পিঁপড়ার গল্প ও রানি বিলকিসের ইসলাম গ্রহণ

আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ১৯তম পারা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা ফুরকানের ২১ থেকে সুরা শুআরা ও সুরা নামলের ১ থেকে ৫৯ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। তারাবির এই অংশে কোরআনের নেয়ামত, অবিশ্বাসীদের প্রশ্নের জবাব, পূর্ববর্তী নবী ও তাঁদের জাতি, আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর কুদরত, আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের গুণ, অপচয়, অহংকার, ব্যবসায় সঠিক ওজন দেওয়া, মানুষের হক নষ্টের পরিণাম, বিভিন্ন জাতি ধ্বংসের কারণ, সোলায়মান (আ.) ও পিঁপড়ার ঘটনা, হুদহুদ পাখির সংবাদ সংগ্রহ, সাবার রানি বিলকিসের আত্মসমর্পণ, মুমিন জীবনে পরীক্ষা ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে।
জালিমদের জন্য ভয়ানক দিন
অবিশ্বাসীদের কিছু আপত্তি ও অনর্থক দাবির জবাব দেওয়া হয়েছে সুরা ফুরকানের ২১ থেকে ৩৪ নম্বর আয়াতে। তারা বলেন, ‘আমাদের কাছে ফেরেশতা আসে না কেন কিংবা কেন আমরা আল্লাহকে দেখি না।’ জবাবে বলা হয়েছে, মুশরিকরা মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের দেখতে পাবে। কিয়ামতের দিনটা তাদের জন্য ভয়ানক হবে। সেদিন তারা প্রচণ্ডরকম আফসোস করবে।
আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের ১৪ বৈশিষ্ট্য
আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বিশেষ কিছু গুণের কথা বলা হয়েছে সুরা ফুরকানের ৬৩ থেকে ৭৭ নম্বর আয়াতে। গুণগুলো হলো—
- তারা পৃথিবীতে বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে।
- মূর্খদের ক্ষমা করে।
- রাত জেগে ইবাদত করে।
- জাহান্নামের ভয় করে।
- তারা মিতব্যয়ী।
- আল্লাহর ইবাদত করে।
- অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে না।
- ব্যভিচার করে না।
- তওবা করে।
- মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না।
- বেহুদা আমোদ-প্রমোদ এড়িয়ে চলে।
- পবিত্র কোরআন যথাযথ শোনে।
- উত্তম স্ত্রী ও সন্তান লাভে আল্লাহর কাছে দোয়া করে।
- সঠিক পথের দিশা ও অন্যদের সঠিক পথ দেখানোর সুযোগ কামনা করে।
সুরা শুআরায় আছে বিভিন্ন জাতি ধ্বংসের বয়ান
সুরা শুআরা মক্কায় অবতীর্ণ। এর আয়াত সংখ্যা ২২৭। এটি মক্কায় অবতীর্ণ। শায়ির শব্দের বহুবচন শুআরা। অর্থ কবি। সুরার শেষের দিকে কবিদের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, তাই সুরার নাম রাখা হয়েছে শুআরা। (হিদায়াতুল কোরআন, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ১৫৯)
মহানবী (সা.)-এর মনখারাপে আল্লাহর সান্ত্বনা
নবুওয়াত পাওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার মানুষকে ধাপে ধাপে ইসলামের দাওয়াত দেন। কাফেররা ইমান না আনার কারণে মহানবীর মন খারাপ হতো। সুরার শুরুতে আল্লাহ তাঁকে এ বিষয়ে সান্ত্বনা দিয়েছেন। আল্লাহ চাইলে পৃথিবীর সবাই ইমানদার হয়ে যেত। কিন্তু তিনি কাউকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেন না। মানুষের কাছে উপদেশ ও নিদর্শন পাঠিয়ে গ্রহণ-অগ্রহণের সুযোগ দেন।
বিভিন্ন জাতির কাহিনি
মুসা-হারুন (আ.) ও ফেরাউনের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ, ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পিতার কাহিনি, নুহ (আ.)-এর জাতি ধ্বংসের কারণ, হুদ (আ.) ও আদ জাতির ঘটনা, সালেহ (আ.) ও সামুদ জাতির বর্ণনা, লুত (আ.)-এর জাতি ধ্বংসের কারণ, শোয়াইব (আ.) ও মাদায়েনবাসীর আলোচনা রয়েছে এ সুরার ১০ থেকে ১৯১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত।
সুরা নামলে আছে পিঁপড়ার গল্প
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা নামলের আয়াত সংখ্যা ৯৩। এটি কোরআনের ২৭তম সুরা। নামল অর্থ পিঁপড়া। এ সুরায় পিঁপড়ার কথোপকথন থাকায় এটিকে সুরা নামল বলা হয়।
স্বজাতি রক্ষায় পিঁপড়ার ভূমিকা
সোলায়মান (আ.)-কে বিশেষ জ্ঞান ও ক্ষমতা দান করেছিলেন আল্লাহ তাআলা। সোলায়মান ছিলে বাদশাহ। ছিলেন অঢেল সম্পদের অধিকারী। রাজ্য নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার কাজে জিন ও পাখিসহ অন্য প্রাণীদের কাজে লাগাতেন তিনি। মানুষের ভাষাসহ অন্যান্য প্রাণীর ভাষা বুঝতেন তিনি। আল্লাহ বলেন, ‘যখন সোলায়মান ও তার বাহিনী পিঁপড়ার উপত্যকায় পৌঁছাল, তখন এক নারী পিঁপড়া বলল, হে পিঁপড়ারা, গর্তে প্রবেশ করো। এমন যেন না হয়, সোলায়মান এবং তার সৈন্যরা তোমাদের পিষে ফেলবে, তোমরা তা টেরও পাবে না। সোলায়মান (আ.) পিঁপড়ার কথায় মৃদু হাসলেন।’ (সুরা নামল, আয়াত: ১৮-১৯)
সুরা নামলের এই আয়াত পাঠে পিঁপড়ার জীবনযাত্রা সম্পর্কে চারটি ধারণা পাওয়া যায়। যথা—
এক. কথা বলতে পারে পিঁপড়া। যেমন আয়াতে বর্ণিত পিঁপড়াটি অন্য পিঁপড়ার সঙ্গে কথা বলেছে।
দুই. নারীশাসিত পতঙ্গ পিঁপড়া। তাদের একজন রানি থাকে। পুরুষ পিঁপড়া থাকে ঘরে আর নারী পিঁপড়া থাকে বাইরে। সোলায়মান (আ.) এবং তাঁর বাহিনী এসে পড়লে রানি পিঁপড়া সবাইকে নিজ নিজ ঘরে প্রবেশের নির্দেশ দেয়।
তিন. পিঁপড়া আলাদা করে মানুষ চিনতে পারে। যেমন সোলায়মান (আ.)-কে চিনেছিল।
চার. পিঁপড়া বিপৎসংকেত বুঝতে পারে। পিঁপড়া সোলায়মানের আগমন এবং বিপৎসংকেত বুঝতে পেরে সবাইকে সতর্ক করেছিল।
রানি বিলকিসের ইসলাম গ্রহণ
সোলায়মান (আ.)-এর একটি পাখি ছিল হুদহুদ। এটি রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার হতো। পাশের দেশে কী হচ্ছে, কোথায় কী ঘটছে, কোন রাজা কোথায় সৈন্য পাঠাচ্ছে ইত্যাদি বিষয়ে খোঁজখবর নিতে এ পাখি ব্যবহার করতেন সোলায়মান নবী। একবার তিনি পাখিকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কোরআনে ঘটনার বর্ণনা এসেছে এভাবে, ‘একদিন সোলায়মান (আ.) পাখিদের খোঁজখবর নিলেন, এরপর বললেন, কী হলো, হুদহুদকে দেখছি না কেন? নাকি সে অনুপস্থিত? আমি অবশ্যই তাকে কঠোর শাস্তি দেব কিংবা হত্যা করব, যদি না সে অনুপস্থিত থাকার যথাযথ কারণ দেখায়। কিছুক্ষণ পর হুদহুদ এসে বলল, আপনি অবগত নন এমন একটি বিষয়ে আমি অবগত হয়েছি। আমি সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে আগমন করেছি। আমি এক নারীকে সাবাবাসীর ওপর রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছুই দেওয়া হয়েছে এবং তার একটা বিরাট সিংহাসন আছে। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যাবলি সুশোভিত করে দিয়েছে। এরপর তাদের সৎপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। অতএব তারা সৎপথ পায় না।’ (সুরা নামল, আয়াত : ২০-২৪)
সোলায়মান (আ.) রানি বিলকিসের কাছে বার্তা পাঠালেন। সব ভেবেচিন্তে নবী সোলায়মানের দরবারে এলেন রানি বিলকিস। স্বচ্ছ স্ফটিক নির্মিত প্রাসাদ দেখে যারপরনাই বিস্মিত হলেন রানি। এদিকে আবার নিজের সিংহাসন সোলায়মান (আ.)-এর কাছে দেখে বিস্ময়ে অবাক হন। পরে সোলায়মানের ধর্মে দীক্ষিত হন।