়। সূর্যের সময়ের সঙ্গে সেগুলো নির্ধারিত। যেমন—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সাহরি-ইফতার ও নামাজের নিষিদ্ধ সময়সমূহ।
এ মূলনীতির আলোকে রমজান মাস শুরু হওয়া কিংবা শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে ঈদ পালন করা নির্ভর করে মূলত চাঁদ দেখার ওপর। আবার চাঁদের উদয়াস্তের ভিন্নতাও একটি প্রমাণিত বিষয়। কেননা সমগ্র বিশ্বে চাঁদের দিগন্ত রেখা এক নয়। বরং ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই সাধারণভাবে নিজ দেশের চাঁদ দেখা বা নির্ভরযোগ্য ঘোষণা অনুযায়ী চাঁদ দেখা প্রমাণিত হওয়ার পরই শুধু ঈদ উদযাপন করা যাবে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভাঙো অর্থাৎ ঈদ করো।’ আরেক হাদিসে আছে, ‘যদি চাঁদ দেখা না যায় (মেঘ কিংবা প্রাকৃতিক কোনো কারণে), তবে ৩০ দিন পূর্ণ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৯, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৮১)
এ হাদিস অনুযায়ী দেশের আকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে মাসের ১ তারিখে ঈদুল ফিতর পালন করতে হবে। মেঘ বা প্রাকৃতিক কোনো কারণে চাঁদ দেখা না গেলে ৩০ রোজা পূর্ণ করে পরদিন ঈদ উদযাপন করতে হবে। কোনো দেশের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালনের কথা কোরআন-হাদিসে কোথাও পাওয়া যায় না।
সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ঈদ করা যাবে?
জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার প্রধান মুফতি মাওলানা হিফজুর রহমান বলেন, ‘যারা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করেন, তারা ইসলামি বিধান বা হাদিস মানেন না। তারা তো সৌদির সঙ্গে মিল রেখে জোহর বা আসরের নামাজ পড়েন না। ইসলামি বিধান অনুযায়ী আমারা চাঁদ বা সূর্য ওঠার সঙ্গে মিল রেখে নামাজ পড়ি। ঈদের বিষয়টিও তেমন। সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ঈদ করা যাবে না। এটি শরিয়াসম্মত নয়।’
কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্ট্যাডিজ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. হাফেজ এবিএম হিজবুল্লাহ বলেন, ‘দেশের কোনো কোনো জায়গায় সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ ও রোজা পালন করা হয়। এটি সঠিক নয়। রোজা বা ঈদ সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এর সব কিছুই স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার সঙ্গে সম্পৃক্ত।’
রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মানতে হবে
মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হলো, দেশের চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদ পালন করা। ইসলামি বিধান হচ্ছে, যদি কোনো এলাকায় সরকারি বা শরিয়তসম্মত ঘোষণা ছাড়াই অন্য দেশের অনুসরণ করে ঈদ করা হয়, তাহলে তা শরিয়তসম্মত হবে না। কারণ ইসলামে সমাজ ও মুসলিম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঐক্য বজায় রাখার নির্দেশ আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজা সেই দিন, যেদিন তোমরা সবাই রোজা রাখো; আর ঈদও হবে সেই দিন, যেদিন তোমরা সবাই ঈদ করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬৯৭)
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘কোরবানি তো সেদিন, যেদিন ইমাম (মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান) ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কোরবানি করে। ঈদুল ফিতর তো সেদিন, যেদিন ইমাম ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রোজা ভাঙে।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭৩১০)। অর্থাৎ মুসলিম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা ঈদ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অধ্যাপক এবিএম হিজবুল্লাহ বলেন, ‘দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে চাঁদ দেখার ঘোষণা আসলে ঈদ উদযাপন করতে হবে। রাষ্ট্র ঘোষিত সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে।’