logo

কাঠমিস্ত্রির গল্প ও আইয়ুব (আ.)-এর ধৈর্যের পুরস্কার

কাঠমিস্ত্রির গল্প ও আইয়ুব (আ.)-এর ধৈর্যের পুরস্কার
ছবি : সংগৃহীত

আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ২৩তম পারা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা ইয়াসিনের ২২ থেকে সুরা সাফফাত, সুরা সোয়াদ, সুরা জুমারের ১ থেকে ৩১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। এই অংশে আল্লাহর জন্য ইবাদত, জাহান্নামিদের পরস্পরকে দোষারোপ, অবিশ্বাসীদের পরিণতি, নবীদের প্রতি অবিশ্বাসীদের উপহাস, আল্লাহর অস্তিত্ব, হাবিব নাজ্জারের উপদেশ, কিয়ামতের ভয়াবহতা,  মায়ের উদরে মানুষের অবস্থান, ইসলামি আকিদা-বিশ্বাস, শিঙায় ফুঁক, হিসাব-নিকাশ, কোরআনের অলৌকিকতা, মুশরিকদের আপত্তির জবাব, আদম (আ.), শয়তানের কাহিনি ও মৃত্যু-পরবর্তী জীবন, ফেরেশতাদের ইবাদত ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা আছে।  

কাঠমিস্ত্রি হাবিব নাজ্জারের গল্প 
পৃথিবীতে ইসা (আ.) আগমনের আগের ঘটনা। সেই যুগে সমৃদ্ধি ও স্থাপত্যে প্রসিদ্ধ এক নগরী ছিল তৎকালীন আন্তাকিয়া শহর (বর্তমান তুরস্কে অবস্থিত)। আন্তাকিয়ার লোকেরা মূর্তিপূজা ও অন্যায়-অনাচারে লিপ্ত ছিল। বহু উপসনায় বিশ্বাসী ছিল। তাদের হেদায়াতের জন্য তিনজন রাসুল পাঠিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। তারা হলেন শামউন, ইউহান্না ও বাবুলস। 

হাবিব ইবনে ইসমাইল নামে এক কঠিমিস্ত্রি থাকতেন ওই শহরের এক প্রান্তে। ইতিহাস তাকে চেনে হাবিব নাজ্জার নামে। তাঁর ছিল কুষ্ঠরোগ। এই রোগের বহু চিকিৎসা করেছেন তিনি। উপাসকদের কাছে মনপ্রাণ উজাড় করে প্রার্থনা করেছেন। কাজ হয়নি। হতাশায় পড়ে গেলেন। রাসুলদের সঙ্গে একদিন তাঁর দেখা হয়। তাঁরা তাঁকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেন। তিনি তাঁদের কাছে রাসুল হওয়ার প্রমাণ চান। তাঁরা প্রমাণ দেখাতে পারবেন জানালেন। তিনি কুষ্ঠরোগের কথা বললেন। তাঁরা বললেন, আমরা আমাদের উপাসকের কাছে প্রার্থনা করব। তিনি ভালো করে দেবেন। হাবিব বেশ আশ্চর্য হলেন তাঁদের কথায়। এত দিন এত ওষুধ আর উপসনা করেও কাজ হয়নি, তাঁরা বলছেন, তাঁদের উপাসক পারবেন। তিনি ঈমান আনেন। একদিন সুস্থ হয়ে উঠেন। তিনি নির্জনে নগরীর এক প্রান্তে আল্লাহর ইবাদত করতে থাকেন। 

আন্তাকিয়বাসী রাসুলদের দাওয়াত গ্রহণ করেনি; বরং তাঁদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে থাকল। তাঁরা দাওয়াত দিতে থাকেন। একপর্যায়ে কাফেররা রাসুলদের হত্যার নীলনকশা করছে, এ খবর পায় হাবিব নাজ্জার। তিনি দ্রুত শহরে এসে তাদের সতর্ক করতে থাকেন। বোঝাতে থাকেন। কাজ হয়নি। কাফেররা তাঁর ওপর উদ্যত হয়ে তাঁকে হত্যা করল। আল্লাহ তাঁকে পুরস্কার হিসেবে দেন জান্নাত। সুরা ইয়াসিনের ১৯ থেকে ২৭ নম্বর আয়াতে এই কাহিনির বিবরণ রয়েছে। 

সূর্য আরশের নিচে পৌঁছে সেজদা করে
সুরা ইয়াসিনের ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘সূর্য তার নির্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ।’ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হজরত কাতাদা বলেন, ‘সূর্য তার কক্ষ পথে মজবুত ও অটল ব্যবস্থাধীনে ভ্রমণ করছে। এতে কখনও এক মিনিট ও এক সেকেন্ডের পার্থক্য হয় না। সূর্যের এই গতি চিরস্থায়ী নয়। তার একটি বিশেষ অবস্থান আছে; যেখানে পৌঁছে তার গতি স্তব্ধ হয়ে যাবে। সেটা হচ্ছে কিয়ামতের দিন।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির) 

হাদিসে আছে, “আবু জার গিফারি (রা.) একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সূর্যাস্তের সময় মসজিদে উপস্থিত ছিলেন। নবিজি বললেন, ‘আবু জার, সূর্য কোথায় অস্ত যায়, জানো?’ আবু জার বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘সূর্য চলতে চলতে আরশেরে নিচে পৌঁছে সেজদা করে।” (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা: ১১৩৩) 

সুরা সাফফাতের বিষয়বস্তু
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা সাফফাতের আয়াত সংখ্যা ১৮২ আয়াত । এটি কোরআনের ৩৭ তম সুরা। সাফ অর্থ কোনো জনসমষ্টিকে এক সরলরেখায় সন্নিবেশিত করা। এ সুরার ১৬৫ নম্বর আয়াতে ফেরেশতাদের সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার বর্ণনা রয়েছে, তাই এর নাম রাখা হয়েছে সুরা সাফফাত। এ সুরায় ফেরেশতাদের ইবাদত, জিনদের লুকিয়ে লুকিয়ে ঊর্ধ্বমহলের সংবাদ শোনার চেষ্টা, জ্বলন্ত অঙ্গার দিয়ে তাদের ধাওয়া করা, পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ ও প্রতিদান, আল্লাহর সৃষ্টির বিবরণ, মুশরিকদের অস্বীকার, জাহান্নামিদের একে অপরকে দোষারোপ, জান্নাতিদের কথোপকথন, নুহ, ইবরাহিম, মুসা, হারুন, ইলিয়াস, লুত ও ইউনুস (আ.)-এর কাহিনির বয়ান রয়েছে।  

পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের গল্প আছে সুরা সোয়াদে
সুরা সোয়াদ মক্কায় অবতীর্ণ। এর আয়াত সংখ্যা ৮৮। এটি কোরআনের ৩৮ তম সুরা।  এ সুরায় কোরআনের মুজেজা, আল্লাহর একাত্ববাদ, ঈমানের মূল ভিত্তি, নবি-রাসুলদের দাওয়াতের পদ্ধতি, পরকাল, অবিশ্বাসীদের অহংকার, সৎকাজের বিরোধিতা, আগের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পরিণতির বয়ান, দাউদ, সোলাইমান, আইয়ুব, ইবরাহিম, ইসহাক, ইয়াকুব, ইসমাইল, ইয়াসা ও জুলকিফল (আ.)-এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ রয়েছে। 

ধৈর্যের পুরস্কার পেয়েছিলেন আইয়ুব (আ.)
সুরা সোয়াদের ৪১ থেকে ৪৪ নম্বর আয়াতে আইয়ুব (আ.)-এর রোগ, তাঁর ধন-সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, সব কিছুতে তাঁর ধৈর্যধারণ এবং পরে আল্লাহর পুরস্কারের বর্ণনা রয়েছে। আইয়ুব (আ.) ছিলেন ইয়াকুব (আ.)-এর বংশধর। তাঁর ছিল প্রচুর ধন-সম্পদ। বাগান, ফলফলাদি ও ফসলি জমির কমতি ছিল না। আল্লাহর অনুগ্রহে ভরপুর ছিল তাঁর জীবন। একবার আল্লাহ তাঁর পরীক্ষা নিতে চাইলেন। আল্লাহ তাঁকে দুরারোগ্য এক রোগ দেন। তাঁর সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায়। সন্তান-সন্ততি হারিয়ে যায়। তিনি তখন একা। তাঁর পাশে কেউ নেই। আছেন শুধু তাঁর একজন পুণ্যবতী স্ত্রী। তিনি সারাক্ষণ স্বামীর সেবা করতেন। শেষে নিজেদের খরচ মেটাতে অন্যের বাসায় কাজ করতেন। আইয়ুব (আ.)-এর রোগ, অভাব ও কষ্ট বাড়তে থাকে। এভাবে মাস পেরিয়ে বছর যায়, বছরের পর বছর। কোনো কোনো তাফসিরবিদ বলেন, এভাবে ১৮ বছর গেল। তিনি পড়ে থাকেন সম্পদহীন, সন্তানহীন, সঙ্গীহীন, আত্মীয়হীন; আছেন শুধু এক স্ত্রী। কিন্তু তিনি প্রতি মুহূর্তে ডাকতে থাকেন আল্লাহকে। প্রার্থনা করতে থাকেন। প্রার্থনায় আছে সর্বোচ্চ আদব ও নিষ্ঠা। অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই; শুধু মধুময় আবেদন। আল্লাহ তাঁর ধৈর্য ও ডাকে খুশি হলেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন। দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিলেন। পরিবার-পরিজন দিলেন। দিলেন আগের চেয়ে বেশি নেয়ামত ও রহমত। 

যা আছে সুরা জুমারে
সুরা জুমার কোরআনের ৩৯তম সুরা। এর আয়াত সংখ্যা ৭৫। এটি মক্কায় অবতীর্ণ । আজকের তারাবিতে এ সুরার প্রথম ৩১ টি আয়াত পড়া হবে। এখানে আল্লাহর একাত্ববাদ, রাসুল (সা.)-এর মুজেজা কোরআন, লোক দেখানো ইবাদত নিষেধ, বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের উদাহরণ, আল্লাহর একাত্ববাদের দলিল, মানুষের সৃষ্টির পর্যায়ক্রম ইত্যাদির আলাপ আছে