যে ৫ আমলে দ্রুত রিজিক বাড়ে

রিজিক নিয়ে সবাই দুশ্চিন্তায় থাকেন। যত উপার্জন হোক না কেন, মনে হয়, আরেকটু যদি হতো। তার ওপর বিপদ লেগেই থাকে। প্রত্যেক মাসে চিন্তা থাকে, এই মাসে কিছু একটা করব। কিন্তু বিপদ, অসুস্থতা কিংবা হঠাৎ কোনো প্রয়োজনের কারণে টাকা যে কীভাবে ব্যয় হয়ে যায়, হিসাব পাওয়া যায় না। এই যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বেশিরভাগ সময় রিজিক নিয়ে পেরেশানি, সেটা দূর করার উপায় কী?
উপায় হলো, যিনি রিজিকের মালিক, তিনি রিজিক নিয়ে কী বলছেন সেটা ফলো করা। রিজিক শুধু অনেক চেষ্টা করে যাওয়ার নাম না; রিজিক হলো মালিকের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়ারও নাম। আমাদেরকে যেমন চেষ্টা করতে হবে, তেমনি আল্লাহর কথামতো রিজিক তাঁর কাছে চাইতে হবে, আমল করতে হবে।
আল্লাহ কোরআনে এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর হাদিসে রিজিকের বরকতের কিছু পথ আমাদের দেখিয়েছেন। এখানে রিজিক বৃদ্ধির পাঁচটি আমল উল্লেখ করা হলো—
তাকওয়া অবলম্বন করা
রিজিকের সঙ্গে তাকওয়ার সম্পর্কটা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। আমরা মনে করি, বেশি রিজিক মানেই বেশি পরিশ্রম, বেশি ব্যবসা, বেশি সুযোগ। অথচ আল্লাহ বলছেন, তাঁর ওপর তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অবলম্বন করাও রিজিকের একটি দরজা। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে রিজিক দেন এমন উৎস থেকে, যা সে কল্পনাও করে না।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)। এমন জায়গা থেকেও রিজিক আসতে পারে, যার কথা মানুষ আগে কখনও চিন্তাই করেনি।
রিজিকের বিষয়ে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের (ভরসা) বিষয়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে তাওয়াক্কুল করতে, তাহলে তিনি তোমাদেরকে পাখির মতো রিজিক দিতেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১৬৪)। পাখি কিন্তু বাসায় বসে থেকে রিজিকের অপেক্ষা করে না। সকালে বের হয়, চেষ্টা করে, তারপর আল্লাহ তার রিজিকের ব্যবস্থা করেন। তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। চেষ্টা করতে হবে, কিন্তু ভরসা রাখতে হবে রিজিকের মালিকের ওপর।
বেশি বেশি ইসতেগফার ও তাওবা করা
কখনো কখনো আমরা রিজিকের সমস্যা সমাধানের জন্য চারদিকে তাকাই, কিন্তু নিজের আমলনামার দিকে তাকাই না। অথচ নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২)
খেয়াল করুন, এখানে ইসতেগফারের পরই এসেছে বৃষ্টি, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির কথা। তাই রিজিকের জন্য শুধু নতুন নতুন রাস্তা খোঁজার পাশাপাশি পুরোনো গুনাহগুলো থেকেও ফিরে আসতে হবে। মুখে শুধু ‘রিজিক চাই’ বললেই হবে না, আল্লাহর কাছে ক্ষমাও চাইতে হবে। ইসতেগফার শুধু গুনাহ মাফের আমল নয়, বরং আল্লাহর রহমত ও বরকত পাওয়ারও একটি দরজা।
নামাজকে জীবনের অগ্রাধিকার দেওয়া
আমরা রিজিকের জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটতে পারি। ব্যবসা, চাকরি, অফিস, মার্কেট, মিটিং, পরিকল্পনা, পরিশ্রম, সবকিছু করতে পারি। কিন্তু নামাজের সময় এলে যদি মনে হয়, ‘এখন সময় নেই’, তাহলে আমাদের অগ্রাধিকারটা কোথায়, সেটাও একবার ভাবা দরকার। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার পরিবারকে নামাজের নির্দেশ দাও এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকো। আমি তোমার কাছে কোনো রিজিক চাই না; আমিই তোমাকে রিজিক দিই।’ (সুরা তহা, আয়াত: ১৩২)
কী অসাধারণ কথা! নামাজের জন্য সময় দিলে রিজিকের সময় কমে যাবে, এমন নয়। বরং আল্লাহ নিজেই জানিয়ে দিচ্ছেন, রিজিক দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর। তাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি বানাতে হবে। তাহাজ্জুদও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত। তবে তাহাজ্জুদকে ‘রিজিক বৃদ্ধির নিশ্চিত আমল’ হিসেবে নির্দিষ্ট করে কোনো সহিহ হাদিসের বক্তব্য না থাকায়, এখানে মূল দলিল হিসেবে নামাজের ব্যাপারে কোরআনের এই নির্দেশনাই যথেষ্ট।
আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখা
রিজিকের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু আল্লাহর সঙ্গে নয়, মানুষের সঙ্গেও জড়িত। বিশেষ করে আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারও সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছে, কথা বন্ধ, ফোন আসে না, খোঁজ নেওয়া হয় না, অথচ মনে হয় রিজিকে কেন বরকত নেই! হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কামনা করে যে, তার রিজিক প্রশস্ত করা হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি করা হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৭)
রিজিকের বরকতের একটি রাস্তা হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। তাই আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করুন। অভিমান থাকলে কমান। ফোন করে খোঁজ নিন। প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়ান। হয়তো সেই ফোনকলের বিনিময়ে কোনো টাকা পাওয়া যাবে না। কিন্তু আল্লাহর কাছে সেই সম্পর্ক রক্ষা করাটাই আপনার রিজিকের বরকতের কারণ হয়ে যেতে পারে।
সদকা করা
রিজিকের বিষয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, ‘আমার কাছে টাকা কম, তাই এখন দান করার সময় নয়।’ অথচ ইসলাম আমাদের উল্টো একটা শিক্ষা দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা কিছু আল্লাহর পথে ব্যয় করো, তিনি তার পরিবর্তে তা দিয়ে দেন।’ (সুরা সাবা, আয়াত: ৩৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা সম্পদ কমিয়ে দেয় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)। দান করলে হাতে থাকা টাকার অঙ্ক কমে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কাছে সেটাই সম্পদ কমে যাওয়া নয়। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করুন। কাউকে খাবার খাওয়ানো, কোনো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, গোপনে সাহায্য করা, কিংবা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পদ ব্যয় করা, সবই সদকার অংশ হতে পারে।
রিজিকের চিন্তায় আমরা অনেক সময় শুধু হিসেব করি, কীভাবে আয় বাড়াব? কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও করা দরকার, কীভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করব? কারণ রিজিক শুধু ব্যাংক-ব্যালেন্সের নাম নয়। রিজিক হলো এমন অর্থ, যা হালাল পথে আসে এবং তাতে বরকত থাকে। রিজিক হলো এমন উপার্জন, যা দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়, আল্লাহর পথে খরচ করা যায়। তাই চেষ্টা করুন। হালাল পথে উপার্জনের চেষ্টা করুন। সঙ্গে তাকওয়া অবলম্বন করুন, ইসতেগফার করুন, নামাজ ঠিক করুন, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখুন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সদকার করুন। তারপর ফলাফলের চিন্তাটা ছেড়ে দিন সেই সত্তার ওপর, যিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহই রিজিকদাতা, শক্তির অধিকারী, পরাক্রমশালী।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৫৮)




