ফজরের নামাজের পর যেসব দোয়া পড়বেন

প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন ফজিলতপূর্ণ দোয়া পড়তেন। বিশেষ করে ফজর ও মাগরিব নামাজের পর পাঠ করার মতো অনেক ফজিলতপূর্ণ দোয়া হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে। এখানে ১০টি দোয়া উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলতসহ উল্লেখ করা হলো-
১. রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ফজর ও মাগরিবের পর কারও সঙ্গে কথাবার্তা না বলে সাতবার দোয়াটি পাঠ করে এবং ওই দিনে বা রাতে তার মৃত্যু হলে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৭৯)। দোয়াটি হলো-
اللَّهُمَّ أَجِرْنِي مِنَ النَّارِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করুন।
২. ফজর ও মাগরিব নামাজের পর সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস; প্রতিটি সুরা তিনবার করে পাঠ করলে সব ধরনের অনিষ্টতা থেকে হেফাজত থাকা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সকাল-সন্ধ্যায় এগুলো পাঠ করলে সব প্রকার অনিষ্টতা থেকে হেফাজতের জন্য যথেষ্ট হবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৭৫)
৩. ফজর ও মাগরিব নামাজের পর তিন বার একটি দোয়া পড়লে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা তিনবার করে দোয়াটি পাঠ করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সন্তুষ্ট করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৮৯)
দোয়াটি হলো-
رَضِيتُ باللهِ رَبَّاً، وَبِالْإِسْلَامِ دِيناً، وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيَّاً
উচ্চারণ: রাদিতু বিল্লাহি রাব্বান ওয়াবিল ইসলামি দ্বীনান ওয়াবি মুহাম্মাদিন নাবিইয়ান।
অর্থ: আমি আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে ও মুহাম্মদ (সা.)-কে নবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।
৪. আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি কেউ দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যা ইস্তিগফারটি পড়ে এবং ওই দিনে বা রাতে ইন্তেকাল করে, তবে সে জান্নাতি হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৬)
সাইয়েদুল ইসতেগফার হলো-
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لاَ يَغْفِرُ الذُّنوبَ إِلاَّ أَنْتَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আনতা রব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খলাকতানি ওয়া আনা আব্দুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাস্তাতাতু। আউজু বিকা মিন শাররি মা সানাতু, আবুউ লাকা বিনিমাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবুউ বিজাম্বি, ফাগফির লি, ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি আমার প্রতিপালক, আপনি ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি আমার সাধ্য মতো আপনার (তাওহিদের) অঙ্গীকার ও (জান্নাতের) প্রতিশ্রুতির ওপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। আপনি আমাকে যে নেয়ামত দিয়েছেন আমি তা স্বীকার করছি এবং আমার অপরাধও স্বীকার করছি। অতএব, আপনি আমাকে মাফ করে দিন। নিশ্চয় আপনি ছাড়া পাপরাশি ক্ষমা করার কেউ নেই।
৫. হাদিসে আছে, ‘প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় যে এ দোয়াটি তিনবার পড়বে, কোনো কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৮৮)। দোয়াটি হলো-
بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لاَ يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الأَرْضِ وَلاَ فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
উচ্চারণ: বিসমিল্লা হিল্লাজি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইয়ুন ফিল আরদি, ওয়ালা ফিস সামায়ি ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম।
অর্থ: আল্লাহ তাআলার নামে যার নামের বরকতে আকাশ ও মাটির কোনো কিছুই কোনো অনিষ্ট করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।
৬. সকাল-সন্ধ্যায় ৩ বার করে পড়বে
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمّ وَالْحَزَنِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুজনি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি ওয়া আউজুবিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখলি, ওয়া আউজু বিকা মিন গালাবাতিদ্ দায়নি ওয়া কাহরির রিজাল।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমি আপনার নিকট দুর্বলতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় কামনা করছি, আপনার নিকট কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে নাজাত কামানা করছি এবং আমি আপনার নিকট ঋণভার ও মানুষের দুষ্ট প্রভাব থেকে পরিত্রাণ চাচ্ছি।
রাসুল (সা.) এ দোয়াটি শিক্ষা দিয়ে আবু উমামা (রা.)-কে বলেন, তুমি সকাল-সন্ধ্যায় দোয়াটি পড়বে। আল্লাহ তোমার দুশ্চিন্তা দূরীভূত করবেন এবং তোমার কর্জ পরিশোধের ব্যবস্থা করবেন।
৭. ফজরের পর ৩ বার পড়বে
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ وَرِضَا نَفْسِهِ وَزِنَةَ عَرْشِهِ وَمِدَادَ كَلِمَاتِهِ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লহি ওয়াবি হামদিহি আদাদা খলকিহি ওয়া রিদা নাফসিহি ওয়াজিনাতা আরশিহি ওয়ামি দাদা কালিমাতিহি।
অর্থ: আমি আল্লাহর প্রশংসার সাথে তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করছি, তাঁর মাখলুকের সংখ্যার পরিমাণ, তাঁর সন্তুষ্টির পরিমাণ, তাঁর আরশের ওজন পরিমাণ ও তাঁর কালিমাগুলোর সংখ্যার পরিমাণ।
হাদিসে আছে, ‘কালিমাটি ফজরের পর তিনবার পড়লে ফজরের নামাজ যেখানে পড়েছে সেখানে বসে চাশতের সময় (অর্ধদিবস) পর্যন্ত ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকার চেয়েও বেশি পরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৮০৬)
৮. ফজর ও মাগরিবের পর আউজু বিল্লাহিস সামিয়িল আলিমি, মিনাশ শাইতানির রজিম তিন বার পড়ে সুরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত ১ বার পড়বে
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ
هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الْأَسْمَاء الْحُسْنَى يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
উচ্চারণ: হুওয়াল্লা হুল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়া, আলিমুল গাইবি ওয়াশ শাহাদাদতি, হুওয়ার রাহমানুর রাহিম। হুআল্লা হুল্লাযি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল মালিকুল কুদ্দুসুস সালামুল মুমিনুল মুহাইমিনুল আযিযুল জাব্বারুল মুতাকাব্বির। সুবহানাল্লাহি আম্মা ইউশরিকুন। হুআল্লাহুল খালিকুল বারিউল মুছাওয়িরু লাহুল আসমাউল হুসনা। ইউসাব্বিহু লাহু মা ফিস-সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্; ওয়া হুয়াল আযিযুল হাকিম।
অর্থ: তিনিই আল্লাহ তাআলা, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যকে জানেন, তিনি পরম দয়ালু, অসীম দাতা। তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনিই একমাত্র মালিক, পবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা, আশ্রয়দাতা, পরাক্রান্ত, প্রতাপান্বিত, মাহাত্মশীল। তারা যাকে অংশীদার করে আল্লাহ তাআলা তা থেকে পবিত্র। তিনিই আল্লাহ তাআলা, স্রষ্টা, উদ্ভাবক, রূপদাতা, উত্তম নামগুলো তাঁরই। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়। (সুরা হাশর, আয়াত: ২২-২৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এই আমল করবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য ৭০ হাজার রহমতের ফেরেশতা নিযুক্ত করে দিবেন। তাঁরা সন্ধ্যা পর্যন্ত পাঠকারীর জন্য রহমতের দোয়া করবে। সেদিন সে মারা গেলে শহীদের মৃত্যু হাসিল হবে। যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় এভাবে পাঠ করবে, সে-ও সকাল পর্যন্ত এই মর্তবা লাভ করবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৯২২)
৯. এই দোয়াটি ১০০ বার পড়বে
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়াবি হামদিহি।
অর্থ: আল্লাহ তাআলার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দৈনিক ১০০ বার তাসবিহটি পাঠ করবে তার পাপগুলো মুছে ফেলা হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনারাশির সমান হয়ে থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪০৫)
১০. কঠিন রোগব্যাধি থেকে রক্ষার জন্য এই দোয়াটি পড়বে
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُونِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّئِ الأَسْقَامِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাসি, ওয়াল জুনুনি, ওয়াল জুযামি, ওয়া মিন সাইয়ি ইল আসকাম।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শ্বেত, উন্মাদনা, কুষ্ঠ এবং সব দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে।



